কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি

    গুহাচিত্র: কেন আঁকতেন তাঁরা

    গুহাচিত্র: কেন আঁকতেন তাঁরা

    কল্পনা করুন, আপনি একটি সরু, আঁধার পাথুরে গলির মধ্যে দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে চলেছেন। চারপাশে নিকষ কালো অন্ধকার। শুধু আপনার হাতের মশালের ক্ষীণ আলোয় ভেসে উঠছে গুহার ভেজা দেওয়াল। হঠাৎ, সেই আলো এসে পড়ল দেওয়ালের এক বাঁকে, আর আপনি থমকে দাঁড়ালেন। আপনার চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে একদল বাইসন, বুনো ঘোড়া, আর বিশাল দেহের এক ম্যামথ। তারা যেন ছুটে চলেছে, লাফিয়ে উঠছে, যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি তাদের পাথরের ভেতরেও প্রাণ দিয়েছে। আপনার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। আপনি বুঝতে পারলেন, আপনি একা নন— হাজার হাজার বছর আগের এক শিল্পী তাঁর মনের গহীন থেকে কিছু একটা কথা বলে গেছেন এই ছবির মাধ্যমে। এটাই গুহাচিত্রের জাদু। কিন্তু প্রশ্ন হল, কেন? কেন এই অদ্ভুত, দুর্গম, নিকাশ কালো গুহার গভীরে তাঁরা এঁকেছিলেন এই অপরূপ সব ছবি? এ কি ছিল জাদু, নাকি গল্প বলার অদম্য তাড়না?

    এই প্রশ্ন আজও বিজ্ঞানী, নৃতত্ত্ববিদ, শিল্পী এবং ইতিহাসবিদদের তাড়িয়ে বেড়ায়। আজ আমরা সেই প্রাচীন মানব মনের গহীনে এক গভীর ডুব দেব, খুঁজে বের করার চেষ্টা করব— কেন আঁকতেন তাঁরা?

    সময়ের অতলে হারানো এক ক্যানভাস: গুহাচিত্র কী ও কোথায়?

    গুহাচিত্র হলো প্রত্যক্ষ জ্ঞানের বাইরে এক জগতের জানালা। এগুলো পৃথিবীর প্রাচীনতম শিল্পকর্মগুলোর অন্যতম, যা উচ্চ-পুরা প্রস্তর যুগের (Upper Paleolithic) মানুষের সৃষ্টি। সময়টা আজ থেকে প্রায় ৪০,০০০ থেকে ১০,০০০ বছর আগে। ইউরোপের গভীর গুহাগুলো, আফ্রিকার পর্বতগাত্র, এশিয়ার গুহা-বসতি, অস্ট্রেলিয়ার রক শেল্টার— সর্বত্রই এই শিল্পকর্ম ছড়িয়ে আছে।

    যখন আমরা আলতামিরা (Altamira, স্পেন), লাস্কো (Lascaux, ফ্রান্স), শুভে (Chauvet, ফ্রান্স) প্রভৃতি গুহার নাম শুনি, তখন আমাদের মনে এক মহাজাগতিক বিস্ময় জাগে। লাস্কোর গুহার ছাদজুড়ে ছুটে চলা ষাঁড়, শুভে’র দেওয়ালে শ্বাসরুদ্ধকর সিংহের দল, অথবা ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপে সম্প্রতি আবিষ্কৃত ৪৫,৫০০ বছরের পুরনো বন্য শূকরের চিত্র— এগুলো সবই জানান দেয় যে, হোমো স্যাপিয়েন্সরা শুধু টিকে থাকার জন্যই ব্যস্ত ছিল না, বরং তাদের মনে ছিল এক অদম্য সৃজনশীলতা।

    বিষয়বস্তু ছিল বিশালাকার তৃণভোজী প্রাণী— বাইসন, হরিণ, ঘোড়া, ম্যামথ, গণ্ডার। মাঝে মাঝে দেখা যায় হাতের ছাপ, যা লাল বা কালো রঙে দেওয়ালে চাপা। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, মানুষ নিজের ছবি তারা আঁকেনি বললেই চলে (বিরল কিছু স্টিক-ফিগার, যেমন লাস্কোর “পাখি-মাথাওয়ালা মানুষ” ছাড়া)। তারা আঁকেনি তাদের আবাসস্থল, পাহাড়, নদী, গাছপালা বা আকাশ। কেন?

