কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি

    কনডেন্সড ম্যাটার ফিজিক্স

    মহাবিশ্ব আমাদের চারপাশে যে বিপুল বৈচিত্র্যময় রূপে ধরা দেয়, তার মূলে রয়েছে পদার্থের ভিন্ন ভিন্ন আচরণ। আকাশের নক্ষত্র থেকে শুরু করে আমাদের হৃদস্পন্দন, স্মার্টফোনের চিপ থেকে শুরু করে রহস্যময় ব্ল্যাক হোল – সবকিছুর নিয়ন্তা পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের যে শাখাটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে আছে, যে শাখা আধুনিক প্রযুক্তির প্রতিটি অগ্রগতির মূলে, অথচ সাধারণ্যে যার আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম, তার নাম কনডেন্সড ম্যাটার ফিজিক্স (Condensed Matter Physics)

    কনডেন্সড ম্যাটার ফিজিক্স

    এই ব্লগ পোস্টে আমরা কনডেন্সড ম্যাটার ফিজিক্সের গভীরে ডুব দেব। এটি শুধু কঠিন বা তরল পদার্থের বিজ্ঞান নয়; এটি বরং সেই জাদুর বিশ্লেষণ যেখানে কোটি কোটি অণু-পরমাণু একত্রিত হয়ে সম্পূর্ণ নতুন, অপ্রত্যাশিত এবং বিস্ময়কর ধর্মের জন্ম দেয়। আমরা জানব কীভাবে সরল কণাদের সম্মিলিত আচরণ থেকে উদ্ভূত হয় সুপারকন্ডাক্টিভিটি, ম্যাগনেটিজম, এমনকি টপোলজিক্যাল ইনসুলেটরের মতো অদ্ভুত সব দশা। আপনি যদি একজন শিক্ষার্থী, প্রযুক্তি-উৎসাহী বা শুধুই কৌতূহলী পাঠক হন, কনডেন্সড ম্যাটারের এই মহাজাগতিক যাত্রা আপনার মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেবে।

    কনডেন্সড ম্যাটার ফিজিক্স কী?

    কনডেন্সড ম্যাটার ফিজিক্স (Condensed Matter Physics) হলো পদার্থবিজ্ঞানের সেই বিশাল ক্ষেত্র যা পদার্থের “ঘনীভূত” (Condensed) দশাগুলোর ভৌত ধর্ম নিয়ে কাজ করে। যখন কোনো গ্যাস বা প্লাজমার তুলনায় অণু-পরমাণুগুলো খুব কাছাকাছি চলে আসে এবং একে অপরের সাথে শক্তিশালী আন্তঃক্রিয়া করে, তখন আমরা বলি পদার্থটি ঘনীভূত অবস্থায় আছে। দৈনন্দিন জীবনে আমরা পদার্থের যে তিনটি কঠিন অবস্থা দেখি— কঠিন, তরল— এ দুটোই মূলত কনডেন্সড ম্যাটারের আওতাভুক্ত। এছাড়াও আছে অতি-শীতল তাপমাত্রার কুয়ান্টাম তরল, বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট, সুপারসলিড ইত্যাদি বহিরাগত (Exotic) দশা।

    কিন্তু কেন একে আলাদা শাখা হিসেবে গণ্য করা হলো? কারণ, স্বতন্ত্র একটি পরমাণু বা অণুর আচরণ আমরা কোয়ান্টাম মেকানিক্স দিয়ে বুঝতে পারি। কিন্তু যখন ১০^২৩ সংখ্যক কণা একত্রিত হয়, তখন এই জটিল আন্তঃক্রিয়ার ফলে যে আচরণ দেখা যায়, তা শুধু ক্ষুদ্রতর অংশগুলোর সমষ্টি নয়। এটি সম্পূর্ণ নতুন একটি বাস্তবতা। সহজ ভাষায়, “পুরোটা তার অংশগুলোর যোগফলের চেয়ে বেশি” – এই দর্শনই কনডেন্সড ম্যাটার ফিজিক্সের প্রাণ।

