পৃথিবীতে প্রাণের বৈচিত্র্য এতটাই বিপুল যে, একে কোনো একক দৃষ্টিতে ধারণ করা অসম্ভব। এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা প্রায় ২০ লক্ষেরও বেশি প্রজাতির প্রাণী শনাক্ত করেছেন, কিন্তু ধারণা করা হয় প্রকৃত সংখ্যা ১ কোটিরও বেশি হতে পারে। এই বিপুল সংখ্যক প্রাণীকে যদি আমরা কোনো রকম সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা ছাড়া বুঝতে চেষ্টা করি, তাহলে এক ভয়াবহ বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়তে হবে। ঠিক এখানেই আসে শ্রেণিবিন্যাস বা ট্যাক্সোনমি (Taxonomy)-র প্রয়োজনীয়তা। এটি এমন এক বিজ্ঞান, যা জীবজগতের প্রতিটি সদস্যকে চিহ্নিত করে, নামকরণ করে এবং তাদের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক অনুযায়ী বিভিন্ন স্তরে সুবিন্যস্ত করে। আপনি যদি জীববিজ্ঞানের শিক্ষার্থী, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, অথবা প্রকৃতি সম্পর্কে জানতে আগ্রহী একজন সাধারণ পাঠক হন, এই সম্পূর্ণ এসইও অপটিমাইজড নিবন্ধটি প্রাণীজগতের শ্রেণিবিন্যাসের জটিল ও সুন্দর প্রক্রিয়াটি আপনার সামনে পরিষ্কার করে দেবে।
শ্রেণিবিন্যাস কী এবং কেন প্রয়োজন?
শ্রেণিবিন্যাস (Classification) হলো একটি পদ্ধতি, যার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রাণীকে তাদের সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন বিভাগে সাজানো হয়। ট্যাক্সোনমি শব্দটি গ্রিক 'taxis' (বিন্যাস) ও 'nomos' (নিয়ম) থেকে এসেছে। জীববিজ্ঞানে এর আনুষ্ঠানিক জনক হলেন সুইডিশ প্রকৃতিবিজ্ঞানী ক্যারোলাস লিনিয়াস (Carolus Linnaeus)।
কিন্তু এই শ্রেণিবিন্যাস কি কেবলই এক ধরণের গ্রন্থাগারিকের কাজ? মোটেও নয়। এর গুরুত্ব বহুমুখী:
১. পরিচয় ও শনাক্তকরণ: ঠিক যেমন একটি বিশাল লাইব্রেরিতে বই খুঁজতে গেলে একটি নির্দিষ্ট নম্বর বা শ্রেণি প্রয়োজন, তেমনি বিশাল জীবজগতের প্রতিটি সদস্যকে খুঁজে পেতে ও চিনতে একটি সার্বজনীন নাম ও অবস্থান জানা প্রয়োজন।
২. বিবর্তনের ইতিহাস বোঝা: আধুনিক শ্রেণিবিন্যাস কেবল বাহ্যিক গঠন দেখে নয়, বরং বিবর্তনের ধারা অনুসরণ করে। এর মাধ্যমে আমরা জানতে পারি কোন প্রাণী কার সাথে বেশি সম্পর্কিত, কে কার পূর্বপুরুষ।
৩. গবেষণার সুবিধা: গবেষণাগারে কোনো একটি প্রাণী নিয়ে কাজ করার সময় তার সঠিক অবস্থান জানা থাকলে, আমরা সহজেই বুঝতে পারি সেই গোত্রের অন্যান্য প্রাণীর আচরণ কেমন হতে পারে।
৪. সংরক্ষণ প্রচেষ্টা: কোন প্রজাতিটি বিপন্ন, কোনটি মহাবিপন্ন, তা নির্ধারণ করতে সঠিক শ্রেণিবিন্যাসের কোনো বিকল্প নেই। একটি অচেনা প্রাণীকে রক্ষা করা যায় না।
ইতিহাসের পাতা থেকে: অ্যারিস্টটল থেকে লিনিয়াস
শ্রেণিবিন্যাসের ধারণা হঠাৎ করে আসেনি। খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতকে গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল (Aristotle) প্রথম জীবজগতকে সুবিন্যস্ত করার চেষ্টা করেন। তিনি প্রাণীজগতকে বড় করে দুই ভাগে ভাগ করেছিলেন: রক্তযুক্ত প্রাণী (Enaima) ও রক্তহীন প্রাণী (Anaima)। আধুনিক হিসেবে এটি যথাক্রমে মেরুদণ্ডী ও অমেরুদণ্ডী প্রাণীর সমতুল্য। অ্যারিস্টটলই প্রথম বর্গ (Genus) ও প্রজাতির (Species) ধারণা দেন।
