আমরা যখন শ্বাসক্রিয়া বা রেসপিরেশন (Respiration) শব্দটি শুনি, তখন আমাদের মস্তিষ্কে প্রথমেই ভেসে ওঠে ফুসফুস, নাক-মুখ দিয়ে বায়ু গ্রহণ ও ত্যাগের চিত্র। প্রাণীজগতের এই জৈবিক প্রক্রিয়াটি এতটাই দৃশ্যমান যে, উদ্ভিদের ক্ষেত্রেও একই রকম কোনো প্রক্রিয়া ঘটে কি না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে বিভ্রান্তি থাকাই স্বাভাবিক। অথচ, উদ্ভিদের প্রতিটি সজীব কোষ নিরন্তর শ্বাসকার্য চালিয়ে যাচ্ছে। হ্যাঁ, উদ্ভিদও শ্বাস নেয়। তবে তাদের শ্বাসকার্যের ধরন, গতি, প্রকৃতি ও জৈবরাসায়নিক পথ প্রাণীদের থেকে বিভিন্ন দিক থেকে ভিন্ন।
উদ্ভিদের শ্বাসক্রিয়া একটি অবিচ্ছিন্ন জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে উদ্ভিদ তাদের সঞ্চিত জটিল জৈব যৌগ (প্রধানত গ্লুকোজ) ভেঙে সরল উপাদানে পরিণত করে এবং এই প্রক্রিয়ায় বিপাকীয় শক্তি (ATP) উৎপন্ন করে। এই শক্তি উদ্ভিদের দৈহিক বৃদ্ধি, কোষ বিভাজন, পুষ্টি পরিবহন, প্রোটিন সংশ্লেষণ সহ প্রভৃতি জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য কাজে ব্যবহৃত হয়। সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদ যে খাদ্য প্রস্তুত করে, শ্বাসক্রিয়ায় সেই খাদ্যই জারিত হয়ে শক্তি নির্গত করে। অর্থাৎ সালোকসংশ্লেষণ ও শ্বসন—এই দুটি প্রক্রিয়া উদ্ভিদের জীবনচক্রের দুই চালিকাশক্তি, যা পরস্পরের পরিপূরক।
এই ব্লগ পোস্টে আমরা উদ্ভিদের শ্বাসক্রিয়ার প্রতিটি দিক গভীর বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্লেষণ করব। শ্বসনের সংজ্ঞা, প্রকারভেদ, আণবিক প্রক্রিয়া, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, প্রভাবকসমূহ, সালোকসংশ্লেষণের সাথে পার্থক্য, পরিবেশগত ভূমিকা এবং অর্থনৈতিক গুরুত্ব—সবই আলোচিত হবে পর্যায়ক্রমে ও বিস্তারিতভাবে।
১. শ্বাসক্রিয়া কাকে বলে?
জীববিজ্ঞানের ভাষায়, শ্বাসক্রিয়া (Respiration) হলো একটি জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়া যেখানে সজীব কোষের মধ্যে অক্সিজেনের উপস্থিতিতে বা অনুপস্থিতিতে জটিল জৈব যৌগ (শর্করা, ফ্যাট, প্রোটিন) জারিত হয়ে সরলতর যৌগে পরিণত হয় এবং বিপুল পরিমাণ বিপাকীয় শক্তি ATP (Adenosine Triphosphate) রূপে মুক্ত হয়, যা জীবনের সকল কার্যক্রমের জ্বালানি হিসেবে কাজ করে।
উদ্ভিদের ক্ষেত্রে এই সংজ্ঞাটি আরও প্রাসঙ্গিক, কারণ উদ্ভিদ নিজের খাদ্য নিজে তৈরি করে এবং তারপর প্রয়োজন অনুযায়ী সেই খাদ্য ভেঙে শক্তি সংগ্রহ করে। শ্বাসক্রিয়া একটি অপচয়ী বিপাক (Catabolism) প্রক্রিয়া, যেখানে বৃহৎ অণু ভেঙে ক্ষুদ্র অণুতে পরিণত হয়। এটি একটি তাপোৎপাদী বিক্রিয়াও বটে, তবে উদ্ভিদদেহে এই তাপ অতি দ্রুত পরিবেশে বিকিরিত হয়ে যায়।
শ্বাসক্রিয়ার একটি সরল সমীকরণ নিচে দেওয়া হলো:
সবাত শ্বসনের সমীকরণ:
এই সমীকরণ থেকে বোঝা যায় যে, একটি গ্লুকোজ অণু ছয় অণু অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে ছয় অণু কার্বন ডাই-অক্সাইড, ছয় অণু পানি এবং বিপুল শক্তি উৎপন্ন করে। এই শক্তির একটি বড় অংশ ATP-তে আবদ্ধ থাকে, যা কোষের প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহৃত হয়।
২. সালোকসংশ্লেষণ বনাম শ্বাসক্রিয়া: পরিপূরক দুই প্রক্রিয়া
উদ্ভিদের জীবনধারণের জন্য দুটি প্রধান বিপাকীয় প্রক্রিয়া হলো সালোকসংশ্লেষণ (Photosynthesis) ও শ্বাসক্রিয়া (Respiration)। এই দুটি প্রক্রিয়া একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। একটি উপচিতী (Anabolism) তো অন্যটি অপচিতী (Catabolism)।