    কেন এই শাখা এত গুরুত্বপূর্ণ?
    এই শাখার আবিষ্কার ছাড়া আধুনিক সভ্যতা কল্পনা করা অসম্ভব। ট্রানজিস্টর, লেজার, এলইডি, কম্পিউটার মেমোরি, ফাইবার অপটিক কেবল, এমআরআই মেশিন, সোলার সেল, কোয়ান্টাম কম্পিউটার— এই সবকিছুর জন্ম হয়েছে কনডেন্সড ম্যাটারের গবেষণাগার থেকে। এটি পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে প্রায়োগিক এবং বৃহত্তম শাখা, যেখানে তত্ত্ব ও পরীক্ষণের এক নিবিড় মেলবন্ধন ঘটে।

    ঐতিহাসিক পটভূমি

    বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে পদার্থবিজ্ঞান ছিল মুখ্যত পরমাণুর গঠন, তড়িৎচুম্বকত্ব এবং আপেক্ষিকতা নিয়ে ব্যস্ত। কঠিন পদার্থ নিয়ে কাজ করতেন ধাতুবিদ ও রসায়নবিদরা। কিন্তু ধীরে ধীরে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারলেন, কঠিন বস্তুর ভেতরে ইলেকট্রনের আচরণ ক্লাসিক্যাল পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম মানছে না।

    ১৯০০ সালে পল ড্রুড ধাতুর বিদ্যুৎ পরিবহণের প্রথম সরল তড়িৎ মডেল দেন। পরবর্তীতে আরনল্ড সমারফেল্ড তাতে কোয়ান্টাম পরিসংখ্যান যুক্ত করেন। কিন্তু প্রকৃত বিপ্লবটি ঘটে ১৯২০-এর দশকের শেষে, যখন ফেলিক্স ব্লখ ও অন্যান্যরা কোয়ান্টাম মেকানিক্স ব্যবহার করে বোঝান, কীভাবে একটি নিখুঁত ক্রিস্টালের ভেতর ইলেকট্রন তরঙ্গ ছড়ায়। তারা দেখান, ইলেকট্রন কখনো ধাতুর মধ্যে বাধাহীনভাবে চলতে পারে, আবার কখনো ব্যান্ড গ্যাপের কারণে অচল হয়ে পড়ে। এই ব্যান্ড তত্ত্বই (Band Theory) আমাদের বোঝালো কীভাবে কিছু বস্তু পরিবাহী (Conductor), কিছু অপরিবাহী (Insulator), আর কিছু অর্ধপরিবাহী (Semiconductor) হয়।

    এই আবিষ্কার ছাড়া বেল ল্যাবসে ট্রানজিস্টরের জন্ম হতো না, এবং পরবর্তী তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লবও অসম্ভব হয়ে পড়ত। কনডেন্সড ম্যাটার ফিজিক্স এভাবেই কোয়ান্টাম তত্ত্বের রূপকার থেকে মানব সভ্যতার রূপকার হয়ে ওঠে।

    মূলনীতি

    কনডেন্সড ম্যাটার ফিজিক্সের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক ধারণাটি হলো ইমার্জেন্স (Emergence)। ইমার্জেন্স বলতে বোঝায়, কোনো ব্যবস্থার ক্ষুদ্রতম উপাদানগুলো সম্মিলিতভাবে এমন এক আচরণ প্রদর্শন করে, যা সেই উপাদানগুলোর নিজস্ব কোনো ধর্ম থেকে সরাসরি অনুমান করা যায় না।

    পানির কথা ভাবুন। দুটি হাইড্রোজেন ও একটি অক্সিজেন পরমাণু মিলে H2O অণু গঠন করে। একটি একক পানির অণু ভেজা নয়, তার কোনো তরঙ্গ বা ঘূর্ণাবর্ত নেই। কিন্তু কোটি কোটি H2O অণু একত্রিত হলে আমরা পাই তরলতা, যা একটি সম্মিলিত ধর্ম। আবার তাপমাত্রা কমালে তা বরফে পরিণত হয়, যা একটি কঠিন ক্রিস্টাল। এই দশা পরিবর্তন একটি ইমার্জেন্ট ঘটনা।