এরপর টানা দুহাজার বছর ধরে প্রকৃতিবিদরা বিভিন্ন প্রাণীর নামকরণ ও বর্ণনা করতে থাকেন, কিন্তু কোনো সর্বজনমান্য ব্যবস্থা ছিল না। একই প্রাণীর ভিন্ন ভিন্ন দেশে ভিন্ন নাম ছিল এবং অনেক সময় একই নামে ভিন্ন প্রাণী ডাকা হতো।
১৭৩৫ সালে ক্যারোলাস লিনিয়াস তার বিখ্যাত গ্রন্থ Systema Naturae প্রকাশ করেন। এখানেই তিনি আধুনিক শ্রেণিবিন্যাসের ভিত্তি স্থাপন করেন। তাঁর সবচেয়ে বড় আবিষ্কার ছিল দ্বিপদী নামকরণ (Binomial Nomenclature) পদ্ধতি। লিনিয়াস প্রায় ৪,৪০০ প্রজাতির প্রাণী ও ৭,৭০০ প্রজাতির উদ্ভিদের নামকরণ করেছিলেন। এই অবদানের জন্য তাকে "Father of Taxonomy" বা "শ্রেণিবিন্যাসের জনক" বলা হয়।
বাইনোমিয়াল নোমেনক্লেচার: দুটি শব্দের জাদু
লিনিয়াস প্রবর্তিত দ্বিপদী নামকরণ পদ্ধতি হল আধুনিক শ্রেণিবিন্যাসের প্রাণ। এই পদ্ধতিতে প্রতিটি প্রাণী একটি অনন্য বৈজ্ঞানিক নাম পায়, যা দুটি অংশ নিয়ে গঠিত। প্রথম অংশটি হলো গণ নাম (Genus name) এবং দ্বিতীয় অংশটি হলো প্রজাতির নাম (Specific epithet)। এই নাম সর্বদা ল্যাটিন ভাষায় বা ল্যাটিনকৃত শব্দে হয় এবং ইটালিক অক্ষরে লেখা হয়। যেমন:
মানুষ: Homo sapiens
বাঘ: Panthera tigris
কুকুর: Canis lupus familiaris
কবুতর: Columba livia
এই পদ্ধতির কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। গণ নামের প্রথম অক্ষর বড় হাতের (Capital) হবে, প্রজাতির নামের সব অক্ষর ছোট হাতের (small) হবে। হাতে লেখার সময় দুইটি অংশের নিচে আলাদা দাগ টানতে হয়, আর ছাপানোর সময় ইটালিক করতে হয়। নামের শেষে অনেক সময় নামকরণকারীর নাম ও সাল সংক্ষেপে দেওয়া হয়, যেমন Panthera leo Linnaeus, 1758।
এই পদ্ধতি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? কারণ ধরুন, "মাছরাঙা" নামের একটি পাখি বাংলাদেশে আছে, পশ্চিমবঙ্গে তাকে "মাছরাঙা"-ই বলে, কিন্তু উত্তর ভারতে বলা হয় "কিংফিশার"। কিন্তু Alcedo atthis নামটি জাপান থেকে শুরু করে ব্রাজিল পর্যন্ত সব জীববিজ্ঞানীর কাছেই একই প্রাণীকে নির্দেশ করে। এই সার্বজনীনতা জীববিজ্ঞানকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
আইসিএনজেড: নামকরণের আন্তর্জাতিক বিধান
শুধু নাম দিলেই তো হবে না, সেই নাম যাতে সারা বিশ্বে বৈধ হয়, তার জন্য একটি আন্তর্জাতিক নিয়মবিধি আছে। প্রাণীদের নামকরণের জন্য এটি হলো ইন্টারন্যাশনাল কোড অফ জুওলজিক্যাল নোমেনক্লেচার (ICZN)। এই কোড নির্ধারণ করে:
কোন নামটি অগ্রাধিকার পাবে: একই প্রাণীর একাধিক নাম থাকলে, যে নামটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে সেইটিই বৈধ বলে গণ্য হবে।
কীভাবে নতুন নাম প্রকাশ করতে হবে: বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশনা, টাইপ স্পেসিমেন নির্ধারণ (হোলোটাইপ), ইত্যাদি।
কোন নাম ব্যবহার করা যাবে না: যদি কোনো নাম পূর্বে অন্য কোনো প্রাণীর জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
