কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি

    সবুজ পৃথিবী (পর্ব-৪): বিচিত্র উদ্ভিদ জগৎ

    আমাদের পরিচিত উদ্ভিদ জগৎ মানেই যেন সবুজ পাতা, রঙিন ফুল আর সালোকসংশ্লেষণের চেনা ছন্দ। কিন্তু প্রকৃতির খেয়ালী সাজঘরে এমন কিছু উদ্ভিদ আছে, যাদের দেখে মনে হয় তারা যেন ভিন্ন কোনো গ্রহ থেকে এসেছে। এরা শিকার ধরে, পাথরের ছদ্মবেশ নেয়, আবার কেউ ফোটে শতবর্ষে একবার, ফুলের গন্ধে ছড়ায় পচা মাংসের দুর্গন্ধ! এদের জীবনচক্র, টিকে থাকার কৌশল এবং বিবর্তনের গল্প শুধু বিস্ময়করই নয়, বরং বিজ্ঞানীদের কাছেও চিরন্তন এক রহস্য। আসুন, আজ আমরা ঘুরে আসি সেই বিচিত্র সব উদ্ভিদের রাজ্যে।

    প্রকৃতির নীরব ঘাতক: মাংসাশী উদ্ভিদ

    সাধারণত উদ্ভিদ মাটি থেকে পুষ্টি নেয়, কিন্তু যখন মাটি অনুর্বর হয়ে পড়ে, তখন কিছু উদ্ভিদ ভিন্ন পথ বেছে নেয়। বিবর্তনের ধারায় তারা হয়ে ওঠে মাংসাশী, যারা কীটপতঙ্গ ও ছোট প্রাণী শিকার করে নিজেদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি সংগ্রহ করে।

    ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপ: গোনায় ওস্তাদ শিকারী

    উত্তর আমেরিকার জলাভূমিতে জন্মানো ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপ (Dionaea muscipula) সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত মাংসাশী উদ্ভিদ। এর পাতা দুটি কব্জার মতো খোলা থাকে, যার কিনারায় থাকে তীক্ষ্ণ কাঁটা। পাতার ভেতরে থাকে অতি সংবেদনশীল স্পর্শকাতর লোম। বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি আবিষ্কার করেছেন, এই উদ্ভিদ আসলে গুনতে পারে! একটি পোকা যখন প্রথমবার লোমে স্পর্শ করে, ফ্লাইট্র্যাপ তখন একটি সতর্ক সংকেত জারি করে, কিন্তু পাতা বন্ধ করে না। এটি একটি "মিথ্যা অ্যালার্ম" হতে পারে ভেবে অপেক্ষা করে। কিন্তু বিশ সেকেন্ডের মধ্যে দ্বিতীয়বার স্পর্শ করলেই তড়িৎ গতিতে (এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে) পাতা বন্ধ হয়ে পোকাকে ফাঁদে ফেলে। এমনকি পোকা ফাঁদে পড়ার পর কতবার ছটফট করছে, তা গুনে সেই অনুযায়ী হজমকারী রস নিঃসরণ করে। বিবর্তনের এই বিস্ময়কর অঙ্ক শেখার পেছনে রয়েছে প্রকৃতির নিখুঁত হিসাব।

    কলসী গাছ: ফাঁদ পেতে শিকার ধরার শিল্পী

    বোর্নিওর গভীর অরণ্যে জন্মানো কলসী গাছ (Nepenthes rajah) এর পাতা উল্টে এক বিশাল কলসীর আকার ধারণ করে, যার ভেতরে থাকে তরল হজমী রস। এই কলসীর আকার এতই বড় যে, শুধু পোকামাকড় নয়, ইঁদুরের মতো ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীও ফাঁদে পড়ে যায়! N. rajah-এর কলসী ৩৫ সেমি পর্যন্ত উঁচু এবং ২.৫ লিটার পর্যন্ত পানি ধারণ করতে পারে। তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই উদ্ভিদের সঙ্গে টুপাইয়া (এক ধরনের গেছো ইঁদুর) প্রাণীটির একটি "মলমূত্রের চুক্তি" আছে। টুপাইয়া এই কলসীর ঢাকনায় বসে মিষ্টি রস খায় এবং বিনিময়ে কলসীর ভেতরেই মলত্যাগ করে, যা গাছের জন্য নাইট্রোজেনের একটি মূল্যবান উৎস হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, সানডিউ (Drosera) নামের আরেকটি উদ্ভিদ পাতায় বিন্দু বিন্দু আঠালো শিশিরের মতো রস নিঃসরণ করে শিকারকে ফাঁদে ফেলে।