    একইভাবে, একটি ইলেকট্রনের চার্জ ও স্পিন বোঝা যায় সহজেই। কিন্তু কোটি কোটি ইলেকট্রন যখন একটি ক্রিস্টাল ল্যাটিসের ভেতর আটকে যায় এবং তাদের স্পিনগুলো একই দিকে মুখ করে থাকে, তখন আমরা পাই ফেরোম্যাগনেটিজম (Ferromagnetism)। লোহার চুম্বকত্ব কোনো একক ইলেকট্রনের ধর্ম নয়, এটি অসংখ্য ইলেকট্রন স্পিনের সমন্বিত আচরণ। এই কারণেই এই শাখার মূলমন্ত্র হলো: “More is Different” — নোবেলজয়ী পদার্থবিদ ফিলিপ অ্যান্ডারসনের অমর উক্তি। অনেক কিছু একসাথে হলে প্রকৃতি সম্পূর্ণ নতুন খেলার মাঠ তৈরি করে।

    বিল্ডিং ব্লক

    কনডেন্সড ম্যাটারকে বোঝার প্রথম ধাপ হলো কাঠামো বা জাফরি (Lattice) বোঝা। বেশিরভাগ কঠিন পদার্থই ক্রিস্টালাইন, অর্থাৎ তাদের পরমাণুগুলো নির্দিষ্ট ছন্দে সাজানো থাকে। এই পর্যায়ক্রমিক বিন্যাস কনডেন্সড ম্যাটার ফিজিক্সের গণিতকে সহজতর করেছে।

    এই জাফরির আছে প্রতিসাম্য (Symmetry)। একটি বর্গাকার জাফরি ৯০ ডিগ্রি ঘোরালে যেমন আগের মতো দেখায়, তেমনি বিভিন্ন ক্রিস্টালের নির্দিষ্ট ঘূর্ণন, প্রতিফলন ও স্থানান্তর প্রতিসাম্য আছে। এই প্রতিসাম্য ভেঙে গেলেই পদার্থের অভ্যন্তরে বিস্ময়কর সব ঘটনা ঘটে। যেমন, তাপমাত্রা কমালে কোনো ক্রিস্টালের গঠন বদলে যেতে পারে (কাঠামোগত দশান্তর), তখন তার প্রতিসাম্য কমে যায়। আবার ফেরোম্যাগনেটিক পদার্থে তাপমাত্রা কমালে হঠাৎ করে সব স্পিন একদিকে মুখ করে, ফলে সময়ের সাপেক্ষে একটি প্রতিসাম্য ভেঙে যায়। প্রতিসাম্যের এই ভাঙনই অনেক নতুন দশার জন্ম দেয়। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে স্পন্টেনিয়াস সিমেট্রি ব্রেকিং একটি কেন্দ্রীয় ধারণা, যা কিনা কণা পদার্থবিজ্ঞান থেকে শুরু করে কসমোলজি পর্যন্ত সর্বত্র দেখা যায়, কিন্তু তার সবচেয়ে মূর্ত রূপটি আমরা এই কঠিন বস্তুর ভেতরেই পাই।

    আরও পড়ুন - ট্রান্সফরমার কীভাবে কাজ করে?

    কোয়ান্টাম বলবিদ্যার প্রয়োগ

    আমরা যখন পরমাণুর কথা ভাবি, ইলেকট্রনগুলোকে নির্দিষ্ট কক্ষপথ বা অরবিটালে দেখা যায়। কিন্তু যখন বহু পরমাণু একসাথে একটি ক্রিস্টাল গঠন করে, তখন এই অরবিটালগুলো একে অপরের সাথে মিশে যায়। পাউলির বর্জন নীতি অনুযায়ী, দুটি ইলেকট্রন একই কোয়ান্টাম অবস্থায় থাকতে পারে না। ফলে কাছাকাছি থাকা কোটি কোটি পরমাণুর অরবিটালগুলো বিভক্ত হতে হতে একটানা শক্তির ব্যান্ড (Energy Band) তৈরি করে।

    দুটি ব্যান্ডের মাঝখানে ফাঁকা জায়গাটুকুই হলো ব্যান্ড গ্যাপ (Band Gap)। এই গ্যাপের আকারই নির্ধারণ করে দেয় বস্তুটি বিদ্যুৎ পরিবহন করবে কি না।

    • পরিবাহী (Conductor): যদি সর্বোচ্চ ব্যান্ডটি আংশিকভাবে ইলেকট্রন দ্বারা পূর্ণ থাকে (যেমন ধাতুতে), তাহলে ইলেকট্রন খুব সহজেই সামান্য শক্তি পেয়ে মুক্তভাবে চলাচল করতে পারে।