| বৈশিষ্ট্য | সালোকসংশ্লেষণ | শ্বাসক্রিয়া |
|---|---|---|
| ধরন | উপচিতী (Anabolism) | অপচিতী (Catabolism) |
| স্থান | কেবল ক্লোরোপ্লাস্টযুক্ত কোষে | সকল সজীব কোষে |
| সময় | দিবালোকে | দিবা-রাত্রি সর্বক্ষণ |
| কাঁচামাল | CO₂ ও H₂O | গ্লুকোজ ও O₂ |
| উৎপন্ন পদার্থ | গ্লুকোজ ও O₂ | CO₂, H₂O ও শক্তি |
| শক্তি | সৌরশক্তি রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয় | রাসায়নিক শক্তি ATP-তে রূপান্তরিত হয় |
| ওজন | উদ্ভিদের শুষ্ক ওজন বৃদ্ধি পায় | উদ্ভিদের শুষ্ক ওজন হ্রাস পায় |
| অঙ্গাণু | ক্লোরোপ্লাস্ট | মাইটোকন্ড্রিয়া |
| আলোর প্রয়োজন | অপরিহার্য | ঐচ্ছিক, তবে পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে |
এই পার্থক্যগুলো থাকা সত্ত্বেও, এই দুই প্রক্রিয়া একে অপরের উপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। সালোকসংশ্লেষণে উৎপন্ন গ্লুকোজ ও অক্সিজেন শ্বাসক্রিয়ার কাঁচামাল, আর শ্বাসক্রিয়ায় উৎপন্ন কার্বন ডাই-অক্সাইড ও পানি সালোকসংশ্লেষণের কাঁচামাল। প্রকৃতির এক আশ্চর্য চক্র এভাবেই অব্যাহত রয়েছে।
৩. উদ্ভিদে শ্বাসক্রিয়ার প্রকারভেদ
অক্সিজেনের প্রাপ্যতার ভিত্তিতে উদ্ভিদের শ্বাসক্রিয়াকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়: সবাত শ্বসন (Aerobic Respiration) ও অবাত শ্বসন (Anaerobic Respiration)। তবে আধুনিক উদ্ভিদ শারীরতত্ত্বে আরও একটি বিশেষ প্রক্রিয়ার নাম উল্লেখিত হয়, যা হলো ফটোরেসপিরেশন (Photorespiration)।
৩.১ সবাত শ্বসন (Aerobic Respiration)
এটি শ্বাসক্রিয়ার সেই প্রক্রিয়া যেখানে অক্সিজেনের উপস্থিতিতে খাদ্যবস্তু সম্পূর্ণরূপে জারিত হয়ে কার্বন ডাই-অক্সাইড, পানি ও প্রচুর পরিমাণে শক্তি (৩৮ ATP) উৎপন্ন করে। প্রকৃতিতে এটি সর্বাধিক প্রচলিত ও কার্যকর শ্বসন পদ্ধতি। উদ্ভিদের অধিকাংশ কোষ স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সবাত শ্বসনের মাধ্যমেই প্রয়োজনীয় শক্তি সংগ্রহ করে।
সবাত শ্বসনের প্রধান পর্যায়গুলো হলো:
গ্লাইকোলাইসিস (Glycolysis) — সাইটোপ্লাজমে ঘটে
ক্রেবস চক্র (Krebs Cycle) বা TCA চক্র — মাইটোকন্ড্রিয়ার ম্যাট্রিক্সে ঘটে
ইলেকট্রন ট্রান্সপোর্ট চেইন (Electron Transport Chain) — মাইটোকন্ড্রিয়ার অন্তঃপর্দায় ঘটে
এই তিন পর্যায়ের সমন্বিত ফলাফলেই এক অণু গ্লুকোজ থেকে তাত্ত্বিকভাবে সর্বোচ্চ ৩৮ ATP অণু উৎপন্ন হয়। বাস্তবে অবশ্য ৩৬ ATP উৎপন্ন হয় বলে আধুনিক গবেষণায় প্রমাণিত।
৩.২ অবাত শ্বসন (Anaerobic Respiration)
যখন অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে বা স্বল্পতায় খাদ্যবস্তু আংশিকভাবে জারিত হয়, তখন তাকে অবাত শ্বসন বলে। এ প্রক্রিয়ায় গ্লুকোজ সম্পূর্ণরূপে জারিত হয় না, ফলে ইথানল (উদ্ভিদে) বা ল্যাকটিক এসিড (প্রাণীতে) উৎপন্ন হয়, এবং শক্তি উৎপন্ন হয় মাত্র ২ ATP। অক্সিজেনস্বল্পতা দেখা দিলে, যেমন— জলাভূমির উদ্ভিদের শিকড়ের ক্ষেত্রে, উদ্ভিদ এই অবাত শ্বসনের উপর নির্ভর করে।
উদ্ভিদে অবাত শ্বসনের সমীকরণ:
এই প্রক্রিয়ায় ইথানল উৎপন্ন হয়, যা উচ্চমাত্রায় কোষের জন্য বিষাক্ত হতে পারে। তাই দীর্ঘ সময় ধরে অক্সিজেনস্বল্পতা উদ্ভিদের জন্য ক্ষতিকর। ধান, শাপলা, কচুরিপানার মতো জলজ উদ্ভিদ অভিযোজনের মাধ্যমে এই পরিস্থিতি সহ্য করতে পারে। তাদের শিকড়ে বিশেষ বায়ু প্রকোষ্ঠ (Aerenchyma) থাকে, যা পরিবেশ থেকে অক্সিজেন সংগ্রহ করে শিকড়ে সরবরাহ করে।