    এই নির্বাচনী দৃষ্টিভঙ্গিই বলে দেয় এগুলো নিছক ‘নিসর্গচিত্র’ বা ‘স্মৃতিচিহ্ন’ নয়। এর পেছনে ছিল জটিলতর এক চিন্তা। আর এখান থেকেই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত— জাদু (Sympathetic Magic) নাকি গল্প (Narrative & Shamanism)?

    শিকারের জাদু ও প্রতীকী তন্ত্র: অ্যাবে ব্রুইল-এর শিকার তত্ত্ব

    গুহাচিত্রের পেছনের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রথম বলিষ্ঠ ও প্রভাবশালী তত্ত্বটি দেন ফরাসি ধর্মযাজক ও প্রত্নতত্ত্ববিদ অ্যাবে হেনরি ব্রুইল (Abbé Henri Breuil)। ২০শ শতকের শুরুতে তিনি ‘শিকার জাদু’ বা ‘সিমপ্যাথেটিক ম্যাজিক’ তত্ত্বের প্রচার করেন। এটি এতটাই শক্তিশালী একটি ধারণা ছিল যে, প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে একে অকাট্য সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছিল।

    ব্রুইল-এর মতে, এই ছবিগুলো ছিল প্রাচীন শিকারিদের এক ধরণের জাদুকরী আচার। যুক্তিটি ছিল সরল কিন্তু আকর্ষণীয়:

    1. সাদৃশ্যের জাদু (Law of Similarity): গুহার দেওয়ালে যদি একটি বাইসন এঁকে তাতে বর্শা বিদ্ধ করা যায়, তাহলে বাস্তবেও সেই প্রাণীটি শিকার করা সহজ হবে। ছবির প্রাণীটি বাস্তব প্রাণীটির একটি ‘ভুডু ডল’-এর মতো কাজ করত।

    2. দুর্গম অবস্থান: বেশিরভাগ এই ছবিই আঁকা হয়েছে গুহার একেবারে অন্ধকার, গভীর ও দুর্গম প্রকোষ্ঠে, যেখানে নিত্যদিনের বসবাসের কোনো চিহ্ন নেই। এর অর্থ, এগুলো নিছক সাজসজ্জা বা বিনোদনের জায়গা ছিল না, বরং ছিল পবিত্র ও গোপন আচারস্থল।

    3. প্রাণীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক: অনেক জায়গায় দেখা যায়, প্রাণীদের শরীরে তীর, বর্শা বা এক ধরণের জাদুকরী কাটা-ছেঁড়া চিহ্ন। লাস্কোতে পাওয়া বিখ্যাত “পাখি-মাথাওয়ালা মানুষ” ও আহত বাইসনের ছবিটিকে ব্রুইল ব্যাখ্যা করেছিলেন একটি শিকার দুর্ঘটনা ও তার জাদুকরী পুনর্নির্মাণ হিসেবে।

    এই তত্ত্বের যৌক্তিকতা কোথায়? প্রাচীন মানুষ ছিল শিকার-নির্ভর। তাদের টিকে থাকা নির্ভর করত শিকারের সফলতার ওপর। এই অনিশ্চিয়তা থেকে জন্ম নিত প্রবল দুশ্চিন্তার। সেই দুশ্চিন্তা মোকাবিলার জন্য তারা ছবির মাধ্যমে ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের এক ‘আত্মবিশ্বাসের মিথ্যে’ তৈরি করেছিল। এটি ছিল এক ধরণের মানসিক প্রস্তুতি, যেখানে পুরো গোত্র এক হয়ে আচার পালন করত, নিজেদের ভবিষ্যতের সাফল্যে আশ্বস্ত করত।