    • অপরিবাহী (Insulator): যদি সর্বোচ্চ পূর্ণ ব্যান্ড (ভ্যালেন্স ব্যান্ড) এবং পরবর্তী খালি ব্যান্ডের (কন্ডাকশন ব্যান্ড) মধ্যে গ্যাপ অনেক বড় হয় (যেমন হীরে), তাহলে ইলেকট্রন লাফিয়ে উঠতে পারে না এবং বিদ্যুৎ চলাচল করতে পারে না।

    • অর্ধপরিবাহী (Semiconductor): গ্যাপ যদি ছোট হয় (যেমন সিলিকন), তাহলে তাপ বা আলোর মাধ্যমে ইলেকট্রন কন্ডাকশন ব্যান্ডে লাফিয়ে উঠতে পারে। এই নিয়ন্ত্রিত পরিবাহিতাই ট্রানজিস্টর ও কম্পিউটারের জগতের ভিত।

    কিন্তু প্রকৃতি এখানেই থামেনি। কিছু কিছু পদার্থে ব্যান্ড থিওরি অপরিবাহী বলে ভবিষ্যদ্বাণী করলেও, তারা দেখা যায় পরিবাহী, আবার কিছু ক্ষেত্রে বিপরীতটাও ঘটে। এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আবিষ্কৃত হয়েছে টপোলজিক্যাল ইনসুলেটর, যেখানে একটি বস্তুর ভেতরটা অপরিবাহী হলেও পৃষ্ঠ সবসময়ই পরিবাহী। অর্থাৎ ইলেকট্রনের তরঙ্গরূপের জ্যামিতিক পাকানো অবস্থা (Topology) এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।

    কোয়াসিপার্টিকেল

    একটি ক্রিস্টালে কোটি কোটি ইলেকট্রনের পাশাপাশি ধনাত্মক নিউক্লিয়াসও আছে, এবং এরা সবাই ক্রমাগত একে অপরকে ধাক্কা দিচ্ছে। এই অবস্থায় কোনো একটি ইলেকট্রনের গতিপথ নির্ণয় করা সম্ভব নয়। কিন্তু কনডেন্সড ম্যাটার ফিজিক্সের এক অসাধারণ কৃতিত্ব হলো কোয়াসিপার্টিকেল (Quasiparticle) ধারণার আবিষ্কার।

    বিশাল সেনাবাহিনীর ভেতর একজন সৈনিকের গতিবিধি না বুঝে আমরা যেমন “পদাতিক বাহিনীর সামগ্রিক গতি” নামে একটি সরল ধারণা তৈরি করি, তেমনি আমরা বলতে পারি, “এই ইলেকট্রনটি আর খালি ইলেকট্রন নেই, এটি একটি ‘ড্রেসড’ ইলেকট্রন বা পোলারন”। যখন একটি ইলেকট্রন জাফরি ভেদ করে চলে, তখন সে পথের পরমাণুগুলোকে সামান্য সরিয়ে দেয়। এই বিকৃতি এক ধরনের বলয় তৈরি করে ইলেকট্রনের সাথে চলতে থাকে। ইলেকট্রন এবং তার চারপাশের জাফরির বিকৃতির এই সম্মিলিত এককটিকে আমরা পোলারন বলি। এর ভর আসল ইলেকট্রনের চেয়ে বেশি, কারণ সে তার চারপাশের জাফরিকেও টেনে নিয়ে চলে।

    এছাড়াও আছে এক্সাইটন, যা একটি ইলেকট্রন ও তার শূন্যস্থান (হোল)-এর বদ্ধ অবস্থা; আর ফোনন, যা জাফরির কম্পনের কোয়ান্টাম। আমরা যখন বলি কোনো কঠিন বস্তুতে তাপ পরিবাহিত হচ্ছে, তখন আমরা আসলে ফোননের প্রবাহ বোঝাই। এই কোয়াসিপার্টিকেলগুলোকে ব্যবহার করে আমরা জটিল সিস্টেমের ধর্মগুলোকে সরল ভাষায় বর্ণনা করতে পারি।

    সুপারকন্ডাক্টিভিটি

    কনডেন্সড ম্যাটার ফিজিক্সের সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনাগুলোর একটি হলো সুপারকন্ডাক্টিভিটি (Superconductivity)। ১৯১১ সালে হাইকে কামারলিং ওনেস আবিষ্কার করেন, অতি শীতল তাপমাত্রায় পারদের রোধ হঠাৎ করেই শূন্য হয়ে যায়।

