কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি

    প্রাচীন মিশরের মহাকাব্য (পর্ব-০৩): ফারাও খুফু থেকে তুতেনখামুন

    ফারাও খুফুর গ্রেট পিরামিড থেকে শুরু করে তুতেনখামুনের সোনালি মুখোশ—প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার তিন হাজার বছরের ইতিহাসে এমন কিছু ফারাও আছেন যাঁদের নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা। প্রায় ১৭০ জন ফারাওয়ের মধ্যে মাত্র কয়েকজন চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন তাদের স্থাপত্যকীর্তি, সামরিক বিজয় কিংবা ধর্মীয় বিপ্লবের জন্য। ফারাওরা ছিলেন দেবতা ও জনগণের মধ্যস্থতাকারী, যাঁরা একাধারে রাষ্ট্রপ্রধান, সেনাপতি ও মহাযাজকের ভূমিকা পালন করতেন। আজ আমরা ফিরে যাব সেই প্রাচীন সভ্যতার স্বর্ণযুগে, যেখানে আমরা খুঁজে পাব স্থাপত্যের মহানায়ক খুফু, নারীশক্তির প্রতীক হাতশেপসুত, যুদ্ধজয়ী থুতমোস তৃতীয়, ধর্মবিপ্লবী আখেনাতেন এবং রহস্যে ঘেরা তরুণ রাজা তুতেনখামুনের অসাধারণ সব কাহিনি।

    ফারাও খুফু থেকে তুতেনখামুন

    ফারাও খুফু: গ্রেট পিরামিডের মহানায়ক

    প্রাচীন মিশরের চতুর্থ রাজবংশের দ্বিতীয় ফারাও ছিলেন খুফু (২৫৮৯–২৫৬৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ), যাঁর গ্রিক নাম চেওপস। কিন্তু কেন খুফু ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় ফারাওদের একজন? কারণ তিনি নির্মাণ করেছিলেন বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের মধ্যে একমাত্র টিকে থাকা স্থাপনা—গিজার গ্রেট পিরামিড

    গ্রেট পিরামিড: এক বিস্ময়কর স্থাপত্য

    খুফুর পিরামিড, যা "গ্রেট পিরামিড" নামে খ্যাত, গিজার তিনটি পিরামিডের মধ্যে সবচেয়ে পুরাতন ও বৃহত্তম। পিরামিডটি আনুমানিক ২৫৮০-২৫৬০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে নির্মিত হয়। এটি নির্মাণের সময় ছিল প্রায় ১৪৬.৭ মিটার (৪৮১ ফুট) উঁচু এবং প্রায় চার হাজার বছর ধরে এটি ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু মানবনির্মিত স্থাপনা। পিরামিডের ভিত্তির প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য ২৩০ মিটার এবং নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছিল আনুমানিক ২৩ লক্ষ পাথরখণ্ড, যার মোট ওজন প্রায় ৬০ লক্ষ টন

    রহস্যে ঘেরা ফারাও

    মজার ব্যাপার হলো, এত বিশাল স্থাপনা নির্মাণ করেও খুফুর ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে আমাদের জানাশোনা অত্যন্ত সীমিত। তাঁর রাজত্ব সম্পর্কে খুব কম লিখিত প্রমাণই টিকে আছে। ১৯০৩ সালে আবিষ্কৃত একটি মাত্র তিন ইঞ্চি উঁচু হাতির দাঁতের মূর্তিই হলো খুফুর একমাত্র সম্পূর্ণ সংরক্ষিত প্রতিকৃতি। তাঁর সম্পর্কে যেসব দলিল পাওয়া গেছে, সেগুলো লেখা হয়েছে তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পর, যা খুফুকে এক রহস্যময় চরিত্রে পরিণত করেছে। গ্রেট পিরামিডের ভেতরে "রাজার কক্ষ", "রানির কক্ষ" ও "গ্র্যান্ড গ্যালারি" নামে তিনটি প্রধান প্রকোষ্ঠ রয়েছে, যার মধ্যে গ্র্যান্ড গ্যালারির দৈর্ঘ্য ৪৭ মিটার ও উচ্চতা ৮ মিটার। খুফুকে প্রায়ই নিষ্ঠুর শাসক হিসেবে চিত্রিত করা হলেও আধুনিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে পিরামিড নির্মাণে দাস নয়, বরং বেতনভুক্ত দক্ষ শ্রমিকরা কাজ করতেন। তাঁর সময়ে "সৌরনৌকা" বা সোলার বার্জের ধারণাও চালু হয়, যা ১৯৫৪ সালে পিরামিডের পাশ থেকে প্রায় অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।

