কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি

    ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান: সত্যি নাকি কল্পকাহিনী?

    আমাদের সবার ছোটবেলার ইতিহাস বইয়ের একটি চিরায়ত বিস্ময়— ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান। মরুভূমির বুকে ফুটে থাকা সবুজের এক স্বর্গরাজ্য, যেখানে মানুষের ইঞ্জিনিয়ারিং দক্ষতা প্রকৃতিকে ছুঁয়ে দিয়েছিল ঈর্ষণীয় উচ্চতায়। অথচ, আধুনিক বিজ্ঞান যখন সেই বিস্ময়ের ধ্বংসাবশেষ খোঁজে, তখনই প্রশ্ন ওঠে— যে বাগানের জন্য এত গল্প, এত কাব্য, তা কি আসলেই ছিল? নাকি তা ছিল কেবলই এক মরীচিকা, প্রাচীন এক সাহিত্যিক কল্পনা?

    ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান: সত্যি নাকি কল্পকাহিনী?

    এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের পাড়ি দিতে হবে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার দুই মহানগরী ব্যাবিলন ও নিনেভেহর ধ্বংসস্তূপে। সাথে থাকবে প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব এবং কিছু চমকপ্রদ তত্ত্ব। তাই, চলুন শুরু করা যাক রহস্যময় এই বাগানের সত্য-মিথ্যার ইতিহাস।

    প্রাচীন কলমে ফুটে ওঠা এক স্বর্গ

    ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান সম্পর্কে আমাদের প্রায় সমস্ত জ্ঞানই আসে প্রাচীন গ্রিক ও রোমান লেখকদের থেকে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ব্যাবিলনীয় বা অ্যাসিরীয় কোনো সমসাময়িক লেখায় এই বাগানের কোনো উল্লেখ নেই। যেসব লেখক এর বর্ণনা দিয়েছেন, তারা সকলেই এই বাগান নির্মাণের কয়েকশ বছর পরের মানুষ এবং তাদের অনেকেই কখনো নিজ চোখে বাগানটি দেখেননি

    বেরোসাস: সর্বপ্রথম বর্ণনাকারী

    খ্রিস্টপূর্ব ২৮০ অব্দে ব্যাবিলনের এক পুরোহিত বেরোসাস (Berossus) তার 'ব্যাবিলোনিয়াকা' (Babyloniaca) গ্রন্থে প্রথম 'ব্যাবিলনের শূন্য উদ্যান'-এর কথা উল্লেখ করেন। তার লেখা থেকে জানা যায়, রাজা দ্বিতীয় নেবুচাদনেজার (Nebuchadnezzar II, শাসনকাল: ৬০৫-৫৬২ খ্রিস্টপূর্ব) তার প্রিয়তমা স্ত্রী আমিতিসের (Amytis) জন্য এই বাগান নির্মাণ করেছিলেন। পারস্যের মিদিয়া অঞ্চলের রাজকন্যা আমিতিস তার সবুজ পাহাড়ে ঘেরা মাতৃভূমির জন্য খুবই কাতর ছিলেন। তাকে খুশি করতে রাজা মরুভূমির বুকে গড়ে তোলেন এক কৃত্রিম পাহাড়— যেখানে থাকবে ঝরনা, ফুল, ফল ও বিচিত্র সব গাছপালা। দুঃখজনকভাবে, বেরোসাসের মূল গ্রন্থটি হারিয়ে গেছে। তার লেখা টিকে আছে কেবল পরবর্তী লেখকদের উদ্ধৃতিতে, যেমন প্রথম শতাব্দীর ইহুদি ঐতিহাসিক জোসেফাসের (Josephus) লেখায়

    ডিওডোরাস সিকুলাস ও স্ট্রাবো: বিশদ স্থাপত্য-বর্ণনা

    পরবর্তীতে, খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে গ্রিক ইতিহাসবিদ ডিওডোরাস সিকুলাস (Diodorus Siculus) বাগানটির একটি বিশদ ও চিত্তাকর্ষক বর্ণনা দেন। তার মতে, বাগানটি ছিল ১০০ ফুট লম্বা, ১০০ ফুট চওড়া এবং ৭৫ ফুট উঁচু— যা শহরের প্রাচীরের উচ্চতার সমান। এটি ছিল ধাপে ধাপে সাজানো এক বিস্ময়কর স্থাপনা (terraced structure), যা দেখতে অনেকটা পাহাড় বা গ্রিক থিয়েটারের মতো। ডিওডোরাস জানান, এই বাগানের ভিত্তি ছিল পাথরের তৈরি, যা ইট, নলখাগড়া, আলকাতরা ও সিসার স্তর দিয়ে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যেন পানি নিচে চুইয়ে না পড়ে

