আমরা প্রায়ই মনে করি, পদার্থবিজ্ঞান মানেই জটিল অঙ্ক, বড় বড় সমীকরণ আর পরীক্ষাগারের ভেতরে আটকে থাকা এক দুরূহ বিষয়। কিন্তু সত্যিটা হলো, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি নড়াচড়া, প্রতিটি ঘটনার মূলে লুকিয়ে আছে পদার্থবিজ্ঞানের সেই মৌলিক সূত্রগুলো—যেগুলো আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিনশ বছর আগে স্যার আইজ্যাক নিউটন আবিষ্কার করেছিলেন।
১৬৮৭ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'ফিলোসফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথেমাটিকা' (Philosophiæ Naturalis Principia Mathematica)-তে নিউটন গতির যে তিনটি সূত্র বিবৃত করেছিলেন, তা-ই পরবর্তীতে চিরায়ত বলবিদ্যার ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই তিনটি সূত্র কেবল বিজ্ঞানের পাঠ্যবইয়ের জন্যই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এরা প্রতিনিয়ত আমাদের চারপাশে কাজ করছে—একটি পাখির উড়ে চলা থেকে শুরু করে রকেটের মহাকাশে পাড়ি দেওয়া পর্যন্ত।
এই ব্লগ পোস্টে আমরা নিউটনের তিনটি গতিসূত্র সহজ ভাষায় বুঝব এবং সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, আমরা দেখব কীভাবে আমাদের বাস্তব জীবনের নানা ঘটনা—হাঁটা, গাড়ি চালানো, ক্রিকেট খেলা, নৌকা থেকে লাফ দেওয়া—সবকিছুর পেছনে এই তিনটি সূত্র জাদুর মতো কাজ করছে। আসুন, পদার্থবিজ্ঞানকে একদম কাছ থেকে ছুঁয়ে দেখি!
প্রথম সূত্র: জড়তার সূত্র (Law of Inertia)
সূত্রটির মূল বিবৃতি
বাংলা ভাষায় নিউটনের গতির প্রথম সূত্রটি হলো:
"বাইরে থেকে কোনো বল প্রয়োগ না করলে স্থির বস্তু চিরকাল স্থির থাকবে এবং গতিশীল বস্তু চিরকাল সমবেগে সরলরেখায় চলতে থাকবে।"
ইংরেজিতে এই সূত্রটি বলা হয়: "An object at rest stays at rest, and an object in motion stays in motion at constant speed and in a straight line, unless acted upon by a net external force."
মূল ধারণা: জড়তা (Inertia)
প্রথম সূত্রের প্রাণকেন্দ্র হলো জড়তা (Inertia)। জড়তা হলো বস্তুর সেই সহজাত ধর্ম, যার কারণে বস্তু তার বর্তমান অবস্থা—স্থির থাকলে স্থির, আবার চলতে থাকলে চলমান—বজায় রাখতে চায়। অর্থাৎ, স্থির বস্তু নিজে থেকে কখনোই গতিশীল হতে পারে না, আবার চলমান বস্তুও নিজে থেকে নিজের গতি বা দিক বদলাতে পারে না। জড়তাকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়: স্থিতি জড়তা (Inertia of Rest) এবং গতি জড়তা (Inertia of Motion)।
বাস্তবে আমরা সবসময় দেখি যে চলন্ত বস্তু কিছুক্ষণ পর থেমে যায়—একটি ফুটবল কিক করার পর কিছুদূর গিয়ে থেমে যায়, একটি গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ করলে তা থেমে যায়। তাহলে কি নিউটনের প্রথম সূত্র ভুল? না। বস্তু থেমে যাওয়ার কারণ হলো, তার ওপর বাইরের বল কাজ করছে—বিশেষ করে ঘর্ষণ বল ও বায়ুর বাধা। মহাশূন্যে, যেখানে বায়ু বা ঘর্ষণ নেই, সেখানে একটি চলন্ত বস্তু প্রকৃত অর্থেই সমবেগে সরলরেখায় অনন্তকাল চলতে থাকবে। নাসা-র মতে, আন্তঃগ্রহ মহাকাশযানের নকশা ও গতিপথ নির্ধারণে এই সূত্রটির সরাসরি প্রয়োগ ঘটে।
বাস্তব জীবনের মজার উদাহরণ
১. চলন্ত বাসে হঠাৎ ব্রেক—শরীর ঝুঁকে পড়ে কেন?
