আকাশের দিকে তাকালে আমরা অসংখ্য তারা দেখতে পাই, কিন্তু খালি চোখে আমরা কখনোই তাদের চারপাশে ঘুরতে থাকা গ্রহগুলো দেখতে পাই না। তারার তীব্র আলোর আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই গ্রহগুলোর অস্তিত্ব জানা, তাদের বায়ুমণ্ডলের উপাদান নির্ণয় করা, এমনকি তাদের আনুমানিক বয়স নির্ধারণ করা—এই সবই সম্ভব হয়েছে জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের এক অনন্য কৌশল ‘বর্ণালীবীক্ষণ’ বা স্পেকট্রোস্কোপির মাধ্যমে। কিন্তু কোটি কোটি কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কোনো গ্রহে গিয়ে নমুনা সংগ্রহ না করে, শুধুমাত্র তার আলো বিশ্লেষণ করেই কীভাবে এত বিস্তারিত তথ্য জানা সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে আলোর ভেতরেই। আলো তার নিজের ভেতরেই বহন করে চলে উৎসের রাসায়নিক স্বাক্ষর, তাপমাত্রা, গতি এবং আরও অনেক তথ্য।
বর্ণালীবীক্ষণ (Spectroscopy)
বর্ণালীবীক্ষণকে সহজ ভাষায় বলা যেতে পারে আলোর রংধনু তৈরির পদ্ধতি। আমরা যখন একটি প্রিজমের ভেতর দিয়ে সাদা আলো পাঠাই, তখন তা সাতটি রঙে বিভক্ত হয়ে একটি বর্ণালী তৈরি করে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দূরবর্তী কোনো তারা বা গ্রহ থেকে আসা আলোকে অত্যন্ত শক্তিশালী স্পেকট্রোগ্রাফ যন্ত্রের ভেতর দিয়ে পাঠান, যা এই আলোকে আরও সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করে। তারা যে বর্ণালী পান, তা কেবল একটি সুন্দর রংধনু নয়, বরং একটি জটিল ‘বারকোড’, যেখানে অসংখ্য উজ্জ্বল ও কালো রেখা বিদ্যমান।
এই রেখাগুলোই হলো গ্রহ-নক্ষত্রের রাসায়নিক উপাদানের ‘আঙুলের ছাপ’ (Fingerprint)। পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি মৌলিক পদার্থের (যেমন- হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, লোহা) পরমাণু একটি নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো শোষণ বা বিকিরণ করে। যখন কোনো তারার আলো কোনো গ্রহের বায়ুমণ্ডল ভেদ করে আমাদের কাছে আসে, তখন সেই বায়ুমণ্ডলে উপস্থিত গ্যাসীয় পদার্থগুলো তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী আলোর কিছু অংশ শোষণ করে নেয়। ফলে বর্ণালীতে সেই নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যে একটি ‘কালো দাগ’ বা ‘শোষণ রেখা’ (Absorption Line) তৈরি হয়। এই রেখাগুলোর প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করেই বিজ্ঞানীরা নিশ্চিতভাবে বলে দিতে পারেন যে গ্রহের বায়ুমণ্ডলে কোন কোন গ্যাস বা মৌল রয়েছে।
গ্রহের বায়ুমণ্ডলের উপাদান বিশ্লেষণ: ট্রানজিট স্পেকট্রোস্কোপি
দূরবর্তী গ্রহের বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতিটির নাম ট্রানজিট স্পেকট্রোস্কোপি (Transit Spectroscopy)। যখন কোনো গ্রহ তার কেন্দ্রীয় নক্ষত্রের সামনে দিয়ে অতিক্রম করে (যাকে আমরা ‘ট্রানজিট’ বলি), তখন নক্ষত্রের আলোর একটি ক্ষুদ্র অংশ গ্রহের বায়ুমণ্ডল ভেদ করে আমাদের টেলিস্কোপে ধরা পড়ে।
