প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার সবচেয়ে বিস্ময়কর ও রহস্যময় দিকগুলোর একটি হলো তাদের মমি ও পরকাল-সংক্রান্ত বিশ্বাস। পিরামিডের বিশালতা, সমাধিগুলোর জটিল গঠন, আর মৃতদেহ সংরক্ষণের অদ্ভুত কৌশল—সবকিছুর পেছনেই ছিল এক গভীর ধর্মীয় ও দার্শনিক চিন্তাধারা। মিশরীয়রা বিশ্বাস করতেন, মৃত্যু কোনো শেষ নয়, বরং তা এক নতুন যাত্রার সূচনা। এই যাত্রা সফল করতে প্রয়োজন ছিল একটি অক্ষত দেহ, প্রয়োজনীয় সামগ্রী এবং পথপ্রদর্শক জাদুমন্ত্র। আসুন, আমরা ডুব দিই প্রাচীন মিশরের সেই রহস্যময় পরকাল-জগতে, যেখানে জীবন ও মৃত্যু এক অদ্ভুত সূত্রে গাঁথা ছিল।
মিশরীয়দের পরকাল-বিশ্বাস: এক স্বপ্নময় জীবনের প্রতিশ্রুতি
প্রাচীন মিশরীয়দের কাছে মৃত্যু ছিল কেবল একটি অবস্থান্তর—এক জীবন থেকে আরেক জীবনে পাড়ি দেওয়ার সেতু। তাদের ধর্মীয় আদর্শে পরকাল-সংক্রান্ত তিনটি মূল ধারণা প্রচলিত ছিল: প্রেতলোক (দুয়াত), চিরন্তন জীবন এবং আত্মার পুনর্জন্মে বিশ্বাস।
মিশরীয়রা বিশ্বাস করতেন যে, মৃত্যুর পর আত্মাকে পাড়ি দিতে হয় এক রহস্যময় জগতে, যার নাম দুয়াত (Duat)। এই দুয়াত ছিল বিপদসংকুল এক রাজ্য, যেখানে আত্মাকে নানা ধরনের দানব, ফাঁদ ও প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হতো। কিন্তু যারা সফলভাবে এই পথ পাড়ি দিতে পারতেন, তারা পৌঁছে যেতেন এক স্বর্গীয় স্থানে, যার নাম ছিল "আরু ক্ষেত" (Field of Reeds) বা "নলখাগড়ার ক্ষেত্র"।
আরু ক্ষেত ছিল পৃথিবীর জীবনের এক নিখুঁত প্রতিরূপ—এক অনন্ত স্বর্গ, যেখানে মৃত ব্যক্তি তার প্রিয়জনদের সাথে মিলিত হতে পারতেন, নীল নদের তীরে চাষাবাদ করতে পারতেন, আর উপভোগ করতে পারতেন অনাবিল আনন্দ। মিশরীয়দের কাছে এই পরকালীন জীবন এতটাই বাস্তব ও কাঙ্ক্ষিত ছিল যে, তারা পুরো জীবন কাটিয়ে দিতেন এর প্রস্তুতি নিতে।
আত্মার পাঁচটি অংশ: এক জটিল দার্শনিক ধারণা
মিশরীয়দের পরকাল-বিশ্বাসের গভীরে ছিল আত্মা সম্পর্কে এক অত্যন্ত জটিল ও সূক্ষ্ম ধারণা। তাদের মতে, প্রতিটি মানুষের অস্তিত্ব পাঁচটি ভিন্ন উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত, যেগুলো মৃত্যুর পর বিভিন্ন গতিপথে চলে যেত। এই পাঁচটি উপাদান হলো:
| উপাদান | নাম | ভূমিকা ও বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|
| জীবনীশক্তি | কা (Ka) | দেহের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত অদৃশ্য শক্তি, যা খাদ্য ও পানীয়ের ওপর নির্ভরশীল |
| আত্মা | বা (Ba) | মানুষের ব্যক্তিত্বের সারাংশ, মৃত্যুর পর কবর ছেড়ে স্বাধীনভাবে বিচরণ করতে পারে |
| ছায়া | শুত (Sheut) | ব্যক্তির ছায়া, যার অস্তিত্ব ছিল স্বতন্ত্র |