বাস যখন সমবেগে চলছিল, তখন পুরো শরীরসহ আপনি একই গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ ব্রেক কষায় বাসটি থেমে গেল, কিন্তু আপনার দেহের ওপরের অংশ—বিশেষ করে মাথা ও ধড়—গতি জড়তার কারণে সেই সম্মুখগতি বজায় রাখতে চায়। ফলে আপনি সামনের দিকে ঝুঁকে পড়েন। আসলে দেহের নিচের অংশ (যা বাসের আসনের সংস্পর্শে ছিল) বাসের সাথে থেমে যায়, কিন্তু উপরের অংশ জড়তার কারণে চলতেই থাকে। একই কারণে যখন বাস হঠাৎ স্টার্ট নেয়, তখন শরীর পেছনের দিকে হেলে যায়—এটিও স্থিতি জড়তার উদাহরণ।
২. ছুটন্ত অবস্থায় হোঁচট খাওয়া
যখন আপনি দৌড়াচ্ছেন, আপনার পুরো শরীর একটি নির্দিষ্ট বেগে এগিয়ে চলছে। হঠাৎ পা কোনো বাধায় আটকে গেলে পা থেমে যায়, কিন্তু শরীরের বাকি অংশ (মাথা, ধড়) গতি জড়তার কারণে আগের বেগেই এগিয়ে যেতে চায়। ফলে আপনি সামনের দিকে পড়ে যান। অন্যদিকে, দাঁড়ানো অবস্থায় পা পিছলে গেলে শরীরের নিচের অংশ সরে যায় কিন্তু উপরের অংশ স্থিতি জড়তার কারণে স্থির থাকতে চায়, ফলে আপনি পেছনের দিকে পড়েন।
৩. গাড়ির সিটবেল্টের বিজ্ঞান
একটি গাড়ি যখন ১০০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা বেগে চলছিল, তখন গাড়ির ভেতরের সবকিছু—সিট, যাত্রী, এমনকি বাতাসও—ঠিক একই বেগে এগিয়ে চলছিল। হঠাৎ গাড়িটি কোনো কিছুর সাথে ধাক্কা খেয়ে মুহূর্তের মধ্যে থেমে গেল। দুর্ঘটনার মুহূর্তে গাড়ি থেমে গেলেও, যাত্রীর দেহ গতি জড়তার কারণে আগের বেগেই এগিয়ে যেতে চায়। সিটবেল্ট না থাকলে যাত্রী ছিটকে গিয়ে উইন্ডশিল্ডে আঘাত পেতে পারেন। সিটবেল্ট একমাত্র সেই "বাইরের বল" যা জড়তার বিরুদ্ধে কাজ করে যাত্রীর দেহকে থামাতে পারে। হোয়িপল্যাশ (Whiplash) নামক এক বিশেষ আঘাতও এই জড়তার কারণেই ঘটে—পেছন থেকে ধাক্কা লাগলে মাথা হঠাৎ পেছনে ও পরে সামনে ঝাঁকুনি দেয়।
৪. গ্লাস থেকে টাকার কায়দা
এটি একটি ক্লাসিক পরীক্ষা যা খুব সহজেই বাড়িতে করা যায়। একটি গ্লাসের ওপর একটি কার্ডবোর্ড বা তাস রাখুন, তার ওপর একটি ধাতব মুদ্রা রাখুন। এবার তাসটিকে খুব দ্রুত আঙুলের টোকায় সরিয়ে দিন। দেখবেন তাসটি সরে গেলেও, মুদ্রাটি স্থিতি জড়তার কারণে সোজা গ্লাসে পড়ে যাবে। বাস্তব জীবনে এই একই নীতি কাজ করে কম্বলের ধুলো ঝাড়ার সময়—লাঠি দিয়ে দ্রুত আঘাতে কম্বলকে সরিয়ে নিলেও ধূলিকণা স্থির থাকতে চায় বলেই ঝরে পড়ে।
৫. সাইকেল চালানোর সময় ব্রেক
যখন সাইকেল চালাচ্ছেন আর হঠাৎ ব্রেক করলেন, সাইকেল থেমে গেলেও আপনার শরীর গতি জড়তার কারণে সামনে এগিয়ে যায়—এ কারণেই সাইকেল থেকে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। ঠিক একইভাবে, একটি ঘূর্ণায়মান বৈদ্যুতিক পাখার সুইচ বন্ধ করার পরও পাখাটি কিছুক্ষণ ঘুরতে থাকে—গতি জড়তার কারণে।
