কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি

    আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট

    আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট
    আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট বা সিকান্দার এর কাল্পনিক ছবি

    আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট। যে নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক অবিশ্বাস্য যোদ্ধার ছবি—যে কিনা মাত্র তেত্রিশ বছরের জীবনে গ্রিস থেকে ভারত পর্যন্ত এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। ইসলামের ইতিহাসে যাকে সিকান্দার বা এস্কান্দার নামেও চেনা হয়। ইতিহাসের পাঠ্যবই তাকে ‘বিশ্ববিজেতা’, ‘দুর্জয় বীর’ বা ‘মহান সম্রাট’ হিসেবে চিত্রিত করে এসেছে যুগের পর যুগ। কিন্তু এই মর্যাদা আর গৌরবগাথার আড়ালে ডুবে আছে আরেক সিকান্দার—যার জীবনের প্রতিটি অধ্যায় বিস্ময়, বিতর্ক আর বিভ্রান্তিতে মোড়া। তার প্রেম ছিল উপন্যাসের চেয়েও গভীর, তার রাগ ছিল আগ্নেয়গিরির চেয়েও ভয়ংকর, আর তার মৃত্যু ও সমাধি পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম সেরা রহস্য।

    ইতিহাসের জমাট বরফ ভেদ করে আমরা খুঁজব সেই অজানা সিকান্দারকে। অবাক হবেন, হয়তো বিচলিতও হবেন, কিন্তু উদাসীন থাকতে পারবেন না।

    জন্ম ও শৈশব

    খ্রিস্টপূর্ব ৩৫৬ সালের জুলাই মাসে মেসিডোনিয়ার রাজধানী পেল্লায় সিকান্দারের জন্ম হয়। তাঁর পিতা ছিলেন রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ, আর মাতা অলিম্পিয়াস। জন্মটুকুও ছিল নাটকীয়তায় ভরা। কথিত আছে, যেই রাতে সিকান্দার জন্ম নেন, সেদিনই ইফেসাসের আর্টেমিসের মন্দির পুড়ে যায়। পারস্যের জ্ঞানী ম্যাজাইরা তখন ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে, ‘এশিয়ার জন্য এক সর্বনাশা দুর্যোগের জন্ম হলো।’

    মাতা অলিম্পিয়াস ছিলেন স্বভাবতই রহস্যময়ী ও উচ্চাভিলাষী। তিনি ছোটবেলা থেকেই সিকান্দারের মনপটে এঁকে দেন যে তিনি নিছক একজন রাজপুত্র নন, বরং স্বয়ং গ্রিক দেবতা জিউসের ঔরসজাত সন্তান। এই বিশ্বাস পরবর্তী জীবনে সিকান্দারকে ‘ঈশ্বর-রাজা’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে বিপুলভাবে প্রভাবিত করেছিল।

    অ্যারিস্টটলের ছায়ায় বেড়ে ওঠা এক মনীষী

    ১৩ বছর বয়সে সিকান্দারের জীবনে ঘটে যায় এক যুগান্তকারী ঘটনা। তাঁর পিতা তাঁকে শিক্ষাদানের জন্য নিয়োগ করেন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ দার্শনিকদের একজন—অ্যারিস্টটলকে। মেসিডোনিয়ার মিয়েজা নামক স্থানে ছোট্ট এক বিদ্যালয়ে টানা তিন বছর ধরে চলেছিল এই শিক্ষাপর্ব।

    এখানে সিকান্দার শুধু দর্শন, চিকিৎসা ও বিজ্ঞানই নয়, শিখেছিলেন হোমারের ইলিয়াড-এর প্রতি অগাধ ভালোবাসা। কথিত আছে, অ্যারিস্টটল নিজে একটি সম্পাদিত ইলিয়াড কপি সিকান্দারকে উপহার দেন, যা তিনি আজীবন নিজের বালিশের নিচে রেখে ঘুমাতেন এবং যুদ্ধাভিযানেও সঙ্গে রাখতেন। অ্যারিস্টটলের শিক্ষাই তাঁকে প্রাচ্যের অজানাকে জানার, বোঝার এবং সেটির সাথে মিশে যাওয়ার প্রেরণা দিয়েছিল।

