কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি

    প্রযুক্তি কি আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে?

    আমাদের হাতের মুঠোয় এখন গোটা পৃথিবী। স্মার্টফোনের একটি টোকায় আমরা পৌঁছে যাই মহাদেশ থেকে মহাদেশে, জানতে পারি গ্রহ-নক্ষত্রের খবর, ক্রয় করতে পারি প্রয়োজনীয় জিনিস, এমনকি ভালোবাসার মানুষটির মুখও দেখতে পাই চোখের নিমেষে। কিন্তু এই আপাত-স্বাধীনতার আড়ালে একটি গভীর প্রশ্ন ধীরে ধীরে আমাদের গ্রাস করছে: প্রযুক্তি কি আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে? আমরা যাকে হাতিয়ার ভেবে ব্যবহার করছি, সেই হাতিয়ারই কি আমাদের আচরণ, চিন্তা, আবেগ ও সিদ্ধান্তগুলোকে অলক্ষ্যে পরিচালিত করছে?

    প্রযুক্তি কি আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে?

    এই ব্লগ পোস্টে আমরা ডিজিটাল যুগের এই মৌলিক দ্বন্দ্বের গভীরে প্রবেশ করব। আমরা দেখব কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্ট ডিভাইস ও নজরদারি প্রযুক্তি আমাদের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিকে চ্যালেঞ্জ করছে। দর্শন, মনোবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি-সমাজতত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করব, প্রকৃতপক্ষে আমরা প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করছি, নাকি প্রযুক্তিই আমাদের এক অদৃশ্য খাঁচায় বন্দি করে ফেলেছে।

    প্রযুক্তি ও নিয়ন্ত্রণ

    মানবসভ্যতার ইতিহাস মানেই প্রযুক্তির ইতিহাস। আগুন আবিষ্কার থেকে চাকা, ছাপাখানা থেকে বাষ্পীয় ইঞ্জিন—প্রতিটি প্রযুক্তিই আমাদের জীবনকে সহজ করেছে এবং একইসঙ্গে আমাদের চিন্তা ও সমাজকাঠামোকে বদলে দিয়েছে। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে এই সম্পর্কে একটি আমূল পরিবর্তন আসে। প্রযুক্তি কেবল আর বাইরের জগতের সম্প্রসারণ নয়, এটি এখন আমাদের অন্তর্জগতের প্রবেশদ্বার হয়ে উঠেছে। সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের আত্মপ্রকাশের মাধ্যম, সার্চ ইঞ্জিন আমাদের জ্ঞানের উৎস, আর স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম আমাদের বিনোদনের একচ্ছত্র ঠিকানা।

    এই পরিবর্তনের মূলে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক শিফট: প্রযুক্তি যখন ‘আমরা কী করতে চাই’ সেটা সহজ করে দেওয়ার বদলে ‘আমরা কী চাই’ সেটাই নির্ধারণ করে দিতে শুরু করে, তখনই তা হাতিয়ার থেকে প্রভুতে রূপান্তরিত হয়। কানাডীয় দার্শনিক মার্শাল ম্যাকলুহানের বিখ্যাত উক্তি, “মাধ্যমই বার্তা” (The Medium is the Message)—একথা আজ চূড়ান্ত সত্য। আমরা যে মাধ্যমে যোগাযোগ করি, সেই মাধ্যমটিই আমাদের চেতনা ও সমাজের চরিত্র নির্ধারণ করে দেয়, বিষয়বস্তু নয়।

    অ্যালগরিদমের কারাগার: স্বাধীনতার মরীচিকা

    আমরা যেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ফেসবুক বা ইউটিউব খুলি, আমাদের সামনে যা আসে তা মোটেই নিরপেক্ষভাবে সাজানো নয়। একটি জটিল অ্যালগরিদম আমাদের অতীতের পছন্দ, ক্লিক, বিরতির সময়কাল ও ডেমোগ্রাফিক তথ্যের ভিত্তিতে ঠিক করে দেয় আমরা কী দেখব। এই পরিস্থিতিতে আমাদের ‘পছন্দ’ আসলে কী, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