৬. চাঁদ ও গ্রহদের গতি
মহাকাশে পৃথিবী ও চাঁদের গতিও নিউটনের প্রথম সূত্রের এক অসাধারণ প্রমাণ। চাঁদ যদি পৃথিবীর মহাকর্ষ বলের আওতায় না থাকত, তাহলে এটি সরলরেখায় সমবেগে মহাশূন্যে ছুটে যেত। কিন্তু পৃথিবীর মহাকর্ষ নামক "বাইরের বল" ক্রমাগত চাঁদের গতিপথকে বাঁকিয়ে একটি উপবৃত্তাকার কক্ষপথে আবদ্ধ করে রেখেছে।
আরও পড়ুন -
দ্বিতীয় সূত্র: বল, ভর ও ত্বরণের সম্পর্ক (F = ma)
সূত্রটির মূল বিবৃতি
নিউটনের দ্বিতীয় সূত্রটি হলো:
"কোনো বস্তুর ভরবেগের পরিবর্তনের হার তার ওপর প্রযুক্ত বলের সমানুপাতিক এবং বল যে দিকে ক্রিয়া করে বস্তুর ভরবেগের পরিবর্তনও সেই দিকে ঘটে।"
সংক্ষেপে এই সূত্রটিকে F = ma সূত্র দিয়ে প্রকাশ করা হয়। অর্থাৎ, কোনো বস্তুর ওপর প্রযুক্ত নিট বল (F) বস্তুটির ভর (m) ও ত্বরণের (a) গুণফলের সমান। এই মহাসূত্র থেকে আমরা বুঝতে পারি: একই পরিমাণ বল প্রয়োগ করলে কম ভরের বস্তুতে বেশি ত্বরণ হবে, আর বেশি ভরের বস্তুতে ত্বরণ হবে কম।
মূল ধারণা: ত্বরণ কিসের ওপর নির্ভর করে?
F = ma সূত্রটি আমাদের বলে, ত্বরণ (a) দুটি জিনিসের ওপর নির্ভর করে—(১) বস্তুর ওপর প্রযুক্ত মোট বল (F) এবং (২) বস্তুর ভর (m)। বল যত বেশি হবে, ত্বরণও তত বেশি হবে (ভর স্থির থাকলে)। আবার ভর যত বেশি হবে, ত্বরণ তত কম হবে (বল স্থির থাকলে)।
একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি পুরোপুরি বোঝা যায়। ধরুন আপনি একটি ফুটবলকে কিক করলেন (ভর ≈ ০.৫ কেজি, ত্বরণ ≈ ১০ মিটার/সেকেন্ড²)। তাহলে ফুটবলে প্রযুক্ত বলের পরিমাণ: F = ০.৫ × ১০ = ৫ নিউটন। এখন যদি একই পরিমাণ বল (৫ নিউটন) একটি বোলিং বলে (ভর ≈ ৫ কেজি) প্রয়োগ করেন, তাহলে তার ত্বরণ হবে: a = F/m = ৫/৫ = ১ মিটার/সেকেন্ড²। অর্থাৎ একই বল দুইটি ভিন্ন ভরের বস্তুতে সম্পূর্ণ ভিন্ন ত্বরণ সৃষ্টি করে।
বাস্তব জীবনের মজার উদাহরণ
১. ফাঁকা বনাম ভারী শপিং ট্রলি
সুপারমার্কেটে গেলে প্রতিনিয়ত নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র দেখা যায়। একটি ফাঁকা শপিং ট্রলি খুব সহজেই ধাক্কা দিয়ে গতিশীল করা যায় এবং তা দ্রুত গতি পায়। কিন্তু সেই একই ট্রলি যখন বাজার করে ভর্তি করা হয়, তখন একই পরিমাণ বল প্রয়োগ করেও তা আগের মতো দ্রুত চালানো যায় না। কারণ, ভর বেড়ে যাওয়ায় ত্বরণ কমে গেছে।
২. ক্রিকেটে বড় শট
ক্রিকেটে যখন একজন ব্যাটসম্যান বিশাল ছক্কা মারেন, তখন তিনি আসলে নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র প্রয়োগ করছেন। ব্যাটসম্যান যদি ব্যাটকে বেশি জোরে (অধিক বল) এবং যতক্ষণ সম্ভব বলের সংস্পর্শে রেখে সুইং করেন, তাহলে বলটি ব্যাট থেকে ছিটকে যাওয়ার সময় বেশি ত্বরণ পায় এবং অধিক গতিতে বাউন্ডারির বাইরে যায়। একই নীতি প্রযোজ্য ফুটবল কিক, টেনিস সার্ভ, কিংবা বেসবল হিটিংয়ের ক্ষেত্রে।
