"ইতিহাস বিজয়ীদের দ্বারা লিখিত হয়"— এই বাক্যটি আমরা প্রায় শুনে থাকি। কথাটি প্রথম কে বলেছিলেন, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। অনেকে দায়ী করেন উইনস্টন চার্চিলকে, আবার কেউ কেউ বলেন নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বা নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি এটি বলেছিলেন। উৎস যা-ই হোক, বাক্যটি আমাদের ইতিহাসের প্রকৃতি সম্পর্কে একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। আমরা অতীত সম্পর্কে যা জানি, তা কি আসলেই বস্তুনিষ্ঠ সত্য? নাকি তা ক্ষমতাশীলদের সাজানো এক গল্প, যেখানে বিজয়ীরা নিজেদের গৌরবগাঁথা রচনা করেছে এবং পরাজিতদের করেছে সম্পূর্ণ উপেক্ষা?
এই প্রশ্নের উত্তর সহজ "হ্যাঁ" বা "না"-তে দেওয়া যায় না। এটি জড়িয়ে আছে ইতিহাস রচনার প্রক্রিয়া, উৎস-উপাদানের সীমাবদ্ধতা, এবং জ্ঞানের ওপর ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণের জটিল সম্পর্কের মধ্যে। এই ব্লগপোস্টে আমরা ইতিহাসের এই বিতর্কিত রূপটি নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করব। আমরা দেখব, কীভাবে বিজয়ীরা ইতিহাসকে নিজেদের পক্ষে দাঁড় করিয়েছে, কীভাবে উপনিবেশিত জনগোষ্ঠী সেই ইতিহাসকে চ্যালেঞ্জ করেছে, এবং বর্তমানে ইতিহাস রচনার নতুন ধারাগুলো কীভাবে একটি বহুমাত্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক অতীত নির্মাণের চেষ্টা করছে।
ইতিহাস রচনার সনাতন ধারা— রাজার জয়গাথা
প্রাচীন ও মধ্যযুগে ইতিহাস রচনার পৃষ্ঠপোষকতা ছিল রাজা, সম্রাট ও বিজেতাদের হাতে। স্বভাবতই, ইতিহাস ছিল তাদের জয়, দয়া ও মহত্বের কাহিনী। সেখানে শত্রুপরাজয়ের বর্ণনা যেমন থাকত, তেমনই থাকত শত্রুপক্ষের হীনতা ও বর্বরতার চিত্র। এই ধারার ঐতিহাসিক পদ্ধতিকে বলা হয় 'র্যাঙ্কীয় ধারা' (Rankean tradition), যেখানে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকেন্দ্রিক ঘটনাবলিই মুখ্য হয়ে ওঠে।
সম্রাট অশোকের কলিঙ্গ যুদ্ধ: এক ব্যতিক্রমী বিজয়ীর আত্মোপলব্ধি
প্রাচীন ভারতে সম্রাট অশোকের কলিঙ্গ যুদ্ধ (আনুমানিক ২৬১ খ্রিস্টপূর্ব) একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। কলিঙ্গ জয়ের পর যুদ্ধক্ষেত্রের রক্ত ও মৃত্যু অশোককে গভীরভাবে বিক্ষুব্ধ করেছিল। তার অনুশোচনা আমরা জানতে পারি তার নিজের খোদাই করা শিলালিপি থেকে, যেখানে তিনি লিখেছেন, "দেড় লাখ লোক নির্বাসিত হয়েছে, এক লাখ লোক নিহত হয়েছে এবং তার চেয়েও বহুগুণ বেশি লোক মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে... এই ঘটনা দেবপ্রিয় (অশোক) গভীরভাবে অনুশোচনা করছেন।" বিজয়ী হিসেবে অশোক চাইলে এই লিপিতে শুধু নিজের জয়ের কথাই লিখতে পারতেন, কিন্তু তিনি লেখেন যুদ্ধের ভয়াবহতার কথা। ফলে, একজন বিজয়ী নিজে কীভাবে ইতিহাস লেখেন, এবং তার সেই লেখা কীভাবে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছায়, তার এক অনন্য নিদর্শন এটি। তবে ইতিহাসের বেশিরভাগ বিজয়ীই এই পথে হাঁটেননি।