ICZN ১৯০৫ সাল থেকে আজ পর্যন্ত প্রাণীজগতের নামকরণের জন্য একমাত্র বৈধ কাঠামো হিসেবে কাজ করছে। বিজ্ঞানীরা নিয়মিত এর সম্মেলনে মিলিত হয়ে প্রয়োজনে নিয়মাবলী হালনাগাদ করেন।
আধুনিক শ্রেণিবিন্যাসের সাতটি রাজধানী (Taxonomic Hierarchy)
আজকের দিনে জীবজগতকে কতগুলো ক্রমিক স্তরের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। এই স্তরগুলোকে একত্রে ট্যাক্সোনমিক হায়ারার্কি বা লিনিয়ান হায়ারার্কি বলা হয়। প্রধান সাতটি স্তর হলো: Kingdom, Phylum (বা Division), Class, Order, Family, Genus, এবং Species। এই সাতটি স্তরকে মৌলিক ধাপ (obligate ranks) বলা হয়। নিচে স্তরগুলো বিস্তৃত থেকে সংকীর্ণের দিকে ব্যাখ্যা করা হলো:
১. জগৎ (Kingdom)
জীবজগতের সর্বোচ্চ স্তর হলো Kingdom|জগৎ। প্রাচীনকালে কেবল Plantae (উদ্ভিদ) ও Animalia (প্রাণী)—এই দুই জগতে ভাগ করা হতো। বর্তমানে R.H. Whittaker-এর ১৯৬৯ সালের Five Kingdom Classification অনুযায়ী জীবজগতকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়: Monera, Protista, Fungi, Plantae, Animalia। পরে Carl Woese ১৯৯০ সালে আরও বেশি মৌলিক ত্রি-ডোমেইন ব্যবস্থা (Archaea, Bacteria, Eukarya) প্রবর্তন করেন। প্রাণীজগৎ অর্থাৎ Animalia Kingdom-এর মধ্যে পড়ে বহুকোষী, পরভোজী ও চলনক্ষম জীবসমূহ।
২. পর্ব (Phylum)
প্রাণীজগতে বর্তমানে প্রায় ৩৫টিরও বেশি Phylum বা পর্ব আছে। একটি পর্বের অন্তর্গত প্রাণীদের দেহের মৌলিক গঠনতান্ত্রিক নকশা (body plan) একই রকমের হয়। যেমন:
Porifera (স্পঞ্জ): এদের দেহ ছিদ্রময়, নির্দিষ্ট টিস্যু নেই।
Cnidaria (হাইড্রা, জেলিফিশ): এদের দেহে নিডোসাইট নামক দংশক কোষ থাকে।
Arthropoda (কীটপতঙ্গ, মাকড়সা, চিংড়ি): খণ্ডায়িত দেহ, সন্ধিল উপাঙ্গ, কাইটিনের তৈরি বহিঃকঙ্কাল।
Chordata (মেরুদণ্ডী প্রাণী): এদের জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে নটোকর্ড, ফুলকা রেখা, ও পৃষ্ঠীয় স্নায়ুরজ্জু থাকে।
৩. শ্রেণি (Class)
প্রতিটি পর্বকে আবার কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। Chordata পর্বকে চেনা যায় এর বড় পাঁচটি শ্রেণির মাধ্যমে: Mammalia (স্তন্যপায়ী), Aves (পাখি), Reptilia (সরীসৃপ), Amphibia (উভচর), এবং Pisces (মাছ)। Arthropoda পর্বের মধ্যে Insecta একটি বিশাল শ্রেণি যা প্রাণীজগতের প্রায় ৮০% প্রজাতি ধারণ করে আছে।
৪. বর্গ (Order)
শ্রেণিকে ভাগ করা হয় বর্গে। Mammalia শ্রেণির অন্তর্গত Carnivora (মাংসাশী), Primates (বানর, মানুষ), Rodentia (ইঁদুর) ইত্যাদি বিভিন্ন বর্গ আছে।
৫. গোত্র (Family)
একই ধরণের গণ নিয়ে গঠিত হয় একটি Family বা গোত্র। মাংসাশী প্রাণীদের মধ্যে Felidae (বিড়াল গোত্র) ও Canidae (কুকুর গোত্র) দুটি আলাদা গোত্র। লিনিয়াস সর্বপ্রথম এই স্তরটিকে ধারণ করেন গাছপালার জন্য।
৬. গণ (Genus)
একই গণের অন্তর্গত প্রজাতিগুলো খুবই কাছাকাছি সম্পর্কিত এবং দেখতে প্রায় একই রকম। যেমন Panthera গণের অন্তর্গত সিংহ (Panthera leo) ও বাঘ (Panthera tigris)।
৭. প্রজাতি (Species)