    সবুজের ছদ্মবেশী অপহরণকারী: পরজীবী উদ্ভিদ

    সব উদ্ভিদ নিজের খাবার নিজে বানায় না। কিছু উদ্ভিদ বিবর্তনের পথে সম্পূর্ণরূপে সালোকসংশ্লেষণের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে এবং অন্য গাছের শিকড় থেকে পুষ্টি চুরি করে বেঁচে থাকে।

    রাফলেসিয়া আর্নল্ডি: বিশ্বের বৃহত্তম পচা ফুল

    ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা ও বোর্নিওর ঘন বর্ষাবনে জন্মানো রাফলেসিয়া আর্নল্ডি (Rafflesia arnoldii) হচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম একক ফুল। এর কোনো পাতা, কাণ্ড কিংবা মূল নেই। এটি সম্পূর্ণরূপে পরজীবী এবং টেট্রাস্টিগমা (Tetrastigma) নামক এক ধরনের লতার শিকড়ের ভেতরে সম্পূর্ণভাবে লুকিয়ে থাকে, যতক্ষণ না এর ফুল ফোটার সময় হয়। এই ফুলের ব্যাস প্রায় এক মিটার (৩ ফুট) এবং ওজন ১১ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। এই বিশাল ফুলটি পরাগায়নের জন্য পচা মাংসের তীব্র গন্ধ ছড়ায়, যা বনের মাছি ও গোবরে পোকাদের আকর্ষণ করে।

    হাইডনোরা আফ্রিকানা: ভিনগ্রহের আগন্তুক

    আফ্রিকার মরুভূমিতে বসবাসকারী হাইডনোরা আফ্রিকানা (Hydnora africana) দেখে একে উদ্ভিদ বলে মনে হয় না। দেখতে অনেকটা ভিনগ্রহের প্রাণীর মুখের মতো এই উদ্ভিদটি প্রায় সম্পূর্ণটাই মাটির নিচে লুকিয়ে থাকে। এটি কোনো ভিনগ্রহের প্রাণী নয়; এটি হলো হাইডনোরা আফ্রিকানা ফুল। মাটির নিচে থাকা ইউফরবিয়া গাছের শিকড় থেকে পুষ্টি চুরি করে বাঁচে। ফুল ফোটার সময় শুধু মাংসল, রক্তলাল রঙের ফুলটিই মাটির ওপরে জেগে ওঠে, যা থেকে ছড়ায় পচা মাংসের তীব্র গন্ধ। এর ভেতরের গঠন এতটাই অদ্ভুত যে আবিষ্কারের পর বিজ্ঞানীরা একে ভুল করে ছত্রাক বলে ভেবেছিলেন।

    মরুভূমির কৌশলী যোদ্ধা: প্রতিকূলতায় টিকে থাকার গল্প

    যেখানে পানির অস্তিত্ব নেই বললেই চলে, সেখানেও কিছু উদ্ভিদ অভিনব সব কৌশলে শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে থাকে।

    ওয়েলউইটসচিয়া মিরাবিলিস: দুই পাতার অনন্ত জীবন

    নামিব মরুভূমির বুকে বেড়ে ওঠা ওয়েলউইটসচিয়া মিরাবিলিস (Welwitschia mirabilis) দেখতে এলোমেলো একগুচ্ছ শুকনো পাতার স্তূপ মনে হতে পারে। অদ্ভুত এই উদ্ভিদটি একটি জীবন্ত জীবাশ্ম, যা ২০০ মিলিয়ন বছর ধরে বিবর্তনের কোনো পরিবর্তন ছাড়াই টিকে আছে। কিন্তু এর বিশেষত্ব হলো, এই উদ্ভিদের সারা জীবনে মাত্র দুটি পাতা গজায়। এই দুটি পাতা কখনো ঝরে যায় না; সারাজীবন ধরে বাড়তেই থাকে, তবে প্রচণ্ড রোদে এগুলো ছিড়ে-খুঁড়ে এলোমেলো হয়ে যায়। এই গাছের জীবনকাল ১,০০০ থেকে ২,০০০ বছর পর্যন্ত। মরুভূমির কুয়াশা থেকে পানি শুষে নেওয়ার অনন্য এক কৌশল এর দীর্ঘায়ুর রহস্য।