    এটি কোনো সাধারণ পরিবাহিতা নয়। একটি সাধারণ ধাতুর রোধ কখনো শূন্য হতে পারে না, কারণ ইলেকট্রনগুলো জাফরির কম্পনের (ফোনন) সাথে ধাক্কা খেয়ে শক্তি হারায়। কিন্তু পর্যাপ্ত শীতল তাপমাত্রায় অনেক পদার্থে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। দুটি ইলেকট্রন, যাদের স্বাভাবিকভাবে পরস্পরকে বিকর্ষণ করার কথা, তারা জাফরির মাধ্যমে এক অপ্রত্যক্ষ আকর্ষণ অনুভব করে এবং একটি জোড়া তৈরি করে। এই জোড়াকে বলে কুপার পেয়ার (Cooper Pair)

    ইলেকট্রন একটি ফার্মিওন (অর্ধ-পূর্ণ স্পিন), কিন্তু কুপার পেয়ার তৈরি হলে তারা বোসনে পরিণত হয়। বোসন কণারা একই কোয়ান্টাম অবস্থায় চুপিসারে জমা হতে পারে (বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেশন)। এর ফলে তারা একটি সুসংহত কোয়ান্টাম তরঙ্গ তৈরি করে, যা জাফরির বাধা অতিক্রম করে প্রবাহিত হতে পারে কোনো প্রকার শক্তিক্ষয় ছাড়াই।

    এই সুপারকন্ডাক্টিভিটি বোঝার জন্য BCS তত্ত্ব (বারডিন, কুপার, শ্রিফার) নোবেল পুরস্কার পায়। কিন্তু গল্প এখানেই শেষ হয়নি। পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা এমন কিছু সিরামিক পদার্থ খুঁজে পান, যা BCS তত্ত্বের ভবিষ্যদ্বাণীর চেয়ে অনেক বেশি তাপমাত্রায় সুপারকন্ডাক্টিং হয়। এই হাই-টেম্পারেচার সুপারকন্ডাক্টর (যেমন কাপরেট) এখনো কনডেন্সড ম্যাটারের সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত রহস্যগুলোর একটি। ঘর-তাপমাত্রার সুপারকন্ডাক্টর আবিষ্কৃত হলে বিদ্যুৎ সঞ্চালন, চৌম্বক ভাসমান ট্রেন, এবং কোয়ান্টাম প্রযুক্তিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।

    ম্যাগনেটিজম

    চৌম্বকত্ব কনডেন্সড ম্যাটারের আরেকটি ক্লাসিক্যাল অথচ জটিল জগত। আমরা জানি, ইলেকট্রনের একটি নিজস্ব চৌম্বক ভ্রামক (স্পিন) আছে। পদার্থের চৌম্বক ধর্ম নির্ভর করে এই স্পিনগুলো কীভাবে সাজানো আছে তার ওপর।

    • প্যারাম্যাগনেটিজম (Paramagnetism): এখানে স্পিনগুলো এলোমেলো। বাহ্যিক চৌম্বকক্ষেত্র দিলে তারা সাময়িকভাবে সারিবদ্ধ হয়, ক্ষেত্র সরালেই আবার এলোমেলো হয়ে যায়।

    • ফেরোম্যাগনেটিজম (Ferromagnetism): এখানে তাপমাত্রার প্রভাবে হঠাৎ করেই সব স্পিন একই দিকে মুখ করে। লোহা, নিকেল এর উদাহরণ। স্পিনগুলোর মধ্যে এক ধরনের শক্তিশালী বিনিময় আন্তঃক্রিয়া (Exchange Interaction) কাজ করে।

    • অ্যান্টিফেরোম্যাগনেটিজম (Antiferromagnetism): এখানে প্রতিবেশী স্পিনগুলো বিপরীত দিকে মুখ করে। সামগ্রিক চুম্বকত্ব শূন্য, কিন্তু ভেতরে স্পিনগুলো সুশৃঙ্খল।