এটি শ্রেণিবিন্যাসের সবচেয়ে মৌলিক একক। সহজ ভাষায়, Species হলো সেই সব প্রাণীর সমষ্টি, যারা নিজেদের মধ্যে প্রজনন করে বংশবৃদ্ধি করতে পারে এবং যাদের সন্তান উর্বর হয়। যেমন, গাধা ও ঘোড়া ভিন্ন প্রজাতি, কারণ এদের মিলনে যে খচ্চর জন্মায় তা বন্ধ্যা। তবে আধুনিক বিজ্ঞান কেবল প্রজননগত ধারণা নয়, বরং ফাইলোজেনেটিক স্পিসিজ কনসেপ্টও ব্যবহার করে।
আরও পড়ুন -
আনুষঙ্গিক স্তরসমূহ
প্রায়শই এই সাতটি মূল স্তরের পাশাপাশি আরও কিছু উপ-স্তর ব্যবহার করা হয়, যেমন:
উপপর্ব (Subphylum): Vertebrata হলো Chordata-র অধীন একটি উপপর্ব।
অধিশ্রেণি (Superclass): Tetrapoda হলো চার পা-বিশিষ্ট প্রাণীদের একটি অধিশ্রেণি।
অধিবর্গ (Superorder), উপবর্গ (Suborder), উপগোত্র (Subfamily), উপগণ (Subgenus) ইত্যাদি। এছাড়া Tribe নামক একটি স্তরও আছে যা Subfamily ও Genus-এর মাঝামাঝি অবস্থানে থাকে।
টাইপ স্পেসিমেন: বর্ণনার ভিত্তি
যখন বিজ্ঞানীরা একটি নতুন প্রজাতির নামকরণ ও বর্ণনা প্রকাশ করেন, তখন তাদের অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট নমুনাকে "টাইপ" হিসেবে নির্ধারণ করতে হবে, যাকে বলে হোলোটাইপ (Holotype)। টাইপ স্পেসিমেন হলো সেই ভৌত নমুনা (বা চিত্র), যা ঐ প্রজাতির নামের স্থায়ী রেফারেন্স হিসেবে কাজ করে। ভবিষ্যতে যদি দেখা যায় যে একই প্রজাতিকে দুইবার ভিন্ন নামে বর্ণনা করা হয়েছে, তাহলে টাইপ পরীক্ষা করেই নিশ্চিত হওয়া যায়, আসল প্রজাতিটি কোনটি।
আধুনিক পদ্ধতি: ক্ল্যাডিস্টিকস ও ফাইলোজেনেটিক্স
লিনিয়াস যে পদ্ধতি দিয়েছিলেন সেখানে মূলত বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ গঠনের (morphology) ভিত্তিতে বিভাজন করা হতো। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে জিনতত্ত্ব (Genetics) বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে শ্রেণিবিন্যাসের জগতে। বর্তমানে ক্ল্যাডিস্টিকস (Cladistics) নামক একটি পদ্ধতি এককথায় রাজত্ব করছে।
ক্ল্যাডিস্টিক পদ্ধতিতে প্রাণীদের বাহ্যিক চেহারা নয়, বরং তাদের ডিএনএ ও আরএনএ-র অনুক্রম (DNA sequencing) বিশ্লেষণ করে বিবর্তনীয় বৃক্ষ (Phylogenetic tree) তৈরি করা হয়। এই পদ্ধতিতে দেখা হয়, কোন প্রাণী কার সাথে সবচেয়ে বেশি জিনগত উপাদান ভাগ করে নেয়। এই বিশ্লেষণ প্রতিনিয়ত আমাদের চমকে দিচ্ছে।
উদাহরণস্বরূপ, আগে তিমিকে মাছ ভাবা হতো, পরে স্তন্যপায়ী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এখন ডিএনএ বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, তিমির সবচেয়ে কাছের জীবিত আত্মীয় হলো জলহস্তী (Hippopotamus)! বাইরে থেকে দেখে এই দুই প্রাণীর মধ্যে যে অকল্পনীয় সম্পর্ক, তা একমাত্র আণবিক ফাইলোজেনেটিক্স-এর কল্যাণেই আবিষ্কৃত হয়েছে।
আরেকটি চমকপ্রদ আবিষ্কার: DNA প্রমাণ করেছে যে পাখিরা (Aves) প্রকৃতপক্ষে সরীসৃপদের (Reptilia) একটি বিবর্তিত শাখা। আধুনিক ক্ল্যাডিস্টিক শ্রেণিবিন্যাসে তাই পাখিদের "ডাইনোসর" হিসেবেও অভিহিত করা হয়।
আধুনিক যুগে একটি প্রাণীর শ্রেণিবিন্যাস কীভাবে হয়?