    আরেক বিখ্যাত গ্রিক ভূগোলবিদ স্ট্রাবো (Strabo) তার 'জিওগ্রাফিকা'য় এই বাগানের সেচব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেন। তিনি লিখেছেন, ইউফ্রেটিস নদী থেকে এক জটিল যান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে পানি উপরের ধাপগুলোতে তোলা হতো

    ফিলো অব বাইজান্টিয়াম: বিশ্বের সপ্তম বিস্ময়

    ফিলো অব বাইজান্টিয়াম (Philo of Byzantium), যিনি খ্রিস্টপূর্ব ২৫০ অব্দে "বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের" তালিকা প্রণয়ন করেছিলেন, তিনিও এই বাগানের সেচ-প্রযুক্তির ভূয়সী প্রশংসা করেন

    এই সমস্ত বর্ণনা একত্র করলে যে চিত্র ফুটে ওঠে তা হলো: এটি একটি বহুতলবিশিষ্ট টেরেস বাগান, যেখানে গাছপালাগুলো ওপর থেকে নিচে ঝুলে থাকার কারণে দূর থেকে দেখে মনে হতো গোটা বাগান বুঝি শূন্যে ভাসছে। তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট: এই বর্ণনাগুলোর মধ্যে যথেষ্ট অমিল ও পরস্পরবিরোধী তথ্য রয়েছে, এবং কোনো বর্ণনাকারীই প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন না

    প্রত্নতাত্ত্বিক নীরবতা— ব্যাবিলনের মাটি যা বলে না

    ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধাঁধা এখানেই। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে জার্মান প্রত্নতাত্ত্বিক রবার্ট কোল্ডেওয়ে (Robert Koldewey) প্রাচীন ব্যাবিলন নগরী (আধুনিক বাগদাদ থেকে ৫০ মাইল দক্ষিণে) ব্যাপকভাবে খনন করেন। তিনি ইশতার গেট, প্রসেসশনাল ওয়েসহ অসংখ্য স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ বের করে আনলেও, একটি জিনিস তিনি খুঁজে পাননি— ঝুলন্ত উদ্যানের কোনো চিহ্ন

    কোল্ডেওয়ের 'ভল্টেড বিল্ডিং' তত্ত্ব

    কোল্ডেওয়ে দক্ষিণ প্রাসাদের উত্তর-পূর্ব কোণে ১৪টি কক্ষবিশিষ্ট একটি ভল্টেড বা খিলানযুক্ত ইমারত আবিষ্কার করেন। তার ধারণা ছিল, এগুলোই হয়তো বাগানের ভিত্তি। কিন্তু এই ধারণা এখন অনেকাংশেই পরিত্যক্ত। কারণ, এই কক্ষগুলোতে পানি নিরোধক কোনো ব্যবস্থার চিহ্ন পাওয়া যায়নি, এবং সেগুলো সম্ভবত ভাণ্ডার হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

    কিউনিফর্ম লিপির নীরবতা

    আরও বড় সমস্যা হলো, ব্যাবিলন থেকে প্রাপ্ত হাজার হাজার কিউনিফর্ম লিপির ফলকে (cuneiform tablets) কোথাও এই বাগানের উল্লেখ নেই। রাজা নেবুচাদনেজার তার অনেক নির্মাণকাজেরই গর্বিত বিবরণ রেখে গেছেন, কিন্তু কোথাও তিনি একটি "টেরেস বাগান" বা "রাণীর জন্য বিশেষ উপহার"-এর কথা বলেননি। কোনো দলিলেই তার উদ্যানতত্ত্বের প্রতি আগ্রহের প্রমাণ নেই

    ইউফ্রেটিসের তলদেশে চাপা পড়া সম্ভাবনা

    কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, বাগানটি যদি থেকেও থাকে, তা ইউফ্রেটিস নদীর তলদেশে বা তার খুব কাছাকাছি ছিল। যেহেতু নদীর গতিপথ কালক্রমে পরিবর্তিত হয়েছে, তাই ধ্বংসাবশেষ বর্তমানে পানির নিচে চাপা পড়ে থাকতে পারে, যা খনন করা বর্তমান প্রযুক্তির পক্ষে সম্ভব নয়

    আরও পড়ুন - লিওনার্দো দা ভিঞ্চি: শিল্পী না বিজ্ঞানী?