৩. গাড়ির ত্বরণ
যখন একটি স্পোর্টস কারের ইঞ্জিন শক্তিশালী হয় (অর্থাৎ বেশি বল উৎপন্ন করতে পারে) এবং গাড়ির ওজন হালকা হয় (কম ভর), তখন সেটি খুব দ্রুত গতি পায়—০ থেকে ১০০ কিমি/ঘণ্টায় পৌঁছাতে মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় নেয়। কিন্তু একটি ভারী ট্রাকের ইঞ্জিন শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও তার ভর অনেক বেশি হওয়ায় ত্বরণ অনেক কম হয়। টাইমস অফ ইন্ডিয়ার এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, মোটরগাড়ি প্রকৌশলীরা ইঞ্জিনের পাওয়ার নির্ধারণ করার সময় ঠিক এই নীতির ওপর ভিত্তি করেই হিসাব কষেন।
৪. দৌড়বিদের শুরুটা
স্প্রিন্টাররা যখন রেস শুরু করেন, তখন তারা শুরুর ব্লকের বিরুদ্ধে পা দিয়ে সজোরে ধাক্কা দেন—এটি হচ্ছে নিউটনের দ্বিতীয় সূত্রেরই প্রয়োগ। তারা যত জোরে পায়ের বল প্রয়োগ করতে পারেন, তত বেশি ত্বরণ নিয়ে তারা দৌড় শুরু করতে পারেন। একইভাবে, একজন বরফ-স্কেটার যতক্ষণ পা দিয়ে জোরে ধাক্কা দিচ্ছেন, ততক্ষণই তার ত্বরণ বাড়ছে।
৫. পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ির গতি কমানো
পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি চালানোর সময় নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র আরেকভাবে কাজ করে। গাড়ি যখন পাহাড়ি রাস্তার ঢাল বেয়ে নামতে থাকে, তখন অভিকর্ষ বলের প্রভাবে গাড়ির ওপর ক্রমাগত বল প্রযুক্ত হয় এবং গাড়ির গতি বাড়তে থাকে (ত্বরণ = বল/ভর)। ব্রেক প্রয়োগ করে আমরা প্রতিরোধী বল সৃষ্টি করি, যা গাড়িতে ঋণাত্মক ত্বরণ (মন্দন) তৈরি করে এবং গতি কমিয়ে আনে।
৬. ওজন বনাম ভর
বিভিন্ন গ্রহে কোনো বস্তুর ওজন ভিন্ন ভিন্ন হয়—এই ধারণাটি বুঝতে দ্বিতীয় সূত্র অপরিহার্য। ওজন (Weight) আসলে মহাকর্ষীয় বল, যা F = mg সূত্র দিয়ে প্রকাশ করা হয়। চাঁদে g (অভিকর্ষজ ত্বরণ) পৃথিবীর তুলনায় কম বলেই, একই ভরের বস্তুর ওজন সেখানে কম। এই হিসাবের মূলে রয়েছে নিউটনের দ্বিতীয় সূত্রই।
তৃতীয় সূত্র: ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়ার সূত্র (Action-Reaction)
সূত্রটির মূল বিবৃতি
নিউটনের তৃতীয় সূত্রটি বাংলায় বলা হয়:
ইংরেজিতে: "For every action, there is an equal and opposite reaction." এর অর্থ হলো, যখনই একটি বস্তু (A) অপর একটি বস্তুর (B) ওপর বল প্রয়োগ করে, তখন দ্বিতীয় বস্তুটিও প্রথম বস্তুর ওপর সমান মানের কিন্তু বিপরীত দিকের বল প্রয়োগ করে। এই দুইটি বল একই সাথে ভিন্ন দুই বস্তুর ওপর ক্রিয়া করে, কোনো একক বস্তুর ওপর নয়।
