আমাদের রাতের আকাশের সবচেয়ে পরিচিত বস্তু চাঁদ। এর মায়াবী আলো, জোয়ার-ভাটার খেলা, এবং পূর্ণিমার রূপ—সবকিছুই আমাদের চিরকালীন মুগ্ধতার উৎস। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন দীর্ঘকাল ধরে বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের ভাবিয়ে তুলেছে: এই চাঁদের উৎপত্তি কীভাবে হলো? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা পৌঁছেছেন আমাদের সৌরজগতের শৈশবের এক ভয়াবহ মহাজাগতিক দুর্ঘটনার কাছে। আজ থেকে প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে, ‘থিয়া’ নামক একটি প্রাচীন গ্রহের সাথে পৃথিবীর সংঘর্ষের ফলেই আমাদের চাঁদের জন্ম হয়েছিল বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। এটি শুধু একটি তত্ত্ব নয়, বর্তমানে এটি চাঁদের উৎপত্তির সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। আসুন, এই মহাজাগতিক ঘটনার গভীরে ডুব দিয়ে চাঁদের জন্মরহস্য উন্মোচন করি।
চাঁদের জন্মকথার সূচনা
আমাদের একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ চাঁদ। সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহ-উপগ্রহের তুলনায় এটি ব্যতিক্রমীভাবে বড়, যা জোড়া-গ্রহ ব্যবস্থার (double-planet system) মতো আচরণ করে। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই জানতেন যে, চাঁদের উৎপত্তি কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭২ সালের মধ্যে অ্যাপোলো মিশনের মাধ্যমে চন্দ্রপৃষ্ঠ থেকে আনা প্রায় ৩৮২ কেজি পাথর ও মাটির নমুনা গবেষণার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এই নমুনাগুলো বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, চাঁদের গঠন পৃথিবীর সাথে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়। এই সাদৃশ্যই পরবর্তীতে জায়ান্ট-ইমপ্যাক্ট তত্ত্বের ভিত্তি তৈরি করে দেয়।
থিয়া কে? এক হারানো গ্রহের গল্প
থিয়া হলো প্রাচীন সৌরজগতের একটি কাল্পনিক প্রোটোপ্ল্যানেট (আদিগ্রহ), যা বর্তমানে আর বিদ্যমান নেই। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি আকারে ছিল মঙ্গল গ্রহের সমান। আধুনিক সিমুলেশন বলছে, থিয়ার ভর ছিল পৃথিবীর ভরের প্রায় ১০% থেকে ৪৫% এর মধ্যে। নামটি এসেছে গ্রিক পুরাণ থেকে, যেখানে থিয়া ছিলেন চাঁদের দেবী সেলিনের মা।
থিয়ার উৎপত্তিস্থল নিয়েও বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন এটি সৌরজগতের বাইরের অংশে জন্মেছিল, কেউ বলেন একদম ভেতরের দিকে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত এক যুগান্তকারী গবেষণায় লোহার আইসোটোপ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, থিয়া সম্ভবত সৌরজগতের অভ্যন্তরীণ অংশেই গঠিত হয়েছিল এবং পৃথিবীর কাছাকাছি কক্ষপথেই ঘুরছিল।
প্রাচীন তত্ত্বগুলো: ফিশন, ক্যাপচার ও সহ-গঠন
জায়ান্ট-ইমপ্যাক্ট তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে চাঁদের উৎপত্তি নিয়ে আরও কয়েকটি তত্ত্ব প্রচলিত ছিল:
ফিশন তত্ত্ব (Fission Theory): ১৮৭৯ সালে জর্জ ডারউইন প্রস্তাব করেন, পৃথিবী যখন তরল অবস্থায় ছিল, তখন দ্রুত ঘূর্ণনের ফলে এর একটি অংশ ছিটকে গিয়ে চাঁদ তৈরি হয়।
ক্যাপচার তত্ত্ব (Capture Theory): চাঁদ অন্য কোথাও তৈরি হয়ে পরে পৃথিবীর মহাকর্ষে বন্দী হয়েছে।
