ইতিহাসের বাতিঘরে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট এক বিস্ময়কর নাম। একজন সামান্য কর্সিকান অভিবাসী, যিনি নিজ প্রতিভা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও লৌহ ইচ্ছাশক্তির বলে মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে ফ্রান্সের শাসনক্ষমতা দখল করে সমগ্র ইউরোপকে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অপরাজেয় এক কৌশলবিদ; রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি ছিলেন আধুনিক ইউরোপের স্থপতি। কিন্তু এই লৌহ মানবের বুকের ভেতরেও বাস করত এক তীব্র আবেগী ও দুর্বল প্রেমিক। নেপোলিয়নের সমগ্র রাজনৈতিক জীবন যেন ছিল তাঁর হৃদয়ের টানাপোড়েনেরই প্রতিচ্ছবি। এই ব্লগ পোস্টে আমরা নেপোলিয়নের জীবনের সেই দুই প্রধান স্রোত— প্রেম ও রাজনীতি— কীভাবে একে অপরের পরিপূরক, আবার কখনো প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে তাঁর জীবনের গতিপথ নির্ধারণ করেছিল, তার এক গভীর বিশ্লেষণ করব।
প্রথম প্রেম ও প্রথম ক্ষত: জোসেফাইনের উত্থান
১৭৯৬ সালের প্যারিস। বিপ্লব-উত্তর ফ্রান্সের বিশৃঙ্খল সমাজে এক তরুণ জেনারেল সবেমাত্র খ্যাতির শিখরে পা রেখেছেন। ২৬ বছর বয়সী নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সাথে পরিচয় হলো ৩২ বছর বয়সী এক বিধবা নারীর— মেরি জোসেফ রোজ ট্যাশার দ্য লা পাজেরি, যাকে ইতিহাস চেনে জোসেফাইন দ্য বোহারনে নামে। জোসেফাইন ছিলেন অভিজাত বংশোদ্ভূত, দুই সন্তানের জননী এবং ফরাসি উচ্চসমাজে পরিচিত এক চতুর ও মার্জিত নারী। বয়স, অভিজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থানের এই পার্থক্য কোনো বাধাই হতে পারেনি নেপোলিয়নের কাছে। তিনি জোসেফাইনকে ভালোবেসেছিলেন এক অন্ধ, প্রায় উন্মাদ আসক্তির মতো।
নেপোলিয়নের প্রেম ছিল অত্যন্ত আবেগী, প্রায় কিশোরসুলভ। যুদ্ধাভিযানের ব্যস্ততম মুহূর্তেও তিনি জোসেফাইনকে লম্বা লম্বা চিঠি লিখতেন, যার প্রতিটি বাক্যে ফুটে থাকত গভীর আকুতি ও ব্যাকুলতা। ১৭৯৬ সালে ইতালি অভিযানের সময় তিনি লিখেছিলেন: "আমি তোমাকে ছাড়া একটি দিনও কাটাতে পারি না... তুমি না থাকলে প্রকৃতি তার সমস্ত সৌন্দর্য হারায়।" যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফেরার প্রতিটি মুহূর্ত তিনি গুনতেন জোসেফাইনের মুখ দেখার আশায়। অথচ জোসেফাইন কখনোই তাঁর এই অপরিমেয় ভালোবাসার সমান প্রতিদান দেননি। নেপোলিয়নের চোখে তিনি ছিলেন এক দেবী; কিন্তু জোসেফাইনের কাছে নেপোলিয়ন ছিলেন এক উত্থানশীল তারকা, যাঁর সঙ্গে বিবাহ তাঁকে অভিজাত সমাজে স্থায়ী আসন করে দিয়েছিল, কিন্তু যাঁর প্রতি তাঁর হৃদয়ের টান ছিল সীমিত। নেপোলিয়ন যখন মিশরের মরুভূমিতে ফ্রান্সের সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বপ্ন বুনছিলেন, তখন প্যারিসে জোসেফাইন অন্য পুরুষের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লেন। ১৭৯৯ সালে নেপোলিয়ন যখন এই বিশ্বাসঘাতকতার খবর পেলেন, তাঁর প্রতিক্রিয়া ছিল আগ্নেয়গিরির উদগীরণের মতো। ক্রোধ, অপমান আর গভীর যন্ত্রণা তাঁকে গ্রাস করল। তিনি জোসেফাইনকে তালাক দিতে চাইলেন, কিন্তু শেষপর্যন্ত ক্ষমা করলেন— অন্তত বাহ্যিকভাবে।