    ফিল্টার বাবল ও ইকো চেম্বার

    অ্যালগরিদমের কাজ হলো আমাদের যতটা সম্ভব প্ল্যাটফর্মে আটকে রাখা। এই উদ্দেশ্যে এটি আমাদের এমন কনটেন্ট দেখায় যা আমাদের পূর্বধারণাকে শক্তিশালী করে। ফলে আমরা একধরনের ‘ফিল্টার বাবল’-এর ভেতর ঢুকে যাই, যেখানে ভিন্নমত বা বিকল্প চিন্তার কোনো স্থান নেই। এই ইকো চেম্বারে আমরা কেবল নিজেদেরই প্রতিধ্বনি শুনতে থাকি। আমাদের মতামত মেরুকৃত হয়, সমাজ বিভক্ত হয়। এখানে প্রযুক্তি আমাদের চিন্তার স্বাধীনতাকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করছে। আমরা ভাবছি, ‘এটা তো আমারই পছন্দের ভিডিও’, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পছন্দটি তৈরি করে দিয়েছে একটি মেশিন-লার্নিং মডেল।

    ডুপামিন ইঞ্জিনিয়ারিং

    সোশ্যাল মিডিয়ার নোটিফিকেশন, লাইক, কমেন্ট—এগুলো কোনো নিরীহ ফিচার নয়। এগুলো ডিজাইন করা হয়েছে আমাদের মস্তিষ্কের ডোপামিন নিঃসরণ প্রক্রিয়াকে উদ্দীপ্ত করার জন্য। বিখ্যাত প্রযুক্তি-নৈতিকতাবিদ ট্রিস্টান হ্যারিস বলেছেন, স্মার্টফোন হলো আধুনিক যুগের ‘স্লট মেশিন’। যখন আমরা ফোন চেক করি, আমরা কখনো পুরস্কার (লাইক, মেসেজ) পাই, কখনো পাই না। এই অনিশ্চয়তাই আমাদের আসক্ত করে তোলে। আচরণগত মনোবিজ্ঞানের গভীর জ্ঞান ব্যবহার করে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এমন ইন্টারফেস তৈরি করেছে, যা আমাদের অবচেতন মনকে শাসন করে। এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ এতটাই নিপুণ যে আমরা নিজেরাই বুঝতে পারি না, কেন আমরা অকারণে ফোনটা বারবার খুলে দেখছি।

    মানুষ কি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে?

    কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) উত্থান প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ-প্রশ্নকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আগে প্রযুক্তি আমাদের পছন্দকে প্রভাবিত করত, এখন এআই সরাসরি আমাদের হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেছে। ব্যাংক লোন অনুমোদন, চাকরির আবেদন যাচাই, এমনকি অপরাধের সম্ভাব্যতা বিচার (Predictive Policing)—সবখানেই অ্যালগরিদমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ঢুকে পড়েছে।

    ‘ব্ল্যাক বক্স’ সমস্যা

    সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, অনেক জটিল এআই মডেলের সিদ্ধান্তের পেছনের যুক্তি মানুষের বোধগম্য নয়। একে বলা হয় ‘ব্ল্যাক বক্স’ সমস্যা। যখন একটি এআই বলে, ‘আপনি এই ঋণের যোগ্য নন’, তখন কেন নন, তা বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয় না। এর ফলে এক ধরনের স্বৈরাচারী প্রযুক্তিগত কাঠামো তৈরি হয়, যেখানে মানুষের কাছে আবেদনের কোনো জায়গা থাকে না। ক্ষমতা চলে যায় সেইসব কর্পোরেশন বা রাষ্ট্রের হাতে, যারা এই অ্যালগরিদম নিয়ন্ত্রণ করে।

    স্বয়ংক্রিয়তা ও স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি

    স্বয়ংক্রিয় গাড়ি যখন পথচারী ও যাত্রীর জীবন বাঁচানোর মধ্যে এক নৈতিক সিদ্ধান্ত নেবে, তখন সেই সিদ্ধান্তের নৈতিক ভিত্তিটা কে নির্ধারণ করবে? প্রোগ্রামার? কর্পোরেট নীতি? নাকি সরকার? আমরা প্রতিনিয়ত এমন কিছু সিদ্ধান্তের ভার যন্ত্রের হাতে ছেড়ে দিচ্ছি, যা মৌলিকভাবে মানুষের নৈতিকতা ও সহমর্মিতার ব্যাপার। এভাবে ধীরে ধীরে আমরা আমাদের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির অনুশীলন করার সুযোগটুকুই হারাতে বসেছি।

