আমরা প্রতিদিন অসংখ্য সিদ্ধান্ত নিই—কি খাবো, কোথায় যাবো, কীভাবে জীবন পরিচালনা করবো।
কিন্তু প্রশ্ন হলো: এই সিদ্ধান্তগুলো কি সত্যিই আমাদের নিজের? নাকি সবকিছু আগেই নির্ধারিত?
এই প্রশ্ন থেকেই উঠে আসে “Free Will” বা স্বাধীন ইচ্ছার ধারণা—যা বিজ্ঞান ও দর্শনের সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি।
Free Will কী?
Free Will বলতে বোঝায় মানুষের সেই ক্ষমতা বা সামর্থ্য, যার মাধ্যমে সে কোনো বাহ্যিক চাপ বা পূর্বনির্ধারিত কারণ ছাড়াই নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে। অর্থাৎ, আমাদের কাজগুলো কি আগে থেকেই মহাবিশ্বের নিয়ম দ্বারা নির্ধারিত, নাকি আমরা আমাদের ইচ্ছামতো ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারি—এটিই হলো মূল প্রশ্ন।
Libertarianism: উদার স্বাধীনতাবাদ
উদার স্বাধীনতাবাদ (আমরা একে ‘স্বাধীনতাবাদ’ বলবো) বলে:
মানুষের কাছে সত্যিকারের স্বাধীন ইচ্ছা আছে। অর্থাৎ, কোনো কাজ করার সময় আপনি সত্যিই ‘অন্যকরণ করতে পারতেন’ (could have done otherwise)।
বিশ্বের সব ঘটনাই পূর্ববর্তী কারণ দ্বারা অনিবার্য নয়। কিছু ঘটনা (বিশেষ করে মানুষের সচেতন সিদ্ধান্ত) মুক্ত, স্বতঃস্ফূর্ত এবং সৃষ্টিশীল।
অন্য কথায়, স্বাধীনতাবাদীরা মনে করেন আপনি যদি কোনো কাজ করেন, তাহলে সেই কাজের জন্য আপনিই চূড়ান্ত উৎস (ultimate source)। আপনার সিদ্ধান্ত শুধু আগের কারণগুলোর প্রতিফলন নয়; বরং আপনি একটি নতুন কার্যকারণ শৃঙ্খল শুরু করতে পারেন।
আপনি যখন সকালে ঘুম থেকে উঠে ভাবছেন—‘আজকে কী পরবো?’—আপনি অনুভব করেন যে আপনার কাছে দুই বা ততোধিক বিকল্প আছে এবং আপনি কোনো বাহ্যিক বাধা ছাড়াই সেগুলোর মধ্যে বেছে নিতে পারেন। এই অভিজ্ঞতা এতটাই প্রত্যক্ষ ও সত্য যে এটাকে ‘ভ্রম’ বলে উড়িয়ে দেওয়া অযৌক্তিক।
স্বাধীনতাবাদ এর সমস্যা:
যদি কোনো সিদ্ধান্ত পূর্ববর্তী কারণ দ্বারা সম্পূর্ণভাবে নির্ধারিত না হয়, তাহলে সেটি আংশিকভাবে দৈব (random) হয়। আর দৈব কোনো কিছুকে ‘আমার নিয়ন্ত্রণে’ বলে না। ধরুন, আপনার হাত কেঁপে উঠল—এটা দৈব, কিন্তু স্বাধীন নয়। তাহলে স্বাধীনতাবাদ কীভাবে দৈবতা থেকে স্বাধীনতা তৈরি করে?
আমাদের মস্তিষ্ক একটি জৈবিক অঙ্গ, যা নিউরনের গতিবিধির মাধ্যমে কাজ করে। আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান দেখায়, আপনি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই আপনার মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশ সক্রিয় হয়ে যায় (বিখ্যাত লিবেট পরীক্ষা)। স্বাধীনতাবাদকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রমাণ করতে হবে যে মস্তিষ্কের ভেতর কোনো ‘অনির্ধারিত’ প্রক্রিয়া কাজ করে যা ‘আমি’ নামক অভিকর্তা দ্বারা চালিত। এখন পর্যন্ত তার প্রমাণ নেই।
Determinism: সবকিছু কি আগে থেকেই নির্ধারিত?
