পৃথিবীর ইতিহাসে এমন অনেক ভাষার উত্থান-পতন ঘটেছে, কিন্তু ইংরেজির মতো ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিকভাবে এত বিস্তৃত ভাষা আর একটিও নেই। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে ইউরোপের এক প্রান্তের ছোট্ট দ্বীপে জার্মানিক গোত্রদের কয়েকটি উপভাষার মিশ্রণে জন্ম নেওয়া এই ভাষাটি কীভাবে আজ সমগ্র বিশ্বের "সেতুভাষা" (Lingua Franca) হয়ে উঠল? বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ১.৫ বিলিয়ন মানুষ ইংরেজিতে কথা বলে, যেখানে মাতৃভাষী বক্তার সংখ্যা মাত্র ৩৮০ মিলিয়নের মতো। এর মানে, ইংরেজি ব্যবহারকারীদের প্রায় ৮০%-ই এই ভাষাকে দ্বিতীয় বা বিদেশি ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেন। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কমনওয়েলথসহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক সংস্থার দাপ্তরিক ভাষা ইংরেজি। বিশ্বের ৬৭টিরও বেশি দেশে ইংরেজি দাপ্তরিক বা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা লাভ করেছে। শুধু তাই নয়, বিশ্বের ১৪২টি দেশের জাতীয় শিক্ষানীতিতে ইংরেজি একটি বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত।
কিন্তু এই বিপুল অর্জনের পেছনে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস এক রক্তাক্ত ও জটিল অধ্যায়ের নাম। ইংরেজির এই বৈশ্বিক রূপান্তর কোনো প্রাকৃতিক বিবর্তনের ফল নয়, বরং এটি ছিল এক সুপরিকল্পিত ঔপনিবেশিক প্রকল্পের ফসল। আজকের এই লেখা সেই ইতিহাসেরই এক মহাকাব্যিক উপস্থাপনা—যেখানে সাম্রাজ্যবাদের লোভ, কূটনীতির ধূর্ততা এবং সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তারের এক নীল নকশা ধাপে ধাপে একটি জাতিগোষ্ঠীর ভাষাকে চাপিয়ে দিয়েছে পুরো বিশ্বের ওপর।
অধ্যায় ১: ইতিহাসের স্রোতে এক ভাষার অভিযাত্রা
ইংরেজির উত্থান বোঝার জন্য আমাদের ফিরে যেতে হবে ইউরোপের ইতিহাসের সেই অন্ধকার যুগে।
জন্মভূমি: জার্মানিক গোত্র ও ইংল্যান্ডের মাটিতে শিকড়
ইংরেজি ভাষার উৎপত্তি ইংল্যান্ড নামক দ্বীপরাষ্ট্রে, খ্রিস্টীয় ৫ম-৬ষ্ঠ শতাব্দীতে। জার্মানির উত্তরাঞ্চলীয় তিনটি গোত্র—অ্যাঙ্গল, স্যাক্সন ও জুট— উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের গ্রেট ব্রিটেন দ্বীপে এসে বসতি স্থাপন করে। অ্যাঙ্গলদের নাম থেকেই 'ইংল্যান্ড' ও 'ইংরেজি' শব্দের উৎপত্তি। প্রাথমিক ইংরেজি ভাষা ছিল এই তিন গোত্রের উপভাষার সংমিশ্রণ, যার সাথে যুক্ত হয়েছে কেল্টিক, ল্যাটিন ও পরবর্তীতে প্রাচীন নর্স ভাষার প্রভাব।
১০৬৬ সালে উইলিয়াম দ্য কনকাররের নেতৃত্বে নরমান ফরাসিরা ইংল্যান্ড জয় করলে ইংরেজির সাথে যুক্ত হয় ফরাসি শব্দভান্ডারের বিশাল এক ভিত্তি। প্রায় তিনশো বছর ধরে ইংল্যান্ডের অভিজাত সমাজ ফরাসিতে কথা বলতেন, আর সাধারণ মানুষের মুখে টিকে থাকত ইংরেজি। এই দ্বিভাষিকতা পরবর্তীতে ইংরেজি শব্দভান্ডারকে অসম্ভব সমৃদ্ধ করে তোলে।
ভাষার রূপান্তর: স্থানীয় উপভাষা থেকে জাতীয় ভাষা
মধ্যযুগের শেষে এবং রেনেসাঁর সময়ে ইংরেজি ধীরে ধীরে তার আধুনিক রূপ পরিগ্রহ করতে শুরু করে। পঞ্চদশ শতাব্দীতে ছাপাখানার আবিষ্কারের ফলে ইংরেজি ভাষার একটি প্রমিত রূপ গড়ে ওঠে। ষোড়শ শতাব্দীতে শেক্সপিয়র ও এলিজাবেথীয় যুগের সাহিত্যের কল্যাণে ইংরেজি হয়ে ওঠে একটি পরিণত ও প্রকাশক্ষমতা সম্পন্ন ভাষা। কিন্তু তখনও এটি ছিল মূলত একটি ইউরোপীয় দ্বীপের আঞ্চলিক ভাষা। বিশ্বভাষা হওয়ার স্বপ্ন তখনও সুদূর পরাহত।
