আপনি কি জানেন, আপনি যে চেয়ারে বসেছেন, তার পরমাণুর ৯৯.৯৯৯৯% জায়গাই ফাঁকা? তবুও চেয়ার আপনাকে ধরে রেখেছে, পড়তে দেয়নি। আর আপনি চেয়ারটিকে মসৃণ, কঠিন ও বাস্তব বলে অনুভব করছেন। কী অদ্ভুত বিরোধ! চলুন, আজ আমরা এই রহস্যের গভীরে ডুব দিই – পরমাণুর অন্তঃস্থ শূন্যতা থেকে স্পর্শের অনুভূতি পর্যন্ত।
পরমাণু: মরুভূমির মাঝে এক বিন্দু মরীচিকা
আমরা ছোটবেলায় পড়ি, পরমাণুতে থাকে নিউক্লিয়াস ও ইলেক্ট্রন। কিন্তু তুলনা করলে দেখা যায়, যদি নিউক্লিয়াস পিংপং বলের আকার হয়, তাহলে প্রথম ইলেক্ট্রনের কক্ষপথ হবে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে! আর তাদের মাঝের পুরো জায়গা শূন্য। তবু কেন একটি লোহার টুকরো বা পাথর আমাদের হাতে শক্ত ঠেকে?
উত্তরটি সহজ নয়, মজারও বটে।
কেন ফাঁকা পরমাণু ‘সলিড’ লাগে? – বৈদ্যুতিক বিকর্ষণের খেলা
আপনি যখন কোনো পাথর স্পর্শ করেন, তখন আপনার হাতের পরমাণু ও পাথরের পরমাণু সরাসরি ছুঁয়ে যায় না। বরং তাদের বাইরের ইলেক্ট্রনগুলো একে অপরকে প্রবলভাবে বিকর্ষণ করে। এটি চুম্বকের সমমেরুর মতো – যত কাছে যান, তত জোরে ঠেলে দেয়। এই বিকর্ষণ বল এত শক্তিশালী যে আপনার হাতের ইলেক্ট্রন ও পাথরের ইলেক্ট্রনের মধ্যে সর্বদা একটি অতিক্ষুদ্র ফাঁক থেকে যায়। আপনার মস্তিষ্ক সেই বিকর্ষণকেই ‘কঠিন স্পর্শ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে।
সহজ ভাষায় আপনি আসলে কখনো কোনো বস্তুকে ‘স্পর্শ’ করেন না। স্পর্শ মানেই বৈদ্যুতিক প্রতিক্রিয়া।
কোয়ান্টাম মেকানিক্সের চশমায় স্পর্শ
এখানে আরও গভীর সত্য আছে। কোয়ান্টাম জগতে ইলেক্ট্রন কণা নয়, বরং সম্ভাবনার মেঘ (ইলেক্ট্রন ক্লাউড)। দুই বস্তুর ইলেক্ট্রন মেঘ একে অপরের উপর চাপ দিলে সেখান থেকে জন্ম নেয় ‘পাউলির অপবর্জন নীতি’ – একই কোয়ান্টাম অবস্থায় দুটি ইলেক্ট্রন থাকতে পারে না। ফলে তারা একে অপরের অস্তিত্বকে ‘অনুভব’ করে এবং দূরে সরে যায়। এই ধাক্কাই স্পর্শের মূলে।
অর্থাৎ, স্পর্শ একধরনের ‘অদৃশ্য দেয়াল’ – যা ইলেক্ট্রনদের পরস্পরকে লঙ্ঘন করতে বাধা দেয়।
তাহলে স্পর্শের ‘ফাঁক’ কোথায়?
এই প্রশ্নটি খুব প্রাসঙ্গিক: “স্পর্শের অনুভূতিতেও কি স্পেস থাকে?” হ্যাঁ, থাকে। আণুবীক্ষণিক স্তরে আপনার হাতের ত্বক ও চেয়ারের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে কয়েক ন্যানোমিটারের ফাঁক সবসময় বর্তমান। কিন্তু স্নায়ুকোষগুলো এতই সংবেদনশীল যে ওই দূরত্বের ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক পরিবর্তন তারা ধরে ফেলে। মস্তিষ্ক তাকে ‘চাপ’ ও ‘স্পর্শ’ হিসেবে রূপ দেয়।
আরও মজার ব্যাপার হলো – আপনি যদি খুব শক্ত করে কিছু চেপে ধরেন, তাহলে ইলেক্ট্রন মেঘ এত কাছে চাপা পড়ে যে কোয়ান্টাম টানেলিং (অতিক্রমণ) ঘটতে পারে। এটাই ফ্ল্যাশ মেমরি ও ট্রানজিস্টরের মূলনীতি।
স্পর্শ এক অপূর্ব মিথ্যা
সুতরাং পরমাণুর বিশাল শূন্যতা সত্ত্বেও আমরা কঠিন অনুভূতি পাই, কারণ ইলেক্ট্রনদের পারস্পরিক বিকর্ষণ বল এক অদৃশ্য প্রাচীর তৈরি করে। আর ‘স্পর্শ’ নামক অভিজ্ঞতা আসলে সেই প্রাচীরের চাপ সম্পর্কে মস্তিষ্কের তৈরি এক অনুবাদ।
বিজ্ঞান আমাদের চোখ খুলে দেয়: পৃথিবী যত কঠিন, ততই অসার – গভীরে গেলে সবই কম্পন, সম্ভাবনা ও ফাঁকা জায়গা। তথাপি এই শূন্যতার ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে আমাদের প্রতিটি আঁকড়ে ধরা, প্রতিটি আদর ও প্রতিটি শক্ত মুঠো। সত্যিই, বাস্তবতার চেয়ে বিস্ময়কর কল্পকাহিনি আর কী হতে পারে?