    কিন্তু পরিহাসের বিষয়, গুরু-শিষ্যের সম্পর্কে পরে চিড় ধরে। অ্যারিস্টটল যেখানে গ্রিক ও ‘বর্বর’দের মধ্যে পার্থক্য করে গ্রিক আধিপত্যবাদে বিশ্বাস করতেন, সিকান্দার ক্রমেই পারস্য ও গ্রিক সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটানোর নীতি গ্রহণ করেন, যা তাঁর পরম শত্রু ও সহচরদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি করেছিল।

    বুকিফালাস

    সিকান্দারের জীবনের অন্যতম হৃদয়স্পর্শী অধ্যায় হলো ‘বুকিফালাস’ নামের সেই অশ্ব, যাকে কিনে আনা হয়েছিল থেসালি থেকে। তীক্ষ্ণবুদ্ধি রাজপুত্র সিকান্দার লক্ষ্য করলেন, ঘোড়াটি দিনের বেলায় নিজের ছায়া দেখে ভয় পাচ্ছে। তিনি বুকিফালাসকে ঘুরিয়ে সূর্যের দিকে মুখ করালেন এবং শান্ত করেন। তখনই রাজা ফিলিপ বুঝতে পারেন, “হে পুত্র, তুমি তোমার যোগ্য এক রাজ্য খোঁজ করো, কারণ মেসিডোনিয়া তোমার জন্য খুব ছোট।”

    পরবর্তী জীবনে সমস্ত রণাঙ্গনে বুকিফালাস ছিল সিকান্দারের নিত্যসঙ্গী। যখন বার্ধক্য ও ক্ষতবিক্ষত দেহ নিয়ে আজকের পাকিস্তানের হাইডাস্পেস নদীর তীরে (ঝিলাম নদী) ঐতিহাসিক যুদ্ধ শেষে বুকিফালাস মারা যায়, তখন সিকান্দারের দুঃখের সীমা ছিল না। তিনি নদীতীরে একটি নগর প্রতিষ্ঠা করে তার প্রিয় ঘোড়ার নামেই রাখেন—বুকিফালিয়া।

    প্রেম, যৌনতা ও বিতর্ক

    ইতিহাসের এই অধ্যায়টি সবচেয়ে বেশি আলোচিত, বিতর্কিত এবং প্রায়শই সংবেদনশীলতার কারণে চাপা দেওয়া হয়। সিকান্দারের সঙ্গে তাঁর আজন্ম বন্ধু হেফাস্টিয়নের সম্পর্ক নিয়ে ইতিহাসবিদরা এখনো দ্বিধাবিভক্ত। প্রাচীন তথ্যসূত্র এবং সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে জানা যায়, দুজনের সম্পর্ক ছিল নিছক বন্ধুত্বের চেয়ে অনেক গভীর, সম্ভবত প্রণয়সম্পর্ক। সিকান্দার নিজেও তাদের সম্পর্ককে ট্রোজান যুদ্ধের মহানায়ক অ্যাকিলিস ও প্যাট্রোক্লাসের ভালোবাসার সঙ্গে তুলনা করতেন。

    হেফাস্টিয়ন যখন মারা যান, তখন সিকান্দার উন্মাদের মতো আচরণ করতে থাকেন। তিনি হেফাস্টিয়নের চিকিৎসককে ক্রুশবিদ্ধ করেন, নিজের চুল কামিয়ে ফেলেন, এবং ব্যাবিলনে তাঁর জন্য এক বিশাল চিতাকুণ্ড নির্মাণ করেন। এরপর মাত্র আট মাসের মধ্যেই সিকান্দারও মৃত্যুবরণ করেন, যা এই গভীর সম্পর্কের সাক্ষ্য বহন করে।

    তবে সিকান্দার এককামী ছিলেন না। তিনি তিনজন নারীকে বিয়ে করেছিলেন: রোকসানা, যিনি এক ব্যাকট্রিয়ান রাজকন্যা এবং সিকান্দারের একমাত্র বৈধ উত্তরাধিকার চতুর্থ আলেকজান্ডারের জননী; পারস্যের সম্রাট তৃতীয় দারিয়ুসের কন্যা স্তাতেইরা; এবং তৃতীয় আর্তাক্সেরক্সেসের কন্যা প্যারিসাতিস। এছাড়াও পারস্যের নপুংসক বাগোয়াসের (Bagoas) সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের উল্লেখ পাওয়া যায়。