অধ্যায় ২: সূর্য যেখানে অস্ত যায় না—সাম্রাজ্যের বিস্তার ও ভাষার স্থাপত্য
ইংরেজি ভাষার প্রকৃত বৈশ্বিক অভিযাত্রা শুরু হয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণের সাথে সাথে। সপ্তদশ শতাব্দী থেকে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত বিস্তৃত এই সময়কাল ইংরেজিকে একটি সাধারণ দ্বীপভাষা থেকে বিশ্বভাষায় রূপান্তরিত করে।
প্রথম ঢেউ: বাণিজ্য ও উপনিবেশ স্থাপন
সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুতে ইংরেজরা উত্তর আমেরিকা, ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ এবং পরবর্তীতে আফ্রিকা ও এশিয়ায় বাণিজ্যকুঠি ও উপনিবেশ স্থাপন করতে শুরু করে। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের মাধ্যমে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার বিশাল সম্পদ ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ লাভ করে। এই জয়ের মধ্য দিয়েই ভারতীয় উপমহাদেশে ইংরেজির অনুপ্রবেশ ঘটে। বাংলায় নবাবী শাসনের পতনের ফলে ইংরেজগণ বাঙ্গলার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় এবং কলকাতায় বাঙ্গলার রাজধানী স্থাপন করে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অধীনে ইংরেজি ভাষা বাঙ্গলার বহুভাষিকতায় নতুন এক অনুষঙ্গ যুক্ত করে, যার ফলে বাঙ্গলার ভাষা-রাজনৈতিক পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে।
একই সময়ে, আটলান্টিকের ওপারে উত্তর আমেরিকায় ব্রিটিশ উপনিবেশগুলো ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছিল। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে ব্রিটিশরা বন্দী ও অভিবাসীদের পাঠিয়ে নতুন উপনিবেশ গড়ে তোলে। আফ্রিকাতেও ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তৃত হতে থাকে। 'সূর্য যেখানে অস্ত যায় না'—এই প্রবাদটি বাস্তবে পরিণত হয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মাধ্যমেই।
সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগে ইংরেজির ভূমিকা
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তারের সাথে সাথে ইংরেজি ভাষাও হয়ে ওঠে প্রশাসন, আইন, বাণিজ্য ও শিক্ষার একমাত্র মাধ্যম। ইংরেজি জানা চাকরিপ্রার্থী থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী—সবার জন্যই অত্যাবশ্যকীয় হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষ ব্রিটিশদের দ্বারা শাসিত ছিল। ১৯২২ সালের দিকে ৪৫৮ মিলিয়ন মানুষ ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ছিল, যা ছিল পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৫%। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর ওপর ইংরেজি ভাষা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে।
উনিশ শতকের শুরুতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে এক বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হলেও তারা ভারতীয়দের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের নৈতিক দায়িত্ব কখনোই স্বীকার করেনি। তবে ১৮১৩ সালের চার্টার অ্যাক্টের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো সরকারিভাবে ভারতে শিক্ষা বিস্তারের জন্য বছরে এক লাখ টাকা ব্যয়ের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, যা ছিল ভারতীয় শিক্ষার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