| নাম | রেন (Ren) | ব্যক্তির নাম, যা সংরক্ষণ করা না হলে আত্মা চিরতরে বিলীন হয়ে যেত |
| হৃদয় | ইব (Ib) | স্মৃতি, চিন্তা ও নৈতিকতার কেন্দ্র, পরকালের বিচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত |
এই পাঁচটি উপাদানের মধ্যে কা ও বা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কা ছিল ব্যক্তির জীবনীশক্তি, যা দেহের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত। মৃত্যুর পর কা দেহ ত্যাগ করলেও, তাকে নিয়মিত খাদ্য ও পানীয়ের নৈবেদ্য দিতে হতো, নইলে সে বিলীন হয়ে যেত। আর বা ছিল মানুষের ব্যক্তিত্বের প্রতীক—একটি মানবমুখী পাখির রূপে কল্পিত, যা দিনের বেলায় কবর ছেড়ে বাইরে উড়ে বেড়াতে পারত, কিন্তু রাতে আবার দেহে ফিরে আসতে হতো।
এই কারণেই দেহ সংরক্ষণ এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অক্ষত দেহ ছাড়া কা ও বা-র পক্ষে টিকে থাকা অসম্ভব ছিল। তাই মিশরীয়রা বিশ্বাস করতেন, দেহ যদি পচে নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে আত্মাও ধ্বংস হয়ে যাবে এবং পরকালের সুখ থেকে বঞ্চিত হবে।
ওসিরিসের পুরাণ: প্রথম মমি ও পুনরুত্থানের গল্প
মিশরীয়দের মমিকরণ ও পরকাল-বিশ্বাসের মূলে রয়েছে দেবতা ওসিরিস (Osiris)-এর এক মর্মস্পর্শী পৌরাণিক কাহিনি। ওসিরিস ছিলেন মিশরের প্রথম রাজা, যিনি মানুষকে সভ্যতা, কৃষি ও আইন-শৃঙ্খলা শিক্ষা দিয়েছিলেন। কিন্তু তার ঈর্ষান্বিত ভাই সেত তাকে হত্যা করে দেহ টুকরো টুকরো করে সমগ্র মিশরে ছড়িয়ে দেয়।
ওসিরিসের স্ত্রী ও বোন আইসিস (Isis) ছিলেন জাদু ও প্রজ্ঞার দেবী। তিনি স্বামীর খণ্ডিত দেহ খুঁজে বের করেন এবং জাদুর সাহায্যে সেগুলো পুনরায় সংযোজিত করেন। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, আইসিসই সর্বপ্রথম মমিকরণের কৌশল প্রয়োগ করেন—তিনি ওসিরিসের দেহকে কাপড়ে মুড়িয়ে সংরক্ষণ করেন, যাতে তার আত্মা পরকালে যেতে পারে।
এই কাহিনির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পুনরুত্থান। আইসিসের জাদুতে ওসিরিস পুনর্জীবন লাভ করেন এবং পরকালের রাজা ও মৃতদের বিচারক হিসেবে অধিষ্ঠিত হন। ওসিরিসের এই মৃত্যু ও পুনরুত্থানের গল্প মিশরীয়দের মধ্যে এক গভীর বিশ্বাস জন্ম দেয়—যদি সঠিক রীতিনীতি পালন করা হয়, তাহলে তারাও ওসিরিসের মতো মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত হতে পারবেন এবং অনন্ত সুখময় পরকাল লাভ করতে পারবেন।
প্রকৃতির চক্রেও মিশরীয়রা ওসিরিসের গল্প খুঁজে পেতেন। নীল নদের বন্যা, ফসলের বৃদ্ধি, আর মরুভূমির বুকে সবুজের আবির্ভাব—সবকিছুই তাদের কাছে ছিল ওসিরিসের মৃত্যু ও পুনর্জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। এভাবেই কৃষিভিত্তিক সমাজের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল ওসিরিসের পুরাণ ও পরকাল-বিশ্বাস।
