কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি

    অসভ্য ভাইকিংস ও মানব সভ্যতায় অবদান : Savage Vikings

    ভাইকিং শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে শিংওয়ালা হেলমেট পরা এক দল বর্বর যোদ্ধার ছবি, যারা জাহাজ থেকে নেমে গ্রামে গ্রামে লুটপাট ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। ইতিহাসের পাতায় তাঁরা পেয়েছেন ‘অসভ্য’ উপাধি, আর সংস্কৃতি জুড়ে ছড়িয়ে আছে ‘ভয়ংকর’ তাদের ভাবমূর্তি। কিন্তু এই ধারণাটি কি পুরোপুরি সঠিক? ইদানীংকালের প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গবেষণায় ভাইকিংদের সম্পর্কে যে নতুন তথ্য বেরিয়ে আসছে, তা আমাদের প্রচলিত অনেক ধারণাকে পাল্টে দিচ্ছে। এই প্রতিবেদনে আমরা ভাইকিংদের সেইসব অবদান নিয়েই কথা বলব, যা তাঁদের ‘অসভ্য’ আখ্যা দিতে আমাদের দ্বিধাগ্রস্ত করে তোলে। আপনি তৈরি তো?

    ভাইকিং কারা?

    ভাইকিংরা ছিল মূলত স্ক্যান্ডিনেভিয়ার (বর্তমান ডেনমার্ক, নরওয়ে ও সুইডেন) বাসিন্দা, যারা ৮ম থেকে ১১শ শতক পর্যন্ত ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে অভিযান, বাণিজ্য ও বসতি স্থাপন করে। ‘ভাইকিং’ শব্দটির প্রচলিত অর্থ ‘সাগর ডাকাত’, কিন্তু এটি শুধু একটি পেশার পরিচয় দেয়, একটি জাতির নয়। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার অনেকেই ছিলেন কৃষক, ব্যবসায়ী, কারিগর ও অনুসন্ধানকারী, যাদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে অভূতপূর্ব সামুদ্রিক বাণিজ্য নেটওয়ার্ক।

    নাবিকত্ব ও অনুসন্ধান: যুগের আগেই বিশ্ব ভ্রমণ

    ভাইকিংদের সবচেয়ে বড় অবদান তাদের অসাধারণ নাবিকত্ব দক্ষতা ও জাহাজ নির্মাণ কৌশল। ভাইকিং লংশিপগুলি ছিল তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে উন্নত জাহাজ। ২৩ মিটার লম্বা গোকস্টাড জাহাজটিতে ৩২ জন দাঁড় বাইতে পারত, অথচ এত বড় জাহাজটিও অগভীর নদীতে চলাচলের জন্য যথেষ্ট হালকা ছিল। কাঠের তক্তা উল্লম্বভাবে না কেটে ফালি করে কাটার কারিগরি কৌশল জাহাজগুলোকে শক্তিশালী ও স্থিতিস্থাপক করে তুলত

    এই জাহাজ নিয়েই ভাইকিংরা পৌঁছে গিয়েছিল ব্রিটেন, ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি এমনকি উত্তর আফ্রিকার উপকূলে। বণিকরা স্থলপথে রাশিয়া হয়ে কনস্টান্টিনোপল (বর্তমান ইস্তাম্বুল) পৌঁছাত, আবার কেউ কেউ পৌঁছে গিয়েছিল বাগদাদেও। লেইফ এরিকসনের নেতৃত্বে তাঁরা কোলম্বাসের প্রায় ৫০০ বছর আগেই উত্তর আমেরিকার নিউফাউন্ডল্যান্ডে পৌঁছেছিলেন

    পশ্চিম দিকে আইসল্যান্ড ও গ্রিনল্যান্ডে স্থায়ী বসতি স্থাপন এবং পূর্ব দিকে ভলগা ও ডিনিপার নদীপথ ধরে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য ও ইসলামিক খিলাফতের সঙ্গে বাণিজ্য সংযোগ স্থাপন ভাইকিংদের অনুসন্ধানী মনোভাবের প্রমাণ।

    আইন ও শাসন: গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন

    ভাইকিং সমাজের একটি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান হল ‘থিং’ (Þing) নামক আইনসভার ব্যবস্থা। এটি ছিল মুক্ত মানুষের সমাবেশ, যেখানে আইন প্রণয়ন, বিরোধ নিষ্পত্তি ও সামাজিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হত। একজন ‘ল স্পিকার’ আইন মুখস্থ করে আবৃত্তি করতেন। স্থানীয় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন থিং কাউন্সিল কাজ করত

    এর সফলতা এতটাই ছিল যে ভাইকিংরা এটি তাদের সমস্ত উপনিবেশে ছড়িয়ে দিয়েছিল। ৯৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত আইসল্যান্ডের আলথিং এখনো টিকে আছে এবং বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো টিকে থাকা সংসদ হিসেবে পরিচিত। নরওয়ের সংসদ ‘স্টোরথিং’, ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জের ‘লোগথিং’ এবং আইল অফ ম্যানের ‘টাইনওয়াল্ড’ আজও ভাইকিংদের সেই আইন প্রণয়নের উত্তরাধিকার বহন করছে। এই প্রক্রিয়া ছিল ‘আইনের শাসন’ প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক প্রয়াস