৩.৩ ফটোরেসপিরেশন (Photorespiration)
এটি একটি বিশেষ ধরনের শ্বসন প্রক্রিয়া, যা C₃ উদ্ভিদের পাতায় উজ্জ্বল আলো, উচ্চ তাপমাত্রা ও কম CO₂ ঘনত্বের সময় ঘটে। রুবিস্কো (RuBisCO) এনজাইম CO₂-এর বদলে O₂-কে গ্রহণ করলে ফটোরেসপিরেশন ঘটে। এই প্রক্রিয়ায় কোনো ATP বা NADH উৎপন্ন হয় না, বরং শক্তি ও কার্বন অপচয় হয়। প্রকৃত অর্থে এটি একটি অপচয়ী প্রক্রিয়া। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে, অতিরিক্ত আলোক শক্তি নিষ্ক্রিয় করতে এবং নাইট্রোজেন বিপাকে ফটোরেসপিরেশনের কিছু ভূমিকা থাকতে পারে। C₄ উদ্ভিদ (যেমন ভুট্টা, আখ) বিশেষ শারীরতাত্ত্বিক অভিযোজনের মাধ্যমে ফটোরেসপিরেশন প্রতিরোধ করতে পারে, ফলে তাদের সালোকসংশ্লেষণ দক্ষতা অনেক বেশি।
৪. শ্বাসক্রিয়ার প্রক্রিয়া: ধাপে ধাপে গভীর জৈবরাসায়নিক বিশ্লেষণ
সবাত শ্বাসক্রিয়ার তিনটি প্রধান ধাপ নিচে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ব্যাখ্যা করা হলো।
৪.১ গ্লাইকোলাইসিস (Glycolysis)
এটি শ্বসনের প্রথম এবং সর্বাধিক প্রাচীন ধাপ, যা সাইটোপ্লাজমে ঘটে। "Glycolysis" শব্দটির অর্থ হলো "শর্করার বিভাজন"। এই প্রক্রিয়ায় এক অণু গ্লুকোজ (৬-কার্বন) ধাপে ধাপে ভেঙে দুই অণু পাইরুভিক এসিডে (৩-কার্বন) পরিণত হয়। এটি দশটি ধারাবাহিক এনজাইম-নিয়ন্ত্রিত বিক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
গ্লাইকোলাইসিসের দশটি ধাপকে দুই পর্বে ভাগ করা যায়:
শক্তি বিনিয়োগ পর্ব (Energy Investment Phase): প্রথম পাঁচটি ধাপে ২ অণু ATP বিনিয়োগ করে গ্লুকোজকে দুই অণু গ্লিসারালডিহাইড-৩-ফসফেট (G3P) এ পরিণত করা হয়।
শক্তি আহরণ পর্ব (Energy Payoff Phase): শেষ পাঁচটি ধাপে ৪ অণু ATP ও ২ অণু NADH উৎপন্ন হয় এবং শেষে দুই অণু পাইরুভেট তৈরি হয়।
সুতরাং গ্লাইকোলাইসিসের নিট লাভ: ২ ATP (মোট ৪, বিনিয়োগ ২) ও ২ NADH।
গ্লাইকোলাইসিস অক্সিজেনের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি উভয় অবস্থাতেই ঘটতে পারে। এটি সবাত ও অবাত উভয় শ্বসনেরই সাধারণ ধাপ। এটি কোষের সাইটোপ্লাজমে ঘটে, তাই মাইটোকন্ড্রিয়া না থাকলেও (যেমন লোহিত রক্তকণিকা) এই প্রক্রিয়া চলতে পারে।
গ্লাইকোলাইসিসের গুরুত্বপূর্ণ এনজাইমসমূহ:
হেক্সোকাইনেজ (Hexokinase)
ফসফোফ্রুক্টোকাইনেজ (Phosphofructokinase) — এটি হার নিয়ন্ত্রণকারী মুখ্য এনজাইম
পাইরুভেট কাইনেজ (Pyruvate kinase)
৪.২ ক্রেবস চক্র বা TCA চক্র (Krebs Cycle / Tricarboxylic Acid Cycle)
সবাত শ্বসনের দ্বিতীয় প্রধান ধাপ হলো ক্রেবস চক্র। এটি ১৯৩৭ সালে স্যার হ্যান্স ক্রেবস আবিষ্কার করেন, যার জন্য তিনি ১৯৫৩ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এই চক্রটি মাইটোকন্ড্রিয়ার ম্যাট্রিক্সে ঘটে।
গ্লাইকোলাইসিসে উৎপন্ন পাইরুভেট প্রথমে মাইটোকন্ড্রিয়ায় প্রবেশ করে এবং পাইরুভেট ডিহাইড্রোজিনেজ এনজাইমের প্রভাবে অক্সিডেটিভ ডিকার্বোক্সিলেশন প্রক্রিয়ায় অ্যাসিটাইল-CoA-তে রূপান্তরিত হয়। এই বিক্রিয়ায় ১ অণু CO₂ ও ১ অণু NADH উৎপন্ন হয়।
এরপর অ্যাসিটাইল-CoA (২-কার্বন) অক্সালোঅ্যাসিটেটের (৪-কার্বন) সাথে যুক্ত হয়ে সাইট্রেট (৬-কার্বন) গঠন করে এবং চক্রাকার পথে ধাপে ধাপে জারিত হয়ে পুনরায় অক্সালোঅ্যাসিটেট ফিরে আসে। এই চক্রে একবার ঘূর্ণনে (এক অণু অ্যাসিটাইল-CoA থেকে) যে সব উৎপাদ পাওয়া যায়:
২ অণু CO₂
৩ অণু NADH
১ অণু FADH₂
১ অণু GTP (যা ATP-তে রূপান্তরিত হয়)
যেহেতু এক অণু গ্লুকোজ থেকে দুই অণু অ্যাসিটাইল-CoA উৎপন্ন হয়, তাই ক্রেবস চক্র থেকে মোট উৎপাদ দ্বিগুণ হবে: ৪ CO₂, ৬ NADH, ২ FADH₂, ২ ATP।
এই চক্র শুধু শক্তি উৎপাদনই করে না, বরং বিভিন্ন জৈব অণু (অ্যামাইনো এসিড, ফ্যাটি এসিড, নিউক্লিওটাইড) সংশ্লেষণের পূর্বসূরিও সরবরাহ করে। তাই ক্রেবস চক্রকে উভমুখী বিপাকীয় চক্র (Amphibolic Pathway) বলা হয়।
৪.৩ ইলেকট্রন ট্রান্সপোর্ট চেইন ও অক্সিডেটিভ ফসফোরাইলেশন (ETC & Oxidative Phosphorylation)
এটি শ্বসনের তৃতীয় ও চূড়ান্ত পর্যায়। এই প্রক্রিয়াটি মাইটোকন্ড্রিয়ার অন্তঃপর্দার (Inner Mitochondrial Membrane) ক্রিস্টি (Cristae) তে সংঘটিত হয়। গ্লাইকোলাইসিস ও ক্রেবস চক্রে উৎপন্ন NADH ও FADH₂ তাদের উচ্চ-শক্তির ইলেকট্রনকে ইলেকট্রন ট্রান্সপোর্ট চেইনের বিভিন্ন বাহকের (কমপ্লেক্স I, II, III, IV) মাধ্যমে স্থানান্তর করে। এই ইলেকট্রন প্রবাহের শক্তি ব্যবহার করে প্রোটন (H⁺ আয়ন) ম্যাট্রিক্স থেকে অন্তঃপর্দার আন্তঃপর্দা স্থানে (Intermembrane Space) পাম্প করা হয়, যা একটি প্রোটন গ্রেডিয়েন্ট বা ইলেকট্রোকেমিক্যাল পটেনশিয়াল সৃষ্টি করে।
এই পটেনশিয়াল শক্তি ব্যবহার করে ATP সিন্থেজ এনজাইম প্রোটন প্রবাহের সাথে ADP-কে ফসফোরাইলেট করে ATP তৈরি করে। এই প্রক্রিয়াকে কেমিওসমোসিস (Chemiosmosis) বলা হয়, যার প্রবক্তা পিটার মিচেল (১৯৭৮ সালে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত)।
ইলেকট্রনগুলো শেষ পর্যন্ত অক্সিজেন দ্বারা গৃহীত হয় এবং প্রোটনের সাথে যুক্ত হয়ে পানি (H₂O) গঠন করে। এজন্যই অক্সিজেন সবাত শ্বসনের চূড়ান্ত ইলেকট্রন গ্রাহক। অক্সিজেন ছাড়া ETC চলতে পারে না, যা সবাত ও অবাত শ্বসনের মূল পার্থক্য।
ATP উৎপাদনের হিসাব (এক অণু গ্লুকোজ থেকে তাত্ত্বিক):
| পর্যায় | সরাসরি ATP | NADH | FADH₂ | পরোক্ষ ATP (ETC থেকে) |
|---|---|---|---|---|
| গ্লাইকোলাইসিস | ২ | ২ | ০ | ৬ (বা ৪) |
| পাইরুভেট অক্সিডেশন | ০ | ২ | ০ | ৬ |
| ক্রেবস চক্র | ২ | ৬ | ২ | ১৮ + ৪ |
| মোট | ৪ | ~৩৬-৩৮ |
প্রকৃত কোষে NADH পরিবহনের শক্তি ব্যয়ের কারণে গ্লাইকোলাইসিসে উৎপন্ন NADH থেকে ৩টি করে ATP না হয়ে ২টি করে হয়, তাই মোট ATP ৩৬-এ দাঁড়ায়।
আরও পড়ুন -
৫. উদ্ভিদের শ্বসন অঙ্গ ও গ্যাসীয় বিনিময়
প্রাণীদের ন্যায় উদ্ভিদের কোনো বিশেষায়িত শ্বসন অঙ্গ নেই। উদ্ভিদের প্রতিটি সজীব কোষ নিজস্ব চাহিদা অনুযায়ী সরাসরি পরিবেশ থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করে। তবে বৃহৎ স্থলজ উদ্ভিদে গ্যাসীয় বিনিময়ের জন্য কতকগুলি বিশেষ কাঠামো রয়েছে।
৫.১ পত্ররন্ধ্র (Stomata)
পাতা ও কচি কাণ্ডের এপিডার্মিসে অবস্থিত অসংখ্য ক্ষুদ্র ছিদ্রই হলো পত্ররন্ধ্র বা স্টোমাটা। প্রতিটি স্টোমাটা দুটি করে রক্ষীকোষ (Guard Cell) দ্বারা বেষ্টিত। রক্ষীকোষগুলির স্ফীতি ও শিথিলতার মাধ্যমে স্টোমাটা খোলে ও বন্ধ হয়। এগুলির মাধ্যমেই অক্সিজেন ভেতরে প্রবেশ করে ও কার্বন ডাই-অক্সাইড বেরিয়ে যায়। একই সাথে প্রস্বেদন (Transpiration) প্রক্রিয়াতেও স্টোমাটা ভূমিকা রাখে। সালোকসংশ্লেষণ ও শ্বাসক্রিয়া উভয়ের জন্যই এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ।
