১৯১৪ সালের ২৮ জুন বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভোতে এক তরুণ সার্বীয় বিপ্লবী গাভরিলো প্রিন্সিপ অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ ও তাঁর স্ত্রী সোফিকে গুলি করে হত্যা করলে গোটা ইউরোপ জুড়ে যে রাজনৈতিক ভূমিকম্প শুরু হয়, তার পরিণতিতে ২৮ জুলাই অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এরপর মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সমগ্র ইউরোপ মহাদেশ যুদ্ধের আগুনে জ্বলে ওঠে। কিন্তু একটি হত্যাকাণ্ড কীভাবে একটি বিশ্বযুদ্ধের জন্ম দিতে পারে? প্রশ্নটি ইতিহাসবিদদের শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ভাবিয়ে চলেছে।
সরল উত্তরটি হলো, ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দের হত্যাকাণ্ডটি কেবল একটি সূত্রপাত ছিল; প্রকৃত কারণগুলো ছিল আরও গভীরে প্রোথিত—একটি জটিল জালের মতো ছড়িয়ে থাকা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক শক্তি, যা ইউরোপকে এক বিস্ফোরণের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে দাঁড় করিয়েছিল। বর্তমান ঐতিহাসিক গবেষণায় জোর দিয়ে বলা হয় যে, এই যুদ্ধের পেছনে একক কোনো দেশ বা ঘটনা দায়ী নয়; বরং এটি ছিল দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত শক্তি ও স্বল্পমেয়াদি আকস্মিক সংকটের এক বিষাক্ত মিশ্রণ। এই ব্লগপোস্টে আমরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর পেছনের বহুস্তরীয় কারণগুলোকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করব।
অধ্যায় ১: দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত কারণসমূহ
১.১ মিত্রজোট ব্যবস্থা (The Alliance System)
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর পেছনে মিত্রজোট ব্যবস্থার ভূমিকা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, অনেক সময় এই ব্যবস্থাকেই ‘ডমিনো এফেক্ট’-এর মূল চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ইউরোপের বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে যে সমীকরণ গড়ে উঠেছিল, তা ছিল মূলত দুইটি পরস্পরবিরোধী শিবিরে বিভক্ত: একদিকে ট্রিপল অ্যালায়েন্স বা ত্রিশক্তি মৈত্রী (জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি ও ইতালি—যদিও পরে ইতালি নিরপেক্ষ থাকে এবং শেষ পর্যন্ত মিত্রশক্তির পক্ষে যোগ দেয়), অন্যদিকে ট্রিপল এন্টেন্টে বা ত্রিশক্তি আঁতাত (ফ্রান্স, রাশিয়া ও ব্রিটেন)।
জোটের শিকড় খুঁজতে গেলে ১৮৭১ সালের ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে ফিরে যেতে হয়। জার্মান চ্যান্সেলর অটো ফন বিসমার্ক ফ্রান্সকে কূটনৈতিক ও সামরিকভাবে একঘরে করে রাখার যে কৌশল তৈরি করেছিলেন, তা-ই পরবর্তীকালে ইউরোপের ‘সশস্ত্র শান্তি’ নামে পরিচিত ভারসাম্যের জন্ম দেয়। ১৮৭৯ সালে স্বাক্ষরিত জার্মানি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির দ্বৈত মিত্রতা চুক্তি (Dual Alliance)-কে ভিত্তি করে ১৮৮২ সালে ইতালিকে নিয়ে গঠিত হয় ত্রিশক্তি মৈত্রী। অন্যদিকে, রাশিয়া ও ফ্রান্স পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আবদ্ধ হয় ১৮৯৪ সালে। ব্রিটেন প্রথমে ‘স্প্লেন্ডিড আইসোলেশন’ বা গৌরবময় বিচ্ছিন্নতা নীতি অনুসরণ করলেও, জার্মানির ক্রমবর্ধমান নৌ-শক্তির কারণে পরে ফ্রান্সের সঙ্গে ১৯০৪ সালে ‘এন্টেন্টে কর্ডিয়াল’ ও রাশিয়ার সঙ্গে ১৯০৭ সালে অ্যাংলো-রাশিয়ান কনভেনশন স্বাক্ষর করে।