    রহস্যের নতুন দিগন্ত— নিনেভেহ তত্ত্ব (The Nineveh Theory)

    উপরিউক্ত সমস্ত অসঙ্গতি একটি যুগান্তকারী প্রশ্নের জন্ম দেয়: "আমরা কি ঠিক জায়গায় খুঁজছি?"

    অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত অ্যাসিরিওলজিস্ট ড. স্টেফানি ড্যালি (Stephanie Dalley) ১৯৯২ সালে প্রথম একটি বোমা ফাটান। ১৮ বছরের গবেষণার পর ২০১৩ সালে তিনি তার বিখ্যাত গ্রন্থ The Mystery of the Hanging Garden of Babylon-এ চূড়ান্তভাবে দাবি করেন: ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান আসলে ব্যাবিলনে ছিল না; এটি ছিল ৩০০ মাইল দূরে, অ্যাসিরীয় সাম্রাজ্যের রাজধানী নিনেভেহতে

    সেনাকেরিবের 'অতুলনীয় প্রাসাদ'

    ড্যালির মতে, বাগানটির প্রকৃত নির্মাতা ছিলেন অ্যাসিরীয় সম্রাট সেনাকেরিব (Sennacherib, রাজত্বকাল: ৭০৪-৬৮১ খ্রিস্টপূর্ব), যিনি নেবুচাদনেজারেরও প্রায় ১০০ বছর আগে শাসন করেছিলেন। সেনাকেরিব তার নতুন প্রাসাদকে "অতুলনীয় প্রাসাদ" (Palace Without a Rival) বলে অভিহিত করেছিলেন এবং লিখেছিলেন, "আমি আমার প্রাসাদের পাশে একটি বিশাল বাগান তৈরি করেছি, যা দেখতে ঠিক যেন আমানুস পর্বতের মতো।"

    প্রযুক্তিগত অলৌকিকতা: আর্কিমিডিসের ৪০০ বছর আগে জল-স্ক্রু

    ড্যালির গবেষণার সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো সেচ-প্রযুক্তি। তিনি প্রমাণ করেন, সেনাকেরিব তার বাগানে পানি তোলার জন্য ব্রোঞ্জের তৈরি এক ধরণের জল-স্ক্রু (water screw) ব্যবহার করেছিলেন, যা আর্কিমিডিসের জন্মেরও প্রায় ৪০০ বছর আগের। অ্যাসিরীয়রা পাহাড়ি অঞ্চল থেকে ৫০ মাইল দূরে অবস্থিত নিনেভেহতে পানি আনার জন্য এক বিশাল খাল ও জলসেতু (aqueduct) তৈরি করেছিল। ড্যালি বলেন, এই জলসেতুর ধ্বংসাবশেষ এতটাই বিশাল যে, আকাশ থেকে দেখলে মনে হয় যেন কোনো আধুনিক মোটরওয়ে। জারওয়ান (Jerwan) নামক স্থানে আবিষ্কৃত এই জলসেতুর গায়ে খোদাই করা ছিল: "আমি, সেনাকেরিব, বিশ্বের রাজা... বহু দূর থেকে আমি নিনেভেহর পরিবেশে জলধারা বয়ে এনেছি..."

    ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বিভ্রান্তি

    তাহলে, নিনেভেহর বাগান ব্যাবিলনের নামে কেন প্রচারিত হলো? ড্যালি ব্যাখ্যা করেন, সেনাকেরিবের মৃত্যুর পর অ্যাসিরীয় সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং ব্যাবিলন উত্থান লাভ করে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গ্রিক ও রোমান লেখকরা ভুলক্রমে দুটি স্থানের নাম গুলিয়ে ফেলেন। তাছাড়া, প্রাচীনকালে "ব্যাবিলন" শব্দটি সমগ্র মেসোপটেমিয়া অঞ্চলের প্রতীক হিসেবেও ব্যবহৃত হতো