    মেসিডোনিয়ার রাজদরবারে সমকামী ও বিষমকামী উভয় ধরনের সম্পর্কই সমানভাবে স্বীকৃত ছিল। ফলে সিকান্দারের যৌনজীবনকে আধুনিক যুগের ‘গে’ বা ‘স্ট্রেইট’—এই চেনা ছকে ফেলা অসম্ভব ও ঐতিহাসিকভাবে অযথার্থ。

    ভারত অভিযান—যুদ্ধ, দর্শন ও আত্মসমর্পণ

    খ্রিস্টপূর্ব ৩২৬ সালে সিকান্দার ভারতবর্ষে পদার্পণ করেন। পুরো বিশ্ব জয়ের নেশায় উন্মত্ত এই সম্রাট ভারতকে ভেবেছিলেন আরেকটি সহজ শিকার। কিন্তু ভারত তাঁকে ভিন্ন এক শিক্ষা দেয়।

    রাজা পুরুর সঙ্গে যুদ্ধ: হাইডাস্পেসের যুদ্ধে সিকান্দার জয়লাভ করেন বটে, কিন্তু পুরুর বীরত্ব ও আত্মমর্যাদা তাঁকে মুগ্ধ করে। সিকান্দার পুরুকে জিজ্ঞাসা করেন, “তোমার সাথে কেমন ব্যবহার করা হোক?” পুরু নির্ভীক কণ্ঠে উত্তর দেন, “একজন রাজার মতো।” এই উত্তর শুনে সিকান্দার তাঁকে পরাজিত না করে মিত্র হিসেবে গ্রহণ করেন, এবং তাঁর রাজ্যও ফিরিয়ে দেন।

    বিবস্ত্র দার্শনিকদের (গিমনোসোফিস্ট) সাক্ষাৎ: ভারতের তক্ষশীলা অঞ্চলে সিকান্দারের দেখা হয়েছিল একদল দিগম্বর সন্ন্যাসী বা ব্রাহ্মণের সঙ্গে, যাঁদের গ্রিকরা বলত ‘গিমনোসোফিস্ট’。 সিকান্দার তাঁদের গভীর প্রজ্ঞা ও সহিষ্ণুতা দেখে অভিভূত হয়ে তাঁদের নিজের সভায় আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু দার্শনিকরা শর্ত দিলেন, “যে আমাদের সঙ্গে যাবে, সে-ও যেন বিবস্ত্র হয়ে জীবনযাপন করে।” এই শর্তে সিকান্দার নিরুত্তর হন। পরবর্তীতে কালানুস (Kalanus) নামে এক ভারতীয় দার্শনিক তাঁর সঙ্গে পারস্যে যান এবং অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়ে স্বেচ্ছায় অগ্নিতে আত্মাহুতি দেন, যা সিকান্দারের মনকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।

    ভারত ত্যাগের আসল কারণ: প্রচলিত ইতিহাস বলে, সিকান্দারের সেনারা ক্লান্ত হয়ে বিদ্রোহ করেছিল। কিন্তু আরেক গভীর সত্য হলো, ভারতীয় প্রতিরোধের তীব্রতা এবং স্থানীয় দার্শনিক ও গণকদের সতর্কবাণী। কথিত আছে, কালানুসের মতো জ্যোতিষীরা সিকান্দারকে জানান যে, আর অভ্যন্তরে গেলে এক ভয়াবহ সর্বনাশ অপেক্ষা করছে। শেষ পর্যন্ত সিকান্দার পিছু হটতে বাধ্য হন।

    আরও পড়ুন - নেপোলিয়ন: প্রেম ও রাজনীতির দ্বন্দ

    গর্ডিয়ান গিঁট ও ডায়োজিনিসের ছায়া

    গর্ডিয়ান গিঁট (The Gordian Knot): আনাতোলিয়ার গর্ডিয়াম শহরে একটি প্রাচীন গরুর গাড়ির জোয়াল বাঁধা ছিল এক দুর্বোধ্য গিঁট দিয়ে। ভবিষ্যদ্বাণী ছিল, যে এই গিঁট খুলতে পারবে, সে একদিন সমগ্র এশিয়া শাসন করবে। বহু বীর-মনীষী ব্যর্থ হওয়ার পর সিকান্দার সেখানে উপস্থিত হয়ে প্রথমে গিঁটটি খোলার চেষ্টা করেন। ব্যর্থ হয়ে তিনি নিজের তলোয়ার বের করে এক কোপে সেই গিঁট কেটে ফেলেন। এটি ছিল তাঁর সমস্যা সমাধানের অনন্য দৃষ্টিভঙ্গির প্রতীক।