স্টোমাটা খোলা-বন্ধ হওয়ার পেছনে আলো, CO₂ ঘনত্ব, অভ্যন্তরীণ জলসম্ভার, পটাসিয়াম আয়নের স্থানান্তর ইত্যাদি নানাবিধ প্রভাবকের ভূমিকা রয়েছে। দিনের বেলা স্টোমাটা সাধারণত খোলা থাকে (সালোকসংশ্লেষণের জন্য CO₂ প্রবেশের তাগিদে) এবং রাতের বেলা বন্ধ থাকে। তবে রাতের শ্বাসক্রিয়ার জন্য অক্সিজেন অনুপ্রবেশের প্রয়োজনে আংশিক খোলা থাকে।
৫.২ লেন্টিসেল (Lenticels)
পরিণত কাণ্ড ও শাখা-প্রশাখার কর্ক বা বাকলের উপর ক্ষুদ্র ডিম্বাকার বা লেন্স-আকৃতির ছিদ্র দেখা যায়, এদের লেন্টিসেল বলে। এপিডার্মিস কর্তৃক সৃষ্ট এসব কাঠামো বাইরের বাতাসের সাথে অভ্যন্তরীণ কোষগুলির গ্যাসীয় বিনিময়ে সাহায্য করে। লেন্টিসেল সবসময় খোলা থাকে, বন্ধ করার কোনো প্রক্রিয়া নেই। পরিণত কাণ্ডের যেখানে স্টোমাটা নেই, সেখানে লেন্টিসেলই প্রধান গ্যাস বিনিময় পথ।
৫.৩ মূলজ শ্বসন (Root Respiration)
মাটির নিচে অবস্থিত শিকড়ের কোষগুলিও নিরবচ্ছিন্নভাবে শ্বাসকার্য চালায়। মাটিতে অবস্থিত বায়ু (Soil Atmosphere) থেকে অক্সিজেন শিকড়ের এপিডার্মিস ও মূলরোমের মাধ্যমে অভিস্রবণ প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করে। মাটির বায়ুতে অক্সিজেনের পরিমাণ বায়ুমণ্ডলের চেয়ে কম, তবে তা শিকড়ের শ্বাসকার্যের জন্য যথেষ্ট। অতিরিক্ত জলসেচ বা জলাবদ্ধতার কারণে মাটির বায়ুর অক্সিজেন প্রতিস্থাপিত হয়ে পানি ঢুকে পড়লে শিকড় অবাত শ্বসনে চলে যায়, যা দীর্ঘস্থায়ী হলে শিকড়ের মৃত্যু ঘটে ও উদ্ভিদ মারা যায়।
জলাভূমির উদ্ভিদে (ম্যানগ্রোভ, ধান) বিশেষ অভিযোজন দেখা যায়:
নিউম্যাটোফোর (Pneumatophore): শ্বাসমূল যা মাটি ভেদ করে ওপরে উঠে আসে এবং বাতাস থেকে সরাসরি অক্সিজেন সংগ্রহ করে।
এরেনকাইমা (Aerenchyma): বায়ু প্রকোষ্ঠবিশিষ্ট প্যারেনকাইমা কলা, যা বায়ু পরিবহনে সক্ষম।
৬. শ্বাসক্রিয়াকে প্রভাবিত করার নিয়ামকসমূহ
উদ্ভিদের শ্বাসক্রিয়ার হার বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নিয়ামকের উপর নির্ভরশীল। এই নিয়ামকগুলি উদ্ভিদের বয়স, শারীরতাত্ত্বিক অবস্থা ও পরিবেশগত পরিস্থিতির সাথে সম্পর্কিত।
৬.১ তাপমাত্রা (Temperature)
তাপমাত্রা শ্বাসক্রিয়ার গতিকে সরাসরি প্রভাবিত করে। সাধারণত ০°C থেকে ৪৫°C তাপমাত্রার মধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে শ্বাসক্রিয়ার হার বৃদ্ধি পায়। প্রতি ১০°C তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে শ্বাসক্রিয়ার হার প্রায় দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ বৃদ্ধি পায়—যা Q₁₀ মান নামে পরিচিত। তবে অতি উচ্চ তাপমাত্রায় (৪৫°C-র উপরে) এনজাইম ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় ও শ্বাসক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। আবার অতি নিম্ন তাপমাত্রায় বিপাক ক্রিয়া মন্থর হয়ে শ্বাসহার প্রায় শূন্যে নেমে আসে। তাই ফ্রিজে ফল-সবজি সংরক্ষণ করলে সেগুলির শ্বাসক্রিয়া হ্রাস পেয়ে পচন বিলম্বিত হয়।
৬.২ অক্সিজেনের ঘনত্ব (Oxygen Concentration)
বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের স্বাভাবিক ঘনত্ব প্রায় ২১%, যা সবাত শ্বাসক্রিয়ার জন্য যথেষ্ট। অক্সিজেনের ঘনত্ব ৫% এর নিচে নেমে গেলে সবাত শ্বসন ব্যাহত হয় ও অবাত শ্বসন শুরু হয়। অক্সিজেন ঘনত্ব বৃদ্ধি করলে (বিশুদ্ধ অক্সিজেন প্রয়োগ করলে) শ্বাসক্রিয়ার হার কিছুটা বাড়লেও অতিরিক্ত অক্সিজেন কোষের জন্য বিষাক্ত অক্সিজেন ফ্রি র্যাডিকেল সৃষ্টি করতে পারে।
৬.৩ কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব (CO₂ Concentration)