    • স্পিন গ্লাস (Spin Glass): এটি এক আজব অবস্থা যেখানে স্পিনগুলো হিমায়িত কিন্তু এলোমেলো। এখানে ফ্রাস্ট্রেশন (হতাশা) কাজ করে, যেখানে একটি স্পিন একই সাথে দুটি বিপরীত নির্দেশ পেয়ে ঠিক করতে পারে না কোন দিকে মুখ করবে।

    আধুনিক গবেষণায় স্পিনট্রনিক্স (Spintronics) একটি বড় ক্ষেত্র, যেখানে শুধু ইলেকট্রনের চার্জ নয়, তার স্পিনকেও তথ্য প্রক্রিয়াকরণে ব্যবহার করা হয়। এর সফল প্রয়োগ আমরা দেখেছি কম্পিউটারের হার্ড ডিস্কের জায়ান্ট ম্যাগনেটোরেসিস্ট্যান্স (GMR) প্রযুক্তিতে, যার জন্য ২০০৭ সালে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।

    টপোলজিক্যাল ফেজ

    গত দুই দশকে কনডেন্সড ম্যাটার ফিজিক্সের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ অগ্রগতি এসেছে টপোলজি (Topology) ধারণা থেকে। জ্যামিতি যেমন দৈর্ঘ্য-প্রস্থ নিয়ে ভাবে, টপোলজি ভাবে বস্তুর সামগ্রিক আকৃতি নিয়ে। একটি কফি মগ আর একটি ডোনাট টপোলজিক্যালভাবে এক, কারণ উভয়েরই একটি করে ছিদ্র আছে।

    এখন প্রশ্ন: ইলেকট্রনের তরঙ্গ ফাংশনের কি টপোলজি থাকতে পারে? উত্তরটি হলো হ্যাঁ। নির্দিষ্ট কিছু অপরিবাহী বা সুপারকন্ডাক্টরের ইলেকট্রনের তরঙ্গ ফাংশন পাকানো (Twisted) অবস্থায় থাকতে পারে। এই প্যাঁচ সম্পূর্ণ বস্তু জুড়ে বিস্তৃত। এই টপোলজিক্যাল ধর্ম কেবল বস্তুর পৃষ্ঠতলের আচরণেই ধরা পড়ে।

    উদাহরণস্বরূপ, একটি টপোলজিক্যাল ইনসুলেটর। এর ভেতরটা সম্পূর্ণ অপরিবাহী, ব্যান্ড গ্যাপ আছে। কিন্তু তার পৃষ্ঠতলের ইলেকট্রনগুলো বাধ্য হয়ে পরিবাহী হয়। আর এই পরিবাহিতা নষ্ট করা যায় না, যদি না টপোলজিক্যাল ধর্মটাই ভেঙে ফেলা হয়। এই পৃষ্ঠ-পরিবাহিতা অমেধ্যের (Impurity) জন্য অত্যন্ত রোধক, কারণ ইলেকট্রনগুলো টপোলজি দ্বারা সুরক্ষিত থাকে; তারা সহজে পেছনে ঘুরতে পারে না (ব্যাক-স্ক্যাটারিং নিষিদ্ধ)।

    এই টপোলজিক্যাল ফিজিক্সই এখন কোয়ান্টাম কম্পিউটারের ভবিষ্যতের চাবিকাঠি হিসেবে দেখা হচ্ছে। মেজরানা ফার্মিওন (একটি কোয়াসিপার্টিকেল যা নিজেই নিজের প্রতিকণা) এই টপোলজিক্যাল সুপারকন্ডাক্টরে তৈরি করা সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে, যা কোয়ান্টাম বিট (কিউবিট)-কে পরিবেশের ঝামেলা থেকে সুরক্ষিত রাখতে পারবে। ২০১৬ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার (থমলেস, হল্ডেন, কস্টারলিটজ) টপোলজিক্যাল ফেজ ট্রানজিশন সংক্রান্ত তত্ত্বের জন্যই দেওয়া হয়েছে, যা বোঝায় এই ক্ষেত্রটি কতটা বিপ্লবী।

    নরম কনডেন্সড ম্যাটার ও জটিল তরল

    এতক্ষণ আমরা শক্ত, কঠিন জগতে ছিলাম। কিন্তু কনডেন্সড ম্যাটার ফিজিক্সের আরেকটি বড় অংশ জুড়ে আছে নরম পদার্থ (Soft Matter)। এর মধ্যে পড়ে পলিমার, জেল, লিকুইড ক্রিস্টাল, ফোম, প্রোটিন এবং জৈবিক টিস্যু। এই সিস্টেমগুলো কঠিন পদার্থের মত স্থিতিশীল নয়। তারা তাপীয় শক্তির প্রভাবে প্রতিনিয়ত নড়ছে, বদলাচ্ছে। এরা কঠিন ও তরলের মধ্যবর্তী অসাধারণ সব ধর্ম দেখায়।