দিল্লির সুলতান ও মুঘল বাদশাহদের দরবারি ইতিহাস
মধ্যযুগে ভারতে মুসলিম শাসনামলে দরবারি ঐতিহাসিকদের মাধ্যমে রাজকীয় ইতিহাস রচনার প্রথা জোরদার হয়। আমির খসরু, জিয়াউদ্দিন বারানি, আবুল ফজলের মতো মনীষীরা তাঁদের পৃষ্ঠপোষক সুলতান বা সম্রাটের বীরত্ব, ন্যায়পরায়ণতা ও ধর্মীয় গুণাবলি বর্ণনা করেছেন। আলাউদ্দিন খিলজি বা ঔরঙ্গজেবের আমলে লেখা ইতিহাস আর শের শাহ সুরির আমলে লেখা ইতিহাসের মধ্যে তাই স্বাভাবিক পার্থক্য বিদ্যমান। এই ইতিহাসগুলো কেবল ঘটনার বিবরণ নয়, বরং শাসকের বৈধতা প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করত।
বিজিতদের নীরবতা— উপনিবেশিক ইতিহাস রচনার সহিংসতা
বিজয়ীদের ইতিহাস লেখার সবচেয়ে ভয়াবহ ও স্থায়ী উদাহরণ হলো ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ। এখানে শুধু সামরিক পরাজয় নয়, একই সাথে একটি জাতির অতীত, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়কে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে এক নতুন ইতিহাস চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
ভারতবর্ষে প্রাচ্যবাদী ইতিহাস রচনা
উইলিয়াম জোন্স, জেমস মিল, টমাস মেকলের মতো ব্রিটিশ প্রশাসক-ঐতিহাসিকেরা ভারতীয় ইতিহাসকে এক বিশেষ ছাঁচে ফেলেছিলেন। জেমস মিল তার 'হিস্ট্রি অব ব্রিটিশ ইন্ডিয়া' (১৮১৭) গ্রন্থে ভারতীয় ইতিহাসকে তিনটি যুগে ভাগ করেন— হিন্দু, মুসলিম ও ব্রিটিশ। এই বিভাজনই পরবর্তীতে সাম্প্রদায়িক ইতিহাস রচনার বীজ বপন করে। তার বক্তব্য ছিল, হিন্দু সভ্যতা ছিল কুসংস্কারাচ্ছন্ন, মুসলিম শাসন ছিল স্বৈরাচারী, আর ব্রিটিশ শাসন ছিল যুক্তিবাদী ও প্রগতিশীল। এই ধারার ইতিহাস রচনা একই সাথে ভারতীয়দের মনে হীনম্মন্যতা তৈরি করে এবং ব্রিটিশ শাসনের নৈতিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
আফ্রিকা ও আমেরিকার আদিবাসীদের 'ইতিহাসহীন' ঘোষণা
উপনিবেশবাদীরা শুধু ইতিহাস সাজায়নি, তারা সরাসরি ইতিহাস মুছে ফেলেছে। আফ্রিকা মহাদেশকে দীর্ঘকাল 'অন্ধকার মহাদেশ' বলে অভিহিত করা হয়েছে। এর পেছনে ছিল ইউরোপীয়দের একটি বর্ণবাদী ধারণা— আফ্রিকার মানুষের নিজস্ব কোনো ইতিহাস, সভ্যতা নেই; ইতিহাসের বাইরেও তাদের অস্তিত্ব ছিল না। দক্ষিণ আফ্রিকার আপার্টেইড শাসন বা রোডেশিয়ার শ্বেতাঙ্গ সরকার ইতিহাসের পাঠ্যক্রম থেকে কৃষ্ণাঙ্গদের উপস্থিতি প্রায় মুছে ফেলেছিল। আমেরিকার আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ানদের গণহত্যার ইতিহাসকেও দীর্ঘদিন মূলধারার পশ্চিমা ইতিহাসে উপেক্ষা করা হয়েছে, যেখানে তাদের "বর্বর" আখ্যা দিয়ে বিজেতাদের অভিযানকে "সভ্যতার অভিযান" হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।
আরও পড়ুন -
উৎসের সংকট— ‘আর্কাইভ’ কি কেবল ক্ষমতার ভাণ্ডার?
ইতিহাস রচনা নির্ভর করে উপাদানের ওপর। কিন্তু ঐতিহাসিক উপাদান, বিশেষ করে সরকারি নথিপত্র, কে তৈরি করে এবং কে সংরক্ষণ করে? স্বভাবতই, রাষ্ট্র ও ক্ষমতাশীল গোষ্ঠী।
রাষ্ট্রীয় আর্কাইভে কী থাকে?