    কিন্তু ব্রুইলের তত্ত্ব কেন ভাঙল?
    পরবর্তীকালের গবেষণা এই তত্ত্বে বড় ফাটল ধরে। প্রথমত, প্রত্নতাত্ত্বিক খননে দেখা যায়, গুহাচিত্রে আঁকা প্রাণী ও গুহার বাইরে ফেলে আসা অস্থি-অবশেষের প্রাণীর মধ্যে মিল নেই বললেই চলে। অর্থাৎ, যা এঁকেছে, তা শিকার করেনি; যা শিকার করেছে, তা আঁকেনি। লাস্কোতে মূল খাদ্য ছিল রেইনডিয়ার, কিন্তু ছবিতে বাইসন ও ঘোড়া প্রাধান্য পেয়েছে। দ্বিতীয়ত, অনেক প্রাণীই অত্যন্ত ভয়ংকর, যেমন গুহা-সিংহ, গণ্ডার, ভাল্লুক— যাদের শিকার করা হতো না, বরং এড়িয়ে চলা হতো। তাহলে তাদের আঁকার প্রয়োজন কী ছিল? তৃতীয়ত, সব ছবিতেই যে সহিংসতার ছাপ আছে, তা নয়। অনেক প্রাণীকে শান্ত, গর্ভবতী বা চলন্ত অবস্থায় দেখা যায়।

    এই প্রশ্নগুলোই জন্ম দেয় এক ভিন্ন, জটিলতর তত্ত্বের— যা জাদু নয়, গল্প ও আধ্যাত্মিকতাকে গুরুত্ব দেয়।

    গল্প বলার অদম্য তাড়না: আখ্যান ও নৃতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা

    মানুষ কি শুধু খাদ্যের জন্যই সৃষ্টি করে? নৃতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ বলে, না। মানুষ বরাবরই একজন ‘গল্পবাজ’ প্রাণী। আধুনিক আফ্রিকার সান জনগোষ্ঠীর (যাদের বুশম্যান বলা হতো) শিল্পকর্মের সঙ্গে প্রাগৈতিহাসিক গুহাচিত্রের যে অসামান্য মিল, তা এই তত্ত্বকে জোরালো করেছে। এই তত্ত্ব বলে, গুহাচিত্র আদতে জগৎ ও জীবন সম্পর্কে গল্প বলার এক শক্তিশালী মাধ্যম।

    ক. টোটেমিজম ও বিশ্বজনীন শৃঙ্খলা:
    কিছু নৃতত্ত্ববিদের মতে, এই ছবিগুলো একেকটি গোত্রের টোটেমিক প্রতীক বা পৌরাণিক পূর্বপুরুষের প্রতিনিধিত্ব করে। বাইসন হয়তো কোনো গোত্রের কাছে শক্তির প্রতীক ছিল, ঘোড়া ছিল গতির। গুহার ভেতরে প্রবেশ করে সেই পৌরাণিক জগতে এক ধরণের তীর্থযাত্রা করা হতো। এই তত্ত্বে, গুহা হয়ে ওঠে এক মন্দির, এবং ছবিগুলো সেই মন্দিরের পবিত্র পাণ্ডুলিপি।

    খ. কসমিক থিম ও দেহভিত্তিক স্থাপত্য:
    গবেষকেরা দেখেছেন, গুহার নির্দিষ্ট স্থানে নির্দিষ্ট প্রাণী আঁকা হয়েছে। যেমন, লাস্কো গুহার “বাইসন হল”-এ বিশালাকার প্রাণীরা, আর সরু করিডোরে ছোট প্রাণী। অনেকের মতে, গুহার পুরো স্থাপত্যটাই একটি প্রাণীর দেহ কল্পনা করে সাজানো হয়েছে— যেখানে মুখ, জরায়ু ও গর্ভাশয় রয়েছে। ছবিগুলো তাই হয়তো ‘জন্ম-মৃত্যু-পুনর্জন্ম’-এর মহাজাগতিক চক্রেরই আখ্যান।

    গ. শিকার সাফল্যের গল্প (শিক্ষামূলক):
    সম্প্রতি কিছু বিজ্ঞানী আবার জাদুর বদলে ‘গল্পের’ মাধ্যমেই শিকার শিক্ষাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। তাদের মতে, একজন দক্ষ শিকারি আগুনের আলোয় ছবি দেখিয়ে তরুণদের শেখাতেন প্রাণীদের আচরণ, তাদের গতি-প্রকৃতি, কোন প্রাণীর কোন অঙ্গে আঘাত করলে তা দ্রুত মারা যায় ইত্যাদি। এটা ছিল প্রাচীন এক ডিজিটাল প্রেজেন্টেশন, একটি মাল্টিমিডিয়া লেসন প্ল্যান। আন্দোলিত মশালের আলোতে ছবিগুলো সত্যিই যেন প্রাণ পেত, যা শিক্ষাকে জীবন্ত করে তুলত।

    সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, শিল্প যদি শুধুই জাদু হতো, তাহলে তা হতো নিখাদ বাস্তবধর্মী নয়, সরল রৈখিক ছবি। কিন্তু গুহাচিত্রে আমরা দেখি বিস্ময়কর বাস্তববাদ, প্রাণীর অ্যানাটমির অসাধারণ জ্ঞান, এবং পরিণত শিল্পরুচি। এটি একা ‘জাদু’ বা ‘শিকার সফলতার’ মতো হীনার্থক আকাঙ্ক্ষা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এর পেছনে ছিল গভীর এক সৌন্দর্যবোধ ও ভাব প্রকাশের তাড়না।

    আরও পড়ুন - চাকা আবিষ্কারের গল্প

    চেতনার পরিবর্তিত অবস্থা ও শামানিক যাত্রা: লুইস-উইলিয়ামস-এর বিপ্লবী তত্ত্ব

    গুহাচিত্রের রহস্য ভেদ করার সবচেয়ে বিপ্লবী ও যুগান্তকারী তত্ত্বটি এসেছে বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রত্নতত্ত্ববিদ ডেভিড লুইস-উইলিয়ামস (David Lewis-Williams) এর কাছ থেকে। তাঁর নিউরোসাইকোলজিক্যাল মডেল এই শিল্পের ব্যাখ্যায় সম্পূর্ণ নতুন এক দিগন্ত খুলে দেয়। তিনি বলেন, এটি শুধু জাদু নয়, শুধু গল্প নয়, এটি ছিল এক ধরণের শামানিক দর্শন বা আধ্যাত্মিক যাত্রা

    তিনি সান জনগোষ্ঠীর শিল্প ও তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে গুহাচিত্রের অসাধারণ মিল খুঁজে পান। সানের শামানরা ট্রান্স বা চেতনার পরিবর্তিত অবস্থায় (Altered States of Consciousness - ASC) গিয়ে বিশ্বাস করতেন যে, তারা আত্মিক জগতে প্রবেশ করছেন। লুইস-উইলিয়ামসের মডেলটি ব্যাখ্যা করে, কিভাবে আমাদের মস্তিষ্কের নিজস্ব জৈবিক গঠন এই ছবিগুলো তৈরি করেছে।

    চেতনার তিন ধাপ ও গুহাচিত্রের সম্পর্ক:

    1. প্রথম ধাপ (Entoptic Phenomena): যখন কেউ ট্রান্সে যায় (নৃত্যের ক্লান্তি, উপবাস, সাইকোট্রপিক ড্রাগ বা সংবেদনহীনতার মাধ্যমে), তখন প্রথমে সে চোখের ভেতরেই জ্যামিতিক আলোর ফসফিন (Phosphenes) দেখে— গ্রিড, জিগজ্যাগ, বিন্দু, সর্পিল ইত্যাদি। গুহাচিত্রের সর্বত্র এই জ্যামিতিক ‘এনটপটিক’ চিহ্ন ছড়িয়ে আছে, যা অন্যান্য তত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে পারে না।

    2. দ্বিতীয় ধাপ: মস্তিষ্ক এই জ্যামিতিক আকারগুলোকে বাস্তব বস্তুর সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করে। আপনি হয়তো একটি জিগজ্যাগ লাইন দেখে তাতে সাপের কল্পনা করবেন। এই ধাপে শামান নিজের মনের ভেতরেই এক ‘বাস্তব’ জগৎ দেখতে শুরু করেন।

    3. তৃতীয় ধাপ (সুড়ঙ্গ ও ঘূর্ণি): শামান অনুভব করেন একটি গভীর সুড়ঙ্গ বা ঘূর্ণির মধ্য দিয়ে পড়ে যাচ্ছেন। এর পরই তিনি পৌঁছান আত্মিক জগতে, যেখানে তিনি প্রাণীশক্তি, পূর্বপুরুষদের আত্মা বা ‘মাস্টার অফ অ্যানিমালস’-এর সঙ্গে দেখা করেন।