মূল ধারণা: বল সবসময় জোড়ায় জোড়ায়
তৃতীয় সূত্রের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, পৃথিবীতে কখনোই একটি মাত্র বল কাজ করে না। প্রতিটি ক্রিয়াবলের বিপরীতে একটি প্রতিক্রিয়া বল সবসময় উপস্থিত থাকে। তবে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বল জোড়া কখনোই একই বস্তুর ওপর ক্রিয়া করে না—বল দুটি ভিন্ন ভিন্ন বস্তুর ওপর ক্রিয়া করে। এ কারণেই তারা একে অপরকে প্রশমিত করতে পারে না। যেমন, আপনি দেয়ালে ধাক্কা দিলে (ক্রিয়া), দেয়ালও আপনাকে সমান বলে পেছনের দিকে ধাক্কা দেয় (প্রতিক্রিয়া)—আপনি সরে যান, কিন্তু দেয়াল সরেও যদি দেয়ালটি যথেষ্ট শক্ত হয়।
বাস্তব জীবনের মজার উদাহরণ
১. হাঁটা: প্রতিটি পদক্ষেপে নিউটন
আমাদের প্রতিদিনের হাঁটাচলাই তৃতীয় সূত্রের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। যখন আপনি হাঁটেন, আপনার পা মাটিকে পেছনের দিকে ধাক্কা দেয় (এটি ক্রিয়া বল)। প্রতিক্রিয়ায় মাটিও আপনার পাকে সমান বলে সামনের দিকে ঠেলে দেয়—এই বলই আপনাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। যে কারণে পিচ্ছিল তলে হাঁটতে কষ্ট হয়, তা হলো ঘর্ষণ কমে যাওয়ায় পা মাটিতে যথেষ্ট ক্রিয়া বল প্রয়োগ করতে পারে না, ফলে প্রতিক্রিয়া বলও কম হয় এবং আপনি এগোতে পারেন না।
২. সাঁতার: পানিকে ধাক্কা দিয়ে এগোনো
সাঁতারের সময় হাত ও পা দিয়ে আমরা পানি পেছনের দিকে ঠেলে দিই (ক্রিয়া)। নিউটনের তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী, পানি আমাদের হাত ও পাকে সমান বলে সামনের দিকে ঠেলে দেয় (প্রতিক্রিয়া), যে কারণে আমরা এগিয়ে যাই। অস্ট্রেলিয়ান ও অলিম্পিক সাঁতারুরা এই বলবিদ্যা পুরোপুরি বোঝেন বলেই নিজেদের স্ট্রোক আরও কার্যকর করতে পারেন।
৩. নৌকা থেকে লাফ দেওয়া
এটি তৃতীয় সূত্রের একটি ক্লাসিক উদাহরণ। ধরুন আপনি একটি ছোট নৌকার ওপর দাঁড়িয়ে আছেন। আপনি যখন নৌকা থেকে ডাঙায় লাফ দেন, আপনার পা নৌকাকে পেছনের দিকে ধাক্কা দেয় (ক্রিয়া)। প্রতিক্রিয়ায় নৌকা আপনার পাকে সমান বলে সামনের দিকে ঠেলে দেয়—আপনি ডাঙায় পৌঁছে যান, কিন্তু নৌকাটি পেছনের দিকে সরে যায়।
৪. পাখির ওড়া ও বিমানের উড্ডয়ন
পাখি যখন আকাশে ওড়ে, তখন তার ডানা বাতাসকে নিচের দিকে চাপ দেয় (ক্রিয়া)। নিউটনের তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী, বাতাসও পাখির ডানায় সমান বলে ওপরের দিকে ধাক্কা দেয় (প্রতিক্রিয়া)—আর এতেই পাখি শূন্যে ভাসতে পারে। একই নীতি কাজ করে বিমান উড্ডয়নের ক্ষেত্রে। বিমানের ইঞ্জিন থেকে নির্গত গ্যাস পেছনের দিকে প্রচণ্ড বেগে ধাক্কা দেয়, এবং প্রতিক্রিয়ায় বিমান সামনের দিকে ধাবিত হয়। রকেট উৎক্ষেপণও একই নীতিতে ঘটে—জ্বালানি পুড়ে উৎপন্ন গ্যাস নিচের দিকে নির্গত হলে, প্রতিক্রিয়ায় রকেট ওপরের দিকে ছুটে যায়।