অধ্যায় ৩: মেকলের 'মিনিট': এক শিক্ষানীতি, এক সাংস্কৃতিক ধ্বংসের বীজ
ইংরেজির বৈশ্বিক উত্থানের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো ১৮৩৫ সালের 'মেকলে মিনিট' বা 'মেকলের শিক্ষানীতি'।
প্রাচ্য-পাশ্চাত্য দ্বন্দ্ব ও মেকলের ভূমিকা
উনিশ শতকের প্রথমার্ধে ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ব্রিটিশ প্রশাসনের মধ্যে দুটি দল তৈরি হয়— প্রাচ্যবাদী (Orientalists) এবং পাশ্চাত্যবাদী (Anglicists)। প্রাচ্যবাদীরা মনে করতেন, ভারতীয়দের তাদের নিজস্ব ভাষা (যেমন সংস্কৃত, আরবি বা ফার্সি) ও প্রাচীন সাহিত্যের মাধ্যমে শিক্ষিত করা উচিত। অন্যদিকে পাশ্চাত্যবাদীরা জোর দিচ্ছিলেন ইংরেজি ভাষা ও পশ্চিমা জ্ঞান-বিজ্ঞানের ওপর।
১৮১৩ সালের সনদ আইনের এক ধারার ব্যাখ্যা নিয়ে এই দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছালে ১৮৩৪ সালে গভর্নর-জেনারেলের কাউন্সিলের আইন সদস্য টমাস ব্যাবিংটন মেকলের ওপর বিষয়টি সমাধানের দায়িত্ব অর্পিত হয়। ১৮৩৫ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি লর্ড মেকলে তার বিখ্যাত 'মিনিট' (মতামতপত্র) পেশ করেন, যা ইতিহাসে 'মেকলে মিনিট' নামে পরিচিত।
"এক শ্রেণির লোক সৃষ্টি" - ভাষা আধিপত্যের কৌশল
মেকলে তার মিনিটে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যই হবে ভারতীয় শিক্ষার মাধ্যম। তিনি বলেছিলেন, ইংরেজি শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো "এমন এক শ্রেণির লোক সৃষ্টি করা, যারা দেখতে ও রক্তে ভারতীয় হবে, কিন্তু চিন্তা-চেতনায়, মননশীলতায় ও পছন্দ-অপছন্দে হবে ইংরেজ।" মেকলের মতে, ইংরেজি সাহিত্য ও পাশ্চাত্য বিজ্ঞান প্রাচ্যের যেকোনো ভাষা ও সাহিত্যের চেয়ে উন্নত। তাঁর যুক্তি ছিল, "একটি ভালো ইউরোপীয় লাইব্রেরির একটিমাত্র বুকশেল্ফই ভারত ও আরবের সমগ্র দেশীয় সাহিত্যের চেয়ে মূল্যবান"।
মেকলের এই সুপারিশের ভিত্তিতেই ১৮৩৫ সালের ইংলিশ এডুকেশন অ্যাক্ট পাস হয়, যার মাধ্যমে ইংরেজি ভাষাকে ভারতের উচ্চশিক্ষার একমাত্র মাধ্যম হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সরকারি সব অর্থ এখন থেকে ইংরেজি শিক্ষায় ব্যয় করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এটি ছিল ভারতের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য এক বড় আঘাত।
নিম্নমুখী পরিস্রাবণ নীতি: এলিট শ্রেণির জন্ম
মেকলের শিক্ষানীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল 'নিম্নমুখী পরিস্রাবণ তত্ত্ব' (Downward Filtration Theory)। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, ইংরেজি শিক্ষার সুযোগ প্রথমে দেওয়া হবে সমাজের উচ্চবিত্ত ও অভিজাত শ্রেণিকে। এই শিক্ষিত উচ্চবিত্তরাই পরবর্তীতে তাদের অর্জিত জ্ঞান সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেবে। কিন্তু বাস্তবে এর ফল ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ভারতীয় সমাজে এক নতুন এলিট শ্রেণির জন্ম হয়, যারা সমাজের বাকি অংশ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এই ইংরেজি-শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি পরবর্তীতে ব্রিটিশ প্রশাসনের অনুগত হয়ে কাজ করে এবং সাম্রাজ্যের ভিত মজবুত করতে সহায়তা করে।