এবার আসুন জেনে নিই, বর্তমানে যখন একটি প্রজাতি আবিষ্কৃত হয়, তখন কীভাবে ধাপে ধাপে তার শ্রেণিবিন্যাস নির্ণয় করা হয়।
১. সংগ্রহ ও সংরক্ষণ: প্রথমে অজানা প্রাণীটির নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। গভীর সমুদ্র, গহীন অরণ্য কিংবা দুর্গম পর্বত থেকে এই নমুনা আসে।
২. অঙ্গসংস্থানিক বিশ্লেষণ: নমুনার বাহ্যিক গঠন (দেহের রং, আকার, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ) এবং অভ্যন্তরীণ গঠন (কঙ্কাল, অঙ্গতন্ত্র) নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। বিশেষ করে জনন অঙ্গের গঠন প্রায়শই প্রজাতি নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে, বিশেষত পোকামাকড়ের ক্ষেত্রে।
৩. অণুবীক্ষণিক পর্যবেক্ষণ: আলোক অণুবীক্ষণ যন্ত্র ও স্ক্যানিং ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ (SEM)-এর সাহায্যে অতি সূক্ষ্ম গঠন দেখা হয়, যা খালি চোখে ধরা পড়ে না।
৪. ডিএনএ বারকোডিং: এটি আধুনিক শ্রেণিবিন্যাসের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। কোষ থেকে ডিএনএ বের করে, নির্দিষ্ট জিন অঞ্চল (যেমন প্রাণীদের ক্ষেত্রে COI জিন) পিসিআর-এর মাধ্যমে বিবর্ধিত করে সিকোয়েন্সিং করা হয়। তারপর এই ডিএনএ বারকোডকে বৈশ্বিক ডাটাবেজ, যেমন GenBank বা BOLD Systems-এ উপস্থিত কোটি কোটি সিকোয়েন্সের সাথে মিলিয়ে দেখা হয়। যদি কোনো মিল না পাওয়া যায়, তাহলে বোঝা যায় এটি একটি নতুন প্রজাতি হতে পারে।
৫. ফাইলোজেনেটিক গাছ তৈরি: প্রাপ্ত ডিএনএ সিকোয়েন্স নিয়ে কম্পিউটার সফটওয়্যারের মাধ্যমে সম্ভাব্য বিবর্তনীয় গাছ তৈরি করা হয়, যা দেখায় প্রাণীটি কার নিকটাত্মীয়।
৬. প্রকাশনা ও পিয়ার রিভিউ: এই সমস্ত তথ্য-প্রমাণ একটি গবেষণাপত্রে লিপিবদ্ধ করে কোনো স্বীকৃত বিজ্ঞান পত্রিকায় (Journal) পাঠানো হয়। অন্য বিশেষজ্ঞরা তা পর্যালোচনা করেন (Peer review)। সবকিছু সঠিক থাকলে, প্রজাতিটির নাম আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত হয়।
শ্রেণিবিন্যাসে চ্যালেঞ্জ ও বিতর্ক
শ্রেণিবিন্যাসের পথ সবসময় মসৃণ নয়। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ক্রিপ্টিক স্পিসিজ (Cryptic species)। কিছু প্রাণী দেখতে একই রকম হলেও জিনগতভাবে তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রজাতি হতে পারে। সম্প্রতি ভারত ও বাংলাদেশে হলুদ অ্যানাকোন্ডা (Yellow Anaconda) ও জালি অজগর (Reticulated Python) নিয়ে বেশ কিছু জিনগত গবেষণা হয়েছে, যা পূর্বের শ্রেণিবিন্যাসকে চ্যালেঞ্জ করছে।
আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো নামকরণে অস্থিরতা। DNA বিশ্লেষণের ফলে যখন দেখা যায় যে দুটি গোত্র আসলে এক, তখন নাম পরিবর্তন করতে হয়। এতে পুরনো বইয়ের তথ্যের সাথে মিলিয়ে পড়তে অসুবিধা হয়। তবে বিজ্ঞান চিরন্তন সত্যের পথে এগোয়, ভুল স্বীকার করে সংশোধনের মধ্যেই তার সার্থকতা।