একটি সাধারণ সরকারি আর্কাইভে আমরা পাই ভূমি জরিপের খতিয়ান, রাজস্ব আদায়ের হিসাব, কোর্টের রায়, পুলিশের প্রতিবেদন। এই নথিগুলো তৈরি করেছে ক্ষমতায় থাকা লোকেরা, রাষ্ট্রের চোখ দিয়ে। এখানে সাধারণ মানুষের জীবন, তাদের সংগ্রাম, তাদের কষ্টের বিবরণ খুব কমই ঠাঁই পায়। ফলে, এই উৎসের ওপর নির্ভর করে লেখা ইতিহাস হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় নীতির সাফল্য-ব্যর্থতার ইতিহাস, যেখানে মানুষের মুখচ্ছবি অস্পষ্ট।
মৌখিক ইতিহাস ও ভিন্ন উৎসের সন্ধান
এই সীমাবদ্ধতা দূর করার জন্য আধুনিক ইতিহাসবিদেরা মৌখিক ইতিহাসের (Oral History) ওপর গুরুত্ব আরোপ করছেন। লিখিত নথির বাইরে মানুষের স্মৃতি, গান, লোককথা, প্রবাদ-প্রবচন ইতিহাসের মূল্যবান উপাদান হতে পারে। নিম্নবর্গের ইতিহাস (Subaltern Studies) চর্চাকারী গবেষকেরা, যেমন রণজিৎ গুহ, দীপেশ চক্রবর্তী, গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক, দেখিয়েছেন যে, আর্কাইভে কৃষক, শ্রমিক, আদিবাসী বা নারীদের কণ্ঠস্বর না থাকলেও তারা ইতিহাসের অংশ। তাদের কথা উদ্ধার করতে গেলে আর্কাইভের "নীরবতার" পেছনের রাজনীতি বুঝতে হয় এবং অপ্রচলিত উৎসের দিকে যেতে হয়।
পাল্টা-ইতিহাস— বিজিতদের জেগে ওঠা
বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে এসে বিশ্বজুড়ে উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনের ফলে ইতিহাস রচনায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। যে মানুষগুলো এতদিন ইতিহাসের পাতায় অনুপস্থিত ছিল, তারাই এখন ইতিহাসের বিষয়বস্তু হয়ে উঠতে শুরু করে।
নিম্নবর্গের ইতিহাস (Subaltern Studies)
১৯৮০-এর দশকে ভারতীয় ইতিহাসবিদদের একদল (রণজিৎ গুহ, পার্থ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ) 'নিম্নবর্গের ইতিহাস' নামে একটি নতুন ধারা চালু করেন। তারা দেখান, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের যে ইতিহাস আমরা পড়ি, তা মূলত অভিজাত ও মধ্যবিত্ত নেতৃত্বের আখ্যান। গান্ধীজির নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলনের আড়ালে চাপা পড়ে গেছে সাধারণ কৃষক, আদিবাসী, শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্ত লড়াই। ১৮৫৫-র সাঁওতাল বিদ্রোহ বা ১৯৪৬-এর তেভাগা আন্দোলনের প্রকৃত কাণ্ডারিরা কখনোই ইতিহাসের আলোয় আসেননি, বরং নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের আড়ালে হারিয়ে গেছেন।
‘দক্ষিণের ইতিহাস’ ও উত্তর-উপনিবেশবাদ
আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার দেশগুলোতে পাশ্চাত্যের লেখা ইতিহাসকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ইতিহাস রচনার চেষ্টা শুরু হয়। নাইজেরিয়ার ঐতিহাসিক কেনেথ ওনুয়াকা ডাইকের লেখা কিংবা কেনিয়ার গেরিলা নেতা-ইতিহাসবিদ দেদান কিমাথির আন্দোলনের ইতিহাস তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের চিন্তক ফ্রানৎস ফানোঁ তার 'দ্য রেচড অব দ্য আর্থ' গ্রন্থে উপনিবেশবাদের মানসিক ধ্বংসাত্মক প্রভাব ব্যাখ্যা করে পরাধীন জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাধীন ইতিহাস রচনার গুরুত্ব বোঝান।