৫. বন্দুকের গুলি ছোড়া
যখন একটি বন্দুকের ট্রিগার চাপা হয়, বিস্ফোরক রাসায়নিক বিক্রিয়ায় উৎপন্ন গ্যাস গুলিকে সামনের দিকে প্রচণ্ড বেগে ঠেলে দেয় (ক্রিয়া)। নিউটনের তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী, গুলিও গ্যাস ও বন্দুককে সমান বলে পেছনের দিকে ধাক্কা দেয় (প্রতিক্রিয়া)। এই প্রতিক্রিয়াটিই হলো বন্দুকের রিকয়েল (recoil) বা পশ্চাদপসরণ। যেকোনো বন্দুক ব্যবহারকারী বলতে পারবেন, গুলি ছোড়ার পর কাঁধে যে ধাক্কা লাগে, সেটি কোনো ছোটখাটো ব্যাপার নয়।
৬. ক্রিকেট ব্যাটসম্যানের অভিজ্ঞতা
ক্রিকেটে যখন একজন ফাস্ট বোলার বল করেন, বলটি ব্যাটসম্যানের দিকে দ্রুতগতিতে ছুটে আসে। ব্যাটসম্যান যখন বলটি ব্যাট দিয়ে মারেন, ব্যাট বলের ওপর বল প্রয়োগ করে (ক্রিয়া)। তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী, বলটিও ব্যাটের ওপর সমান বল প্রয়োগ করে (প্রতিক্রিয়া), যে কারণে ব্যাটসম্যানের হাতে ধাক্কা অনুভূত হয়। বল যদি অনেক দ্রুতগতির হয়, তাহলে প্রতিক্রিয়া বলও তত শক্তিশালী হয়।
৭. নিউটনের ক্রেডল
নিউটনের ক্রেডল হলো পাঁচটি ধাতব বল, যা সুতো দিয়ে পাশাপাশি ঝোলানো থাকে। যখন এক প্রান্তের বলটি টেনে ছেড়ে দেওয়া হয়, সেটি পাশের বলটিকে আঘাত করে এবং থেমে যায়। কিন্তু আঘাতপ্রাপ্ত বলটি বলটিকে স্থির অবস্থায় রেখে নিজে নড়ে না—বরং শক্তি ও ভরবেগ বল থেকে বলে স্থানান্তরিত হয়ে শেষ প্রান্তের বলটিকে সমান উচ্চতায় দোল দিয়ে ওঠায়। এটি একই সাথে তৃতীয় সূত্র ও ভরবেগের সংরক্ষণশীলতার নীতি প্রদর্শন করে।
তিন সূত্রের মিলনমেলা: একটি ক্রিকেট ম্যাচের গল্প
এবার আসুন, একটি কাল্পনিক ক্রিকেট ম্যাচের একটি মাত্র ওভারের ভেতরে আমরা নিউটনের তিনটি সূত্রকেই একসাথে কাজ করতে দেখি।
ঘটনা ১ (তৃতীয় সূত্র—বোলার): ফাস্ট বোলার তাসকিন দীর্ঘ রান-আপ নিয়ে এসে সজোরে বল করলেন। রান-আপের সময় তার পা মাটিতে পেছনের দিকে ধাক্কা দেয় (ক্রিয়া), আর মাটি তাকে সামনের দিকে ঠেলে দেয় (প্রতিক্রিয়া)—এটাই তৃতীয় সূত্র। বল যখন তার হাত ছেড়ে বেরোয়, তখন তার আঙুলগুলো বলকে সামনের দিকে ঠেলে দেয়, এবং বলও তার আঙুলে সমান বলে ধাক্কা দেয়।
ঘটনা ২ (দ্বিতীয় সূত্র—বোলারের গতি): তাসকিন যত জোরে (অধিক বল) এবং ততক্ষণ ধরে বলের ওপর বল প্রয়োগ করতে পারেন, বল তত বেশি ত্বরণ পায়—এটি দ্বিতীয় সূত্র (F = ma)। বল লাইটওয়েট (মাত্র ১৬৩ গ্রাম) হওয়ায়, একই বল প্রয়োগে তার ত্বরণ হয় অনেক বেশি।