ধরা যাক, গ্রহটি যখন নক্ষত্রের সামনে নেই, তখন আমরা নক্ষত্রের যে স্বাভাবিক আলো পাই, তার বর্ণালী বিশ্লেষণ করি। এরপর গ্রহটি যখন নক্ষত্রের সামনে আসে, তখন নক্ষত্রের আলো গ্রহের বায়ুমণ্ডল ভেদ করে আসার ফলে বর্ণালীতে নতুন কিছু শোষণ রেখা যুক্ত হয়। এই দুটি বর্ণালীর মধ্যে পার্থক্য বিশ্লেষণ করেই বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন গ্রহের বায়ুমণ্ডলে কী কী উপাদান রয়েছে।
এই পদ্ধতি ব্যবহার করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই অসংখ্য বহির্গ্রহের বায়ুমণ্ডলে পানি (H₂O), মিথেন (CH₄), কার্বন-ডাই-অক্সাইড (CO₂), কার্বন মনোক্সাইড (CO), অ্যামোনিয়া (NH₃) এবং এমনকি হাইড্রোজেন সায়ানাইডের মতো জটিল যৌগের অস্তিত্ব শনাক্ত করেছেন। এই আবিষ্কারগুলো শুধু গ্রহের গঠনই জানায় না, বরং সেখানে প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাবনা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়।
আলো বলে দেয় গ্রহের তাপমাত্রা ও ঋতু পরিবর্তন
বর্ণালীবীক্ষণ শুধু রাসায়নিক উপাদানই শনাক্ত করে না, এটি গ্রহের তাপমাত্রাও পরিমাপ করতে পারে। পদার্থবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র অনুযায়ী, একটি বস্তু যত বেশি উত্তপ্ত হয়, সে তত বেশি তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো বিকিরণ করে এবং তার বর্ণালীর সর্বোচ্চ তীব্রতার তরঙ্গদৈর্ঘ্য পরিবর্তিত হয়। এই সূত্র ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা গ্রহ থেকে আসা অবলোহিত (ইনফ্রারেড) রশ্মির বর্ণালী বিশ্লেষণ করে গ্রহের পৃষ্ঠের বা বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা নির্ণয় করেন।
শুধু তা-ই নয়, একটি গ্রহ যখন তার নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে, তখন তার বিভিন্ন অংশ সূর্যালোকের দিকে আসে। গ্রহটির পুরো কক্ষপথ ধরে আলোর বর্ণালীর এই পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা গ্রহটির ‘ফেজ কার্ভ’ (Phase Curve) তৈরি করতে পারেন, যা থেকে গ্রহের বায়ুমণ্ডলের ত্রিমাত্রিক গঠন, মেঘের উপস্থিতি এবং দিন-রাতের তাপমাত্রার তারতম্য সম্পর্কে জানা যায়। এই তথ্য ব্যবহার করে বহির্গ্রহের আবহাওয়া ও জলবায়ু সম্পর্কে ধারণা করা সম্ভব হচ্ছে।
গ্রহের বয়স নির্ণয়
গ্রহের বয়স জানা একটি জটিল প্রক্রিয়া, কারণ গ্রহ নিজে থেকে তেমন আলো বিকিরণ করে না। কিন্তু যেহেতু একটি গ্রহ ও তার কেন্দ্রীয় নক্ষত্র সাধারণত একই সময়ে একই আন্তঃনাক্ষত্রিক মেঘ থেকে সৃষ্টি হয়, তাই নক্ষত্রের বয়সই মূলত গ্রহের বয়স বলে ধরে নেওয়া হয়। নক্ষত্রের বয়স নির্ণয়ের কয়েকটি শক্তিশালী পদ্ধতি হলো:
১. আইসোক্রোন ফিটিং (Isochrone Fitting): একটি নক্ষত্র তার জীবনের বেশিরভাগ সময় ‘মেইন সিকোয়েন্স’ নামক একটি স্থিতিশীল অবস্থায় কাটায়। নক্ষত্রের উজ্জ্বলতা ও তাপমাত্রার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে তাত্ত্বিক মডেলের সাথে মিলিয়ে এর বয়স অনুমান করা হয়।
২. জাইরোক্রোনোলজি (Gyrochronology): নক্ষত্রের বয়স বাড়ার সাথে সাথে এর নিজ অক্ষে ঘূর্ণনের গতি কমতে থাকে। স্পেকট্রোস্কোপির মাধ্যমে নক্ষত্রের ঘূর্ণন গতি মেপে বিজ্ঞানীরা এর বয়স সম্পর্কে ধারণা পান।