পরিবেশে CO₂-এর আধিক্য শ্বাসক্রিয়ার হার হ্রাস করে। এটি একটি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া (Negative Feedback) যা শ্বসনের শেষজাত দ্রব্য দ্বারা এনজাইমের সক্রিয়তা বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার ফল। এই নীতির ভিত্তিতেই ফল-মূল সংরক্ষণের সময় "কন্ট্রোল্ড অ্যাটমোস্ফিয়ার স্টোরেজ"-এ উচ্চ CO₂ ও নিম্ন O₂ মাত্রা বজায় রাখা হয়, যাতে ফল ধীরে পাকে ও শ্বাসক্রিয়া হ্রাস পায়।
৬.৪ পানি (Water)
উদ্ভিদ কলায় পানির পরিমাণ শ্বাসক্রিয়ার হারকে প্রভাবিত করে। শুষ্ক বীজে পানির পরিমাণ খুব কম (৫-১৫%) থাকে, ফলে সেখানে শ্বাসক্রিয়ার হার অত্যন্ত মন্থর বা প্রায় স্থগিত থাকে। বীজ অঙ্কুরোদ্গমের সময় প্রচুর পানি শোষণ করলে বিপাক সক্রিয় হয় ও শ্বাসক্রিয়ার হার বহুগুণ বেড়ে যায়। অতিরিক্ত পানির কারণেও জলাবদ্ধতায় অক্সিজেনস্বল্পতায় শ্বাসক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে।
৬.৫ খাদ্যসামগ্রী ও বিপাকীয় বস্তু (Substrate Availability)
কোষে শ্বাসযোগ্য বস্তু (গ্লুকোজ, ফ্যাট, প্রোটিন) পর্যাপ্ত পরিমাণে বিদ্যমান থাকলে শ্বাসক্রিয়ার হার বৃদ্ধি পায়। উদ্ভিদের ক্ষুধিত অবস্থায় (Starvation) শ্বাসক্রিয়ার হার কমে যায়, কারণ ভাঙার মতো খাদ্য মজুত থাকে না।
৬.৬ আলো (Light)
যদিও সরাসরি শ্বাসক্রিয়ার জন্য আলোর প্রয়োজন হয় না, কিন্তু পরোক্ষভাবে আলো শ্বাসক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। আলোর উপস্থিতিতে সালোকসংশ্লেষণ বন্ধ হয়ে গেলে পাতার অভ্যন্তরে অক্সিজেন ও গ্লুকোজের প্রাচুর্য শ্বাসক্রিয়ার হারকে বাড়িয়ে দিতে পারে। আবার অন্ধকারে স্টোমাটা বন্ধ হয়ে গেলে অক্সিজেন প্রবেশ কমে শ্বাসক্রিয়ায় সাময়িক মন্থরতা দেখা যেতে পারে।
৬.৭ আঘাত ও রোগ (Injury and Disease)
যান্ত্রিক আঘাত পেলে বা রোগজীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হলে আক্রান্ত স্থানের শ্বাসক্রিয়ার হার বহুগুণ বেড়ে যায়। এর কারণ, ক্ষত নিরাময় ও প্রতিরক্ষার জন্য অতিরিক্ত শক্তির প্রয়োজন হয়। ফসল তোলার পর ফল ও সবজিতে কাটা বা থেঁতলানো জায়গায় দ্রুত পচন ধরার পেছনে এই বর্ধিত শ্বাসক্রিয়ার বড় ভূমিকা আছে।
৭. উদ্ভিদের বিভিন্ন অংশে শ্বাসক্রিয়ার ভিন্নতা
উদ্ভিদের সব অংশের শ্বাসক্রিয়ার হার সমান নয়। বিপাকীয় সক্রিয়তা, খাদ্য জমা ও বয়সের উপর শ্বাসক্রিয়ার হার নির্ভর করে।
ভ্রূণমুকুল ও মূলাগ্র (Apical Meristem): কোষ বিভাজন ও প্রসারণের জন্য বিপুল শক্তির প্রয়োজন হওয়ায় এই অঞ্চলে শ্বাসক্রিয়ার হার সর্বাধিক।
কুঁড়ি ও মুকুল (Buds): অঙ্কুরোদ্গম ও প্রস্ফুটনের সময় বিপাক তুঙ্গে থাকায় শ্বাসক্রিয়ার হার অত্যন্ত বেশি।
পরিপক্ব পাতা: এদের শ্বাসক্রিয়ার হার মাধ্যম থেকে উচ্চ, কারণ সালোকসংশ্লেষী কলায় বিপাকীয় কার্যক্রম সবসময় চলে।
পরিণত কাণ্ড ও মূল: কাঠের মতো অজীব কলা বাদে কেবল জীবিত কোষগুলি শ্বাসকার্য চালায়, তাই তুলনামূলকভাবে শ্বাসহার কম।
শুষ্ক বীজ ও স্পোর: সুপ্ত অবস্থায় অতি অল্প শ্বাসক্রিয়া চলে, যা নির্ণয় করাও কষ্টকর।
ফল পাকার সময়: ক্লাইম্যাক্টেরিক ফল (যেমন আম, কলা, টমেটো) পাকার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে ইথিলিন হরমোনের প্রভাবে শ্বাসক্রিয়ার হার তীব্রভাবে বৃদ্ধি পায়, একে ক্লাইম্যাক্টেরিক রাইজ বলে। এরপর দ্রুত পচন শুরু হয়।
৮. শ্বাসক্রিয়ার অর্থনৈতিক ও কৃষিগত গুরুত্ব