নারীবাদী ইতিহাস— লিঙ্গ বৈষম্যের চোখে অতীত
নারীবাদী আন্দোলন ইতিহাসের জগতে এক নতুন বিপ্লব নিয়ে আসে। তারা প্রশ্ন তোলে, ইতিহাস মানেই কি পুরুষের ইতিহাস? প্রথাগত ইতিহাসে নারীরা ছিল প্রায় অদৃশ্য, কারণ যুদ্ধ, রাজনীতি, কূটনীতি— যেসব বিষয় ইতিহাসে প্রাধান্য পেয়েছে— সেসব ছিল পুরুষের একচেটিয়া এলাকা।
নারী ইতিহাসবিদেরা দেখাতে শুরু করেন যে, পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি শুধু ইতিহাসের বিষয়বস্তুই নির্ধারণ করে না, বরং নির্ধারণ করে ইতিহাস রচনার ভাষা ও পদ্ধতিকেও। তারা পরিবার, গৃহস্থালি, খাদ্য, স্বাস্থ্য, প্রজনন— এসব ব্যক্তিগত ও 'গার্হস্থ্য' বিষয়কেও রাজনৈতিক হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং ইতিহাসের আলোচনায় নিয়ে আসেন। এর ফলে, আমরা জানতে পারি, কীভাবে শিল্প বিপ্লবের সময় পুরুষ শ্রমিকের পাশাপাশি নারী ও শিশু শ্রমিকেরাও শোষিত হয়েছে, এবং কীভাবে তাদের শ্রমকে কম মূল্যায়িত করে পুরুষদের 'প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
আধুনিক প্রযুক্তি ও ইতিহাস রচনার গণতন্ত্রীকরণ
একুশ শতকে এসে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও ইন্টারনেট ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। এখন আর ইতিহাস লেখার ক্ষমতা কেবল পেশাদার ঐতিহাসিক বা রাষ্ট্রের হাতে নেই।
ডিজিটাল আর্কাইভ ও উন্মুক্ত জ্ঞান
গুগল বুকস, ইন্টারনেট আর্কাইভ, এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রকল্পের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ ঐতিহাসিক দলিল এখন বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মানুষের জন্য উন্মুক্ত। ভারতে 'ভারতীয় ডিজিটাল লাইব্রেরি' বা পশ্চিমবঙ্গের 'স্কুল অব কালচারাল টেক্সটস অ্যান্ড রেকর্ডস'-এর মতো উদ্যোগ দুর্লভ পাণ্ডুলিপি ও নথি ডিজিটাইজেশন করছে, যা ইতিহাস চর্চাকে গণতান্ত্রিক করে তুলছে।
সোশ্যাল মিডিয়া ও ‘নাগরিক ইতিহাসবিদ’
বর্তমানে ব্যক্তিগত ব্লগ, ফেসবুক পেজ, ইউটিউব চ্যানেল, পডকাস্ট— সব মাধ্যমেই সাধারণ মানুষ ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করছে। তারা পারিবারিক স্মৃতি, স্থানীয় ইতিহাস, কিংবা কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের ইতিহাস নিজেরাই তুলে ধরছে। এর ফলে, বৃহৎ আখ্যানের (Meta-narrative) বাইরে অসংখ্য 'ছোট ছোট ইতিহাস' তৈরি হচ্ছে। এর নেতিবাচক দিকও আছে— ভুয়া তথ্য ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়ানোর মাধ্যমও এটি। কিন্তু একথা অনস্বীকার্য যে, ইতিহাস কে বলবে, তা নিয়ে পুরনো একচেটিয়া অধিকার ভেঙে পড়েছে।
তাহলে ইতিহাস কি সম্পূর্ণ মিথ্যা? সত্য ও বস্তুনিষ্ঠতার সংকট
উপরের আলোচনা থেকে একটি জরুরি প্রশ্ন আসে: তাহলে কি ইতিহাস সম্পূর্ণভাবেই আপেক্ষিক? কোনো বস্তুনিষ্ঠ সত্য কি নেই? ইতিহাস যদি বিজয়ীরা লেখে, আর পরাজিতরাও যদি নিজেদের করে লেখে, তাহলে 'প্রকৃত' ইতিহাসটি কী?