    তিনটি প্রধান তত্ত্বের খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ

    বর্তমান ঐতিহাসিক মহলে ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যানের অস্তিত্ব ও অবস্থান নিয়ে প্রধানত তিনটি তত্ত্ব প্রচলিত আছে

    তত্ত্ব ১: সম্পূর্ণ কল্পকাহিনী (Pure Myth)

    এই তত্ত্বের প্রবক্তারা বলেন, ঝুলন্ত উদ্যান কখনোই ছিল না। তাদের যুক্তি: (১) ব্যাবিলনে বা নিনেভেহতে এর কোনো ভৌত প্রমাণ নেই; (২) সমসাময়িক কোনো ব্যাবিলনীয় বা অ্যাসিরীয় নথিতে এর উল্লেখ নেই; (৩) গ্রিক বর্ণনাগুলো সম্পূর্ণ দ্বিতীয় বা তৃতীয় পক্ষের কল্পনা, যা প্রাচ্যের এক চিরসবুজ স্বর্গের (প্যারাডাইস) প্রতি গ্রিকদের রোমান্টিক ধারণা থেকে উৎসারিত। বিখ্যাত গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস, যিনি খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে ব্যাবিলনের অত্যন্ত বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন, তিনি কোথাও এই বাগানের নামোল্লেখ করেননি— এটাই এই তত্ত্বের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার

    তত্ত্ব ২: ব্যাবিলনেই ছিল (Located in Babylon)

    এটি ঐতিহ্যবাহী বিশ্বাস। জোসেফাস, স্ট্রাবো, ডিওডোরাসের মতো লেখকদের বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে অনেকে বিশ্বাস করেন, বাগানটি ব্যাবিলনের রাজপ্রাসাদ চত্বরের কাছেই ছিল। কোল্ডেওয়ের ভল্টেড বিল্ডিং বা নেবুচাদনেজারের উত্তর প্রাসাদকে এর সম্ভাব্য অবস্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই তত্ত্বের সমর্থনে সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো প্রাচীন সাহিত্যের ধারাবাহিকতা— যতই অপ্রত্যক্ষ হোক, অসংখ্য উৎস একটি "ব্যাবিলন"-কেন্দ্রিক বাগানের কথাই বলে।

    তত্ত্ব ৩: নিনেভেহতেই ছিল আসল বিস্ময় (Located in Nineveh)

    ড. স্টেফানি ড্যালির নেতৃত্বে এই তত্ত্ব বর্তমানে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে। এর পক্ষে জোরালো প্রমাণগুলো হলো: (১) নিনেভেহতে সেনাকেরিবের জল-প্রকৌশলের সুস্পষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ (জলসেতু, খাল) বিদ্যমান, যা ব্যাবিলনে নেই; (২) অ্যাসিরীয় প্রাসাদ-ত্রাণ ভাস্কর্যে (relief sculptures) সোপান-বাগানের ছবি পাওয়া গেছে; (৩) সেনাকেরিবের নিজস্ব দলিলে বাগানের উল্লেখ আছে, যা ব্যাবিলনের কোনো দলিলে নেই। এই তত্ত্বের ফলে ইতিহাসের একটি জটিল গিঁট অনেকটাই খুলে গেলেও, চূড়ান্ত প্রমাণ এখনও অধরা।

    ঝুলন্ত উদ্যানের ইঞ্জিনিয়ারিং বিস্ময়

    বাগানটি যেখানেই থাকুক না কেন, এর নির্মাণকৌশল ছিল বিস্ময়কর।

    মাটি ও পানির অসম লড়াইয়ে জয়

    মেসোপটেমিয়া অঞ্চল ছিল রোদে পোড়া, শুষ্ক। একটি বহুতল বাগানে গাছপালা বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন ছিল বিপুল পরিমাণ পানির। স্ট্রাবো ও ডিওডোরাসের বর্ণনা অনুযায়ী, ইউফ্রেটিস নদী থেকে পানি তোলার জন্য একটি জটিল 'আর্কিমিডিস স্ক্রু' বা 'চেইন পাম্প' ব্যবহৃত হতো। ড্যালির মতে, সেনাকেরিবের প্রকৌশলীরা ব্রোঞ্জ ঢালাইয়ের এক নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করে এই স্ক্রু তৈরি করেছিলেন, যা ছিল সে যুগের এক বৈপ্লবিক আবিষ্কার। এই যন্ত্র নদী থেকে পানি তুলে সবচেয়ে ওপরের টেরেসে দিত, আর সেখান থেকে পানি কৃত্রিম খাল ও ঝরনার মাধ্যমে ধাপে ধাপে নিচে নামত।