    লিথপস: নিখুঁত পাথর সেজে বেঁচে থাকা

    দক্ষিণ আফ্রিকার মরুভূমিতে পাথর আর নুড়ির মধ্যে আপনি হয়তো পা ফেলবেন, কিন্তু খেয়াল করবেন না যে আপনি আসলে একটি উদ্ভিদ মাড়িয়ে যাচ্ছেন! লিথপস (Lithops) বা "জীবন্ত পাথর" এতটাই নিখুঁতভাবে নিজেকে পাথরের মতো ছদ্মবেশী করে যে, পশুদের চোখে ধুলো দিয়ে বেঁচে থাকে। এর পাতাগুলো গোলাকার এবং রং আশেপাশের নুড়িপাথরের মতো ধূসর বা বাদামী, তাই এদের "জীবন্ত পাথর" (Living Stones) বলা হয়। আরেকটি মজার উদ্ভিদ হলো ইউফোরবিয়া ওবেসা (Euphorbia obesa), যা দেখতে একেবারে হুবহু বেসবলের মতো। কিন্তু এমন অদ্ভুত চেহারাই এদের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে; অতিরিক্ত অবৈধ সংগ্রহ ও চোরাচালানের কারণে আজ এরা বন্য পরিবেশে বিপন্ন।

    বাওবাব ও ড্রাগন ব্লাড: রূপকথার দৈত্যাকার বৃক্ষ

    আফ্রিকার সাভানায় দেখা যায় উল্টো হয়ে বেড়ে ওঠা বাওবাব গাছ, যার কাণ্ড এতই মোটা যে তা প্রায় ৯ মিটার (৩০ ফুট) পর্যন্ত চওড়া হতে পারে। বর্ষাকালে এই কাণ্ড হাজার হাজার লিটার পানি জমা করে রাখে, যা শুকনো মৌসুমে গাছের প্রাণ বাঁচায়। অন্যদিকে, ইয়েমেনের সোকোত্রা দ্বীপে জন্মানো ড্রাগন ব্লাড ট্রি (Dracaena cinnabari) দেখতে বিশালাকার ছাতার মতো। গাছটির কাণ্ড কাটলে গাঢ় লাল রঙের রস বের হয়, যা প্রাচীনকালে মানুষ ড্রাগনের রক্ত ভেবে ভুল করত। এই রস আজও ওষুধ ও প্রসাধনী তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই গাছ শুধু পৃথিবীর একটি মাত্র দ্বীপেই পাওয়া যায়।

    নৃত্যরতা পাতার দল: গতিময় উদ্ভিদ

    উদ্ভিদ মানেই স্থির- এ ধারণা পাল্টে দিয়েছে কিছু বিশেষ প্রজাতি। এরা প্রয়োজনে পলক ফেলার চেয়েও দ্রুত নড়াচড়া করতে পারে।

    লজ্জাবতী লতা: ছোঁয়ায় মুহূর্তেই মুদ্রাবদ্ধ

    সবার পরিচিত লজ্জাবতী লতা (Mimosa pudica) স্পর্শ পেলেই তার কচি পাতাগুলো গুটিয়ে ফেলে। এই আকস্মিক নড়াচড়ার পেছনে রয়েছে দ্রুত কোষীয় পানির চাপের (টার্গর প্রেশার) পরিবর্তন। পাতা স্পর্শ করার সাথে সাথেই একটি বৈদ্যুতিক সংকেত (যা প্রাণীর স্নায়ুতন্ত্রের মতো কাজ করে) পাতার গোড়ার বিশেষ কোষে পৌঁছে এবং কোষ থেকে পানি বের করে দেয়, ফলে পাতা নেতিয়ে পড়ে। এটি মূলত তৃণভোজী পোকামাকড়কে ফাঁকি দিয়ে আত্মরক্ষার এক অভিনব কৌশল।