উত্তর লুকিয়ে আছে পদ্ধতির মধ্যে। ইতিহাস কোনো স্থির, চূড়ান্ত বস্তু নয়। এটি একটি ধারাবাহিক গবেষণা, পুনর্গঠন ও ব্যাখ্যার প্রক্রিয়া। একজন পেশাদার ঐতিহাসিকের দায়িত্ব হলো— উৎসের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা, একাধিক পরস্পরবিরোধী উৎসের মুখোমুখি হওয়া, নিজের পক্ষপাত সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং এসব মিলিয়ে যুক্তিনির্ভর একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যাখ্যা দাঁড় করানো।
ইতিহাস সম্পূর্ণ মিথ্যা নয়, কিন্তু তা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষও নয়। একটি ঘটনার যে অকাট্য তথ্য আছে (যেমন, পলাশীর যুদ্ধ ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন হয়েছিল), তা নিয়ে বিতর্ক নেই। কিন্তু যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল ব্যাখ্যা করতে গিয়েই ইতিহাসবিদের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক অবস্থান কাজ করে। একজন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী ঐতিহাসিক বলবেন, ক্লাইভের কূটনীতি ছিল প্রখর; আর একজন ভারতীয় জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিক বলবেন, মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতাই মুখ্য। দুটোই সত্য, কিন্তু জোর দেওয়ার জায়গা ভিন্ন। ইতিহাসের কাজই হলো এই বহুসত্যের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র আঁকা।
ইতিহাসের শিক্ষা— কেন আমাদের ভিন্ন কণ্ঠস্বর শোনা জরুরি?
বিজয়ীদের লেখা ইতিহাসের বিপদ হলো, এটি সমাজে ক্ষমতার বৈষম্যকে স্থায়ী করে। ইতিহাস যদি বলে, কোনো একটি গোষ্ঠী সবসময় জয়ী, বীর ও সভ্য, তাহলে অন্য গোষ্ঠীগুলো পরাজিত, দুর্বল ও বর্বর হিসেবে চিহ্নিত থেকে যায়। এর ফলে সমাজে বর্ণবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, লিঙ্গবৈষম্য জিইয়ে থাকার পক্ষে যুক্তি তৈরি হয়।
অন্যদিকে, যখন আমরা পরাজিত, শোষিত, নিপীড়িত ও নীরবদের ইতিহাস জানতে চাই, তখন আমরা সমাজের গভীরে জমে থাকা ক্ষত ও অন্যায়গুলো চিহ্নিত করতে পারি। এর মাধ্যমেই সমাজ হিসেবে আমরা ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনের দিকে এগোতে পারি। তাই, ইতিহাসকে জিজ্ঞাসা করতে হবে: কাদের কথা বলা হলো না? কেন বলা হলো না? এই প্রশ্ন করাই গণতান্ত্রিক সমাজের ইতিহাসচর্চার মূল কথা।
একটি বহুস্বরিক অতীতের দিকে
"ইতিহাস বিজয়ীদের লেখা"— এই উক্তিটি তাই আংশিক সত্য। ইতিহাস রচনার ক্ষমতা দীর্ঘদিন বিজয়ী, শাসক ও ক্ষমতাশীলদের হাতে ছিল— একথা সত্য। কিন্তু ইতিহাস কেবল তারাই লেখে না। বিদ্রোহী কবি, প্রতিবাদী শিল্পী, গ্রামের অশিক্ষিত বৃদ্ধা, নদীতে মাছ ধরা জেলে— তারাও ইতিহাস লেখেন, তাঁদের নিজস্ব ভাষায়। ইতিহাসবিদের কাজ শুধু সরকারি নথি ঘাঁটা নয়, বরং এই সব হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠস্বরকে খুঁজে বের করা।
বর্তমানে ইতিহাস চর্চা অনেক বেশি বহুমাত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে। আমরা এখন জানি, অতীত একক কোনো গল্প নয়, বরং অনেক গল্পের এক জটিল জাল। এই জটিলতাই ইতিহাসের সৌন্দর্য। তাই আমাদের কাজ হলো, সহজ-সরল বিজয়গাথা নিয়ে সন্তুষ্ট না থেকে ইতিহাসের জটিলতা ও বৈচিত্র্যকে স্বীকার করা। মনে রাখতে হবে, ইতিহাস কেবল পেছনে তাকানো নয়, বর্তমানকে বোঝা এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্যও তা অপরিহার্য। যে জাতি তার ইতিহাসের সব কণ্ঠস্বরকে সমান গুরুত্ব দেয়, সে জাতিই প্রকৃত অর্থে সভ্য।
আরও পড়ুন -