Determinism বা নির্ধারণবাদ একটি মতবাদ। সহজ ভাষায়, বিশ্বের প্রতিটি ঘটনা, মানুষের প্রতিটি চিন্তা ও কর্ম, পূর্ববর্তী কারণগুলোর দ্বারা অনিবার্যভাবে নির্ধারিত। অর্থাৎ, মহাবিশ্বের বর্তমান অবস্থা যদি আপনি পুরোপুরি জানতেন, তাহলে ভবিষ্যতের সব কিছু নিখুঁতভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারতেন।
ফরাসি গণিতবিদ ও দার্শনিক পিয়েরে সিমোন ল্যাপ্লাস (১৭৪৯-১৮২৭) এই ধারণাকে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তিনি বলেন, এমন এক অসীম বুদ্ধিমত্তার অস্তিত্ব কল্পনা করা যাক (যাকে ‘ল্যাপ্লাসের দানব’ বলা হয়) যে মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বের সব কণার অবস্থান ও বেগ জানতে পারে। তাহলে সে অতীত ও ভবিষ্যতের সব কিছু সমীকরণের মতো হিসেব করে ফেলতে পারে। তার কাছে ‘আকস্মিকতা’ বা ‘নতুন সৃজন’ বলে কিছু নেই। সব কিছুই কার্যকারণের শৃঙ্খলে বাঁধা।
বিজ্ঞান কি নির্ধারণবাদকে সমর্থন করে?
ক্লাসিক্যাল পদার্থবিদ্যা (নিউটনের বলবিজ্ঞান) পুরোপুরি নির্ধারণবাদী। আপনি যদি একটি পাথর ছুড়ে মারেন, তার গতিপথ সম্পূর্ণভাবে প্রাথমিক বেগ, কোণ, অভিকর্ষজ ত্বরণ দ্বারা নির্ধারিত। এই দৃষ্টিতে মানুষের মস্তিষ্কও জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়ার একটি অংশ মাত্র। আপনার ‘আমি এটি করতে চাই’ অনুভূতিটিও আসলে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট নিউরনের গতিবিধির অনিবার্য পরিণতি।
কিন্তু ২০শ শতাব্দীর কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান বলছে, অতিক্ষুদ্র কণার জগতে ঘটনা সম্পূর্ণ অনির্ধারিত ও দৈব। ইলেকট্রনের অবস্থান আমরা শুধু সম্ভাবনার ভিত্তিতে বলতে পারি, নিশ্চিত করে না। এর মানে কি নির্ধারণবাদ ভুল? এটা এখনো বিতর্কিত, কারণ ‘দৈব’ মানেই ‘স্বাধীন ইচ্ছা’ নয়——দৈব তো নিয়ন্ত্রণহীন, তাও স্বাধীনতার মতো কিছু নয়। গনিতের সম্ভাবনা আমাদের শেখায় যে, এই ‘দৈব’ নিজেও এক সম্ভাবনা।
Compatibilism: আমরা সীমার মধ্যে স্বাধীন
Compatibilism বা সঙ্গতিবাদের মূল বক্তব্য অত্যন্ত সোজা:
একটি কাজ তখনই স্বাধীন বলে গণ্য হবে, যখন সেটি ব্যক্তির নিজস্ব ইচ্ছা, চরিত্র ও যুক্তি অনুযায়ী করা হয়—এবং তাতে বাহ্যিক কোনো বাধা বা জবরদস্তি না থাকে। এই স্বাধীনতা পূর্বনির্ধারণের সঙ্গে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ।
অন্য ভাষায়, স্বাধীন ইচ্ছার জন্য ‘পূর্বনির্ধারিত না হওয়া’ জরুরি নয়; বরং জরুরি হলো ‘আপনার অভ্যন্তরীণ কারণের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া’।
স্কটিশ দার্শনিক ডেভিড হিউম ছিলেন সঙ্গতিবাদের অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি বলেছিলেন, মানুষ স্বাভাবিকভাবে ‘নির্ধারণ বনাম স্বাধীনতা’কে ভুলভাবে বিরোধী ভাবে। আসলে ‘স্বাধীনতা’ বলতে বোঝায় ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করার ক্ষমতা—যেখানে ইচ্ছা নিজেও কারণ দ্বারা নির্ধারিত। তিনি লেখেন: “স্বাধীনতা ও নির্ধারণের মধ্যে যে বিরোধ কল্পনা করা হয়, তা একটি ভুল ধারণার ওপর ভিত্তি করে।”
নির্ধারণবাদ ও স্বাধীন ইচ্ছার এই বিতর্কের সহজ উত্তর সম্ভবত নেই। সবচেয়ে বাস্তবসম্মত অবস্থানটি হয়তো মধ্যপন্থী সঙ্গতিবাদ। আমরা আমাদের জিন, পরিবেশ ও ইতিহাস দ্বারা অনেকটাই আকৃতি পাই (নির্ধারণ), কিন্তু সেই আকৃতির ভেতরেই আমাদের চিন্তা, প্রতিফলন ও যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গা আছে (স্বাধীনতা)। ঠিক যেমন একটি নদীর গতিপথ তার খাত দ্বারা নির্ধারিত, কিন্তু খাতের ভেতরে প্রতিটি ফোঁটা জলের ‘বেছে নেওয়ার’ মতো কিছু না থাকলেও নদী নিজেই নিজের পথ খুঁজে নেয়।
আপনি হয়তো ‘স্বাধীন’ না, কিন্তু ‘সার্থক’ (meaningful) ও ‘দায়বদ্ধ’। আর এটাই সম্ভবত যথেষ্ট।
(আরও পড়ুন - স্পর্শের বিভ্রম)