    স্থাপত্য ও নির্মাণকৌশল

    বাগানের ভিত্তি ছিল পাথরের স্তম্ভ ও খিলানের ওপর স্থাপিত। পানি যাতে নিচের কাঠামো নষ্ট করতে না পারে, সে জন্য নলখাগড়া, প্রাকৃতিক আলকাতরা (bitumen) এবং সিসার পাত দিয়ে ছাদগুলোকে সম্পূর্ণ জলনিরোধী করা হয়েছিল। তার ওপর ছিল গভীর মাটির স্তর, যাতে বড় বড় গাছও রোপন করা সম্ভব হয়েছিল। স্ট্রাবো লিখেছেন, বাগানটি ছিল চতুর্ভুজাকার এবং এর ধাপগুলো এতটাই প্রশস্ত ছিল যে, সবচেয়ে বড় গাছগুলোর জন্যও তা যথেষ্ট ছিল

    কেন এই বিতর্ক গুরুত্বপূর্ণ?

    ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যানের সত্যতা নিয়ে বিতর্ক কেবল একটি ভৌগোলিক অবস্থান নির্ণয়ের প্রশ্ন নয়, এটি ইতিহাস রচনার প্রকৃতি, পুরাতত্ত্বের সীমাবদ্ধতা এবং মানুষের কল্পনা ও বাস্তবতার দ্বন্দ্বের এক প্রতিচ্ছবি।

    ইতিহাসের গতিপ্রকৃতি: হেরোডোটাসের নীরবতা

    প্রাচীন বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত পর্যটক-ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস ব্যাবিলনের যে মনোরম বিবরণ দিয়েছেন, তাতে এর প্রাচীর, মন্দির, ইশতার গেট সবই আছে, কিন্তু ঝুলন্ত উদ্যানের কোনো উল্লেখ নেই। যিনি বিশ্বের সাতটি আশ্চর্যের ধারণার পথিকৃৎ, তিনি কেন এই বিস্ময়কে উপেক্ষা করলেন? এটা হয়তো ইঙ্গিত দেয় যে, তার সময়ে ব্যাবিলনে এই বাগান ছিল না, কিংবা এটি এতটাই গোপনীয় বা সাধারণ ছিল যে তিনি তা উল্লেখযোগ্য মনে করেননি।

    কল্পনা ও বাস্তবতার মিশেল

    শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা কাহিনীগুলোতে সত্য ও কল্পনা একাকার হয়ে গেছে। ইউরোপীয় রেনেসাঁ চিত্রকররা তাদের কল্পনায় ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যানকে এক রোমান্টিক, সুউচ্চ পিরামিড-আকৃতির স্বর্গরাজ্য হিসেবে এঁকেছেন। এই শৈল্পিক চিত্রায়ণ পরবর্তী প্রজন্মের ধারণাকে আরও বেশি প্রভাবিত করেছে। বাস্তবে, প্রাচীন বর্ণনার সাথে আধুনিক এই ছবিগুলোর কোনো মিল নেই।

    'সপ্তাশ্চর্য' তকমার রাজনীতি

    প্রাচীন গ্রিকরা তাদের পরিচিত বিশ্বের বিস্ময়কর স্থাপনাগুলোর তালিকা তৈরি করেছিল। 'সপ্তাশ্চর্য' ধারণাটি ছিল গ্রিক-কেন্দ্রিক। তারা যে স্থাপনাগুলোকে বিস্ময় বলেছে, তার সবগুলোই গ্রিক সভ্যতার স্বর্ণযুগ বা তার কাছাকাছি সময়ে নির্মিত, অথবা গ্রিক পর্যটকদের কাছে সহজগম্য ছিল। ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান ছিল এই তালিকার একমাত্র ব্যতিক্রম, যা সম্পূর্ণ অ-গ্রিক সভ্যতার কীর্তি। নিনেভেহ তত্ত্বটি যদি সত্যি হয়, তবে তালিকাটি ছিল আরও বেশি জটিল: কারণ তখন একটি অ্যাসিরীয় স্থাপনাকে ভুল করে ব্যাবিলনীয় বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটি প্রাচীন ইতিহাসবিদদের ভৌগোলিক জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা এবং 'অলৌকিক'-এর প্রতি তাদের দুর্বলতাকে নির্দেশ করে।