    নজরদারি পুঁজিবাদ: আপনি নিজেই পণ্য

    হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক শোশানা জুবফ ‘নজরদারি পুঁজিবাদ’ (Surveillance Capitalism) নামে একটি নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কথা বলেছেন। এই ব্যবস্থায়, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মূল পণ্য আমরা নিজেরা—আরও নির্দিষ্ট করে বললে, আমাদের অভিজ্ঞতা, আচরণ ও তথ্য। গুগল বা ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো আমাদের ব্যক্তিগত তথ্যের পাহাড় সংগ্রহ করে, তাকে প্রক্রিয়াজাত করে এবং ভবিষ্যতে আমাদের আচরণ কী হবে, তা পূর্বাভাস দিয়ে বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বিক্রি করে।

    এই মডেলে আমাদের সম্মতি একধরনের ছদ্ম-সম্মতি। হাজার হাজার শব্দের ‘প্রাইভেসি পলিসি’ পড়ে ‘Agree’ বাটনে ক্লিক করার মাধ্যমে আমরা আমাদের জীবনের গোপনতম অধ্যায়গুলোকে বাজারে ছেড়ে দিচ্ছি। এখানে নিয়ন্ত্রণ এতই সূক্ষ্ম যে আমরা স্বেচ্ছায় নিজেদেরই কারারুদ্ধ করছি। ডিজিটাল জগতে আমাদের প্রতিটি পদচারণা রেকর্ড হচ্ছে, আমাদের চাওয়া-পাওয়াকে ইঞ্জিনিয়ার করা হচ্ছে, এবং আমরা ক্রমশ এক ‘উত্তর-গোপনীয়তার’ যুগে প্রবেশ করছি, যেখানে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের ধারণাটাই বিপন্ন।

    আরও পড়ুন - সাইবার নিরাপত্তা : কেন গুরুত্বপূর্ণ?

    আসক্তি নয়, পুনর্নির্মাণ

    আমরা যখন বলি ‘প্রযুক্তি আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে’, তখন এটা নিছক একটি রূপক নয়; এটা স্নায়ুবিজ্ঞানের বাস্তবতা। মানুষের মস্তিষ্ক বিবর্তিত হয়েছে বেঁচে থাকার জন্য, ডিজিটাল জগতের জন্য নয়। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের স্নায়ুবিক গঠনকেই বদলে দিচ্ছে।

    নিউরোপ্লাস্টিসিটি ও ডিজিটাল অভ্যাস

    নিউরোপ্লাস্টিসিটি হলো মস্তিষ্কের নিজেকে পুনর্গঠিত করার ক্ষমতা। আমরা যখন প্রতিনিয়ত ছোট ছোট ডিজিটাল কনটেন্ট (রিলস, শর্টস, টুইট) গ্রহণ করি, আমাদের মস্তিষ্কের ‘অ্যাটেনশন স্প্যান’ বা মনোযোগের স্থায়িত্ব কমতে থাকে। আমরা গভীর কোনো কিছু পড়ার বা চিন্তা করার ধৈর্য হারিয়ে ফেলি। এটি কোনো তাত্ত্বিক আশঙ্কা নয়; গবেষণায় দেখা গেছে, গত দুই দশকে মানুষের গড় মনোযোগের স্থায়িত্ব ১২ সেকেন্ড থেকে কমে ৮ সেকেন্ডে নেমে এসেছে, যা একটি গোল্ডফিশের চেয়েও কম! প্রযুক্তি এখানে আমাদের মস্তিষ্ককে শারীরিকভাবে পুনর্গঠিত করে তার বশীভূত করে ফেলছে।

    FOMO ও সামাজিক উদ্বেগ

    সোশ্যাল মিডিয়া ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’ (FOMO) নামে এক মানসিক অবস্থার জন্ম দিয়েছে। অন্যদের পোস্ট করা জীবনযাপনের চকচকে ছবি দেখে আমরা প্রতিনিয়ত হীনমন্যতা ও উদ্বেগে ভুগি। এর ফলে আমরা আরও বেশি করে সেই প্ল্যাটফর্মেই ডুবে থাকি, কারণ ভয় হয়—না জানি কী মিস করলাম! এটি এক দুষ্টচক্র। উদ্বেগ কমাতে আমরা প্রযুক্তিই ব্যবহার করি, কিন্তু সেই প্রযুক্তিই আবার উদ্বেগের মূল উৎস। এই আচরণগত নিয়ন্ত্রণ এতটাই শক্তিশালী যে সিগারেট বা মদের চেয়েও ছাড়া কঠিন।