মমিকরণ: অক্ষয় দেহের নিখুঁত বিজ্ঞান
মিশরীয়দের পরকাল-বিশ্বাসের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রকাশ ছিল মমিকরণ। এটি ছিল এক জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া, যাকে তারা বলত "গোপনীয়তার বিজ্ঞান" (Science of Secrecy)। প্রায় ৭০ দিন ধরে চলা এই প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে ছিল ধর্মীয় আচার, বৈজ্ঞানিক কৌশল এবং নিখুঁত শৈল্পিকতার সমন্বয়।
ধাপ ১: দেহ প্রস্তুতি ও অঙ্গ অপসারণ
মমিকরণের প্রথম ধাপ ছিল মৃতদেহকে নীল নদের পানিতে ধুয়ে পবিত্র করা। এরপর শুরু হতো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ—অভ্যন্তরীণ অঙ্গ অপসারণ। মিশরীয়রা জানতেন যে, নরম অঙ্গগুলোই প্রথম পচে যায় এবং দেহ ধ্বংস করে। তাই তারা বিশেষজ্ঞ শল্যচিকিৎসকদের মাধ্যমে বাম পাশে একটি ছোট ছেদ করে ফুসফুস, যকৃৎ, পাকস্থলী ও অন্ত্র বের করে নিতেন।
তবে তারা একটি অঙ্গ রেখে দিতেন—হৃদয়। মিশরীয়দের বিশ্বাস ছিল, হৃদয়ই মানুষের স্মৃতি, চিন্তা ও নৈতিকতার কেন্দ্র। পরকালের বিচারে এই হৃদয়েরই ওজন করা হবে, তাই এটি দেহের ভেতরেই সংরক্ষণ করা হতো। অন্যদিকে মস্তিষ্ক ছিল তাদের কাছে মূল্যহীন—তারা নাকের ছিদ্র দিয়ে বিশেষ যন্ত্র ঢুকিয়ে মস্তিষ্ক গলিয়ে বের করে ফেলে দিতেন।
তবে এই বের করা অঙ্গগুলো ফেলে দেওয়া হতো না। সেগুলো বিশেষ পাত্রে সংরক্ষণ করা হতো, যেগুলোকে বলা হয় ক্যানোপিক জার। এই পাত্রগুলোর ঢাকনায় খোদাই করা থাকত চার দেবতার মুখ—হোরাসের চার পুত্র—যারা পরকালে মৃত ব্যক্তির অঙ্গগুলোর রক্ষক হিসেবে কাজ করতেন।
ধাপ ২: লবণে শোধন ও নিখুঁত সংরক্ষণ
অঙ্গ অপসারণের পর দেহকে ভেতর-বাইরে ভালোভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করা হতো। তারপর দেহের ভেতরে ও বাইরে প্রচুর পরিমাণে নেট্রোন লবণ (Natron) ভরে দেওয়া হতো। নেট্রোন হলো সোডিয়াম কার্বনেট ও সোডিয়াম বাইকার্বনেটের এক প্রাকৃতিক মিশ্রণ, যা মিশরের শুষ্ক হ্রদ থেকে সংগ্রহ করা হতো। এই লবণের অসাধারণ জলশোষণ ক্ষমতা ছিল—এটি দেহ থেকে সমস্ত আর্দ্রতা শুষে নিত, ফলে ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাক জন্মাতে পারত না।
এভাবে প্রায় ৪০ দিন ধরে দেহকে নেট্রোনে চাপা দিয়ে রাখা হতো। এই সময়ের মধ্যে দেহের প্রায় ৭৫% ওজন কমে যেত এবং ত্বক কালচে বাদামী রঙ ধারণ করত। শুকিয়ে যাওয়ার পর দেহ হয়ে যেত অত্যন্ত হালকা এবং টেকসই, যা হাজার হাজার বছর ধরে অক্ষত থাকতে সক্ষম।
ধাপ ৩: তেল-মোম ও লিনেন কাপড়ে মোড়ানো