    ডায়োজিনিসের সঙ্গে সাক্ষাৎ: একদিন সিকান্দার গ্রিক দার্শনিক ডায়োজিনিসের কাছে গিয়ে বড় হয়ে দাঁড়ান। ডায়োজিনিস তখন রোদ পোহাচ্ছিলেন। সিকান্দার জিজ্ঞাসা করেন, “আপনার জন্য আমি কী করতে পারি?” ডায়োজিনিস নির্বিকারভাবে উত্তর দেন, “আমার রোদটা ছেড়ে সরে দাঁড়াও।”

    আশ্চর্যজনকভাবে সিকান্দার রাগ না করে বলেছিলেন, “আমি যদি সিকান্দার না হতাম, তাহলে আমি ডায়োজিনিস হতে চাইতাম।” কথিত আছে, এই দুই ব্যক্তিত্ব একই দিনে খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ সালে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। একজন জয় করেছিলেন গোটা বিশ্ব, আরেকজন জয় করেছিলেন নিজেকে।

    রহস্যময় মৃত্যু—ষড়যন্ত্র, বিষ, নাকি অভিশাপ?

    খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ সালের জুন মাস। ব্যাবিলনের প্রাসাদে মাত্র ৩২ বছর বয়সী সিকান্দার শয্যাশায়ী। সেনাবাহিনী তখন আরব অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আচমকাই প্রচণ্ড জ্বর আসে, যা ক্রমে তীব্রতর হয়। ১২ দিনের যন্ত্রণাদায়ক অসুস্থতার পর তিনি মারা যান।

    কিন্তু আসলে কী হয়েছিল? ইতিহাসবিদদের সামনে একাধিক তত্ত্ব রয়েছে:

    ১. বিষক্রিয়া: অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, সিকান্দারকে ধীরে ধীরে বিষ দেওয়া হয়েছিল। ভেরাট্রাম অ্যালবাম নামক সাদা ফুলের নির্যাস থেকে তৈরি বিষাক্ত মদই কাল হয়েছিল বলে ধারণা করেন বিজ্ঞানী ড. লিও শেপ। বিষক্রিয়ার তত্ত্বকে সমর্থন জানিয়ে তাঁরা বলেন, এই বিষ পানে শরীর ধীরে ধীরে অবশ হয়ে যায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে—যে উপসর্গ সিকান্দারের মৃত্যুকালীন বিবরণীর সাথে মিলে যায়。

    ২. টাইফয়েড জ্বর: সাম্প্রতিক আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় ঐতিহাসিক বর্ণনার ‘রেমিটেন্ট ফিভার’ বা ‘থেমে থেমে আসা জ্বর’-এর ভিত্তিতে দাবি করা হয়, টাইফয়েড জ্বরই এর জন্য দায়ী। জ্বরটি ধীরে ধীরে তাঁর স্নায়ুতন্ত্রকে গ্রাস করেছিল এবং পরবর্তীতে পেরিটোনাইটিস ও অ্যাকিউট নেক্রোটাইজিং প্যানক্রিয়াটাইটিসের মতো জটিলতা দেখা দেয়।

    ৩. প্যারালাইসিস ও জীবন্ত সমাধির ভয়াবহ তত্ত্ব: কিছু গবেষক দাবি করেন, গুইলেইন-বারি সিনড্রোম (Guillain-Barré Syndrome) নামক বিরল স্নায়বিক রোগে সিকান্দার সম্পূর্ণ অবশ হয়ে পড়েন। তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস এতটাই ধীর হয়ে গিয়েছিল যে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ভয়ংকর ব্যাপার হলো, প্রাচীন গ্রিসে মৃত্যু নির্ধারিত হতো শ্বাস-প্রশ্বাসের ওপর নির্ভর করে, হৃদস্পন্দন দেখে নয়। এর অর্থ হতে পারে, সিকান্দারকে জীবিত অবস্থাতেই মৃত ভেবে সমাধিস্থ বা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল।