এই ক্ষমার পেছনে রাজনৈতিক হিসাবও ছিল। জোসেফাইন প্যারিসের উচ্চ সমাজে নেপোলিয়নের পদচারণা মসৃণ করেছিলেন। তিনি জানতেন কীভাবে অভিজাতদের সাথে মিশতে হয়, কীভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়তে হয়। প্রথম কনসাল এবং পরবর্তীতে সম্রাট হিসেবে নেপোলিয়নের অভিষেকে জোসেফাইন ছিলেন তাঁর পাশে, সম্রাজ্ঞীর ভূমিকায়। ১৮০৪ সালে নেপোলিয়ন নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করলে, জোসেফাইনকেও তিনি নিজ হাতে মুকুট পরিয়ে দেন— এক অনন্য দৃশ্য, যা ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে আছে।
কিন্তু এই দাম্পত্যের ভেতরে ফাটল ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছিল। জোসেফাইন নেপোলিয়নের কোনো উত্তরাধিকারী জন্ম দিতে সক্ষম হননি। অন্যদিকে, নেপোলিয়নের সাম্রাজ্য যখন ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে, তখন বোনাপার্ট রাজবংশের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার জন্য এক রক্তসম্পর্কীয় উত্তরাধিকারীর প্রয়োজনীয়তা রাজনৈতিক অপরিহার্যতা হয়ে দাঁড়ালো।
রাজনীতির কাছে প্রেমের আত্মসমর্পণ: জোসেফাইনের সাথে বিচ্ছেদ
১৮০৯ সালের শেষভাগে এসে নেপোলিয়নের সামনে এক কঠিন সিদ্ধান্ত উপস্থিত হলো। একদিকে তাঁর জীবনের সবচেয়ে গভীর প্রেম, অন্যদিকে তাঁর গড়া সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ। দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর রাজনীতি জয়ী হলো। নেপোলিয়ন জোসেফাইনকে জানালেন যে, ফ্রান্সের স্বার্থে তাঁকে ত্যাগ করতে হবে। এই বিচ্ছেদের দৃশ্যটি ছিল মর্মান্তিক। প্রাসাদের লাল স্যালনে দাঁড়িয়ে জোসেফাইন যখন বিবাহবিচ্ছেদের কাগজ পড়তে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন, নেপোলিয়নের বুকেও তখন ঝড় বইছিল। তিনি জোসেফাইনকে বলেছিলেন, "আমি চাই তুমি সবসময় আমার হৃদয়ের সম্রাজ্ঞী হয়ে থাকো, কিন্তু রাষ্ট্রের প্রয়োজনে আমাকে অন্য পথ বেছে নিতে হবে।"
১৮১০ সালের জানুয়ারিতে তাঁদের বিচ্ছেদ চূড়ান্ত হয়। নেপোলিয়ন জোসেফাইনকে নাভারার ডাচেস উপাধি দেন, বিপুল ভাতা বরাদ্দ করেন এবং মালমেইসন প্রাসাদে তাঁর বিলাসবহুল জীবনের ব্যবস্থা করে যান। কিন্তু আবেগের বাঁধন ছিন্ন করা অত সহজ ছিল না। বলা হয়, বিচ্ছেদের পরেও নেপোলিয়ন নিভৃতে জোসেফাইনের প্রাসাদে যেতেন; তাঁর কাছেই তিনি মনের কথা বলতেন। জোসেফাইন মারা যান ১৮১৪ সালের মে মাসে, নেপোলিয়নের প্রথম পতনের কিছুদিন পরেই। নির্বাসিত অবস্থায় যখন নেপোলিয়ন এই খবর পেয়েছিলেন, তিনি দুদিন খাবার স্পর্শ করেননি। এলবা দ্বীপ থেকে তিনি লিখেছিলেন, "সে-ই একমাত্র নারী যাকে আমি সত্যিই ভালোবেসেছিলাম।"
হ্যাপসবার্গের রাজকন্যা: রাজনৈতিক বিবাহের স্বর্ণমুদ্রা