সহ-গঠন তত্ত্ব (Co-formation Theory): পৃথিবী ও চাঁদ একই সময়ে একই অঞ্চলে পাশাপাশি গঠিত হয়েছিল।
কিন্তু অ্যাপোলো মিশনের পর এই তত্ত্বগুলো একে একে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং জায়ান্ট-ইমপ্যাক্ট তত্ত্বই মূলধারায় চলে আসে।
জায়ান্ট-ইমপ্যাক্ট হাইপোথিসিস
জায়ান্ট-ইমপ্যাক্ট হাইপোথিসিস (Giant-Impact Hypothesis), যাকে কখনো কখনো ‘থিয়া ইমপ্যাক্ট’ও বলা হয়, প্রথম প্রস্তাব করেন কানাডীয় ভূতত্ত্ববিদ রেজিনাল্ড ডেলি ১৯৪৬ সালে। ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি এটি পুনরুজ্জীবিত হয় এবং বর্তমানে এটি চাঁদের উৎপত্তি সম্পর্কিত সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তত্ত্ব।
এই তত্ত্ব অনুসারে, সৌরজগতের গঠনের প্রায় ৫ থেকে ১০ কোটি বছর পর (আজ থেকে প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে), একটি মঙ্গল-আকারের বস্তু পৃথিবীর সাথে ধাক্কা খায়। এই সংঘর্ষ এতটাই ভয়াবহ ছিল যে এর ফলে সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষ থেকে ধীরে ধীরে চাঁদ গঠিত হয়। পৃথিবী ও চন্দ্র পৃষ্ঠের খনিজ ও আইসোটোপের সাদৃশ্যই এই তত্ত্বের পক্ষে সবচেয়ে জোরালো প্রমাণ।
আরও পড়ুন -
মহাসংঘর্ষের প্রক্রিয়া
সেই সংঘর্ষের সময় সৌরজগতের বয়স ছিল মাত্র ৫ থেকে ১০ কোটি বছর। পৃথিবী তখনো পুরোপুরি ঠাণ্ডা হয়ে শক্ত হয়নি—তার পৃষ্ঠ ছিল উত্তপ্ত লাভায় ভরা।
মহাকর্ষীয় টানের কারণে থিয়া নামের সেই প্রোটোপ্ল্যানেটটি ধীরে ধীরে পৃথিবীর দিকে এগিয়ে আসে। শেষ পর্যন্ত এটি আনুমানিক ৪৫ ডিগ্রি কোণে ও সেকেন্ডে প্রায় ৯.৮ কিলোমিটার বেগে পৃথিবীকে আঘাত করে। এই আঘাতে থিয়া সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়, আর পৃথিবীর বিশাল অংশ ছিটকে মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়ে।
এই ধ্বংসাবশেষ দ্রুত পৃথিবীর চারপাশে একটি চাকতি তৈরি করে, যা পরবর্তীতে একত্রিত হয়ে চাঁদ গঠন করে। কিছু আধুনিক সিমুলেশন এমনটাই ইঙ্গিত দেয় যে, এই পুরো প্রক্রিয়াটি ঘটেছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই।
প্রমাণ ও রহস্য: কেন এই তত্ত্ব এত শক্তিশালী?
জায়ান্ট-ইমপ্যাক্ট তত্ত্বের পক্ষে বেশ কিছু শক্তিশালী প্রমাণ রয়েছে:
কক্ষপথের অভিমুখ: চাঁদের কক্ষপথ পৃথিবীর ঘূর্ণনের অভিমুখের সাথে প্রায় সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আইসোটোপিক সাদৃশ্য: অ্যাপোলো মিশনের মাধ্যমে আনা চন্দ্রপাথর ও পৃথিবীর শিলায় অক্সিজেন, লোহা, পটাশিয়ামসহ বিভিন্ন আইসোটোপের অনুপাত প্রায় অভিন্ন। এটি ইঙ্গিত করে যে, এদের উৎস একটিই—এই সংঘর্ষ।
লোহার অভাব: চাঁদে লোহার পরিমাণ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। এই তত্ত্ব এটি ব্যাখ্যা করতে পারে, কারণ চাঁদ তৈরি হয়েছে মূলত পৃথিবীর উপরিভাগের (crust) হালকা উপাদান থেকে।
ভূ-গর্ভে থিয়ার চিহ্ন (LLVPs): ২০২৩ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর কেন্দ্রের কাছে আফ্রিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরের নিচে অবস্থিত দুটি বিশাল ঘন শিলাখণ্ড (Large Low-Velocity Provinces বা LLVPs) সম্ভবত থিয়ারই অবশিষ্টাংশ। এই ব্লবগুলোর প্রতিটির ভর চাঁদের প্রায় দ্বিগুণ।
থিয়ার ভাগ্য: ধ্বংস নাকি মিশে যাওয়া?