    রানি হাতশেপসুত: পুরুষের ছদ্মবেশে নারী ফারাও

    প্রাচীন মিশরের তিন হাজার বছরের ইতিহাসে মোট ১৭০ জন ফারাও ছিলেন বলে ধারণা করা হয়, যার মধ্যে নারী ফারাও ছিলেন মাত্র সাতজন। এই সাতজন নারীর মধ্যে সবচেয়ে সফল ও দীর্ঘস্থায়ী শাসক ছিলেন হাতশেপসুত (রাজত্ব: ১৪৭৯–১৪৫৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দ), যাঁকে বলা হতো "মহৎ নারীদের প্রধান"

    সিংহাসনের পথে বাধা ও জয়

    হাতশেপসুত ছিলেন রাজা প্রথম থুতমোস ও রানি আহমোসের কন্যা। রাজা প্রথম থুতমোসের মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসার কথা ছিল হাতশেপসুতেরই, কিন্তু নারী হওয়ার কারণে মিশরীয় সমাজ তাকে রাজা হিসেবে মেনে নেয়নি। ফলে সিংহাসনে বসেন তাঁর সৎভাই দ্বিতীয় থুতমোস, যাঁর সঙ্গে পরবর্তীতে হাতশেপসুতের বিয়ে হয়। দ্বিতীয় থুতমোসের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র তৃতীয় থুতমোস তখন অপ্রাপ্তবয়স্ক। হাতশেপসুত প্রথমে তাঁর অভিভাবক হিসেবে রাজ্যশাসন শুরু করলেও পরবর্তীতে নিজেই ফারাও হিসেবে অভিষিক্ত হন। তিনি পুরুষ ফারাওদের মতোই নকল দাড়ি পরিধান করতেন এবং পুরুষের পোশাকেই জনসমক্ষে উপস্থিত হতেন, যা ছিল তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার এক অনন্য উদাহরণ।

    বাণিজ্য ও স্থাপত্যের স্বর্ণযুগ

    হাতশেপসুতের শাসনামল ছিল শান্তি ও সমৃদ্ধির সময়। তিনি যুদ্ধের পরিবর্তে বাণিজ্যে গুরুত্ব দেন। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত অভিযান ছিল "পুন্ট ভূমি"তে (বর্তমান সোমালিয়া বা ইরিত্রিয়া) পাঠানো বাণিজ্য বহর, যা থেকে মিশরে আনা হয়েছিল গন্ধরস, মরিচ, সোনা ও নানা মূল্যবান সামগ্রী। এই অভিযানের সাফল্য তাঁর শাসনের বৈধতা প্রমাণে বড় ভূমিকা রাখে। তাঁর শাসনামলে নির্মিত হয় অভিনব স্থাপত্যশৈলীর এক অসাধারণ মন্দির দেইর এল-বাহরি, যা আধুনিক স্থাপত্যেরও বিস্ময়বস্তু।

    ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা

    হাতশেপসুতের মৃত্যুর পর সৎপুত্র তৃতীয় থুতমোস ক্ষমতা গ্রহণ করে তাঁর স্মৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা করেন। মন্দিরের গায়ে খোদাই করা হাতশেপসুতের নাম ও ছবি নষ্ট করে দেওয়া হয়। কেননা তিনি বিশ্বাস করতেন, এক নারীর ফারাও হয়ে ওঠা মিশরীয় ঐতিহ্যের পরিপন্থী। কিন্তু ইতিহাসের বিচারে হাতশেপসুত প্রমাণ করেছিলেন যে নারীও হতে পারেন সফল ফারাও, যা আজও নারীশক্তির এক অনন্য উদাহরণ।