    উদাহরণ হিসেবে লিকুইড ক্রিস্টাল-এর কথাই ধরুন। এটি একটি তরল, কিন্তু এর অণুগুলো সুশৃঙ্খলভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। আপনার টিভি বা মোবাইলের এলসিডি (LCD) স্ক্রিন এই লিকুইড ক্রিস্টালের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি। সামান্য বিদ্যুৎ প্রবাহ দিয়েই এই অণুগুলোর দিক বদলে ফেলা যায়, ফলে আলো নিয়ন্ত্রিত হয় এবং আমরা পর্দায় রঙিন ছবি দেখতে পাই।

    পলিমার হলো লম্বা চেইনের মতো অণু (যেমন প্লাস্টিক, ডিএনএ)। এদের আচরণ বোঝা কঠিন, কিন্তু কনডেন্সড ম্যাটার ফিজিক্সের স্কেলিং ল’ ও রেনরমালাইজেশন গ্রুপ তত্ত্বের মাধ্যমে আমরা পলিমারের স্থিতিস্থাপকতা ও গঠন বোঝাতে সক্ষম হয়েছি। জীববিজ্ঞানের আণবিক যন্ত্রপাতিও এখন এই নরম কনডেন্সড ম্যাটারের আলোকেই বোঝার চেষ্টা চলছে।

    গাণিতিক কাঠামো ও পরীক্ষণ পদ্ধতি

    কনডেন্সড ম্যাটার ফিজিক্স বোঝার জন্য যে গাণিতিক যন্ত্রপাতির প্রয়োজন, তা অত্যন্ত উন্নত। কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি এখানে ব্যাপক ব্যবহৃত হয়। শ্রোডিঙার সমীকরণ থেকে শুরু করে ব্লখের উপপাদ্য, সবই এই শাখার মেরুদণ্ড।

    পরীক্ষাগারে কনডেন্সড ম্যাটার নিয়ে কাজ করতে গেলে ক্রায়োজেনিক্স (অতি শীতলীকরণ) জানতে হবে। হিলিয়ামের সাহায্যে তাপমাত্রা প্রায় পরম শূন্যের (-২৭৩.১৫°সে) কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে কোয়ান্টাম ধর্মগুলো প্রকট হয়।

    এক্স-রে ডিফ্র্যাকশন (XRD)নিউট্রন স্ক্যাটারিং ব্যবহার করে আমরা ক্রিস্টালের কাঠামো বুঝতে পারি। স্ক্যানিং টানেলিং মাইক্রোস্কোপ (STM) দিয়ে আমরা একেকটি পরমাণু দেখতে পাই এবং সরাতেও পারি। অ্যাঙ্গল-রিজলভড ফটোএমিশন স্পেকট্রোস্কোপি (ARPES) দিয়ে সরাসরি বস্তুর ইলেকট্রনিক ব্যান্ড কাঠামো মাপা সম্ভব, যা তাত্ত্বিক ভবিষ্যদ্বাণীর প্রমাণ দেয়।

    আধুনিক প্রযুক্তিতে প্রয়োগ

    কনডেন্সড ম্যাটার ফিজিক্স যে কেবল তত্ত্বের খেলা নয়, তার প্রমাণ আমাদের হাতের মুঠোয়।

    ১. ট্রানজিস্টর ও তথ্য বিপ্লব:
    সেমিকন্ডাক্টর ফিজিক্সের সন্তান ট্রানজিস্টর। কোটি কোটি ট্রানজিস্টর নিয়ে গঠিত মাইক্রোচিপ আমাদের কম্পিউটার, মোবাইল চালায়। মুরের সূত্র ধরে ট্রানজিস্টর যত ছোট হচ্ছে, আমরা এখন কোয়ান্টাম টানেলিং-এর সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি, যার সমাধানও দিতে হবে এই শাখাকে।