৩. রাসায়নিক ঘড়ি (Chemical Clock): নক্ষত্রের বর্ণালীতে বিভিন্ন ভারী ধাতুর (যেমন- লোহা, ম্যাগনেসিয়াম) প্রাচুর্য দেখেও এর বয়স নির্ধারণ করা যায়, কারণ মহাবিশ্বের বয়স বাড়ার সাথে সাথে ভারী মৌলের পরিমাণ বাড়ছে।
জীবনের সন্ধানে আলোর বিশ্লেষণ: বায়োসিগনেচার ও টেকনোসিগনেচার
জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর প্রয়োগ সম্ভবত বহির্জাগতিক প্রাণের সন্ধান। বর্ণালীবীক্ষণের মাধ্যমেই বিজ্ঞানীরা ‘বায়োসিগনেচার’ (Biosignature) বা জীবনের রাসায়নিক স্বাক্ষর খুঁজে থাকেন। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন (O₂) ও মিথেনের (CH₄) সহাবস্থান একটি শক্তিশালী বায়োসিগনেচার, কারণ এই গ্যাস দুটি একসাথে টিকে থাকতে পারে তখনই, যদি কোনো জৈবিক প্রক্রিয়া (যেমন- উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ) ক্রমাগত এগুলো উৎপাদন করতে থাকে।
ভবিষ্যতের টেলিস্কোপগুলো (যেমন- জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ বা ‘হ্যাবিটেবল ওয়ার্ল্ডস অবজারভেটরি’) আরও সূক্ষ্মভাবে দূরবর্তী গ্রহের বর্ণালী বিশ্লেষণ করে অক্সিজেন, ওজোন (O₃), এমনকি ক্লোরোফিলের মতো জটিল জৈব অণুর সন্ধান করবে, যা প্রাণের অস্তিত্বের প্রায় নিশ্চিত প্রমাণ দিতে পারে। শুধু জীবনের সন্ধানই নয়, বর্ণালীবীক্ষণ ‘টেকনোসিগনেচার’-ও (Technosignature) খুঁজতে পারে, যেমন- কোনো উন্নত সভ্যতার তৈরি কৃত্রিম উপগ্রহ বা সৌর প্যানেলের প্রতিফলিত আলো।
চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
দূরবর্তী গ্রহের আলো বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত কঠিন ও স্পর্শকাতর একটি কাজ। প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো, নক্ষত্রের তীব্র আলোর তুলনায় গ্রহের আলো অত্যন্ত ক্ষীণ। এর জন্য প্রয়োজন অত্যন্ত সংবেদনশীল ডিটেক্টর এবং উন্নত অ্যালগরিদম, যা গ্রহের আলোকে নক্ষত্রের আলো থেকে আলাদা করতে পারে। তাছাড়া, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলও মহাকাশ থেকে আসা আলোকে শোষণ করে বিকৃত করে দেয়, তাই মহাকাশে টেলিস্কোপ স্থাপন করা হয় এই সমস্যা এড়াতে।
তবুও, প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা আমাদের প্রতিনিয়ত নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে আমরা হয়তো পৃথিবীর মতো কোনো গ্রহের বায়ুমণ্ডলে পানির ফোঁটা, সবুজ উদ্ভিদের আলো, এমনকি বুদ্ধিমান সভ্যতার তৈরি দূষণের চিহ্নও খুঁজে পেতে পারি। আলোর এই বিশ্লেষণই হবে আমাদের সেই যাত্রার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
আমাদের
চোখের সামনে ভেসে থাকা আলো নিছকই আলো নয়; এটি একটি মহাজাগতিক বার্তাবাহক,
যা কোটি কোটি বছর ধরে মহাবিশ্বের ইতিহাস বয়ে চলেছে। বর্ণালীবীক্ষণের
মাধ্যমে আমরা সেই আলোকে পড়তে শিখেছি, বুঝতে শিখেছি তার ভাষা। এই পদ্ধতিই
আমাদের জানিয়েছে দূর গ্রহের রাসায়নিক গঠন, তার তাপমাত্রা, বয়স, এমনকি
সেখানে প্রাণের সম্ভাবনাও। বর্ণালীবীক্ষণ আমাদের মহাবিশ্বের সবচেয়ে
দূরবর্তী ও রহস্যময় বস্তুগুলোর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের এক অনন্য সেতুবন্ধন
তৈরি করে দিয়েছে। এই জ্ঞানের পরিধি যত বাড়বে, আমরা ততই মহাবিশ্বে আমাদের
অবস্থান এবং একাকিত্বের স্বরূপ বুঝতে সক্ষম হব।
আরও পড়ুন -