    তৃতীয় থুতমোস: প্রাচীন মিশরের নেপোলিয়ন

    হাতশেপসুতের সৎপুত্র তৃতীয় থুতমোস (রাজত্ব: ১৪৭৯–১৪২৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) ছিলেন ইতিহাসের অন্যতম সফল সেনানায়ক। তাকে বলা হয় "প্রাচীন মিশরের নেপোলিয়ন"।

    ১৭টি সামরিক অভিযান

    তৃতীয় থুতমোসের জীবনের প্রথম বিশ বছর কেটেছে সৎমা হাতশেপসুতের ছায়ায়। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি বিনা দ্বিধায় সাম্রাজ্য বিস্তারে মনোনিবেশ করেন। তাঁর নেতৃত্বে মিশরীয় সেনাবাহিনী ১৭টি বড় সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত বিজয় ছিল মেগিদ্দোর যুদ্ধ, যেখানে তিনি কানানীয় বিদ্রোহীদের পরাজিত করেন এবং মিশরীয় সাম্রাজ্যের সীমানা ইউফ্রেটিস নদী পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। এই যুদ্ধের মাধ্যমেই থিবস হয়ে ওঠে প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম ধনী ও শক্তিশালী নগরী।

    রেকর্ড রাখার গুরুত্ব

    তৃতীয় থুতমোসের প্রতিটি যুদ্ধের বিবরণ কার্নাক মন্দিরের দেয়ালে খোদাই করে রাখা হয়েছিল, যা আজও ইতিহাসবিদদের জন্য অমূল্য তথ্যভাণ্ডার। তিনি শুধু যোদ্ধাই ছিলেন না, বরং ছিলেন একজন দক্ষ প্রশাসকও। তাঁর শাসনামলে মিশরীয় সাম্রাজ্য ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছায়, যা পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে আর কখনও অতিক্রম করা সম্ভব হয়নি।

    আখেনাতেন: ধর্মীয় বিপ্লবী ফারাও

    মিশরের অষ্টাদশ রাজবংশের এক বিতর্কিত অথচ সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক ফারাও ছিলেন আখেনাতেন (রাজত্ব: ১৩৫৩–১৩৩৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)। তিনি ছিলেন প্রাচীন বিশ্বের প্রথম একেশ্বরবাদের প্রবর্তক।

    আতেনবাদ: সূর্যদেবতার উপাসনা

    আখেনাতেন সিংহাসনে বসার পর মিশরের চিরাচরিত বহুদেববাদী ধর্মব্যবস্থা বাতিল করে আতেনবাদের প্রবর্তন করেন। আতেন ছিলেন সূর্যের চাকতি, যাকে তিনি একমাত্র সত্যিকারের দেবতা ঘোষণা করলেন। তিনি দেবতা আমুনের উপাসনা নিষিদ্ধ করেন, মন্দিরগুলো বন্ধ করে দেন এবং পুরোহিতদের ক্ষমতা খর্ব করেন। তাঁর রাজধানী থিবস থেকে সরিয়ে নীল নদের তীরে গড়ে তোলেন নতুন শহর আখেতাতেন (বর্তমান আমরনা)।

    শিল্প ও সংস্কৃতিতে নতুন যুগ

    আখেনাতেনের শাসনামলে মিশরীয় শিল্পেও এলো বৈপ্লবিক পরিবর্তন। প্রচলিত রীতির বদলে বাস্তবধর্মী ও আবেগপূর্ণ চিত্রকলার উদ্ভব হয়, যা "আমরনা শিল্প" নামে পরিচিত। তাঁর স্ত্রী রানি নেফেরতিতি ছিলেন সে সময়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী নারী, যার আবক্ষ মূর্তি আজও বিশ্বের অন্যতম নান্দনিক শিল্পকর্ম হিসেবে স্বীকৃত।

