কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি

    ভাষার বিবর্তন (পর্ব-০৭): মুদ্রণযন্ত্র ও প্রমিত ভাষা

    আপনি কি জানেন, “colour” না “color”—কোন বানানটি সঠিক? কেন ইংরেজি ব্যাকরণে ‘you are’-এর সঙ্গে ‘I is’ বসে না? কেন আধুনিক জার্মান ভাষায় একসময়ের খণ্ডিত আঞ্চলিক উপভাষাগুলো লুপ হয়ে গিয়ে একটি প্রমিত রূপ দাঁড়ালো? কেন উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যে আমরা একই বানানের একাধিক রূপ দেখতে পাই?

    মুদ্রণযন্ত্র ও প্রমিত ভাষা

    এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা পৌঁছাব পঞ্চদশ শতাব্দীর ইউরোপে, এক ব্যক্তির অসাধারণ আবিষ্কারের কাছে—জোহানেস গুটেনবার্গের মুদ্রণযন্ত্র। এই যন্ত্র কেবল বই ছাপার পদ্ধতি বদলে দেয়নি; এটি ভাষার মূলে গিয়ে আঘাত করেছিল। আজকের এই ব্লগ পোস্টে আমরা জানব কীভাবে মুদ্রণযন্ত্র ইউরোপ ও ভারতীয় উপমহাদেশের ভাষাগুলোর বানান ও ব্যাকরণকে প্রমিত করেছিল, ভাষাকে ‘স্থির’ করেছিল, এবং কীভাবে সেই প্রমিত রূপ আজও আমরা ব্যবহার করছি।

    মুদ্রণপূর্ব যুগের ভাষার বিশৃঙ্খলা

    মুদ্রণযন্ত্রের আগে হাতে লেখা পাণ্ডুলিপির যুগে ভাষার অবস্থা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রতিটি লেখক বা লিপিকার (scribe) নিজের আঞ্চলিক উচ্চারণ, পছন্দ ও অভ্যাস অনুযায়ী বানান ও ব্যাকরণ ব্যবহার করতেন। ‘Book’ শব্দটি কেউ লিখতেন ‘boc’, কেউ ‘bok’, আবার কেউ ‘booke’। ব্যাকরণের জটিল রূপভেদ ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। কারণ কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ ছিল না যা নির্ধারণ করে দেবে কোন বানানটি ‘সঠিক’। লাতিন ছিল পণ্ডিত ও ধর্মযাজকদের ভাষা, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাষাগুলো—যাকে আমরা ‘আঞ্চলিক ভাষা’ (vernacular) বলি—ছিল নানা উপভাষায় বিভক্ত

    ১৪৫০ সালের দিকে জার্মানির মেইন্ৎস শহরে গুটেনবার্গ যখন তার মুদ্রণযন্ত্র চালু করলেন, তখন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে এই যন্ত্র একদিন ভাষার মানচিত্রই বদলে দেবে

    ইংরেজি ভাষার প্রমিতিকরণ – ক্যাক্সটন থেকে অভিধান পর্যন্ত

    ১৪৭৬ সালে ইংল্যান্ডে ফিরে এসে উইলিয়াম ক্যাক্সটন প্রথম প্রিন্টিং প্রেস বসান। ক্যাক্সটন বুঝতে পেরেছিলেন যে ইংরেজি ভাষা তখন ভীষণভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ, এবং তিনি তাকে প্রমিত করতে চেয়েছিলেন। মুদ্রণযন্ত্র ইংরেজি ভাষায় প্রমিতিকরণের সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল বানান ও যতিচিহ্নের ক্ষেত্রে

    ইতিহাসবিদ সি. এম. মিলওয়ার্ড বলেছেন, মুদ্রণযন্ত্র ইংরেজি বানানের প্রমিতিকরণ এবং লন্ডনের উপভাষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ক্যাক্সটন লন্ডনের উপভাষায় তাঁর বই ছাপান, আর যেহেতু অধিকাংশ প্রকাশনা ঘর লন্ডনে ছিল, তাই সেই উপভাষাটি ক্রমে ‘স্ট্যান্ডার্ড’ ইংরেজিতে পরিণত হয়। লন্ডনের ভাষার প্রাধান্য এতটাই প্রবল হয় যে এটি ধীরে ধীরে অন্যসব আঞ্চলিক বৈচিত্র্যকে গৌণ করে দেয়। ১৬০৪ সালে প্রকাশিত হয় ইংরেজির প্রথম অভিধান “টেবিল অ্যালফাবেটিক্যাল”

    যাইহোক, বানান প্রমিতিকরণের কাজটি তাৎক্ষণিক ছিল না। পাণ্ডুলিপি ও মুদ্রণ পদ্ধতি বহুদিন ধরে সমান্তরালভাবে বিদ্যমান ছিল, এবং সপ্তদশ শতকের শেষভাগে গিয়ে প্রিন্টাররা বানান ও যতিচিহ্নের বিষয়ে একমত হতে শুরু করেন। ১৬৮৩-৮৪ সালে জোসেফ মক্সনের “মেকানিক এক্সারসাইজেস” ছিল প্রথম ‘প্রিন্টারের ব্যাকরণ’ যা বানান ও যতিচিহ্নের পরামর্শ দিয়েছিল।

    জার্মান ভাষার প্রমিতিকরণ – লুথার বাইবেলের ভূমিকা

    জার্মানির গল্পটি আরও নাটকীয়। গুটেনবার্গের আবিষ্কারের পর মুদ্রণশিল্প যখন জার্মানিতে ছড়িয়ে পড়ল, তখন জার্মান ভাষা ছিল নানা আঞ্চলিক উপভাষায় বিভক্ত। প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের নিজস্ব কথ্যভাষা ছিল।