    নাচনেওয়ালা গাছ: দারউইনের বিভ্রান্তি

    ভারত ও বাংলাদেশের মতো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এশিয়ায় জন্মানো টেলিগ্রাফ উদ্ভিদ (Codariocalyx motorius বা Desmodium gyrans) বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইনকেও বিস্মিত করেছিল। এই গাছের ছোট ছোট পাতাগুলো কোনো রকম বাহ্যিক স্পর্শ ছাড়াই ক্রমাগত নাচতে থাকে, অনেকটা টেলিগ্রাফের সঙ্কেতের মতো উপরে-নিচে দুলতে থাকে। এমনকি উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দ বা গানের তালেও এরা নাচতে পারে! কেন এরা এমন করে, তা এখনও পুরোপুরি রহস্য, তবে ধারণা করা হয় এটি সূর্যের আলো শোষণের সর্বোচ্চ কৌশল।

    আরও কিছু চরম বিস্ময়

    টাইটান অ্যারাম: দৈত্যাকার পচা ফুল

    সুমাত্রার অরণ্যে ফোটা টাইটান অ্যারাম (Amorphophallus titanum) বা "মৃতদেহ ফুল" এর উচ্চতা প্রায় ১০ ফুট (৩ মিটার) পর্যন্ত হতে পারে!। এর ভেতর থেকে গরম গরম বাতাসের সাথে নির্গত হয় পঁচা মাংসের তীব্র দুর্গন্ধ, যা মাইলখানেক দূর থেকে আকর্ষণ করে পরাগায়নকারী মাছি ও পোকাদের।

    ভিক্টোরিয়া অ্যামাজনিকা: পানির বুকে প্রকাণ্ড থালা

    আমাজন নদীর অববাহিকায় জন্মানো এই দৈত্যাকার শাপলা পাতার ব্যাস ৩ মিটার (প্রায় ১০ ফুট) পর্যন্ত হতে পারে। পাতাগুলো এতটাই শক্ত যে, নিচে বিশেষ এক ধরনের কাঁটাওয়ালা কাঠামো থাকায় একটি ছোট শিশু অনায়াসে এর ওপর ভেসে থাকতে পারে।

    রিসারেকশন প্ল্যান্ট: মৃত্যুঞ্জয়ী পুনরুত্থান

    মেক্সিকোর মরুভূমিতে জন্মানো সেলাজিনেলা লেপিডোফাইলা (Selaginella lepidophylla) শতকরা ৯৫ ভাগ পানি হারিয়ে সম্পূর্ণ শুকিয়ে মরার মতো হয়ে যায়। কিন্তু বৃষ্টির একটি ফোঁটা পড়লেই এটি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সবুজ হয়ে আবার জেগে ওঠে এবং সালোকসংশ্লেষণ শুরু করে দেয়। একে সত্যিকারের "পুনরুত্থান উদ্ভিদ" বলা হয়।

    আন্দিজের রানি: শতবর্ষে এক ফুল

    দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পর্বতমালার ৪,০০০ মিটার উচ্চতায় জন্মানো পুয়া রাইমন্ডি (Puya raimondii) ফুল ফোটার জন্য অপেক্ষা করে ৮০ থেকে ১৫০ বছর। যখন ফোটে, তখন এর উচ্চতা গিয়ে দাঁড়ায় ১৫ মিটার (প্রায় ৫০ ফুট) যেখানে একসাথে ১০,০০০-এরও বেশি ফুল ফোটে। এবং জীবনচক্রের শেষে, বিপুল পরিমাণ বীজ ছড়িয়ে দিয়ে এটি মারা যায়।

    বিবর্তন কোনো সরলরৈখিক পথে চলে না। কখনো সে পরমাণুর অঙ্ক শেখায় ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপকে, কখনো পাথরের প্রলেপ এনে দেয় লিথপসের গায়ে, তো কখনো হাজার বছরের ধৈর্য এনে দেয় ওয়েলউইটসচিয়ার বুকে। এই বিচিত্র উদ্ভিদগুলো কেবল আমাদের বিস্মিত করতেই নয়, বরং এরা প্রকৃতির অভিযোজন ক্ষমতার জীবন্ত প্রমাণ। পৃথিবীর বুকে টিকে থাকার লড়াইয়ে সৃষ্টিশীলতার কোনো শেষ নেই।

    আরও পড়ুন - 
    সবুজ পৃথিবী (পর্ব-৩): পরিবেশের রক্ষাকবচ
    সবুজ পৃথিবী (পর্ব-০২): সূর্যালোক থেকে খাদ্য
    সবুজ পৃথিবী (পর্ব-০১): প্রাণের স্পন্দন

    একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

    নবীনতর পূর্বতন

    نموذج الاتصال