    বিপ্লবের পরিণতি

    আখেনাতেনের মৃত্যুর পর তাঁর ধর্মীয় বিপ্লব দ্রুত ধসে পড়ে। পরবর্তী ফারাওরা আতেনবাদের চিহ্ন মুছে ফেলতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন এবং প্রথাগত বহুদেববাদী ধর্ম পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। এমনকি আখেনাতেনের নাম ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলো তাঁকে আবার ইতিহাসের আলোয় নিয়ে এসেছে, এবং আজ তিনি স্বীকৃত ইতিহাসের অন্যতম সাহসী ধর্মসংস্কারক হিসেবে।

    তুতেনখামুন: বালক রাজার অমর গল্প

    প্রাচীন মিশরের সবচেয়ে বিখ্যাত ফারাওদের নাম করতে গেলে সবার আগে যে নামটি আসে, তিনি হলেন তুতেনখামুন (রাজত্ব: আনুমানিক ১৩৩২–১৩২৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)। অথচ মজার ব্যাপার হলো, তিনি তাঁর জীবদ্দশায় তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু করেননি! তাঁর খ্যাতির একমাত্র কারণ—১৯২২ সালে তাঁর প্রায় অক্ষত সমাধির আবিষ্কার

    হাওয়ার্ড কার্টারের অভিযান

    ১৯২২ সালের ৪ নভেম্বর ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক হাওয়ার্ড কার্টার এবং তাঁর পৃষ্ঠপোষক লর্ড কার্নারভন মিশরের "রাজাদের উপত্যকায়" তুতেনখামুনের সমাধি আবিষ্কার করেন। এটি ছিল এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত, কেননা প্রাচীনকালে প্রায় সব ফারাওয়ের সমাধি লুট হয়ে গেলেও তুতেনখামুনের সমাধি ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়ে যাওয়ায় সেটি ছিল বহুলাংশে অক্ষত

    সোনালি ধনভাণ্ডার ও বিখ্যাত মুখোশ

    সমাধির ভেতর থেকে পাওয়া যায় পাঁচ হাজারেরও বেশি অমূল্য রত্ন, যার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো তুতেনখামুনের সোনার তৈরি মমির মুখোশ। এই মুখোশটি আজ মিশরীয় সভ্যতার অন্যতম স্বীকৃত প্রতীক হয়ে উঠেছে। সমাধিতে আরও ছিল সোনার রথ, সিংহাসন, অস্ত্রশস্ত্র, আসবাবপত্র, খাদ্যসামগ্রী, এমনকি রাজার সঙ্গী হওয়ার জন্য মমি করা দাসদাসীর দেহও

    অল্প বয়সে মৃত্যু ও রহস্য

    তুতেনখামুনের জীবন ছিল সংক্ষিপ্ত ও রহস্যে ঘেরা। তিনি ছিলেন ফারাও আখেনাতেনের পুত্র এবং মাত্র ৯ বছর বয়সে সিংহাসনে বসেন। তাঁর রাজত্ব ছিল মাত্র ১০ বছরের, আর মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৯ বছর। সাম্প্রতিক গবেষণায় জানা গেছে যে আখেনাতেন ও তাঁর স্ত্রী ছিলেন সহোদর ভাইবোন, যার ফলে তুতেনখামুনের শরীরে জন্মগত নানা ত্রুটি ছিল এবং তিনিও নিজের সৎবোনকেই বিয়ে করেছিলেন। সিটি স্ক্যানে দেখা গেছে তাঁর পায়ে হাড় ভাঙা ছিল এবং তিনি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন, যা তাঁর অকালমৃত্যুর কারণ হয়ে থাকতে পারে। এছাড়া, কার্টারের সমাধি আবিষ্কারের পর যাঁরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের কয়েকজনের অস্বাভাবিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে "মমির অভিশাপের" কিংবদন্তিও ছড়িয়ে পড়ে, যা তুতেনখামুনকে ঘিরে রহস্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তুতেনখামুন সম্ভবত ইতিহাসের একমাত্র ব্যক্তিত্ব, যিনি নিজের কৃতিত্বের চেয়ে নিজের মৃত্যু ও সমাধির জন্যই বেশি বিখ্যাত!