জোসেফাইনের সাথে বিচ্ছেদের পর নেপোলিয়নের সামনে সুযোগ আসে ইউরোপের প্রাচীনতম ও সর্বোচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন রাজবংশ হ্যাপসবার্গের সাথে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হওয়ার। অস্ট্রিয়ার সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রান্সিসের কন্যা আর্চডাচেস মারি লুইস তখন মাত্র ১৮ বছর বয়সী তরুণী। নেপোলিয়নের বয়স তখন ৪০। ১৮১০ সালে এই বিবাহ সম্পন্ন হয়— যা ছিল সম্পূর্ণরূপে এক রাজনৈতিক চুক্তি। মারি লুইসের জন্য নেপোলিয়ন ছিলেন সেই দানব, যিনি তাঁর দেশের পরাজয়ের কারণ; অথচ রাষ্ট্রীয় চাপে তিনি এই বিবাহে সম্মত হন।
এই বিবাহের মধ্য দিয়ে নেপোলিয়ন কয়েকটি রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে চেয়েছিলেন। প্রথমত, একটি রক্তসম্পর্কীয় উত্তরাধিকারী লাভ। দ্বিতীয়ত, হ্যাপসবার্গ রাজবংশের সাথে বৈবাহিক সূত্রে নিজের সাম্রাজ্যের বৈধতা ও মর্যাদা বৃদ্ধি— কারণ ইউরোপীয় রাজন্যবর্গ তখনো নেপোলিয়নকে একজন "উচ্চাকাঙ্ক্ষী সেনা" ছাড়া কিছুই মনে করতেন না। তৃতীয়ত, অস্ট্রিয়ার সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখা। প্রথম লক্ষ্যটি অচিরেই পূরণ হয়। ১৮১১ সালে মারি লুইস এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেন, যাকে নেপোলিয়ন "রোমের রাজা" উপাধি দেন এবং ভবিষ্যতের উত্তরাধিকারী হিসেবে ঘোষণা করেন।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল নিষ্ঠুর। মারি লুইস কখনোই নেপোলিয়নকে ভালোবাসতে পারেননি। তিনি ছিলেন শীতল, নীরব ও কর্তব্যপরায়ণ— কিন্তু নেপোলিয়নের নাটকীয় প্রেমের ভাষা তাঁর হৃদয় স্পর্শ করতে পারেনি। রাজনৈতিক দিক থেকেও এই বিবাহ নেপোলিয়নের আশানুরূপ ফল দেয়নি। ১৮১২ সালে রাশিয়া অভিযানে তিনি যখন শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলেন, মারি লুইসের পিতা অস্ট্রিয়া আবারও নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে মিত্রশক্তির সাথে যোগ দিলেন। ১৮১৪ সালে নেপোলিয়নের পতনের পর, মারি লুইস দ্রুতই স্বামীর সঙ্গ ত্যাগ করে পিতার কাছে ফিরে গেলেন এবং পরে অন্য পুরুষকে বিবাহ করলেন। নেপোলিয়নের মৃত্যুর পরও তিনি নির্বাসিত স্বামীর কোনো খোঁজ নেননি— ইতিহাস যাকে মনে রেখেছে এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা হিসেবে।
আরও পড়ুন -
রাজনীতির মঞ্চে নেপোলিয়ন: কূটনীতি, কৌশল ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা
নেপোলিয়নের রাজনৈতিক জীবন ছিল একাধারে বিস্ময়কর উত্থান ও করুণ পতনের মহাকাব্য। ফরাসি বিপ্লবের বিশৃঙ্খল সময়ে তিনি প্রথম আলোচনায় আসেন ১৭৯৩ সালে টুলনের যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীকে পরাজিত করে। এরপর শুরু হয় এক দুর্বার গতি। ১৭৯৬ সালে ইতালি অভিযানের সাফল্য তাঁকে ফ্রান্সের সবচেয়ে জনপ্রিয় সেনানায়কে পরিণত করে। ১৭৯৯ সালে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি ফ্রান্সের প্রথম কনসাল হন। ১৮০৪ সালে নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করে তিনি এক স্বৈরাচারী কিন্তু দক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলেন।