    শিল্প ও কারুশিল্প: সূক্ষ্ম শিল্পের নিদর্শন

    ভাইকিংরা যে শুধু যোদ্ধা ছিলেন তা নয়, তাঁরা ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ কারিগর। কাঠের খোদাই, ধাতব কাজ ও অলংকার নির্মাণে তাঁদের পারদর্শিতা অসামান্য। ওসবার্গ জাহাজের নকশা ও খোদাই এখনো শিল্পকলার অনন্য নিদর্শন।

    প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলিতে অস্ত্রের চেয়েও বেশি পাওয়া গেছে অলংকার, চিরুনি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় কারুশিল্প। লোহা ও কাঠের কাজে পারদর্শী ভাইকিং কামাররা জাহাজ নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন। তাদের ধাতুর কাজ এত উন্নত ছিল যে রোরবি তরোয়ালগুলোর মতো জটিল নিদর্শন তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল। সংক্ষেপে, ভাইকিংদের কারিগরি দক্ষতা ছিল বহুমাত্রিক, যুদ্ধের সরঞ্জাম তৈরির পাশাপাশি তাঁরা শিল্পের বোধসম্পন্ন মানুষ ছিলেন।

    ভাষা ও সাহিত্যে ভাইকিংদের অবদান

    আধুনিক ইংরেজি ভাষার ওপর ভাইকিংদের প্রভাব গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। প্রায় এক হাজারেরও বেশি ওল্ড নর্স (প্রাচীন স্ক্যান্ডিনেভিয়ান ভাষা) শব্দ ইংরেজি ভাষার অংশ হয়েছে। ‘Sky’, ‘Egg’, ‘Law’, ‘Leg’, ‘Call’, ‘Take’, ‘Window’, ‘Knife’, ‘Die’, ‘Skin’—এই সব মৌলিক শব্দ ভাইকিংদের উপহার

    সর্বনামের ওপর প্রভাব সবচেয়ে গভীর। ‘They’, ‘Them’, ‘Their’—ইংরেজির এই গুরুত্বপূর্ণ সর্বনাম তিনটিই এসেছে ওল্ড নর্স থেকে। ক্রিয়াপদেও প্রভাব রয়েছে, ‘To be’ ক্রিয়ার ‘Are’ রূপটিও ভাইকিংদের দান। এছাড়া ‘Berserk’ ও ‘Ransack’ শব্দ দুটির ভাইকিং উৎস আমাদের মনে করিয়ে দেয় তাঁদের যোদ্ধা সংস্কৃতির কথাও।

    ভাষার পাশাপাশি সাহিত্যেও তাঁরা অবদান রেখে গেছেন। এডিক ও স্ক্যাল্ডিক কবিতায় সংরক্ষিত নর্স পুরাণ ও সাগাসমূহ ইউরোপীয় সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।

    নগরায়নে ভাইকিংদের অবদান

    ভাইকিং বণিকদের বাণিজ্য কার্যক্রম ইউরোপ জুড়ে নগর কেন্দ্রগুলির বিকাশ ও সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ইয়র্ক শহরটি ভাইকিংদের দখলে আসার পর পরিকল্পিত নগরায়নের আওতায় আসে। সেখানে দেখা যায় সমান পরিমাপের প্লট, নির্দিষ্ট দূরত্বের রাস্তা এবং নিকাশি ও আবর্জনা ফেলার নির্দিষ্ট ব্যবস্থা

    আয়ারল্যান্ডে ডাবলিন ও কর্কও ভাইকিংদের হাতে ঘনবসতিপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত হয়। স্ক্যান্ডিনেভিয়াতেই বির্কা (সুইডেন), রিবে (ডেনমার্ক), কাউপাং (নরওয়ে) ও হেডেবি (জার্মানি) ছিল ভাইকিং যুগের প্রথম দিকের প্রধান চারটি নগর কেন্দ্র। এই নগরগুলোতে কৃষির বাইরে কারিগরি ও বাণিজ্যই ছিল প্রধান পেশা। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান রাজ্য গঠনে এই নগরগুলির মৌলিক গুরুত্ব ছিল

    ব্যক্তিগত সাজসজ্জা ও স্বাস্থ্যবিধি: ‘অসভ্য’ আখ্যার বিপরীতে

    প্রচলিত ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীতে, ভাইকিংরা ছিল ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি ও সাজগোজে অত্যন্ত সচেতন। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে ভাইকিংদের কবর থেকে প্রচুর পরিমাণে চিরুনি, চিমটা, ক্ষুর ও কানের ক্লিনার পাওয়া গেছে—অস্ত্রের চেয়েও বেশি। চিরুনিগুলো প্রায়শই হাড় বা পশুর শিং দিয়ে তৈরি হত এবং নান্দনিক খোদাই থাকত