    দ্বিতীয় রামেসিস: মহান রামেসিসের রাজত্ব

    খুফু থেকে তুতেনখামুন পর্যন্ত যাত্রা শেষ হলেও প্রাচীন মিশরের আরেক ফারাওয়ের কথা না বললেই নয়, যিনি "রামেসিস দ্য গ্রেট" নামে পরিচিত—দ্বিতীয় রামেসিস (রাজত্ব: ১২৭৯–১২১৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)

    দীর্ঘতম রাজত্ব ও সামরিক বিজয়

    তিনি ছিলেন মিশরের উনবিংশ রাজবংশের তৃতীয় ফারাও এবং ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী শাসক, যিনি প্রায় ৬৬ বছর মিশর শাসন করেন। তাঁর শাসনামলে মিশরীয় সাম্রাজ্য আরও একবার সমৃদ্ধির শিখরে পৌঁছায়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল কাদেশের যুদ্ধ, যেখানে তিনি হিট্টাইট সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। যদিও যুদ্ধটি অমীমাংসিত থেকে যায়, রামেসিস তাঁর প্রচারণা-কৌশলে একে মহাবিজয় হিসেবে চিত্রিত করতে সক্ষম হন এবং পরবর্তীতে ইতিহাসের প্রথম লিখিত শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন।

    আবু সিম্বেল: পাথরে খোদাই করা কীর্তি

    তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপত্যকীর্তি হলো দক্ষিণ মিশরের আবু সিম্বেল মন্দির। নীল নদের তীরে পাথর কেটে তৈরি এই বিশাল মন্দিরটি শুধু তাঁর শক্তিরই জানান দেয় না, বরং স্থাপত্যকলায় মিশরীয়দের অসাধারণ দক্ষতারও প্রমাণ। মন্দিরের মূল ফটকে বসানো আছে রামেসিসের চারটি বিশালাকার মূর্তি, প্রতিটি প্রায় ২০ মিটার উঁচু। ১৯৬০-এর দশকে আসওয়ান বাঁধ নির্মাণের সময় মন্দিরটিকে সম্পূর্ণভাবে কেটে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, যা ছিল আধুনিক প্রকৌশলের এক অভূতপূর্ব নিদর্শন

    শত সন্তানের জনক

    রামেসিস ৯০ বছরেরও বেশি সময় বেঁচে ছিলেন এবং তাঁর ১০০-এর বেশি সন্তান ছিল বলে ধারণা করা হয়। এত বিপুল সন্তানের পিতা হিসেবে তিনিই সম্ভবত ইতিহাসের একমাত্র ফারাও। তাঁর মমি আজও কায়রো মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে, যা দেখতে প্রতি বছর লাখো পর্যটক ভিড় করেন।

    ফারাওদের অমর উত্তরাধিকার

    ফারাও খুফু থেকে তুতেনখামুন পর্যন্ত এই যাত্রা শুধু মিশরের ইতিহাস নয়, বরং সমগ্র মানবসভ্যতার ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। খুফুর গ্রেট পিরামিড আজও আমাদের বিস্মিত করে স্থাপত্যের অসাধারণ নিদর্শন হিসেবে। হাতশেপসুত প্রমাণ করেছেন যে নারীও হতে পারেন সফল রাষ্ট্রনায়ক। তৃতীয় থুতমোস দেখিয়েছেন যুদ্ধকৌশলের গুরুত্ব। আখেনাতেন ধর্মীয় চিন্তার বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পথিকৃৎ। আর তুতেনখামুন তাঁর অকালমৃত্যুর পরও হয়ে আছেন বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ফারাও।

    তিন হাজার বছর আগের এই শাসকদের উত্তরাধিকার আজও আমাদের শিক্ষা দেয় নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা ও মানবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার চিরন্তন মূল্য সম্পর্কে। পিরামিডের পাথরে খোদাই করা ইতিহাস আজও আমাদের জানান দেয়—মানুষের স্বপ্ন যখন সত্যিকারের মহৎ হয়, তখন সময়ের স্রোতও তাকে মুছে ফেলতে পারে না।

    আরও পড়ুন - 
    প্রাচীন মিশরের মহাকাব্য (পর্ব-০২): পিরামিড
    প্রাচীন মিশরের মহাকাব্য (পর্ব-০১): সূচনা

    একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

    নবীনতর পূর্বতন

    نموذج الاتصال