অধ্যায় ৪: "বিভাজন করো, শাসন করো"—ভাষাকে অস্ত্র করে
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ইংরেজি ভাষাকে শুধু শিক্ষার মাধ্যম হিসেবেই ব্যবহার করেনি, বরং একে এক শক্তিশালী রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগিয়েছিল। "বিভাজন করো, শাসন করো" (Divide and Rule) ছিল তাদের মূলমন্ত্র।
ফার্সি থেকে ইংরেজি: ভাষা-রাজনীতির প্রথম ধাক্কা
ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সাম্রাজ্যে ভাষার প্রায়োগিকতা নিয়ে জারি করা ফরমান ছিল দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম ভাষানীতি। এই ভাষানীতির আওতায় মুসলমান রাজশক্তির প্রতীক ফার্সি ভাষার ব্যবহার নিষিদ্ধ করে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি ভাষা প্রতিষ্ঠা করা হয়। এটি ছিল এক প্রতীকী আঘাত—মুসলিম শাসনের শেষ চিহ্নটুকুও নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া। ফার্সি ভাষা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারতীয় উপমহাদেশের দাপ্তরিক ও সাংস্কৃতিক ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। হঠাৎ করে এর পরিবর্তে ইংরেজি চাপিয়ে দেওয়া উপমহাদেশের শিক্ষিত সমাজের জন্য ছিল এক বড় ধাক্কা।
হিন্দু-মুসলিম বিভাজনে ভাষার ব্যবহার
পলাশীর যুদ্ধের পর ইংরেজরা বাংলার হিন্দুদের জমিদারী, সরকারি চাকুরি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে নিজেদের দলভুক্ত করে নেয়, আর মুসলিমদের পরিকল্পিতভাবে পেছনে ফেলে দেওয়া হয়। তবে স্বাভাবিকভাবেই ইংরেজদের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ছিল মুসলিমদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দেওয়া। অন্যদিকে কলকাতা মাদ্রাসা ছিল এদেশে ইংরেজ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যার উদ্দেশ্য ছিল আরবি ও ফার্সি শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে মুসলমানদের সরকারি কাজের জন্য যোগ্য করে তোলা। অর্থাৎ একদিকে মুসলিম শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা হচ্ছিল, অন্যদিকে একটি অনুগত মুসলিম শ্রেণি তৈরির চেষ্টাও চলছিল।
ভাষার মাধ্যমেই ইংরেজরা তাদের 'Divide and Rule' নীতির বাস্তবায়ন ঘটায়। একদিকে ইংরেজি ভাষাকে অভিজাতদের ভাষা হিসেবে তুলে ধরা হতো, অন্যদিকে স্থানীয় ভাষাভাষীদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা হতো। এই কৌশল এতটাই সূক্ষ্ম ও সুদূরপ্রসারী ছিল যে, ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পরও উপমহাদেশে এর রাজনৈতিক "প্রেতাত্মা" বিরাজমান ছিল।
অধ্যায় ৫: বিংশ শতাব্দী: সূর্য অস্ত যায়, কিন্তু ভাষা টিকে থাকে
বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে পৃথিবীর ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একের পর এক এশীয়, আফ্রিকান ও ক্যারিবীয় উপনিবেশ স্বাধীনতা লাভ করতে শুরু করে। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৫০ সালের মধ্যে ব্রিটিশ উপনিবেশ তার শেষ দেখতে শুরু করে।
স্বাধীনতা-উত্তর ভাষা-বিতর্ক ও ইংরেজির জয়