    এমন সময়ে আবির্ভাব ঘটলেন মার্টিন লুথারের। ১৫২২ সালে তিনি নিউ টেস্টামেন্টের জার্মান অনুবাদ প্রকাশ করলেন, এবং ১৫৩৪ সালে সম্পূর্ণ বাইবেল। লুথার নিজের স্যাক্সন উপভাষাকে ভিত্তি করে একটি এমন ভাষা তৈরি করলেন যা সমস্ত জার্মান উপভাষার মানুষের কাছে বোধগম্য ছিল। এই অনুবাদ এত ব্যাপকভাবে ছাপা ও বিতরিত হলো যে ধীরে ধীরে পুরো জার্মানভাষী অঞ্চলে এটি আদর্শ ভাষায় পরিণত হলো

    লুথারের বাইবেলের প্রভাব এতটাই গভীর ছিল যে পণ্ডিতদের মতে, তিনি একাই জার্মান ভাষাকে প্রমিত করে দিয়েছিলেন। এটি ভাষার ইতিহাসে মুদ্রণযন্ত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী উদাহরণ।

    ফরাসি ভাষার প্রমিতিকরণ – যান্ত্রিক পুনরুৎপাদনের যুগ

    ষোড়শ শতাব্দীর ফ্রান্সে মুদ্রণ প্রযুক্তি একটি অসাধারণ পরিবর্তন এনেছিল। কেটি চেনোয়েথ-এর গবেষণা অনুযায়ী, এই সময়েই ফরাসি ভাষা একটি গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যায়। মুদ্রাকর ও লেখকরা নিজেদের মাতৃভাষাকে ‘যান্ত্রিকভাবে পুনরুৎপাদনযোগ্য’ হিসেবে কল্পনা করতে শুরু করেছিলেন। আধুনিক ফরাসি ভাষা যেমন ষোড়শ শতাব্দীর প্রিন্টিং প্রেস থেকে বেরিয়ে আসা কাগজের বই, তেমনি এটি সেই যান্ত্রিক পুনরুৎপাদনের যুগের একটি পণ্য। ফ্রান্সে প্রিন্টিং হাউসগুলো বানানের একরূপকরণে (uniformization) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

    বাংলা ভাষার প্রমিতিকরণ – শ্রীরামপুর মিশন ও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ

    ভারতবর্ষেও মুদ্রণযন্ত্র ভাষার প্রমিতিকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। পর্তুগিজ মিশনারিরা ১৫৫৬ সালে গোয়ায় প্রথম প্রিন্টিং প্রেস স্থাপন করলেও বাংলা অক্ষরে মুদ্রণের ইতিহাস শুরু হয় অষ্টাদশ শতাব্দীতে। চার্লস উইলকিন্স সর্বপ্রথম বাংলা অক্ষর টাইপ ডিজাইন করেন, এবং ১৭৭৮ সালে নাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেডের “A Grammar of the Bengal Language” ছাপা হয়

    উনিশ শতকে এসে শ্রীরামপুর মিশনারি প্রেস ও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সহযোগিতায় বাংলা ভাষার গঠন ও শব্দভাণ্ডার প্রমিত হতে শুরু করে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো পাঠ্যপুস্তক তৈরি করে এবং অনুবাদের মাধ্যমে বাংলাকে একটি প্রমিত রূপ দিতে সচেষ্ট হয়। তবে এই প্রমিতিকরণে উচ্চবর্গীয় নাগরিকদের প্রভাব ছিল প্রবল, ফলে আঞ্চলিক ও জনমানুষের ভাষা প্রায়ই বাদ পড়ে গিয়েছিল। তথাপি মুদ্রণ মাধ্যম বাংলা ভাষার ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। উনিশ শতকে কলকাতার ‘বটতলা’ অঞ্চলে সস্তায় ছাপা বই বাংলা ভাষাকে আরও ব্যাপকভাবে প্রমিত করতে ভূমিকা রেখেছিল।

    গুটেনবার্গের ধাতব অক্ষরগুলো কাগজে ফুটিয়ে তোলা প্রথম শব্দগুলোর প্রভাব আমরা আজও অনুভব করি। প্রতিবার যখন আমরা একটি নির্দিষ্ট বানানে লিখি, একটি প্রমিত ব্যাকরণ মেনে চলি, বা একটি অভিধানের পাতা ওল্টাই, আমরা সেই ইতিহাসেরই উত্তরাধিকার বহন করি। প্রিন্টিং প্রেস ভাষাকে ‘স্থির’ করে দিয়েছিল। আজকের ডিজিটাল যুগে হয়তো ভাষা আবারও দ্রুত বদলাচ্ছে, কিন্তু প্রমিত রূপের ধারণাটি গুটেনবার্গের দেওয়া এক অমোঘ উপহার।

    আরও পড়ুন -
    ভাষার বিবর্তন (পর্ব-০৬): ভাষায় ধর্ম ও ব্যবসার প্রভাব
    ভাষার বিবর্তন (পর্ব-০৫): বাংলা ভাষার জন্ম
    ভাষার বিবর্তন (পর্ব-০৪): ধ্রুপদী ভাষার স্বর্ণযুগ
    ভাষার বিবর্তন (পর্ব-০৩): লিখন পদ্ধতি
    ভাষার বিবর্তন (পর্ব-০২): প্রস্তর যুগের প্রতিধ্বনি
    ভাষার বিবর্তন (পর্ব-০১): ইশারা থেকে শব্দ


    একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

    নবীনতর পূর্বতন

    نموذج الاتصال