    ২. অপটোইলেক্ট্রনিক্স:
    এলইডি ও লেজার ডায়োড নির্ভর করে ব্যান্ড গ্যাপ ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ওপর। বিভিন্ন যৌগিক অর্ধপরিবাহী (যেমন গ্যালিয়াম নাইট্রাইড) নির্দিষ্ট রঙের আলো দেয়। নীল এলইডি-র আবিষ্কার আধুনিক শক্তি সাশ্রয়ী আলো ও ডিসপ্লে প্রযুক্তি এনেছে, যার জন্য ২০১৪ সালে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।

    ৩. ডেটা স্টোরেজ:
    স্পিনট্রনিক্সের মাধ্যমে তৈরি জায়ান্ট ম্যাগনেটোরেসিস্ট্যান্স (GMR) হার্ড ড্রাইভের স্টোরেজ ক্ষমতা হাজার গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন টপোলজিক্যাল ইনসুলেটর ব্যবহার করে আরও ক্ষুদ্র ও দ্রুত মেমোরি তৈরির স্বপ্ন দেখা হচ্ছে।

    ৪. মেডিকেল ইমেজিং:
    এমআরআই (MRI) মেশিনে যে শক্তিশালী সুপারকন্ডাক্টিং ম্যাগনেট ব্যবহার করা হয়, তা নিওবিয়াম-টাইটানিয়ামের মতো সুপারকন্ডাক্টিং অ্যালয় দিয়ে তৈরি।

    ৫. নবায়নযোগ্য শক্তি:
    সোলার সেলের মূলনীতি হলো ফটোভোলটাইক এফেক্ট, যা একটি অর্ধপরিবাহী যন্ত্র। পেরোভস্কাইট সোলার সেল নিয়ে বর্তমান গবেষণা কনডেন্সড ম্যাটার ফিজিক্সেরই অংশ।

    চ্যালেঞ্জ

    যদিও আমরা অসাধারণ সব অগ্রগতি করেছি, তবুও কনডেন্সড ম্যাটার ফিজিক্সের সামনে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়ে আছে।

    ১. হাই-টেম্পারেচার সুপারকন্ডাক্টিভিটি (High-Tc):
    এটি এখনো তাত্ত্বিকভাবে পুরোপুরি বোঝা যায়নি। কাপরেট অক্সাইডে কুপার পেয়ারের প্রক্রিয়া বিসিএস তত্ত্বকে সমর্থন করে না। যেদিন রুম-টেম্পারেচার সুপারকন্ডাক্টর তৈরি হবে, সেদিন শক্তি খাতে বিপ্লব নেমে আসবে, কিন্তু তার জন্য দরকার এই রহস্যের মীমাংসা।

    ২. কোয়ান্টাম কম্পিউটিং:
    টপোলজিক্যাল কিউবিটই বর্তমানে সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখা হচ্ছে। মেজরানা ফার্মিওন খুঁজে বের করা এবং নিয়ন্ত্রণ করা এখন সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। মাইক্রোসফটের মতো কোম্পানি এই টপোলজিক্যাল পদ্ধতিতে বিনিয়োগ করছে।

    ৩. ফ্রাস্ট্রেটেড ম্যাগনেটিজম ও স্পিন লিকুইড:
    কিছু পদার্থে স্পিন একেবারে পরম শূন্য তাপমাত্রাতেও জমাট বাধে না। তারা প্রতিনিয়ত কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশনের মধ্যে থাকে। এই কোয়ান্টাম স্পিন লিকুইড একটি রহস্যময় দশা, যা আমরা সবেমাত্র বুঝতে শুরু করেছি। এর মধ্যে উদ্ভট টপোলজিক্যাল ধর্ম আছে, যা ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম প্রযুক্তিতে কাজে লাগতে পারে।

    ৪. জৈবিক কনডেন্সড ম্যাটার:
    ভাইরাস, প্রোটিন ফোল্ডিং, কোষের ঝিল্লি— এসব জীবন্ত বস্তুকে কনডেন্সড ম্যাটারের দৃষ্টিতে দেখা এখন নতুন ফ্রন্টিয়ার। পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র ব্যবহার করে জীবনের রহস্য উন্মোচনের স্বপ্ন দেখছেন অনেকে।

    আরও পড়ুন - হিগস বোসন কী?

    একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

    নবীনতর পূর্বতন

    نموذج الاتصال