সংঘর্ষের পর থিয়ার কী হয়েছিল? বিজ্ঞানীদের ধারণা, এর মূল অংশ বা কোর পৃথিবীর কোরের সাথে মিশে যায়, যে কারণে পৃথিবীর কোর আশানুরূপভাবে বড়। ২০২৩ সালের সেই একই গবেষণা বলছে, থিয়ার ম্যান্টেল (আবরণ) এর কিছু অংশ পৃথিবীর নিম্ন ম্যান্টলে অক্ষত অবস্থায় টিকে আছে। এই ঘন শিলাগুলোই আজ LLVPs নামে পরিচিত।
চাঁদের দ্রুত জন্ম: কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সৃষ্টি!
দীর্ঘদিন ধরে মনে করা হতো, সংঘর্ষের পর ধ্বংসাবশেষ থেকে চাঁদ গঠিত হতে লাখ লাখ বছর লেগেছিল। কিন্তু ২০২২ সালে নাসার এক অত্যাধুনিক সুপারকম্পিউটার সিমুলেশন একটি চমকপ্রদ তথ্য প্রকাশ করে: চাঁদের গঠন মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সম্পন্ন হয়ে থাকতে পারে। এই গবেষণা অনুযায়ী, সংঘর্ষের পর ধ্বংসাবশেষ সরাসরি কক্ষপথে স্থাপিত হয়ে দ্রুত জমাট বেঁধে চাঁদ তৈরি করে, যা পূর্বের ধারণার তুলনায় অনেক দ্রুততর। এটি থিওরিটির জন্য একটি বড় ধরণের আপডেট এবং চন্দ্রগঠনের গতি সম্পর্কে নতুন ধারণা দেয়।
বিকল্প মডেল ও সাম্প্রতিক গবেষণা
যদিও জায়ান্ট-ইমপ্যাক্ট তত্ত্ব বহুল গৃহীত, তবুও কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়। যেমন, চাঁদ ও পৃথিবীর মধ্যে আইসোটোপের অত্যাধিক সাদৃশ্য নিয়ে ধাঁধা তৈরি হয়েছিল। এর সমাধানে বিজ্ঞানীরা কিছু বিকল্প মডেল প্রস্তাব করেছেন:
বৃহত্তর থিয়া: রবিন ক্যানাপ প্রস্তাব করেন, থিয়া ছোট ছিল না, বরং প্রায় অর্ধ-পৃথিবীর সমান ভরের ছিল। এতে সংঘর্ষের পর উভয় বস্তুর মিশ্রণে চাঁদের গঠন সহজেই ব্যাখ্যা করা যায়।
দ্রুত ঘূর্ণায়মান পৃথিবী: মাটিজা চুক ও সারা স্টুয়ার্টের মডেলে দেখা যায়, সংঘর্ষের আগে পৃথিবী খুব দ্রুত ঘুরছিল (দিন ছিল মাত্র ২-৩ ঘণ্টার), ফলে অপেক্ষাকৃত ছোট প্রভাবকও পৃথিবী থেকে অনেক উপাদান ছিটকে দিতে পারে।
সাম্প্রতিক গবেষণায় চাঁদের বরফ ও উদ্বায়ী পদার্থের উপর জোর দিয়ে থিওরিটির আরও ব্যাখ্যা-সাপেক্ষ দিকগুলো উন্মোচিত হচ্ছে।
সাংস্কৃতিক প্রভাব ও নামকরণের ইতিহাস
এই তত্ত্ব আমাদের সংস্কৃতি ও দর্শনেও প্রভাব ফেলেছে। ‘থিয়া’ নামটি এসেছে গ্রীক পুরাণ থেকে, যেখানে থিয়া ছিলেন চাঁদের দেবী সেলিনের মা। বাংলা সাহিত্যেও চাঁদের উৎপত্তি নিয়ে কৌতূহলের অন্ত নেই। ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রথম আলো-সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে এই তত্ত্ব নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
চাঁদের জন্ম যে এত নাটকীয় ও ধ্বংসাত্মক একটি ঘটনার ফসল, তা সত্যিই বিস্ময়কর। মহাজাগতিক এই সংঘর্ষ কেবল আমাদের রাতের আকাশের শোভাই বাড়ায়নি, বরং পৃথিবীর কক্ষপথ, অক্ষীয় হেলানো অবস্থান (যা ঋতু পরিবর্তন ঘটায়) ও জোয়ার-ভাটা নিয়ন্ত্রণ করে প্রাণের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। থিয়া আজ আর নেই, কিন্তু তার স্মৃতি রয়ে গেছে আমাদের চাঁদে এবং আমাদের পায়ের নিচে পৃথিবীর গভীরে।
আরও পড়ুন -