    লুইস-উইলিয়ামসের মতে, গুহার দেওয়ালই হলো এই আত্মিক জগতের পর্দা বা ‘মেমব্রেন’। শামান ট্রান্স থেকে ফিরে এসে আঁকতেন এই দর্শন। দেওয়াল যেন ছিল এক পাতলা আবরণ, যার ওপারে ছিল আত্মার জগৎ। ছবি এঁকে তারা বাস্তব জগতে সেই আত্মিক সত্তাকে ধরে রাখতেন। ভীমবেটকা, আলতামিরা বা লাস্কোর দুর্গম প্রকোষ্ঠে পৌঁছানোই এক ধরণের ‘ভিশন কোয়েস্ট’, যেখানে অন্ধকার ও নীরবতা স্বাভাবিক চেতনার পরিবর্তন ঘটিয়ে দিত। অনেক ছবি যেখানে দেওয়ালের ফাটল থেকে প্রাণী ‘বেরিয়ে আসছে’— তা আত্মিক জগৎ থেকে উদ্ভূত হওয়ারই প্রতীক।

    এই তত্ত্বের সৌন্দর্য হলো, এটি জাদু ও গল্প— উভয়কেই একসূত্রে গেঁথেছে। জাদু (প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা) ও গল্প (আত্মিক জগতের দর্শনের আখ্যান) উভয়ই এই শামানিক ট্রান্সের ফলাফল। শামান একইসাথে ছিলেন গল্পকার, জাদুকর, চিকিৎসক এবং পুরোহিত।

    আদিম ক্রিয়েটিভিটি: সৌন্দর্য, স্থিতি ও সময়

    সাম্প্রতিককালে আরেকটি শক্তিশালী তত্ত্ব উঠে এসেছে, যা জাদু বা গল্প— কোনো বাহ্যিক প্রয়োজনকে মুখ্য বলে মানতে চায় না। এটি বিশ্বাস করে ‘আর্ট ফর আর্টস সেক’ (Art for Art's Sake) বা নিছক সৃষ্টির আনন্দে আঁকা। মস্তিষ্কের বিবর্তনের সঙ্গে মানুষের এক ধরণের নান্দনিকতা ও সৃজনী ক্ষমতার উদয় হয়েছিল, যা সে প্রকাশ করেছে চিত্রের মাধ্যমে। অর্থাৎ, একটি ঘোড়াকে সুন্দর ভাবে দেখে, তার প্রশংসা করে, ক্যানভাসে ধরে রাখার তাড়না থেকেই ছবি আঁকা।

    অত্যাধুনিক এক গবেষণা এই তত্ত্বকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়। আর্কিও-অ্যাকোস্টিকস (Archaeoacoustics) গবেষকেরা দেখেছেন, গুহাগুলোতে ছবি যেখানে আঁকা, সেই স্পটগুলো আশ্চর্যজনকভাবে সবচেয়ে প্রতিধ্বনিপূর্ণ (echoic) স্থান। সেখানে হাততালি দিলে বা পা ফেললে শব্দ যেন ঘোড়ার পায়ের খুরের শব্দ বা বাইসনের ডাকের মতো প্রতিধ্বনিত হয়।

    সম্প্রতি লন্ডনের কিছু গবেষক একটি চমকপ্রদ তথ্য দিয়েছেন। তাঁরা দাবি করছেন, গুহার ছবির ঘোড়া, বাইসনের ওপর যে দাগ-বিন্দু ইত্যাদি থাকে, তা আসলে প্রাচীন ক্যালেন্ডার বা ‘প্রোটো-রাইটিং’ সিস্টেম। তাদের মতে, প্রাণীদের পাশে আঁকা বিন্দু বা চন্দ্রাকৃতি দাগগুলো ওই প্রাণীর প্রজনন ঋতুর হিসাব রাখার পদ্ধতি, যা নির্দেশ করে চাঁদের মাস। এটি কোনো গল্প নয়, এটি একধরনের সংগৃহীত জ্ঞান, বিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিদ্যার মিশ্রণ। তাহলে, এটি কি “জ্ঞান রেকর্ড করার গল্প”? নিঃসন্দেহে।