অনেকের ধারণা ছিল, ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের সাথে সাথে ইংরেজি ভাষার প্রভাবও কমে যাবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটল সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ভারতের সংবিধান রচনার সময় যখন দাপ্তরিক ভাষা নির্ধারণের প্রশ্ন ওঠে, তখন 'হিন্দুস্তানি'কে (হিন্দি-উর্দুর সম্মিলিত ভাষা) রাষ্ট্রভাষা করার দাবি ওঠে। কিন্তু অনেক পণ্ডিত এর বিরোধিতা করেন। ড. বি.আর. আম্বেডকার যুক্তি দেন, শুধু হিন্দিকে দাপ্তরিক ভাষা করা হলে ভারতের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী অন্যদের থেকে কম গুরুত্ব পাবে। দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলো হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার তীব্র বিরোধিতা করে। এই বিতর্ক এতটাই তীব্র হয়েছিল যে, শেষ পর্যন্ত ইংরেজিকেই রাখা হয় সহ-দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ইংরেজি আজও দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে টিকে আছে। ভারতে ১২৫ মিলিয়ন, পাকিস্তানে ১০৮ মিলিয়ন, নাইজেরিয়ায় ৭৯ মিলিয়ন এবং ফিলিপাইনে ৬৪ মিলিয়ন মানুষ ইংরেজিতে কথা বলে—এরা সবাই প্রধানত দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহারকারী। শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ আরও অসংখ্য দেশে ইংরেজি সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃত।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্থান: ইংরেজির দ্বিতীয় বসন্ত
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বরাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্থান ইংরেজির বৈশ্বিক মর্যাদাকে আরও সুদৃঢ় করে। প্রথমে ইংল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের বৈশ্বিক প্রভাবের দ্বারা ইংরেজি ভাষা ছড়িয়ে পড়েছিল, পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাবের দ্বারা ইংরেজি ভাষা আরও বিস্তৃত হয়। অর্থনীতি, সামরিক শক্তি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির মাধ্যমে আমেরিকা ইংরেজিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সমস্ত প্রকার মুদ্রিত ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে ইংরেজি ভাষা আন্তর্জাতিক আলোচনার প্রধান ভাষায় পরিণত হয়।
ইংরেজি এখন শুধু সাবেক উপনিবেশগুলোর ভাষাই নয়, বরং বৈশ্বিক যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। বাণিজ্য, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কূটনীতি ও বিনোদনের ভাষা হিসেবে ইংরেজি একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখেছে।
অধ্যায় ৬: বিশ্বায়নের নতুন মাত্রা: ইন্টারনেট, হলিউড ও কর্পোরেট বিশ্ব
বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এবং একবিংশ শতাব্দীতে এসে বিশ্বায়নের জোয়ারের সাথে সাথে ইংরেজি ভাষার গুরুত্ব আরও বহুগুণ বেড়ে যায়।
ইন্টারনেট: ইংরেজির অন্যতম বড় দুর্গ
ইন্টারনেটের আবিষ্কার ও প্রসার ইংরেজির বৈশ্বিক আধিপত্যকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অন্যান্য ভাষার বিষয়বস্তুর পরিমাণ বাড়ছে, তবুও আজও ইন্টারনেটের প্রায় ৫৫% কনটেন্ট ইংরেজিতে। বেশিরভাগ প্রধান সার্চ ইঞ্জিন, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এবং ওয়েবসাইটের মূল ভাষা ইংরেজি। গুগল, ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার—সবগুলোই ইংরেজি ভাষাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।