শুকানোর পর দেহে বিভিন্ন ধরনের সুগন্ধি তেল, মোম ও রজন মাখানো হতো। এগুলো শুধু দেহকে নমনীয় ও জীবন্ত দেখাতেই সাহায্য করত না, বরং প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষণের কাজও করত। এরপর শুরু হতো চূড়ান্ত ও সবচেয়ে শ্রমসাধ্য কাজ—লিনেন কাপড়ে মোড়ানো।
প্রথমে প্রতিটি আঙুল আলাদাভাবে মোড়ানো হতো, তারপর হাত, পা, বাহু—এক-এক করে সমগ্র দেহ। মোড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে লুকিয়ে রাখা হতো তাবিজ, রত্ন ও ছোট ছোট মূর্তি, যা পরকালে মৃত ব্যক্তিকে সুরক্ষা দেবে বলে বিশ্বাস করা হতো। সবশেষে পুরো দেহকে লিনেনের কয়েকটি স্তরে জড়িয়ে শেষকৃত্যের মুখোশ পরানো হতো, যা ছিল মৃত ব্যক্তির আদর্শিত প্রতিকৃতি। রাজা-বাদশাহদের ক্ষেত্রে এই মুখোশ তৈরি হতো খাঁটি সোনা দিয়ে—যেমন তুতেনখামুনের বিখ্যাত সোনার মুখোশ।
মৃতের বই: পরকালের পথনির্দেশিকা
মমিকরণ শেষে মৃতদেহকে সমাধিতে রাখা হতো, কিন্তু তার সাথে দেওয়া হতো এক অমূল্য সম্পদ—"মৃতের বই" (Book of the Dead)। এটি কোনো একক গ্রন্থ নয়, বরং প্যাপিরাসে লেখা এক সংগ্রহ, যেখানে থাকত প্রায় ১৯০টি জাদুমন্ত্র ও পথনির্দেশনা।
মৃতের বইয়ের মন্ত্রগুলো ছিল মৃত আত্মার জন্য এক ধরনের "টিকে থাকার গাইড"। এতে বলা থাকত:
দুয়াতের ভয়ঙ্কর দানবদের কীভাবে শান্ত করা যায়
কোন দেবতার সামনে কী বলতে হবে
বিপজ্জনক ফাঁদগুলো কীভাবে এড়ানো যায়
পরকালের পথে কী কী বাধা আসতে পারে
মিশরীয়রা বিশ্বাস করতেন, এই মন্ত্রগুলো না জানলে আত্মা দুয়াতের বিপদসংকুল পথ পাড়ি দিতে ব্যর্থ হবে এবং চিরতরে হারিয়ে যাবে। তাই মৃতের বইয়ের কিছু অংশ সমাধির দেয়ালে খোদাই করা হতো, কিছু অংশ রাখা হতো প্যাপিরাসে লিখে মমির সাথে।
মৃতের বইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি ছিল ১২৫ নং মন্ত্র, যেখানে "হার্ট উইইং" বা হৃদয়ের ওজন পরিমাপের দৃশ্য বর্ণিত হয়েছে। এই অধ্যায়টিই নির্ধারণ করত মৃত ব্যক্তি পরকালে প্রবেশ করতে পারবেন কি না।
হৃদয়ের ওজন পরিমাপ: চূড়ান্ত বিচারের দৃশ্য
মিশরীয় পরকাল-বিশ্বাসের সবচেয়ে নাটকীয় ও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিল হৃদয়ের ওজন পরিমাপের বিচার। এই দৃশ্যে মৃত ব্যক্তিকে উপস্থিত হতে হতো দেবতা ওসিরিসের সিংহাসনের সামনে, যেখানে বসে থাকতেন বিচারক হিসেবে স্বয়ং ওসিরিস এবং তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন ৪২ জন দেবতা, যারা ছিলেন মিশরের ৪২টি প্রদেশের প্রতিনিধি ও নৈতিকতার রক্ষক।
প্রথমে মৃত ব্যক্তিকে একটি "নেগেটিভ কনফেশন" বা "অস্বীকারোক্তি" পাঠ করতে হতো। এখানে তাকে ৪২টি পাপের কথা একে একে উচ্চারণ করে বলতে হতো যে, তিনি এগুলোর কোনোটিই করেননি—যেমন: "আমি চুরি করিনি", "আমি মিথ্যা বলিনি", "আমি কাউকে হত্যা করিনি", "আমি নীল নদের পানি দূষিত করিনি" ইত্যাদি।