    উত্তরাধিকার ও আধুনিক প্রভাব

    বাগানটি ভৌতভাবে টিকে থাকুক বা না থাকুক, সংস্কৃতিতে এর উত্তরাধিকার অপরিসীম।

    বিশ্বজনীন 'স্বর্গ' ধারণার বীজ

    ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যানের ধারণাই পরবর্তীকালে 'প্যারাডাইস' বা 'স্বর্গোদ্যান'-এর ইউরোপীয় ধারণাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, মানুষ চিরকালই প্রকৃতির রুক্ষতার মাঝেও এক টুকরো সবুজ শান্তির খোঁজ করেছে। 'ঝুলন্ত উদ্যান' এখন একটি বিশেষণ; যেকোনো আকর্ষণীয় ছাদ-বাগান, যেমন আধুনিক সিঙ্গাপুরের মেরিনা বে স্যান্ডসের স্কাইপার্ক বা নিউ ইয়র্কের হাই লাইন, এর সাথেই ব্যাবিলনের এই কিংবদন্তির তুলনা টানা হয়।

    আধুনিক প্রত্নতত্ত্বের দৃষ্টিভঙ্গি

    এই রহস্য আধুনিক প্রত্নতত্ত্বের একটি বড় শিক্ষাও বটে। এটি দেখায় যে, কোনো স্থাপনার অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য শুধু সাহিত্যই যথেষ্ট নয়, বরং মাটি খুঁড়ে পাওয়া ভৌত প্রমাণই শেষ কথা। বর্তমানে ইরাকের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ব্যাবিলন ও নিনেভেহ উভয় স্থানেই খননকাজ ব্যাহত হচ্ছে। ভবিষ্যতে হয়তো প্রত্নতাত্ত্বিকরা এমন কিছু প্রমাণ পাবেন, যা এই বিতর্কের চূড়ান্ত ইতি টানবে। ২০১৯ সালে ইউনেস্কো ব্যাবিলনকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, যা এই এলাকায় নতুন করে আন্তর্জাতিক গবেষণার আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারে

    মরীচিকা নাকি মাটি? আমরা এখন কোথায় দাঁড়িয়ে?

    ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান: সত্যি নাকি কল্পকাহিনী? প্রাপ্ত প্রমাণের ভিত্তিতে আজকের উপসংহারটি জটিল।

    সম্পূর্ণ কল্পকাহিনী হিসেবে উড়িয়ে দেওয়ার পক্ষে যুক্তি আছে— কোনো ভৌত প্রমাণ নেই, সমসাময়িক নথি নীরব। কিন্তু একইসাথে, একে নিছক গল্প বলাও মুশকিল। কারণ এর পক্ষে যে প্রাচীন সাহিত্যিক সাক্ষ্যগুলো আছে, তা অত্যন্ত বিস্তারিত এবং ধারাবাহিক। পাঁচজন ভিন্ন ভিন্ন লেখক, পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন শতাব্দীতে প্রায় একই ধরণের এক বিস্ময়ের কথা বলেছেন।

    দেখে মনে হয়, সত্য ঘটনাটি সম্ভবত কোথাও মাঝামাঝি।

    ক্রমবর্ধমান প্রত্নতাত্ত্বিক ও ভাষাতাত্ত্বিক প্রমাণ জোরালোভাবে ইঙ্গিত করছে, স্টেফানি ড্যালির 'নিনেভেহ তত্ত্বই' সম্ভবত সঠিক। সেনাকেরিবের নির্মিত জল-প্রকৌশলের বিস্ময়কর প্রমাণ, তার নিজের গর্বিত বিবরণ এবং ব্যাবিলনের সম্পূর্ণ নীরবতা— এই তিনটি বিষয় মিলিয়ে এটাই মনে হয় যে, প্রাচীন বিশ্বের এই সপ্তম আশ্চর্যটি আসলে অ্যাসিরীয়দের কীর্তি, যা পরবর্তীকালে ভুল করে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যাবিলনীয়দের নামে চিহ্নিত হয়ে গেছে।

    আরও পড়ুন - আদিম সঙ্গীত

    একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

    নবীনতর পূর্বতন

    نموذج الاتصال