ওয়েবসাইটের ডোমেইন নেম, প্রোগ্রামিং ভাষা (পাইথন, জাভা, সি++ ইত্যাদি), সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট কিট—সবকিছুর পরিচালন ভাষা ইংরেজি। সফটওয়্যার, অ্যাপস ও প্রোগ্রামিং ভাষার মূল নির্দেশনা ইংরেজিতে লেখা। ফলে প্রযুক্তির জগতে প্রবেশ করতে গেলেও ইংরেজির বিকল্প নেই। কম্পিউটার বিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং রোবোটিক্সের মতো অত্যাধুনিক ক্ষেত্রগুলো পুরোপুরি ইংরেজি-নির্ভর। ইংরেজি কেবল প্রযুক্তির ভাষা নয়, এটি প্রযুক্তি উদ্ভাবনেরও ভাষা।
বিজ্ঞান ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভাষা
বিজ্ঞান ও জ্ঞানচর্চার জগতেও ইংরেজির আধিপত্য সুস্পষ্ট। বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান ভাষা ইংরেজি। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসা ও ব্যবসায়ের অধিকাংশ গবেষণা প্রবন্ধ ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়। নেচার, সায়েন্স, দ্য ল্যানসেট-এর মতো বিখ্যাত জার্নালগুলো সবই ইংরেজিতে প্রকাশিত। ফলে একজন গবেষক যদি বিশ্বমঞ্চে নিজের কাজ তুলে ধরতে চান, তাঁকে ইংরেজিতে দক্ষ হতে হবে।
জাতিসংঘসহ বিশ্বের প্রধান আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দাপ্তরিক ভাষা ইংরেজি। আন্তর্জাতিক বৈঠক, চুক্তি ও নীতিনির্ধারণে ইংরেজি ব্যবহার হয়。 কূটনীতিক, আইনজীবী ও নীতি-নির্ধারকদের জন্য ইংরেজি অপরিহার্য। একইভাবে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, মার্কেটিং, পর্যটন ও কূটনীতিতে ইংরেজি অপরিহার্য ভূমিকা রাখে।
বিনোদন: হলিউড ও পপ সংস্কৃতির প্রভাব
হলিউডের চলচ্চিত্র, নেটফ্লিক্সের সিরিজ, পপ সঙ্গীত—বিনোদনের জগতেও ইংরেজির একচেটিয়া প্রভাব বিদ্যমান। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ ইংরেজি সিনেমা দেখে, ইংরেজি গান শোনে এবং ইংরেজি বই পড়ে। এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনও পরোক্ষভাবে ইংরেজির বৈশ্বিক প্রভাবকে বাড়িয়ে তোলে। এক প্রকার সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ হিসেবে হলিউড ও পশ্চিমা গণমাধ্যম ইংরেজিকে তরুণ প্রজন্মের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে।
বিশ্বায়ন ও ইংরেজির অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা
পৃথিবী বিশ্বায়নের পথে অগ্রসর হতে থাকে। এই আধুনিক পৃথিবীর বিশ্বায়নে প্রযুক্তির অভূতপূর্ব ভুমিকা ছিল, যেটা পুরো বিশ্বকে একটি ছাঁচের মধ্যে নিয়ে এসে পারস্পারিক সম্পর্কযুক্ত একটি বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। আর সেখানে সম্পর্ক স্থাপনের ভিত্তি হিসেবে যোগাযোগের জন্য একটি ভাষার প্রয়োজন হয়। আর এখানেই ইংরেজি ভাষা বৈশ্বিক সম্পর্কের মাধ্যম হয়ে কাজ করে, তা কিছু নির্দিষ্ট সংখ্যক ভাষাভাষীর মাতৃভাষায় সীমাবদ্ধ না থেকে একটি সার্বজনীন ভাষা হয়ে দাঁড়ায়।
বর্তমানে ইংরেজি বিশ্বের সর্বাধিক ব্যবহৃত আন্তর্জাতিক ভাষা। এটি যোগাযোগ, শিক্ষা, ব্যবসা, প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও কূটনীতিতে প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশ্বের ৫৮টি সার্বভৌম রাষ্ট্রে ইংরেজি দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃত, এবং ডি ফ্যাক্টো (অনানুষ্ঠানিক কিন্তু বাস্তবিক) স্বীকৃতি সহ ৩৯% দেশে ইংরেজি কোনও না কোনওভাবে সরকারি ভাষা। ফলে, যে ভাষা একসময় ছিল এক ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রের আঞ্চলিক ভাষা, আজ তা পরিণত হয়েছে এক বৈশ্বিক শক্তিতে।