ঘটনা ৩ (প্রথম সূত্র—বলের গতি): বল একবার তাসকিনের হাত ছেড়ে বেরিয়ে গেলে, যদি বাতাসের বাধা ও অভিকর্ষ না থাকত, তাহলে বলটি সমবেগে সরলরেখায় তার গতিপথে চলতে থাকত (প্রথম সূত্র)। কিন্তু বাতাসের বাধা ও অভিকর্ষ বল—এই দুইটি "বাইরের বল" একইসাথে কাজ করায় বলের গতি ধীর হতে থাকে এবং পিচের দিকে নেমে যায়।
ঘটনা ৪ (দ্বিতীয় সূত্র—ব্যাটসম্যান): ব্যাটসম্যান সাকিব বলটিকে সজোরে ব্যাট চালিয়ে মারলেন। ব্যাট যখন বলের সংস্পর্শে আসে, ব্যাট বলের ওপর একটি বল প্রয়োগ করে, এবং বলটি ত্বরণপ্রাপ্ত হয়ে বাউন্ডারির দিকে ছুটে যায়। আবারও দ্বিতীয় সূত্র। সাকিব যত জোরে ও যতক্ষণ বলের সংস্পর্শে থেকে ব্যাট চালান, বল তত বেশি ত্বরণ পায়।
ঘটনা ৫ (তৃতীয় সূত্র—ব্যাটসম্যানের হাত): বল ব্যাটে লাগার মুহূর্তে, বলটিও ব্যাটের ওপর সমান বলে বিপরীত দিকে ধাক্কা দেয়—এ কারণেই সাকিবের হাতে ঝাঁকুনি অনুভূত হয় (তৃতীয় সূত্র)। ফাস্ট বোলারের বল ব্যাটে লাগলে হাতে যে ধাক্কা লাগে, তার কারণ বলটির গতিশক্তি বেশি থাকায় ক্রিয়া বলও তীব্র।
ঘটনা ৬ (প্রথম সূত্র—ফিল্ডার): বল সীমানার কাছাকাছি গিয়ে থামছে। ফিল্ডার লিটন বলটির পেছনে ছুটছেন। বল যখন ধীরে ধীরে গড়িয়ে থামতে থাকে, তখন ঘর্ষণ বল কাজ করছে—যদি ঘর্ষণ না থাকত, বল অনির্দিষ্টকাল ধরে গড়াতেই থাকত (প্রথম সূত্র)।
একটি মাত্র ওভারের ভেতরেই নিউটনের তিনটি সূত্র এতবার কাজ করল—আর ক্রিকেটপ্রেমীরা আমরা মাঠের উত্তেজনায় মশগুল হয়ে পদার্থবিজ্ঞানের এই জাদু টেরও পেলাম না!
নিউটনের গতির তিনটি সূত্র কেবল পদার্থবিজ্ঞানের শ্রেণিকক্ষের জন্য আবদ্ধ কোনো তত্ত্ব নয়; এগুলো আমাদের অস্তিত্বেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। সকালে বিছানা ছেড়ে ওঠা থেকে রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত—আমরা যে প্রতিটি নড়াচড়া করি, যে প্রতিটি বস্তুকে নাড়াই, যে প্রতিটি বাহন চালাই, সবকিছুর পেছনে নীরবে কাজ করে চলেছে এই তিনটি অমোঘ সূত্র।
প্রথম সূত্র আমাদের শেখায় বস্তুর জড়তা সম্পর্কে—কেন আমরা চলন্ত গাড়িতে ব্রেক কষলে সামনে ঝুঁকে পড়ি, কেন সিটবেল্ট পরা জরুরি। দ্বিতীয় সূত্র (F = ma) ব্যাখ্যা করে কেন ভারী বস্তু সরাতে বেশি বল প্রয়োজন, কেন ফুটবলকে জোরে কিক করলে তা দ্রুত যায়। আর তৃতীয় সূত্র আমাদের আক্ষরিক অর্থেই এগিয়ে নিয়ে চলে—এই সূত্র ছাড়া আমরা হাঁটতেও পারতাম না, গাড়িও চলত না, রকেটও মহাকাশে পাড়ি দিতে পারত না।
পরেরবার ক্রিকেট খেলার সময় যখন ব্যাটে বলে জোরালো শট মারবেন, অথবা স্রোতের বিপরীতে হাঁটার সময় পায়ের মাংসপেশিতে টান অনুভব করবেন, তখন একবার নিউটনের তিনটি সূত্রের কথা ভেবে দেখবেন। দেখবেন, পদার্থবিজ্ঞান হঠাৎ করেই কত মজার আর কত কাছের মনে হবে!