    সংশ্লেষণ: জাদু ও গল্পের মিলনমেলা

    তাহলে সত্যিটা কী? কেন আঁকতেন তাঁরা? হাজারো শিল্পকর্ম, হাজারো বছর আর বিশাল ভৌগোলিক বিস্তারের দিকে তাকালে আমরা কি একক কোনো ব্যাখ্যায় পৌঁছাতে পারি? এ প্রশ্নের উত্তর সম্ভবত, “না।”

    গুহাচিত্র কোনো একক উদ্দেশ্যে আঁকা হয়নি। যেমন আজকের মানুষ একই সাথে প্রয়োজনে ব্যাংকের চেক লিখছে, আবার ভালো লাগায় কবিতা লিখছে, আবার দুশ্চিন্তায় ভগবানের ছবি এঁকে পুজো করছে— তেমনই প্রাচীন মানুষও বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্ন ভিন্ন কারণে ছবি এঁকেছে। এটা ছিল একটি বিবর্তনশীল এক্সপ্রেশন, যা শুধু টিকে থাকার সংগ্রাম নয়, বরং টিকে থাকাকে অর্থবহ করে তোলার প্রাণান্ত চেষ্টা।

    আমি যদি চিত্রকর হতাম, আর আমার গোষ্ঠী যদি মহামারিতে ভুগত, তাহলে হয়তো আমি ‘জাদু’ করতাম, ছবি এঁকে রোগগ্রস্ত প্রাণীকে তাড়ানোর চেষ্টা করতাম। আবার যখন কিশোরদের শেখাতাম, তখন ‘গল্প’ বলতাম সেই সব শিকারের কাহিনী। আর একরাতে উন্মত্ত নৃত্যের পর সম্মোহিত অবস্থায় আমি যদি এক সিংহের সঙ্গে মিলিত হতাম, তাহলে ফিরে এসে সেই ‘দর্শনের’ গল্প বলতাম ছবির মাধ্যমে। আমাদের পূর্বপুরুষরা একইসঙ্গে ছিলেন জাদুকর, বিজ্ঞানী, শিল্পী এবং গল্পকার। এবং গুহা ছিল সেই ‘মাল্টিমিডিয়া স্পেস’, যেখানে এই সব পরিচয় একীভূত হতো।

    শেষাবধি, গুহাচিত্র হলো এক চিরন্তন আয়না, যেখানে প্রতিফলিত হয় মানুষের নিজেকে প্রকাশ করার অমিত তাড়না। সময় বদলায়, মাধ্যম বদলায়, কিন্তু গল্প ও জাদু— এই দুইয়ের গাঁথুনি ছাড়া যে মানুষ বাঁচতে পারে না, তা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি।

    যে গল্প এখনো ফুরোয়নি

    আজ থেকে চল্লিশ হাজার বছর আগে একজন মানুষ একটি অন্ধকার সুড়ঙ্গে পা রেখেছিলেন। হাতে ছিল চর্বির প্রদীপ আর গিরিমাটি। নির্জনতায়, নিরাপত্তাহীনতায়, আবার এক গভীর আনন্দে তিনি সৃষ্টি করেছিলেন যা কিছু অমর। তাদের সেই অমর সৃষ্টির রহস্য আমাদের তাড়া করে বেড়ায়, এবং এর মাঝেই লুকিয়ে আছে মানবিকতার স্বরূপ। জাদু নাকি গল্প— এই দ্বন্দ্বের উত্তরে আমরা আসলে বুঝতে পারি, আমরা মানুষ, আমরা যুক্তিরও ঊর্ধ্বে কিছু একটা খুঁজে বেড়াই। সেই খোঁজ কখনো থামেনি, থামবেও না। ব্লগ লেখা থেকে শুরু করে বড়পর্দার সিনেমা— আমরা এখনো সেই গুহামানবের উত্তরসূরি, যারা গল্প বলতে ভালোবাসে আর জাদুতে বিশ্বাস করে।

    আরও পড়ুন - কাহোকিয়া: মিসিসিপির পিরামিড পুরী

    একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

    নবীনতর পূর্বতন

    نموذج الاتصال