নেপোলিয়নের রাজনৈতিক দর্শনে যুদ্ধ ও কূটনীতি ছিল একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। তিনি যখনই কোনো অঞ্চল জয় করতেন, তখনই সেখানে ফরাসি আইন, প্রশাসনিক সংস্কার এবং আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করতেন। তাঁর বিখ্যাত "নেপোলিয়নিক কোড" আজও ইউরোপের আইনব্যবস্থার ভিত্তি। কিন্তু এসব সংস্কারের আড়ালে ছিল এক স্পষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য: বোনাপার্ট রাজবংশের অধীনে সমগ্র ইউরোপকে একত্রিত করা।
নেপোলিয়নের রাজনৈতিক কৌশলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর গতির বিস্ময়। শত্রুপক্ষ প্রতিক্রিয়া জানানোর আগেই তিনি আক্রমণ করে বসতেন। অস্টারলিৎসের যুদ্ধ (১৮০৫) ছিল এর চরম উদাহরণ, যেখানে তিনি রাশিয়া ও অস্ট্রিয়ার সম্মিলিত বাহিনীকে কৌশলে ফাঁদে ফেলে ধ্বংস করেছিলেন। কিন্তু এই সাফল্যই কালক্রমে তাঁর পতনের বীজ বপন করেছিল। নিজের অপরাজেয়তার মিথে বিশ্বাসী হয়ে তিনি অসম্ভবকে সম্ভব করতে গিয়ে বারবার ভুল সিদ্ধান্ত নেন।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভুলগুলোর একটি ছিল ১৮১২ সালের রাশিয়া অভিযান। কূটনৈতিক চাপ ও অর্থনৈতিক অবরোধের পরিবর্তে তিনি রাশিয়ার বিশাল ভূখণ্ডে সেনাবাহিনী পাঠান, যা শীত, রোগ ও গেরিলা আক্রমণে ধ্বংস হয়ে যায়। ছয় লাখ সেনার মধ্যে মাত্র কুড়ি হাজার ফিরে আসতে পেরেছিল। এই বিপর্যয়ের পরই ইউরোপীয় শক্তিগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ১৮১৩ সালে লাইপজিগের যুদ্ধে পরাজয়ের পর ১৮১৪ সালে তিনি প্রথমবার সিংহাসনচ্যুত হয়ে এলবা দ্বীপে নির্বাসিত হন। ১৮১৫ সালে তিনি পুনরায় ফ্রান্সে ফিরে আসেন এবং "শত দিনের" রাজত্ব কায়েম করেন, কিন্তু ওয়াটারলুর যুদ্ধে চূড়ান্ত পরাজয়ের মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের যবনিকা পতন ঘটে।
প্রেম ও রাজনীতির মোহনায়: এক জীবনের সমীকরণ
নেপোলিয়নের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাঁর প্রেম ও রাজনীতি ছিল অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। জোসেফাইনের সাথে তাঁর সম্পর্কের শুরুটা ছিল নিখাদ আবেগের, কিন্তু তাতেও রাজনীতি মিশে ছিল— কারণ জোসেফাইনের উচ্চ সমাজের সংযোগ নেপোলিয়নের ক্ষমতারোহণকে সহজ করেছিল। আবার জোসেফাইনের প্রতি তাঁর অন্ধ ভালোবাসাই তাঁকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে দুর্বল করেছিল। ১৭৯৯ সালে মিশর থেকে ফিরে তিনি যে অভ্যুত্থান ঘটান, তার পেছনে জোসেফাইনের প্রতি ক্রোধ ও প্রতিশোধস্পৃহাও কিছুটা কাজ করেছিল— তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে জোসেফাইন যাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, তিনিই ফ্রান্সের সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তি।