উদ্ভিদের শ্বাসক্রিয়া বোঝা কেবল পাঠ্যপুস্তকের তত্ত্ব নয়, এর রয়েছে সুদূরপ্রসারী ব্যবহারিক গুরুত্ব। কৃষি, উদ্যানপালন, ফসল সংরক্ষণ ও খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পে এর জ্ঞান অপরিহার্য।
৮.১ ফসল ও ফল-সবজি সংরক্ষণ (Storage of Harvested Produce)
ফসল কাটার পর ফল, সবজি ও শস্যদানা জমা রাখার সময় এদের শ্বাসক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি। শ্বাসক্রিয়ার ফলে খাদ্যসামগ্রী ভেঙে যায়, ওজন হ্রাস পায়, তাপ উৎপন্ন হয় এবং জীবাণু সংক্রমণের সুযোগ সৃষ্টি হয়। সংরক্ষণাগারে নিম্ন তাপমাত্রা (রেফ্রিজারেশন), নিম্ন অক্সিজেন ও উচ্চ CO₂ ঘনত্ব (Controlled Atmosphere Storage) বজায় রেখে শ্বাসক্রিয়া হ্রাস করে পচন রোধ করা হয়। যেমন, আপেল ও নাশপাতি দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষণ করতে এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়।
৮.২ বীজ সংরক্ষণ (Seed Storage)
শুষ্ক, সুপ্ত বীজে শ্বাসক্রিয়া প্রায় নগণ্য। তবে বাতাসের আর্দ্রতা বেশি হলে বীজ পানি শোষণ করে, শ্বাসক্রিয়া বেড়ে যায়, খাদ্য নিঃশেষ হয় এবং অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা কমে যায়। কাজেই বীজ সংরক্ষণের জন্য শীতল, শুষ্ক ও বায়ুনিরুদ্ধ পাত্র আবশ্যক। জিন ব্যাংকে বীজ সংরক্ষণে তাপমাত্রা -১৮°C এর নিচে রাখা হয়।
৮.৩ ফল পাকানো (Fruit Ripening)
ফল কৃত্রিমভাবে পাকানোর প্রক্রিয়ায় শ্বাসক্রিয়ার ভূমিকা বিশাল। ইথিলিন গ্যাস প্রয়োগ করে ফলের ক্লাইম্যাক্টেরিক শ্বাসক্রিয়া সক্রিয় করে তোলা হয়, যা দ্রুত পাকতে সহায়তা করে। তবে অনিয়ন্ত্রিত শ্বাসক্রিয়া ফলের অতিরিক্ত পচন ও নরম হয়ে যাওয়ার কারণ।
৮.৪ শস্য ব্যবস্থাপনা (Crop Management)
জলাবদ্ধ জমিতে ফসলের শিকড়ে অক্সিজেনের অভাব ঘটে, অবাত শ্বসন বেড়ে গিয়ে ফসল নষ্ট হয়। কাজেই সঠিক নিকাশি ব্যবস্থা অপরিহার্য। ধান চাষের মতো জলজ পরিবেশে সঠিক জলস্তর বজায় রাখা ও বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করা শ্বাসক্রিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কর্দমাক্ত মাটিতে ধানের ফলন ভালো হওয়ার কারণ হলো ধানের শিকড়ে বায়ুপ্রকোষ্ঠ থাকায় তারা জলাবদ্ধতার মধ্যেও শিকড়ে অক্সিজেন পৌঁছে দিতে পারে।
৮.৫ জীবপ্রযুক্তি ও টিস্যু কালচার (Biotechnology & Tissue Culture)
উদ্ভিদ টিস্যু কালচারে কোষের দ্রুত বিভাজন ও বৃদ্ধির জন্য বিপুল শক্তি প্রয়োজন, যা শ্বাসক্রিয়ার মাধ্যমেই আসে। সঠিক বায়ুচলাচল ও শর্করা সরবরাহ নিশ্চিত করতে হয়। বায়োরিয়্যাক্টরে অক্সিজেন সরবরাহ একটি বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ।
৯. উদ্ভিদ ও প্রাণীর শ্বাসক্রিয়ার তুলনা
উদ্ভিদ ও প্রাণীর শ্বাসক্রিয়া মৌলিক জৈবরাসায়নিক পথে অভিন্ন হলেও গঠন, অঙ্গসংস্থান, হার ও অভিযোজনের দিক থেকে বিস্তর পার্থক্য বিদ্যমান।
| বৈশিষ্ট্য | উদ্ভিদ | প্রাণী |
|---|---|---|
| শ্বসন অঙ্গ | কোনো নির্দিষ্ট অঙ্গ নেই; স্টোমাটা, লেন্টিসেল, কোষপর্দা | ফুসফুস, ফুলকা, ত্বক ইত্যাদি বিশেষায়িত অঙ্গ |
| শ্বাসক্রিয়ার হার | ধীরগতি সম্পন্ন | দ্রুতগতি সম্পন্ন |
| খাদ্য | নিজস্ব খাদ্য (স্বভোজী) | অন্যের খাদ্য (পরভোজী) |
| গ্লাইকোলাইসিস পরবর্তী অবাত পথ | ইথানল উৎপন্ন | ল্যাকটিক এসিড উৎপন্ন |
| আলোর প্রভাব | পরোক্ষ, ফটোরেসপিরেশন হয় | নেই |