সমস্যা হলো, এই চুক্তিগুলো ছিল শুরুতে প্রতিরক্ষামূলক হলেও, সংকটকালে প্রতিটি দেশের কূটনৈতিক সিদ্ধান্তকে তারা বিপজ্জনকভাবে সীমিত করে তোলে। কোনো একটি ছোট দেশের ওপর আক্রমণ ঘটলে তার মিত্ররা স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। ১৯১৪ সালের ২৮ জুন সারায়েভোর রাস্তায় যখন প্রিন্সিপের গুলি ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দের প্রাণ কেড়ে নেয়, ঠিক তখনই এই জোটব্যবস্থা এক ভয়াবহ শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সার্বিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে জার্মানির কাছ থেকে তথাকথিত ‘ব্ল্যাঙ্ক চেক’ বা শর্তহীন সমর্থন পায়, যা ভিয়েনার নীতিনির্ধারকদের কঠোর অবস্থান নিতে আরও উৎসাহিত করে। অন্যদিকে, রাশিয়া সার্বিয়ার পক্ষে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলে ফ্রান্স তার মিত্র রাশিয়াকে কূটনৈতিক সমর্থন দেয়। এরপর জার্মানির শ্লিফেন পরিকল্পনা (Schlieffen Plan) বাস্তবায়ন করতে গিয়ে নিরপেক্ষ বেলজিয়াম আক্রমণ করলে ব্রিটেনও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
গুরুত্বপূর্ণভাবে লক্ষণীয়, মিত্রজোট ব্যবস্থা ছিল ইউরোপের ‘শক্তির ভারসাম্য’ বজায় রাখার কৌশল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা-ই পরিণত হয়েছিল ইউরোপীয় শক্তিগুলোকে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার হাতিয়ারে। জোটগুলো এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল যেখানে কোনো দেশ একা পিছু হটতে পারেনি, কারণ পিছু হটলে তারা তাদের মিত্রকে হারানোর ভয়ে ছিল। ফলে কূটনৈতিক সংকট সামরিক সংঘাতে পরিণত হয়েছিল প্রায় অনিবার্যভাবেই। এই প্রক্রিয়ায় প্রতিটি বৃহৎ শক্তির নিজস্ব স্বার্থ ও ভয় কাজ করেছিল, কিন্তু তার মধ্যে জার্মানির উত্থান ও ব্রিটেনের সঙ্গে তার নৌ-প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল সবচেয়ে উত্তেজনাকর।
১.২ সাম্রাজ্যবাদ ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুটা ছিল ‘নয়া সাম্রাজ্যবাদ’-এর যুগ। ইউরোপীয় বৃহৎ শক্তিগুলো, বিশেষ করে ব্রিটেন ও ফ্রান্স, ইতোমধ্যেই আফ্রিকা, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বিস্তীর্ণ ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল। ১৮৭১ সালে একীভূত জার্মানি এই দৌড়ে অনেক দেরিতে যোগ দেয়। কাইজার দ্বিতীয় ভিলহেল্ম (Kaiser Wilhelm II)-এর ‘ভেল্টপোলিটিক’ (Weltpolitik) বা বিশ্বরাজনীতির নীতি ছিল জার্মানিকে একটি বৈশ্বিক পরাশক্তির মর্যাদা দেওয়ার উচ্চাভিলাষী প্রচেষ্টা। এই নীতির প্রধান কুশীলব হিসেবে কাইজারের পররাষ্ট্রসচিব ও পরবর্তী চ্যান্সেলর বের্নহার্ড ফন ব্যুলোভ (Bernhard von Bülow) বিখ্যাত এক বক্তৃতায় জার্মানির জন্য ‘সূর্যের আলোয় স্থান’ (Place in the Sun) দাবি করেন।
জার্মানির এই সম্প্রসারণবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা ইউরোপে একের পর এক সংকট সৃষ্টি করে। ১৯০৫ সালের প্রথম মরোক্কো সংকট ও ১৯১১ সালের দ্বিতীয় মরক্কো সংকটে জার্মানি সরাসরি ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। প্রথম মরোক্কো সংকটে কাইজার ভিলহেল্ম টাঙ্গিয়ারে গিয়ে মরক্কোর স্বাধীনতার পক্ষে বক্তব্য দিয়ে ফ্রান্সের ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জ করেন। দ্বিতীয় মরোক্কো সংকটে জার্মানি আগ্রাসী উপকূলে তাদের গানবোট ‘প্যান্থার’ প্রেরণ করে, যা ফ্রান্স ও ব্রিটেনের সঙ্গে জার্মানির সম্পর্ক আরও বিষাক্ত করে তোলে। এই সংকটগুলোর প্রতিটিতে জার্মানি কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন ও অপদস্থ হয়, যা জার্মান নেতৃত্বের মধ্যে একটি ‘অবরোধের মনস্তত্ত্ব’ (encirclement mentality) গড়ে তোলে—এই বিশ্বাস যে, শত্রুশক্তিগুলো জার্মানিকে ঘিরে ফেলতে চাইছে।