এরপর শুরু হতো আসল পরীক্ষা। দেবতা আনুবিস (Anubis)—যার ছিল শৃগালের মাথা—একটি তুলাযন্ত্রের এক পাল্লায় রাখতেন মৃত ব্যক্তির হৃদয়, আর অন্য পাল্লায় রাখতেন দেবী মা'আত-এর পালক। মা'আত ছিলেন সত্য, ন্যায় ও মহাজাগতিক শৃঙ্খলার দেবী, আর তার এই পালক ছিল নিখুঁত সততার প্রতীক।
তুলাযন্ত্রের পাশে বসে থাকতেন এক অদ্ভুতদর্শী প্রাণী—আম্মিত (Ammit), যার ছিল কুমিরের মাথা, সিংহের দেহ এবং জলহস্তীর পিছনের অংশ। একে বলা হতো "মৃতভোজী" বা "হৃদয়গ্রাসী"।
যদি মৃত ব্যক্তির হৃদয় মা'আতের পালকের চেয়ে ভারী হতো—অর্থাৎ পাপের বোঝায় ভারাক্রান্ত হতো—তাহলে আম্মিত সেই হৃদয় গ্রাস করে ফেলত। এর অর্থ ছিল চূড়ান্ত বিনাশ: আত্মার অস্তিত্ব চিরতরে লোপ পেয়ে যেত, কোনো পুনর্জন্ম বা পরকাল থাকত না।
কিন্তু যদি হৃদয় পালকের সমান ওজনের হতো, তাহলে দেবতা থোথ (Thoth)—যিনি ছিলেন জ্ঞান ও লেখার দেবতা—তা লিপিবদ্ধ করতেন এবং মৃত ব্যক্তিকে ওসিরিসের সামনে উপস্থাপন করতেন। এরপর ওসিরিস তাকে "সত্যের কণ্ঠস্বর" ঘোষণা করতেন এবং আরু ক্ষেতে প্রবেশের অনুমতি দিতেন।
শুধু মানুষ নয়: প্রাণীদেরও মমি
মিশরীয়দের মমিকরণ শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তারা তাদের পোষা প্রাণী ও পবিত্র বলে বিবেচিত জীবজন্তুকেও মমি করে রাখতেন। প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যে মিশর থেকে উদ্ধার হয়েছে বিড়াল, কুমির, বাজপাখি, আইবিস পাখি, বেবুন, এমনকি গুবরে পোকা ও ইঁদুরের মমিও।
কিছু প্রাণীকে মমি করা হতো পোষা প্রাণী হিসেবে—যাতে পরকালে তারা মালিকের সঙ্গ দিতে পারে। আবার কিছু প্রাণীকে মমি করা হতো ধর্মীয় কারণে। মিশরীয়রা বিশ্বাস করতেন যে, কিছু প্রাণী নির্দিষ্ট দেবতার প্রতিনিধিত্ব করে—যেমন বিড়াল ছিল দেবী বাসতেতের প্রতীক, কুমির ছিল দেবতা সোবেকের প্রতীক, আর আইবিস পাখি ও বেবুন ছিল দেবতা থোথের প্রতীক। এই পবিত্র প্রাণীগুলোর মমি তৈরি করে তারা দেবতাদের উদ্দেশ্যে নৈবেদ্য হিসেবে মন্দিরে উৎসর্গ করতেন।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, লাখ লাখ আইবিস পাখির মমি উদ্ধার করা হয়েছে মিশরের বিভিন্ন সমাধি ও মন্দির থেকে। গবেষকরা ধারণা করেন, এগুলো এক ধরনের ধর্মীয় শিল্পের অংশ ছিল—পুণ্যার্থীরা এই মমি কিনে মন্দিরে দান করতেন, অনেকটা আজকের দিনের মোমবাতি বা ফুল দান করার মতো।
আধুনিক বিজ্ঞানের চোখে মমি: নতুন রহস্য উন্মোচন