অন্যদিকে, মারি লুইসের সাথে তাঁর বিবাহ ছিল পুরোপুরি রাজনৈতিক হিসাবের ফসল। কিন্তু এই বিবাহই প্রমাণ করে যে, রাজনীতির জন্য প্রেম বিসর্জন দিলেও রাজনীতি নেপোলিয়নের প্রতি অনুগ্রহশীল হয়নি। হ্যাপসবার্গের সাথে সম্বন্ধ স্থাপনের পরেও অস্ট্রিয়া তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিল; মারি লুইস কখনোই তাঁর অনুগত স্ত্রী হয়ে ওঠেননি। এই ব্যর্থতা প্রমাণ করে যে, নেপোলিয়নের জীবন ছিল দুই বিপরীত শক্তির টানাপোড়েনের ক্ষেত্র— একদিকে হৃদয়ের গভীর প্রেমের আকুতি, অন্যদিকে সিংহাসনের জন্য অদম্য লোভ। এই দুই শক্তির দ্বন্দ্বে তিনি কখনো প্রেমিক হিসেবে পরাজিত হয়েছেন, কখনো সম্রাট হিসেবে; কিন্তু শেষপর্যন্ত এই দ্বন্দ্বই তাঁর জীবনকে মহাকাব্যিক মর্যাদায় উন্নীত করেছে।
নেপোলিয়নের ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিল বুনোট
জোসেফাইন ও মারি লুইস ছাড়াও নেপোলিয়নের জীবনে আরও কয়েকটি নারীর আগমন ঘটেছিল, যাঁরা রাজনৈতিক বা আবেগীয় কারণে তাঁর জীবনে প্রভাব ফেলেছিলেন। পোলিশ কাউন্টেস মারিয়া ওয়ালেভস্কা ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। ১৮০৭ সালে পোল্যান্ডে নেপোলিয়নের সাথে তাঁর পরিচয় হয়। ওয়ালেভস্কা ছিলেন এক অনুগত দেশপ্রেমী, যিনি পোল্যান্ডের স্বাধীনতার আশায় নেপোলিয়নের কাছে আসেন। নেপোলিয়ন তাঁর প্রেমে পড়েছিলেন এবং ওয়ালেভস্কা পরবর্তীকালে নেপোলিয়নের এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন— আলেক্সান্ডার ওয়ালেভস্কি, যিনি পরে ফ্রান্সের বিশিষ্ট কূটনীতিক হয়েছিলেন। ওয়ালেভস্কাই সম্ভবত একমাত্র নারী যিনি নেপোলিয়নকে কোনো রাজনৈতিক চাওয়া ছাড়াই, অকৃত্রিমভাবে ভালোবেসেছিলেন। নির্বাসিত অবস্থায় এলবা থেকে ফেরার সময় ওয়ালেভস্কাই তাঁকে অর্থ সাহায্য করেছিলেন।
নেপোলিয়নের প্রথম প্রেমের গল্পও ছিল কম নাটকীয় নয়। মার্সেই শহরে কিশোর বয়সে তিনি দেজিরে ক্লারির প্রেমে পড়েছিলেন, যার বোন জুলি ক্লারি ছিলেন নেপোলিয়নের ভাই জোসেফ বোনাপার্টের স্ত্রী। দেজিরে নেপোলিয়নের বাগদত্তা ছিলেন, কিন্তু প্যারিসে এসে নেপোলিয়ন যখন জোসেফাইনের প্রেমে ডুবে গেলেন, দেজিরেকে ত্যাগ করলেন। ইতিহাসের নির্মম পরিহাস— দেজিরে ক্লারি পরে বিবাহ করেন জাঁ-ব্যাপটিস্ট বের্নাদোতকে, যিনি ১৮১৮ সালে সুইডেনের রাজা হন। অর্থাৎ, নেপোলিয়ন যে নারীকে ত্যাগ করেছিলেন, সেই নারীই হয়ে গেলেন আরেক দেশের রানি। এই সম্পর্ক নেপোলিয়নের রাজনৈতিক জীবনে বারবার ফিরে এসেছিল, কারণ বের্নাদোত পরবর্তীতে নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে মিত্রশক্তির হয়ে অস্ত্র ধরেছিলেন।
প্রেমপত্র: ইতিহাসের নথিপত্রে ভালোবাসার ভাষা
নেপোলিয়নের লেখা প্রেমপত্র ইউরোপীয় সাহিত্য ও ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ। এসব চিঠিতে ফুটে উঠেছে একদিকে প্রচণ্ড আবেগী প্রেমিকের প্রতিকৃতি, অন্যদিকে এক চঞ্চল, অধৈর্য, প্রায় অসুস্থ ভালোবাসার দলিল। ১৭৯৬ সালের ডিসেম্বরে ইতালির মিলান থেকে তিনি জোসেফাইনকে লেখেন: "আমি তোমাকে চুমু খাচ্ছি, হাজার বার চুমু খাচ্ছি... কিন্তু তুমি আমাকে দিচ্ছ না!... কী অদ্ভুত ক্ষমতা তোমার, আমার সমগ্র আত্মাকে আচ্ছন্ন করে রাখার!"