অধ্যায় ৭: ভাষিক সাম্রাজ্যবাদের রেশ: বিতর্ক ও সমালোচনা
ইংরেজির এই বিশ্বজনীন সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে থাকা ঔপনিবেশিক ইতিহাস ও ভাষিক সাম্রাজ্যবাদের বিষয়টি বারবার বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ভাষিক সাম্রাজ্যবাদ: সংজ্ঞা ও বাস্তবতা
ভাষিক সাম্রাজ্যবাদ (Linguistic Imperialism) হলো প্রভাবশালী দেশের কোনো ভাষা যখন অন্য দেশ বা সংস্কৃতির ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, এবং এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য বজায় রাখা হয়। ঔপনিবেশিক আমলে ইংরেজি ভাষা ছিল শাসক ও শোষিতের মধ্যে বিভেদ তৈরির এক গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। আজও বহু দেশে ইংরেজি জানা মানুষকে 'শিক্ষিত' এবং না-জানা মানুষকে 'অশিক্ষিত' বা 'অযোগ্য' হিসেবে বিবেচনা করার যে মানসিকতা দেখা যায়, তা এই ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারেরই ফসল।
ভারতের ভাষা-বিতর্ক: অমিত শাহর মন্তব্য ও জাতীয়তাবাদী বাস্তবতা
সম্প্রতি ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের একটি মন্তব্য গোটা দেশে তুমুল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনি বলেন, 'ইংরেজি ভাষায় কথা বলার জন্য মানুষ শিগগিরই লজ্জিত বোধ করবে'। অমিত শাহ ইংরেজি ভাষা জানা এবং সেই ভাষায় কথা বলাকে নিয়ে তাঁর মত ব্যক্ত করেছিলেন, যা তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় স্তরে ভাষা নিয়ে পুরনো বিতর্ককে উস্কে দেয়।
ভারতের প্রেক্ষাপটে এই বিতর্ক অত্যন্ত জটিল। একদিকে, ইংরেজি ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতীক এবং এর আধিপত্য ভারতীয় ভাষাগুলোর বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে অনেকে মনে করেন। অন্যদিকে, ইংরেজি বর্তমানে ভারতের বিভিন্ন ভাষাভাষী রাজ্যগুলোর মধ্যে যোগাযোগের নিরপেক্ষ মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। স্বাধীনতার পর, ভারতের ভাষা নিয়ে বহু বিতর্ক ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ইংরেজিকে "অস্থায়ী" সংযোগরক্ষাকারী ভাষা হিসেবে রাখা হয়। কিন্তু সেই অস্থায়ী ব্যবস্থাই এখন স্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: ভাষার বি-উপনিবেশায়ন ও আত্মপরিচয়ের সংকট
বাংলাদেশের মতো ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্রেও ইংরেজির প্রভাব নিয়ে বিতর্ক কম নয়। ভাষার নামকে ভিত্তি করে গঠিত জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ, যার আত্মপরিচয়ে প্রয়োজন নিজস্ব সংস্কৃতি, নিজস্ব ইতিহাস ও ঐতিহ্য। কিন্তু উপনিবেশ শাসন বিলুপ্ত হওয়ার পরও উপনিবেশের করণকৌশল, পরম্পরা বা কার্যবৃত্তি এখনো সমভাবেই জারিত রয়েছে।
অনেকে মনে করেন, ইংরেজি ভাষার অতিরিক্ত গুরুত্ব প্রদানের ফলে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি হুমকির মুখে পড়ছে। অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলার পরিবর্তে ইংরেজি মাধ্যমের প্রতি ঝোঁক, অফিস-আদালতে ইংরেজি ব্যবহারের প্রবণতা এবং সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে ইংরেজি বলার প্রবণতা—এসবই ঔপনিবেশিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করেন ভাষা-আন্দোলনের পুরোধারা।