    ৪. ম্যালেরিয়া: প্রচলিত তত্ত্ব অনুযায়ী, অ্যানোফিলিস মশার কামড়ে সিকান্দার ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। এটি বহু ঐতিহাসিক গ্রহণ করেছেন।

    হারানো সমাধি—২৩০০ বছরের এক অমীমাংসিত ধাঁধা

    সিকান্দারের মৃত্যুর পরেই শুরু হয় আরেক রহস্যের। প্রাচীন ঐতিহাসিকদের বর্ণনা অনুযায়ী, টলেমি সিকান্দারের মরদেহ প্রথমে মধুতে সংরক্ষিত অবস্থায় একটি সোনার শবাধারে করে মিশরের মেমফিসে নিয়ে যান, পরে তা আলেকজান্দ্রিয়ায় এক দৃষ্টিনন্দন মন্দির ‘সোমা’-তে সমাহিত করা হয়。

    জুলিয়াস সিজার থেকে শুরু করে রোমান সম্রাট কারাকাল্লা পর্যন্ত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বেরা সিকান্দারের কবর পরিদর্শন করেছেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। তারপর ৩৯২ খ্রিস্টাব্দে রোমান সম্রাট থিওডোসিয়াস প্যাগান উপাসনা নিষিদ্ধ করলে হুড পরা পুরোহিতরা সিকান্দারের দেহ সরিয়ে নিয়ে কোনো এক অজানা গহ্বরে লুকিয়ে ফেলেন। এরপরই ইতিহাস থেকে সিকান্দারের দেহাবশেষ নিখোঁজ হয়ে যায়।

    এখনো খোঁজ থামেনি। আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিকেরা ১৪০টিরও বেশি আনুষ্ঠানিক খননকাজ চালিয়েও এর কোনো সন্ধান পাননি। কেউ বলেন, ভেনিস শহরের সেন্ট মার্কস ব্যাসিলিকায় রাখা মমিটি ভুল করে আলেকজান্ডারের বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। আবার কেউ বলেন, ভার্জিনা বা আম্ফিপোলিসে প্রাপ্ত সমাধিগুলোর কোনোটিতেই সিকান্দার শায়িত আছেন।

    কিংবদন্তি ও রূপকথার সিকান্দার—আরব্য উপাখ্যানে ‘যুলকারনাইন’

    ইসলামী ও পারসিক ঐতিহ্যে সিকান্দার এক অদ্ভুত রূপ পরিগ্রহ করেছেন। আরবি ও ফারসি সাহিত্যে সিকান্দার ‘যুলকারনাইন’ বা ‘দুই শিংওয়ালা’ নামে পরিচিত। কোরআনের সূরা কাহাফ-এ উল্লিখিত ‘যুলকারনাইন’ চরিত্রটিকে অনেক ঐতিহাসিক আলেকজান্ডার বলে চিহ্নিত করেন। ফেরদৌসীর শাহনামা এবং নিজামীর ইস্কান্দারনামায় সিকান্দারকে এক মুসলিম বীর ও নবী হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, যিনি সত্যের প্রচারক এবং আল্লাহর বিশেষ বরপ্রাপ্ত।

    এই গল্পগুলোতে সিকান্দার ‘অন্ধকারের দেশে’ গিয়ে ‘আবে-হায়াত’ বা অমৃতের পানির সন্ধান করেন, যা পুরোপুরি রূপকথার পর্যায়ে উন্নীত। এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি সংস্কৃতিই সিকান্দারকে নিজেদের মতো করে চিত্রিত করেছে, যা প্রমাণ করে তিনি নিছক একজন বিজেতা নন, বরং একটি কালোত্তীর্ণ প্রতীক।

    জিউস-আম্মোনের পুত্র

    মিশর জয়ের পর সিকান্দার দুর্গম লিবিয়ান মরুভূমির সিওয়া মরূদ্যানে অবস্থিত দেবতা জিউস-আম্মোনের মন্দিরে উপস্থিত হন। মরুযাত্রা ছিল বিপজ্জনক। জনশ্রুতি আছে, পথে বালিঝড়ের সময় দুটি কাক অবিশ্বাস্যভাবে সেনাদলকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়। মন্দিরের প্রধান পুরোহিত সিকান্দারকে ‘জিউসের পুত্র’ বলে সম্বোধন করেছিলেন।