| শ্বাসক্রিয়ার তাপ | সহজেই বিকিরিত | দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে |
১০. আধুনিক গবেষণা ও ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি
উদ্ভিদ শ্বাসক্রিয়া বর্তমান গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র, বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন ও খাদ্য নিরাপত্তার প্রেক্ষাপটে।
ফটোরেসপিরেশন হ্রাস: বিজ্ঞানীরা জিন প্রকৌশলের মাধ্যমে ফটোরেসপিরেশন কমিয়ে ফসলের ফলন বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। RIPE (Realizing Increased Photosynthetic Efficiency) প্রকল্পের আওতায় ধান ও গমের শ্বাস-সালোকসংশ্লেষণ দক্ষতা বাড়াতে কাজ চলছে।
অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট: শ্বাসক্রিয়ায় উৎপন্ন ROS (Reactive Oxygen Species) উদ্ভিদের বার্ধক্য ও রোগ প্রতিরোধে জড়িত। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পথের হেরফের ঘটিয়ে ফসলের স্থায়িত্ব বাড়ানোর প্রচেষ্টা চলছে।
তাপমাত্রা সহনশীলতা: বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে উচ্চ তাপমাত্রায় শ্বাসক্রিয়ার অতিরিক্ত বৃদ্ধি ফসলের নিট সালোকসংশ্লেষণ হ্রাস করছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাপসহিষ্ণু শস্যজাত উদ্ভাবন অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
বায়ু দূষণ ও শ্বাসক্রিয়া: বায়ুদূষণের প্রভাবে পত্ররন্ধ্র আংশিক বন্ধ হয়ে গ্যাসীয় বিনিময় ব্যাহত হয় ও শ্বাস-সালোকসংশ্লেষণে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়। নগর-উদ্ভিদের স্বাস্থ্যে এর গভীর প্রভাব পড়ছে।
উদ্ভিদের শ্বাসক্রিয়া কোনো সরল ঘটনা নয়; এটি একটি জটিল, বহুস্তরীয়, নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রিত জৈব-রাসায়নিক পদ্ধতি, যা উদ্ভিদের জীবনীশক্তির মূল উৎস। বাহ্যিক দৃষ্টিতে নিশ্চল মনে হলেও উদ্ভিদের অভ্যন্তরে প্রতি মুহূর্তে অসংখ্য কোষে শ্বাসকার্য অবিরাম চলছে, শক্তি উৎপাদন করছে, জীবন ধারণ করছে। পাতা থেকে শুরু করে শিকড়ের অগ্রভাগ, বীজের ভ্রূণ থেকে পরিণত কাণ্ডের জীবিত কোষ—সর্বত্র শ্বাসক্রিয়া বিরাজমান।
সালোকসংশ্লেষণ ও শ্বাসক্রিয়া উদ্ভিদের বিপাকীয় চক্রের দুই স্তম্ভ। যেখানে সালোকসংশ্লেষণ খাদ্য ও অক্সিজেনের উৎস, সেখানে শ্বাসক্রিয়া সেই খাদ্যকে কাজে লাগিয়ে জীবনধারণের শক্তি সরবরাহ করে। একটি ছাড়া অন্যটি অর্থহীন। শ্বাসক্রিয়ার সঠিক জ্ঞান কৃষি, খাদ্যসংরক্ষণ, উদ্যানপালন, পরিবেশ বিজ্ঞান ও জীবপ্রযুক্তি—সবক্ষেত্রেই অপরিহার্য।
বর্তমান জলবায়ু সংকটের যুগে উদ্ভিদের শ্বাসক্রিয়াকে আরও নিবিড়ভাবে বোঝার প্রয়োজনীয়তা তীব্রতর হয়েছে। উন্নত প্রযুক্তি ও আণবিক জীববিজ্ঞানের কল্যাণে আমরা এখন শ্বাসক্রিয়ার এনজাইম, জিন ও বিপাকীয় পথগুলোকে পুনর্বিন্যস্ত করে ফসলের উৎপাদনশীলতা ও পরিবেশ সহিষ্ণুতা বাড়ানোর স্বপ্ন দেখছি।
মনে রাখতে হবে, উদ্ভিদের প্রতিটি নিঃশ্বাস আমাদের পরোক্ষ নিঃশ্বাসেরই অংশ। কারণ উদ্ভিদ শ্বাস নিলে যে CO₂ ত্যাগ করে, তা আবার সালোকসংশ্লেষণের কাঁচামাল, আর যে O₂ ত্যাগ করে, তা আমাদের প্রাণ বাঁচায়। এই জটিল পারস্পরিকতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে পৃথিবীর প্রাণের রহস্য, যেখানে উদ্ভিদের শ্বাসক্রিয়া এক নীরব কিন্তু অবিচল নায়কের ভূমিকা পালন করে চলেছে। এই নীরব নায়ককে যথাযথ জানা, বোঝা এবং সম্মান জানানোই আমাদের বিবেকবুদ্ধিসম্পন্ন দায়িত্ব।
আরও পড়ুন -