ভাষার মৃত্যু ও বৈচিত্র্য সংকট
ভাষাবিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, ইংরেজির এই একচ্ছত্র আধিপত্য বিশ্বের ছোট ছোট ভাষাগুলোর অস্তিত্বের জন্য হুমকি। প্রতি দুই সপ্তাহে পৃথিবী থেকে একটি করে ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৭,০০০ ভাষা প্রচলিত থাকলেও শতাব্দীর শেষ নাগাদ এর অর্ধেকই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। ইংরেজি সহ কয়েকটি প্রধান ভাষার আগ্রাসী বিস্তার এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে। একে বলা যায় এক ধরনের জ্ঞানতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক গণহত্যা, যেখানে একটি ভাষার সাথে সাথে বিলুপ্ত হয়ে যায় একটি জাতির হাজার বছরের জ্ঞান, ইতিহাস ও ঐতিহ্য।
এক ভাষার বিশ্বজয়, অজস্র ভাষার বিলুপ্তি
ইংরেজি ভাষার উত্থানের গল্পটি আসলে দ্বিমুখী এক কাহিনী। একদিকে, এটি মানব ইতিহাসের এক বিস্ময়কর অর্জন—কীভাবে একটি ক্ষুদ্র দ্বীপের ভাষা সমগ্র বিশ্বের সেতুভাষায় পরিণত হলো। আজ ১.৫ বিলিয়ন মানুষ ইংরেজিতে কথা বলে, এবং এই সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। ব্রিটিশ কাউন্সিলের ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে, ২.৩ বিলিয়ন মানুষ কোনো না কোনো স্তরে ইংরেজি বলতে পারে, যার মধ্যে ১.৯ বিলিয়নেরও বেশি অ-মাতৃভাষী। মজার তথ্য হলো, বৈশ্বিক ইংরেজি কথোপকথনের মাত্র ৪% ঘটে দুই মাতৃভাষী ইংরেজি বক্তার মধ্যে, অর্থাৎ সিংহভাগ কথোপকথনেই একজন অ-মাতৃভাষী বক্তা থাকেন।
কিন্তু অন্যদিকে, এই সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক রক্তাক্ত ইতিহাস—সাম্রাজ্যবাদ, শোষণ, সাংস্কৃতিক নিপীড়ন এবং অগণিত দেশীয় ভাষা ও সংস্কৃতির বিলুপ্তির কাহিনী। এই সাম্রাজ্যবাদী রাজনৈতিক শক্তি নানা কূটকৌশলে প্রথমে বাঙ্গলা ও পরে সমগ্র উপমহাদেশে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়। মেকলের শিক্ষানীতি থেকে শুরু করে প্রশাসনিক ফরমান—সবকিছুর কেন্দ্রে ছিল একটিই উদ্দেশ্য: ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর মনে হীনম্মন্যতা ও পরাধীনতার বীজ বপন করা।
আজকের বিশ্বায়িত সমাজে ইংরেজি ভাষা এক বাস্তবতা। এর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বিশ্বের ১৪২টি দেশের শিক্ষানীতিতে ইংরেজি বাধ্যতামূলক বিষয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিজ্ঞানচর্চা, উচ্চশিক্ষা ও প্রযুক্তির জগতে ইংরেজি এখন এক অপরিহার্য মাধ্যম। কিন্তু এই বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার পাশাপাশি আমাদের মনে রাখতে হবে, কোনো ভাষাই অন্য ভাষার চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়। প্রতিটি ভাষাই একটি সংস্কৃতি, একটি ইতিহাস, একটি জাতির আত্মার বাহন।
মনে রাখবেন—আপনার প্রতিটি ইংরেজি শব্দের পেছনে লুকিয়ে আছে ঔপনিবেশিক শাসনের এক দীর্ঘ ইতিহাস, আর আপনার না-বলা বাংলা শব্দের পেছনে লুকিয়ে আছে আপনার পূর্বপুরুষের আত্মত্যাগের গল্প। ভাষার ভারসাম্য রক্ষাই পারে আমাদের প্রকৃত আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে টিকিয়ে রাখতে।