ট্যাক্সোনমির ভবিষ্যৎ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও মেশিন লার্নিং এখন চিত্র থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রজাতি শনাক্ত করতে পারছে। এনভায়রনমেন্টাল ডিএনএ (eDNA) প্রযুক্তির মাধ্যমে কোনো পুকুরের এক ফোঁটা জল থেকেই সেখানে বসবাসকারী প্রাণীদের তালিকা বানানো সম্ভব হচ্ছে। ভবিষ্যতে হয়তো প্রতিটি প্রজাতি একটি QR কোডের মতো ডিজিটাল আইডেন্টিটি পাবে, যা স্ক্যান করলেই তার পুরো জিনোম ও বিবর্তনের ইতিহাস আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠবে।
পৃথিবীর প্রায় ৮০% প্রজাতি এখনো বিজ্ঞানের নজরে আসেনি। কীটপতঙ্গ ও গভীর সমুদ্রের প্রাণীর জগতে এখনো রাজত্ব করছে অজানা। আণবিক ট্যাক্সোনমির কল্যাণে আগামী দশকগুলোতে হয়তো এই সংখ্যা দ্রুত বদলে যাবে। ২০২৫ সালে বর্ণিত এক হিসেব অনুযায়ী, প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১৮,০০০ নতুন প্রজাতি শনাক্ত হচ্ছে।
প্রাণীর শ্রেণিবিন্যাস নিছক একটি তালিকা তৈরির কাজ নয়; এটি হলো পৃথিবীর প্রাণের বিবর্তনের ইতিহাসকে পড়ার এক মহাকাব্যিক প্রচেষ্টা। লিনিয়াস থেকে শুরু করে আধুনিক জিনবিজ্ঞানী পর্যন্ত, প্রতিটি মানুষ এই মহাযজ্ঞে নিজের ইট যোগ করেছেন। আমরা যখন একটি বাঘকে Panthera tigris নামে ডাকি, তখন আমরা কেবল একটি নাম উচ্চারণ করি না, বরং স্বীকার করি তার সঙ্গে সিংহ, চিতাবাঘ, এমনকি আমাদের পোষা বিড়ালের গভীর সম্পর্কের কথা। শ্রেণিবিন্যাস হলো প্রকৃতির আত্মীয়তার ছক। যে গ্রহে আমরা বাস করি, তার জীববৈচিত্র্যকে জানতে ও বাঁচাতে এই আত্মীয়তার বোধই আমাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
আরও পড়ুন -
পরিচিত কিছু প্রাণী ও উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম
| ক্র. | প্রাণী (Animal) | বৈজ্ঞানিক নাম | উদ্ভিদ (Plant) | বৈজ্ঞানিক নাম |
|---|---|---|---|---|
| 1 | মানুষ | Homo sapiens | ধান | Oryza sativa |
| 2 | গরু | Bos taurus | গম | Triticum aestivum |
| 3 | ছাগল | Capra hircus | ভুট্টা | Zea mays |
| 4 | ভেড়া | Ovis aries | আলু | Solanum tuberosum |
| 5 | ঘোড়া | Equus ferus caballus | টমেটো | Solanum lycopersicum |
| 6 | কুকুর | Canis lupus familiaris | বেগুন | Solanum melongena |
| 7 | বিড়াল | Felis catus | মরিচ | Capsicum annuum |
| 8 | বাঘ | Panthera tigris | পেঁয়াজ | Allium cepa |
| 9 | সিংহ | Panthera leo | রসুন | Allium sativum |
| 10 | হাতি | Elephas maximus | আদা | Zingiber officinale |
| 11 | শিয়াল | Vulpes vulpes | হলুদ | Curcuma longa |
| 12 | নেকড়ে | Canis lupus | সরিষা | Brassica juncea |
| 13 | হরিণ | Cervus elaphus | বাঁধাকপি | Brassica oleracea |
| 14 | খরগোশ | Oryctolagus cuniculus | ফুলকপি | Brassica oleracea var. botrytis |
| 15 | ইঁদুর | Rattus rattus | গাজর | Daucus carota |
| 16 | বাদুড় | Pteropus vampyrus | মুলা | Raphanus sativus |
| 17 | উট | Camelus dromedarius | শসা | Cucumis sativus |
| 18 | গণ্ডার | Rhinoceros unicornis | কুমড়া | Cucurbita maxima |
| 19 | জলহস্তী | Hippopotamus amphibius | লাউ | Lagenaria siceraria |
| 20 | ভাল্লুক | Ursus arctos | করলা | Momordica charantia |