    ভাইকিংরা সপ্তাহে অন্তত একবার গোসল করত এবং ‘লউগারদাগুর’ বা ‘গোসলের দিন’ নামে তাদের একটি নির্দিষ্ট দিন ছিল, যার নাম থেকেই বিভিন্ন স্ক্যান্ডিনেভিয়ান ভাষায় ‘শনিবার’ শব্দের উৎপত্তি। মধ্যযুগীয় ইংরেজ ইতিহাসবিদ জন অফ ওয়ালিংফোর্ড অভিযোগ করেছিলেন যে ভাইকিংরা প্রতিদিন চুল আঁচড়াত, সাপ্তাহিক গোসল করত এবং ঘন ঘন পোশাক বদলাত—যার ফলে ইংরেজ মহিলারা তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে স্বামী-সন্তান ছেড়ে চলে যেত! এমনকি দাঁতের যত্নেও সচেতন ছিল ভাইকিংরা; বিভিন্ন কঙ্কালে পাওয়া দাঁতের গঠন থেকে তাদের উন্নত দাঁতের স্বাস্থ্যের প্রমাণ মেলে

    নারীদের অধিকার: যুগের তুলনায় ব্যতিক্রমধর্মী

    মধ্যযুগীয় ইউরোপের অন্যান্য সমাজের তুলনায় ভাইকিং সমাজে নারীর মর্যাদা ছিল অনেক বেশি। স্বামী বাড়িতে না থাকলে বা মারা গেলে স্ত্রী সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব পেতেন। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে নারীদের সঙ্গে পাওয়া চাবিগুলি ছিল গৃহস্থালির এই ক্ষমতার প্রতীক

    বিবাহিত নারীদের জন্য তালাকের ব্যবস্থা ছিল বিস্ময়করভাবে সহজ। গার্হস্থ্য সহিংসতা, আর্থিক অনটন এমনকি যৌন অসামঞ্জস্যতার কারণেও নারীরা তালাক দিতে পারতেন এবং যৌতুক ও সম্পত্তি ফিরে পেতেন। বিবাহবহির্ভূত সন্তানদের জন্য ‘অবৈধ’ ধারণাটি ভাইকিং সমাজে ছিল না। উত্তরাধিকার সূত্রেও মেয়েরা পুত্রের সমান অধিকার পেতে পারত। আইসল্যান্ডীয় গ্রাগাস আইন ও নরওয়েজীয় ফ্রোস্ট্যাটিং আইনে নারীদের এই অধিকার সুরক্ষিত ছিল। অড দ্য ডিপ-মাইন্ডেডের মতো নারী নেতা সম্প্রদায়ের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্বও হতে পেরেছিলেন

    ভাইকিং মিথের পেছনের সত্য

    ভাইকিংদের ‘অসভ্য’ ভাবমূর্তির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো, যাঁরা ইতিহাস লিখেছেন—মধ্যযুগীয় খ্রিস্টান সন্ন্যাসীরা—তাঁরাই ভাইকিং আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই সেই বিবরণ ছিল একপেশে। যে সমাজ আক্রমণের শিকার হয়, তারাই ইতিহাস রচনা করে—এটিই বোধগম্য। আর ভাইকিং শিংওয়ালা হেলমেটের মিথটির উৎপত্তি ১৮৭৬ সালে রিচার্ড ওয়াগনারের অপেরা ‘রিং অফ দ্য নিবেলুং’-এ, বাস্তব কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণে নয়। প্রকৃত ভাইকিং হেলমেট ছিল চামড়া বা ধাতুর তৈরি সরল আকৃতির

    মধ্যযুগ ছিল একটি হিংস্র সময়। ফ্রাঙ্কিশ, অ্যাংলো-স্যাক্সন বা আরব সমাজেও লুটপাট ও যুদ্ধ ছিল সাধারণ ঘটনা। ভাইকিংরা সম্ভবত অন্যদের চেয়ে বেশি বর্বর ছিল না, শুধু পদ্ধতি ও লক্ষ্য ছিল ভিন্ন

    ‘অসভ্য’ আখ্যার অন্তরালে এক উন্নত সভ্যতা

    ভাইকিংরা যেমন ছিল দক্ষ নাবিক, বণিক ও অনুসন্ধানকারী, তেমনি ছিল আইন প্রণেতা, শিল্পী ও স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ। তাঁরা ইউরোপের নগরায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, ইংরেজি ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ভিত্তি স্থাপন করেছে এবং অন্যান্য সমসাময়িক সমাজের তুলনায় নারীদের অধিকতর স্বাধীনতা দিয়েছে। ‘অসভ্য’ আখ্যা তাঁদের পূর্ণ পরিচয়ের একটি ক্ষুদ্র ও একপেশে অংশমাত্র। প্রকৃত ইতিহাসের পূর্ণ চিত্র দেখার জন্য প্রয়োজন—পক্ষপাতমুক্ত দৃষ্টি।

    একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

    নবীনতর পূর্বতন

    نموذج الاتصال