আরও পড়ুন -
FAQ
প্রশ্ন ১: নিউটনের প্রথম গতিসূত্র কী?
উত্তর:
নিউটনের প্রথম গতিসূত্র বা জড়তার সূত্র বলে, বাইরের কোনো বল প্রয়োগ না
করলে স্থির বস্তু চিরকাল স্থির এবং গতিশীল বস্তু চিরকাল সমবেগে সরলরেখায়
চলতে থাকবে।
প্রশ্ন ২: নিউটনের দ্বিতীয় সূত্রের সমীকরণ কী?
উত্তর:
F = ma। যেখানে F হলো নিট বল, m হলো বস্তুর ভর, এবং a হলো ত্বরণ। এই
সমীকরণ থেকে বোঝা যায়, বল বাড়লে ত্বরণ বাড়ে, আর ভর বাড়লে একই বলের জন্য
ত্বরণ কমে।
প্রশ্ন ৩: ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সূত্রটি কীভাবে হাঁটার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য?
উত্তর:
হাঁটার সময় পা মাটিকে পেছনের দিকে ধাক্কা দেয় (ক্রিয়া বল)। নিউটনের
তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী, মাটিও সমান বলে পাকে সামনের দিকে ঠেলে দেয়
(প্রতিক্রিয়া বল), যা আমাদের এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।
প্রশ্ন ৪: গাড়ির সিটবেল্ট কোন সূত্রের উদাহরণ?
উত্তর:
গাড়ির সিটবেল্ট নিউটনের প্রথম সূত্র বা জড়তার সূত্রের একটি ব্যবহারিক
প্রয়োগ। ব্রেক কষার পর গাড়ি থেমে গেলেও যাত্রীর দেহ জড়তার কারণে এগিয়ে
যেতে চায়—সিটবেল্ট এই গতি প্রতিরোধ করে আঘাত থেকে রক্ষা করে।
প্রশ্ন ৫: রকেট উৎক্ষেপণ কোন সূত্রের ওপর ভিত্তি করে ঘটে?
উত্তর:
রকেট উৎক্ষেপণ ঘটে নিউটনের তৃতীয় সূত্রের ওপর ভিত্তি করে। রকেটের ইঞ্জিন
থেকে নির্গত গ্যাস পেছনের দিকে প্রচণ্ড বেগে ধাক্কা দেয় (ক্রিয়া), আর
প্রতিক্রিয়ায় রকেট সামনের দিকে ছুটে যায়।
প্রশ্ন ৬: নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র অনুযায়ী, ত্বরণ কিসের ওপর নির্ভর করে?
উত্তর:
দ্বিতীয় সূত্র অনুযায়ী, কোনো বস্তুর ত্বরণ নির্ভর করে (১) বস্তুর ওপর
প্রযুক্ত নিট বলের পরিমাণের ওপর এবং (২) বস্তুটির ভরের ওপর। বল বাড়লে ত্বরণ
বাড়ে, ভর বাড়লে ত्वरण কমে।
প্রশ্ন ৭: নিউটনের সূত্রগুলো কবে এবং কোথায় প্রকাশিত হয়েছিল?
উত্তর:
নিউটনের গতির সূত্রগুলো প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৬৮৭ সালে, স্যার আইজ্যাক
নিউটনের লেখা 'Philosophiæ Naturalis Principia Mathematica' (প্রাকৃতিক
দর্শনের গাণিতিক নীতিসমূহ) নামক গ্রন্থে।