কিন্তু এই চিঠিগুলোর মধ্যেও রাজনৈতিক চেতনার প্রকাশ লক্ষণীয়। তিনি প্রায়ই জোসেফাইনকে নির্দেশ দিতেন কোন রাজনীতিবিদের সাথে কীভাবে আচরণ করতে হবে, কাকে উপেক্ষা করতে হবে, কাকে কাছে টানতে হবে। অর্থাৎ, নেপোলিয়নের প্রেমপত্রও ছিল এক ধরণের রাজনৈতিক দলিল। অন্যদিকে, জোসেফাইনের উত্তর ছিল সংক্ষিপ্ত, বিক্ষিপ্ত ও উদাসীনতায় ভরা— যা নেপোলিয়নকে আরও উন্মাদ করে তুলত।
শেষ অধ্যায়: সেন্ট হেলেনার নিঃসঙ্গ সম্রাট
১৮১৫ সালের ওয়াটারলুর যুদ্ধের পর নেপোলিয়ন ব্রিটিশদের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এবার তাঁকে আর ইউরোপের কোথাও রাখা হলো না; পাঠানো হলো দক্ষিণ আটলান্টিকের দুর্গম দ্বীপ সেন্ট হেলেনায়। এখানেই কেটেছে তাঁর জীবনের শেষ ছয় বছর— এক নিঃসঙ্গ, গ্লানিময় অস্তিত্ব, যেখানে ক্ষমতা ছিল না, প্রেম ছিল না, ছিল শুধু স্মৃতি আর অনুশোচনা।
এই নির্বাসিত জীবনে তিনি প্রায়ই জোসেফাইনের কথা ভাবতেন। তাঁর ঘরে জোসেফাইনের একটি ক্ষুদ্র প্রতিকৃতি ছিল। একবার এক দর্শনার্থী সেই প্রতিকৃতি দেখে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, "মহারাজ, এ কি আপনার স্ত্রী?" নেপোলিয়ন উত্তর দিয়েছিলেন, "না, এ আমার প্রেমিকা— যে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি এবং সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল।"
সেন্ট হেলেনায় নেপোলিয়ন স্মৃতিকথা লিখতে শুরু করেন, যেখানে তিনি তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এসব লেখাতেও জোসেফাইনের উল্লেখ বারবার এসেছে। ১৮২১ সালের ৫ মে, মৃত্যুশয্যায় তাঁর শেষ উচ্চারিত শব্দগুলোর মধ্যে ছিল "ফ্রান্স... সেনাবাহিনী... সেনাপ্রধান... জোসেফাইন..."— মৃত্যুর আগে সম্রাট ফিরে গিয়েছিলেন তাঁর জীবনের দুই প্রধান প্রেমে: স্বদেশ ও সেই এক নারী, যাকে তিনি কখনোই ভুলতে পারেননি।
এক অনন্য জীবনের শিক্ষা
নেপোলিয়নের জীবন আমাদের শেখায় যে, প্রেম ও রাজনীতি মানুষের জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী দুই চালিকা শক্তি, কিন্তু এরা পরস্পরের পরিপূরক নয়; বরং এক অদৃশ্য যুদ্ধে লিপ্ত থাকে। নেপোলিয়ন যখনই প্রেমের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন, রাজনীতি তাঁকে ধোঁকা দিয়েছে; আর যখনই রাজনীতির জন্য প্রেম বিসর্জন দিয়েছেন, তখনই তাঁর আত্মা ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। এই দ্বন্দ্বই নেপোলিয়নের জীবনের ট্র্যাজেডি, আর এই ট্র্যাজেডিই তাঁকে শুধু একজন সম্রাট বা সেনাপতি হিসেবে নয়, বরং একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে ইতিহাসের পাতায় অমর করে রেখেছে।
আরও পড়ুন -