| 21 | বানর | Macaca mulatta | পটল | Trichosanthes dioica |
| 22 | শিম্পাঞ্জি | Pan troglodytes | ঢেঁড়স | Abelmoschus esculentus |
| 23 | গরিলা | Gorilla gorilla | কলা | Musa paradisiaca |
| 24 | ক্যাঙ্গারু | Macropus rufus | আম | Mangifera indica |
| 25 | কোয়ালা | Phascolarctos cinereus | কাঁঠাল | Artocarpus heterophyllus |
| 26 | পাণ্ডা | Ailuropoda melanoleuca | পেয়ারা | Psidium guajava |
| 27 | ডলফিন | Delphinus delphis | লিচু | Litchi chinensis |
| 28 | তিমি | Balaenoptera musculus | আনারস | Ananas comosus |
| 29 | হাঙর | Carcharodon carcharias | নারকেল | Cocos nucifera |
| 30 | অক্টোপাস | Octopus vulgaris | খেজুর | Phoenix dactylifera |
| 31 | সি হর্স | Hippocampus hippocampus | আপেল | Malus domestica |
| 32 | স্টারফিশ | Asterias rubens | কমলা | Citrus sinensis |
| 33 | সি আরচিন | Echinus esculentus | লেবু | Citrus limon |
| 34 | স্পঞ্জ | Spongia officinalis | আঙুর | Vitis vinifera |
| 35 | কোরাল | Acropora cervicornis | ডালিম | Punica granatum |
| 36 | অ্যামিবা | Amoeba proteus | তরমুজ | Citrullus lanatus |
| 37 | প্যারামেসিয়াম | Paramecium caudatum | বাঙ্গি | Cucumis melo |
| 38 | ইউগ্লিনা | Euglena viridis | স্ট্রবেরি | Fragaria × ananassa |
| 39 | হাইড্রা | Hydra vulgaris | ব্লুবেরি | Vaccinium corymbosum |
| 40 | টেপওয়ার্ম | Taenia solium | রাস্পবেরি | Rubus idaeus |
| 41 | রাউন্ডওয়ার্ম | Ascaris lumbricoides | চা | Camellia sinensis |
| 42 | কেঁচো | Lumbricus terrestris | কফি | Coffea arabica |
| 43 | জোঁক | Hirudo medicinalis | কোকো | Theobroma cacao |
| 44 | শামুক | Helix aspersa | আখ | Saccharum officinarum |
| 45 | ঝিনুক | Mytilus edulis | পাট | Corchorus olitorius |
| 46 | স্ক্যালপ | Pecten maximus | তুলা | Gossypium hirsutum |
| 47 | ক্ল্যাম | Mercenaria mercenaria | রাবার | Hevea brasiliensis |
| 48 | অক্স | Bos indicus | বাঁশ | Bambusa vulgaris |
| 49 | ইয়াক | Bos grunniens | বটগাছ | Ficus benghalensis |
| 50 | মুরগি | Gallus gallus domesticus | অশ্বত্থ | Ficus religiosa |
| 51 | হাঁস | Anas platyrhynchos | নিম | Azadirachta indica |
| 52 | কবুতর | Columba livia | ইউক্যালিপটাস | Eucalyptus globulus |
| 53 | কাক | Corvus splendens | পাইন | Pinus sylvestris |
| 54 | চড়ুই | Passer domesticus | দেবদারু | Cedrus deodara |
| 55 | ঈগল | Aquila chrysaetos | সেগুন | Tectona grandis |
| 56 | পেঁচা | Bubo bubo | মহগনি | Swietenia mahagoni |
| 57 | টিয়া | Psittacula krameri | শাল | Shorea robusta |
| 58 | রাজহাঁস | Cygnus olor | কৃষ্ণচূড়া | Delonix regia |
| 59 | পেঙ্গুইন | Aptenodytes forsteri | রাধাচূড়া | Peltophorum pterocarpum |
| 60 | উটপাখি | Struthio camelus | গুলমোহর | Delonix regia |
| 61 | ফ্লেমিঙ্গো | Phoenicopterus roseus | গোলাপ | Rosa indica |