প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে মমি নিয়ে গবেষণায় এসেছে বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন। এখন আর মমির কাপড় খুলে দেহ পরীক্ষা করতে হয় না—সিটি স্ক্যান, এমআরআই, ডিএনএ বিশ্লেষণ ও রাসায়নিক পরীক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা মমির ভেতরের সবকিছু দেখতে পান কোনো ক্ষতি না করেই।
এই গবেষণাগুলো থেকে পাওয়া গেছে চমকপ্রদ সব তথ্য। ২০২১ সালে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন প্রথম অন্তঃসত্ত্বা নারীর মমি—যার গর্ভে একটি ভ্রূণ ছিল। ডিএনএ পরীক্ষা থেকে জানা গেছে, তুতেনখামুনের মৃত্যুর কারণ ছিল ম্যালেরিয়া ও জন্মগত হাড়ের সমস্যা। এমনকি কিছু মমির ডিএনএ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, তারা মোটেও মিশরীয় ছিলেন না, বরং ইউরোপীয় অভিবাসী ছিলেন।
তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় নতুন ধারণাটি হলো—কিছু বিশেষজ্ঞ এখন বলছেন, প্রাচীন মিশরীয়রা হয়তো মৃতদেহ সংরক্ষণের জন্য মমি তৈরি করতেন না। তাদের মতে, মমিকরণের মূল উদ্দেশ্য ছিল মৃত ব্যক্তিকে দেবতায় রূপান্তরিত করা—অর্থাৎ এটি ছিল এক ধরনের ধর্মীয় রূপান্তরের আচার, কেবল দেহ সংরক্ষণ নয়। যদিও এই মতবাদ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, এটি দেখায় যে মমি ও পরকাল নিয়ে আমাদের জ্ঞানের পরিধি এখনো অসম্পূর্ণ।
প্রাচীন মিশরীয়দের মমি ও পরকাল-বিশ্বাস কেবল এক ধর্মীয় আচার ছিল না—এটি ছিল মৃত্যুকে জয় করার এক মহান প্রয়াস। তারা বিশ্বাস করতেন না যে মৃত্যুই শেষ। বরং তারা বিশ্বাস করতেন, সঠিক প্রস্তুতি নিলে মৃত্যুর পরেও জীবন চলতে পারে—আরও সুন্দর, আরও শান্তিময় এক জগতে।
এই বিশ্বাসই তাদের উদ্বুদ্ধ করেছিল পিরামিডের মতো সুবিশাল স্থাপনা নির্মাণে, মমিকরণের মতো জটিল ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া উদ্ভাবনে, এবং মৃতের বইয়ের মতো পথনির্দেশিকা রচনায়। মিশরীয় সভ্যতার প্রায় তিন হাজার বছরের ইতিহাসে এই পরকাল-বিশ্বাস ছিল একটি স্থায়ী কেন্দ্রীয় শক্তি, যা তাদের শিল্প, স্থাপত্য, সাহিত্য ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি দিককে প্রভাবিত করেছিল।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা হয়তো তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে কুসংস্কার বলতে পারি। কিন্তু তাদের এই প্রয়াসের পেছনে যে গভীর মানবিক আকাঙ্ক্ষা কাজ করেছিল—মৃত্যুর পরেও টিকে থাকার, প্রিয়জনদের সাথে মিলিত হওয়ার, নিজের অস্তিত্বকে চিরস্থায়ী করার—সেই আকাঙ্ক্ষা চিরন্তন। সময় বদলেছে, ধর্ম বদলেছে, কিন্তু মৃত্যুকে জয় করার এই স্বপ্ন আজও আমাদের তাড়া করে বেড়ায়—ঠিক যেভাবে তাড়া করেছিল পাঁচ হাজার বছর আগের মিশরীয়দের।
আরও পড়ুন-