    প্যানোপ্টিকন থেকে ডিজিটাল কারাগার

    ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো ‘শাস্তি ও সভ্যতা’ গ্রন্থে জেরেমি বেন্থামের ‘প্যানোপ্টিকন’ কারাগারের ধারণা ব্যবহার করে আধুনিক সমাজের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ব্যাখ্যা করেছেন। প্যানোপ্টিকন ছিল এমন এক কারাগার, যেখানে একজন প্রহরী কেন্দ্র থেকে সব বন্দিকে দেখতে পারে, কিন্তু বন্দিরা কখনো জানে না তারা ঠিক কখন দেখা হচ্ছে। ফলে বন্দিরা নিজেদেরই নিজেরা নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। আজকের ডিজিটাল জগৎ এক বিশাল প্যানোপ্টিকন। আমরা ক্যামেরা, ব্রাউজিং হিস্ট্রি, জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত এক অদৃশ্য প্রহরীর (সরকার বা কর্পোরেশন) নজরে আছি। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার, আমরা জেনেছি যে আমাদের নজরদারি করা হচ্ছে, কিন্তু ঠিক কখন, কীভাবে, কতটা—তা না জানার কারণে আমরা স্বেচ্ছায় আমাদের আচরণ শোধন করি। এভাবেই প্রযুক্তি শারীরিক শৃঙ্খল ছাড়াই আমাদের মন ও দেহের ওপর কর্তৃত্ব স্থাপন করে।

    প্রযুক্তি কি তবে সম্পূর্ণ দোষী?

    এই বিশ্লেষণের পর মনে হতে পারে, প্রযুক্তি বুঝি এক ভয়ংকর দানব, আর আমরা তার অসহায় শিকার। কিন্তু ছবিটা সম্পূর্ণ একপেশে নয়। প্রযুক্তির এই দার্শনিক সমালোচনা করতে গিয়ে আমরা যেন মানুষের ‘এজেন্সি’ বা নিজস্ব ক্ষমতাকে খাটো না করি। প্রতিটি প্রযুক্তি ব্যবহারের পেছনে একটি সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট থাকে।

    প্রযুক্তি নির্ধারণবাদ বনাম সামাজিক নির্মাণ

    প্রযুক্তি নির্ধারণবাদ (Technological Determinism) বলে, প্রযুক্তি সমাজকে চালিত করে। কিন্তু এই মতবাদ পুরোপুরি সত্য নয়। মানুষ তার চাহিদা, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি অনুযায়ী প্রযুক্তিকে গ্রহণ করে বা বর্জন করে, পরিবর্তনও করে। যে অ্যালগরিদম আমাদের আটকে রাখে, সেটাই আবার প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বরকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দেয়। আরব বসন্ত বা ভারতে নানা সামাজিক আন্দোলনে সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা এর প্রমাণ। কাজেই, প্রযুক্তি নিজে কিছু করে না; যে ক্ষমতাকাঠামো ও মুনাফার তাগিদে এটি তৈরি হয়, তার সমালোচনা করাই জরুরি। দোষটা আসলে সেই ‘সিস্টেমের’, যে সিস্টেম আমাদের আসক্ত, মেরুকৃত ও বিচ্ছিন্ন রাখতে চায়।

    প্রতিরোধের সম্ভাবনা

    ঠিক যেমন একটি হাতুড়ি ভাঙতেও পারে, গড়তেও পারে, প্রযুক্তিও তেমন। গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমরা এর মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোকে কীভাবে সাজাই। ডিজিটাল লিটারেসি বা সাক্ষরতা বৃদ্ধি, ওপেন সোর্স প্রযুক্তির প্রসার, প্রাইভেসি-কেন্দ্রিক নীতিমালা প্রণয়ন এবং সবচেয়ে বড় কথা, সচেতনতা—এই হাতিয়ারগুলো আমাদের নিজস্ব স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের চাবিকাঠি। ফোনের নোটিফিকেশন বন্ধ করা, স্ক্রিন টাইম নির্ধারণ করা, অথবা ডিজিটাল ডিটক্স করা—এসবই আমাদের এজেন্সির প্রকাশ।

    ডিজিটাল মিনিমালিজম ও দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা

    আধুনিক প্রযুক্তির এই নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী আন্দোলনগুলোর একটি হলো ‘ডিজিটাল মিনিমালিজম’। ক্যাল নিউপোর্টের মতো লেখকরা বলছেন, প্রযুক্তিকে আমরা তখনই নিয়ন্ত্রণ করতে পারব, যখন আমরা প্রযুক্তির ব্যবহারে একটি স্পষ্ট দর্শন নিয়ে এগোব। প্রয়োজন নেই সব অ্যাপ ব্যবহার করার, সব নোটিফিকেশনে সাড়া দেওয়ার। প্রযুক্তি হবে আমাদের দাস, আমরা তার দাস নই—এই নীতি মেনে চলাই এই দর্শনের মূল কথা।

    এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শন ও প্রকৃতির প্রতি আহ্বান আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ সেই কবেই বলেছিলেন, সভ্যতার যান্ত্রিক অগ্রগতি মানুষের আত্মাকে শুষ্ক করে ফেলছে। তিনি যে ‘অতিচেতনার’ (Super-consciousness) কথা বলেছেন, তা এই যান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের বিপরীতে দাঁড় করানো যায়। প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানো, সৃজনশীল কাজে মনোনিবেশ করা এবং একাগ্র চিন্তা—এগুলোই ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্তির প্রকৃত রাস্তা।

    স্বাধীনতা নাকি টেকনোক্রেসি?

    প্রশ্ন থেকে যায়, মানব সভ্যতা কোন পথে এগোচ্ছে? আমরা কি একটি ‘টেকনোক্রেসি’র দিকে যাচ্ছি, যেখানে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও অ্যালগরিদমই সব সিদ্ধান্ত নেবে? নাকি আমরা এমন এক ভারসাম্য খুঁজে পাব, যেখানে প্রযুক্তি আমাদের জীবনের মানোন্নয়ন করবে, কিন্তু আমাদের মানবিক মর্মকে গ্রাস করবে না?

    ইউরোপীয় ইউনিয়নের জেনারেল ডাটা প্রোটেকশন রেগুলেশন (GDPR) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণের সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলো দেখায় যে, রাজনৈতিক সচেতনতা ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই কেবল প্রযুক্তির ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে। একে কেবল ব্যক্তিগত লড়াই হিসেবে না দেখে, সামষ্টিক রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা জরুরি।

    আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তি মন্দ নয়, কিন্তু প্রযুক্তির বর্তমান মালিকানা ও ব্যবহার-কাঠামো মন্দ। আমাদের চাই এমন একটি ডিজিটাল পরিবেশ, যা আসক্তি নয়, মুক্তি আনে; যা মেরুকরণ নয়, সংলাপ তৈরি করে; যা নজরদারি নয়, সহযোগিতার মাধ্যম হয়। সেজন্য প্রয়োজন প্রযুক্তির নৈতিক নকশা (Ethical Design), যেখানে ব্যবহারকারীর সুস্থতা ও স্বাধীনতাই হবে মুখ্য, মুনাফা নয়।

    কে কাকে নিয়ন্ত্রণ করে?

    তাহলে, প্রযুক্তি কি আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে? সংক্ষিপ্ত উত্তর—হ্যাঁ, অনেকাংশেই করছে, কিন্তু আমরাই তাকে সেই ক্ষমতা দিয়েছি। এটি একটি দুষ্টচক্রের মতো: আমরা একাকিত্ব ও ক্লান্তি এড়াতে প্রযুক্তির শরণাপন্ন হই, আর সেই প্রযুক্তিই আমাদের আরও একা, আরও ক্লান্ত করে তোলে। ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানবের মতো আমরা এক শক্তি তৈরি করেছি, যে কিনা এখন আমাদেরই গ্রাস করার পথে। তবে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের গল্পের দানবের মতো প্রযুক্তিও চায় তার স্রষ্টার মনোযোগ ও দায়িত্বশীলতা।

    মুক্তির প্রথম ধাপ হলো এই স্বীকারোক্তি যে, আমাদের মনোযোগ, সময় ও সম্পর্ক বিক্রি হয়ে যাচ্ছে এক অদৃশ্য বাজারে। দ্বিতীয় ধাপ হলো নিজেদের জীবনের ওপর সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য দৃঢ় সংকল্প। প্রযুক্তি পিছু হঠবে না, বরং আরও বুদ্ধিমান, আরও নিমগ্নকারী হবে। কিন্তু যে মুহূর্তে আমরা বুঝতে পারি যে ‘আমি ভাবছি, অতএব আমি আছি’—এই ‘আমি’র ওপরই সবকিছুর ভিত্তি, সেই মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় প্রযুক্তির বিরুদ্ধে মানব আত্মার বিজয়যাত্রা।

    আরও পড়ুন - HTTPS কেন নিরাপদ?

    একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

    নবীনতর পূর্বতন

    نموذج الاتصال