| 62 | কাঠঠোকরা | Picus viridis | সূর্যমুখী | Helianthus annuus |
| 63 | মাছরাঙা | Alcedo atthis | পদ্ম | Nelumbo nucifera |
| 64 | সিল | Phoca vitulina | শাপলা | Nymphaea nouchali |
| 65 | সি লায়ন | Zalophus californianus | গাঁদা | Tagetes erecta |
| 66 | লামা | Lama glama | জবা | Hibiscus rosa-sinensis |
| 67 | আলপাকা | Vicugna pacos | টিউলিপ | Tulipa gesneriana |
| 68 | ফেরেট | Mustela putorius | লিলি | Lilium candidum |
| 69 | স্কাঙ্ক | Mephitis mephitis | অর্কিড | Orchis latifolia |
| 70 | অপসাম | Didelphis virginiana | ক্যাকটাস | Opuntia ficus-indica |
| 71 | স্লথ | Bradypus variegatus | অ্যালোভেরা | Aloe vera |
| 72 | আরমাডিলো | Dasypus novemcinctus | তুলসী | Ocimum tenuiflorum |
| 73 | প্লাটিপাস | Ornithorhynchus anatinus | পুদিনা | Mentha spicata |
| 74 | ইচিডনা | Tachyglossus aculeatus | ধনিয়া | Coriandrum sativum |
| 75 | লেমুর | Lemur catta | জিরা | Cuminum cyminum |
| 76 | টারসিয়ার | Tarsius tarsier | মৌরি | Foeniculum vulgare |
| 77 | মোল | Talpa europaea | কালোজিরা | Nigella sativa |
| 78 | হেজহগ | Erinaceus europaeus | লবঙ্গ | Syzygium aromaticum |
| 79 | বাদুড়জাতীয় মোল | Chiroptera spp. | দারুচিনি | Cinnamomum verum |
| 80 | মাছ (সাধারণ) | Actinopterygii spp. | তেজপাতা | Laurus nobilis |
| 81 | মাছ (বিভিন্ন) | Osteichthyes spp. | সয়াবিন | Glycine max |
| 82 | সাপ | Naja naja | মসুর ডাল | Lens culinaris |
| 83 | কুমির | Crocodylus niloticus | ছোলা | Cicer arietinum |
| 84 | ব্যাঙ | Rana tigrina | মটরশুঁটি | Pisum sativum |
| 85 | টিকটিকি | Hemidactylus frenatus | চিনাবাদাম | Arachis hypogaea |
| 86 | মশা | Anopheles gambiae | কাজুবাদাম | Anacardium occidentale |
| 87 | মাছি | Musca domestica | কাঠবাদাম | Prunus dulcis |
| 88 | পিঁপড়া | Formica rufa | আখরোট | Juglans regia |
| 89 | তেলাপোকা | Periplaneta americana | নার্সিসাস | Narcissus poeticus |
| 90 | ঘাসফড়িং | Locusta migratoria | ক্যামেলিয়া | Camellia japonica |
| 91 | ঝিঁঝিঁ পোকা | Gryllus campestris | আগাভে | Agave americana |
| 92 | ড্রাগনফ্লাই | Anax junius | মস | Funaria hygrometrica |
| 93 | প্রজাপতি | Danaus plexippus | ফার্ন | Pteridium aquilinum |
| 94 | মৌমাছি | Apis mellifera | স্পিরুলিনা | Arthrospira platensis |
| 95 | মাকড়সা | Araneae spp. | ক্লোরেলা | Chlorella vulgaris |
| 96 | ঝিনুকজাতীয় | Mollusca spp. | ডায়াটম | Navicula spp. |
| 97 | ক্রাস্টেশিয়ান | Crustacea spp. | সায়ানোব্যাকটেরিয়া | Anabaena spp. |
| 98 | স্টারফিশজাতীয় | Echinodermata spp. | লাইকেন | Usnea spp. |
| 99 | মাশরুম | Agaricus bisporus | ইস্ট | Saccharomyces cerevisiae |
| 100 | ইয়াক | Bos grunniens | ইস্ট (ইস্ট ফাঙ্গাস) | Saccharomyces cerevisiae |