    এই ঘটনা সিকান্দারের ব্যক্তিত্বে এক বিপজ্জনক পরিবর্তন আনে। তিনি তখন থেকেই মুদ্রায় নিজের মাথায় মেষের শিং (অ্যামোনের প্রতীক) খোদাই করতে শুরু করেন। পূর্বের গ্রিক বিশ্বাস ছিল, কোনো মানুষই ঈশ্বর হতে পারে না। কিন্তু প্রাচ্যের শাসকরা ঈশ্বরের মর্যাদা পান। প্রাচ্যে গিয়ে সিকান্দারও নিজেকে সেই ঈশ্বরতুল্য মর্ত্যে রূপ দিতে চেয়েছিলেন, যা তাঁর গ্রিক সেনাপতিদের চরম ক্ষুব্ধ করে তোলে।

    অজানা অজানা কিছু কথা

    • সিকান্দারের এক চোখ ছিল নীল, আরেক চোখ ছিল বাদামি। প্রাচীন গ্রন্থে উল্লেখ আছে, তিনি অস্বাভাবিক মিষ্টি গন্ধযুক্ত শরীরের অধিকারী ছিলেন।

    • সিকান্দার সবেমাত্র ১৬ বছর বয়সে প্রথম যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে এক বিদ্রোহী গোত্রকে পরাস্ত করেন এবং সেখানেই প্রথম নগর গড়েন ‘আলেকজান্দ্রোপলিস’।

    • জীবনে কখনো একটি মাত্র যুদ্ধেও পরাজিত হননি এই যোদ্ধা—একটি রেকর্ড যা নেপোলিয়ন বোনাপার্টের পক্ষেও বলা সম্ভব নয়।

    • সিকান্দার প্রায় ৭০টির মতো শহর প্রতিষ্ঠা করেন, যার অনেকগুলোর নামই ছিল ‘আলেকজান্দ্রিয়া’।

    • বিখ্যাত দার্শনিক ডায়োজিনিসের সাথে দেখা করার সময় সিকান্দারের বয়স ছিল মাত্র ২২ বছর। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, ডায়োজিনিস স্তূপীকৃত মানুষের হাড়ের মধ্যে কিছু খুঁজছিলেন। জিজ্ঞাসা করায় বলেছিলেন, “আমি তোমার বাবার হাড় খুঁজছি, কিন্তু কোনটি দাসের আর কোনটি স্বাধীন—পার্থক্য করতে পারছি না।” এই ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য সিকান্দারের বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের ভাবনায় রেখাপাত করেছিল।

    গ্রিক বর্মে মোড়া এক বিষণ্ণ আত্মা

    সিকান্দারের জীবন নিয়ে যতই কথা বলা হোক না কেন, তা শেষ হবার নয়। তিনি একই সাথে নির্মম গণহত্যাকারী এবং সংস্কৃতির সেতু নির্মাতা। তিনি নিজেকে ঈশ্বর ভাবতেন, অথচ তাঁর শেষ ইচ্ছা ছিল তাঁর দেহ যেন নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়, যাতে সবাই ভাবে তিনি স্বর্গে ফিরে গেছেন।

    বহুকাল আগে এক ভারতীয় জ্ঞানী সিকান্দারকে বলেছিলেন: “রাজন, তুমি যে ভূমি দখল করছো, তা তোমার মৃত্যুর পর তোমার দুই পায়ের চেয়ে বেশি জায়গা নেবে না।” সিকান্দারের পুরো জীবন যেন সেই এক অমোঘ সত্যের জন্য এক দীর্ঘ, রক্তাক্ত এবং বেদনাদায়ক অনুসন্ধান। বিজয়ীর বেশে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি হয়তো নিজের ভেতরেই লুকিয়ে থাকা শূন্যতাকে জয় করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই জয়ের পথটি যে পৃথিবীর বুক চিরে যায়, সেটি যেন তাঁর অজানাই থেকে গেল।

    আরও পড়ুন - ব্ল্যাক ডেথ মহামারী

    একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

    নবীনতর পূর্বতন

    نموذج الاتصال