সাম্রাজ্যবাদের পেছনে অর্থনৈতিক কারণও ছিল শক্তিশালী। ইউরোপের শিল্প বিপ্লব-উত্তর অর্থনীতিগুলোর কাঁচামাল ও ভোক্তাবাজারের প্রয়োজন ছিল অপরিসীম। লেনিন ১৯১৭ সালে প্রকাশিত ‘সাম্রাজ্যবাদ: পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর’ গ্রন্থে যুক্তি দেন যে একচেটিয়া পুঁজিবাদ (monopoly capitalism) বিদেশি বাজার ও সম্পদের জন্য প্রতিযোগিতার জন্ম দেয়, যা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে পরিণত হয়। লেনিনের মতে, ‘পৃথিবী যখন ভাগ হয়ে গেছে, তখন তাকে পুনর্বণ্টন করা প্রয়োজন হয়—এবং তা কেবল শক্তির মাধ্যমেই সম্ভব।’
তবে অর্থনৈতিক কারণগুলো এককভাবে যুদ্ধ ঘটায়নি, বরং অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে মিলে কাজ করেছিল। ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যে আলজেরিয়া-লরেন-এর মতো শিল্পসমৃদ্ধ অঞ্চল নিয়ে যে বিরোধ ছিল, তা অর্থনৈতিক ও জাতীয়তাবাদী আবেগের শক্তিশালী মিশ্রণ তৈরি করেছিল। প্রকৃত অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরশীলতা যুদ্ধ ঠেকানোর চেয়ে বরং রাজনৈতিক উত্তেজনা দ্বারা ছাপিয়ে গিয়েছিল।
আরও পড়ুন -
১.৩ জাতীয়তাবাদ ও বলকান অঞ্চলের বিস্ফোরক পরিস্থিতি
জাতীয়তাবাদ ছিল উনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী আদর্শিক শক্তি, কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে এর দ্বৈত চরিত্র ছিল স্পষ্ট। পশ্চিম ইউরোপে এটি ছিল রাষ্ট্রক্ষমতার প্রতীক—ফ্রান্সে এটি ছিল ১৮৭১ সালে জার্মানির কাছে হারানো আলজেরিয়া-লরেন অঞ্চল পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষা; জার্মানিতে এটি ছিল নতুন জাতিরাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের বাসনা। কিন্তু পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে জাতীয়তাবাদ ছিল বিস্ফোরক—বহুজাতিক অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় ও অটোমান সাম্রাজ্যের ভেতরকার ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা।
বলকান উপদ্বীপ ছিল এই জাতীয়তাবাদী আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু। ঊনবিংশ শতাব্দীতে অটোমান সাম্রাজ্যের ক্রমশ দুর্বলতা (‘ইউরোপের রুগ্ন ব্যক্তি’) ও পশ্চাদপসারণের ফলে বলকানে নতুন নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়: সার্বিয়া, গ্রিস, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া। কিন্তু এই রাষ্ট্রগুলোর প্রত্যেকেরই সীমান্ত ছিল অস্থায়ী এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক স্বজাতি জনগোষ্ঠী বসবাস করত। এর ফলে ‘বৃহত্তর সার্বিয়া’, ‘বৃহত্তর বুলগেরিয়া’-র মতো প্যান-জাতীয়তাবাদী আন্দোলনগুলো প্রতিবেশী রাষ্ট্র ও বৃহৎ সাম্রাজ্যগুলোর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সার্বিয়ার নেতৃত্বে দক্ষিণ স্লাভদের একত্রীকরণের যে স্বপ্ন, তাকে ‘ইউগোস্লাভিজম’ বলা হতো।
১৯০৮ সালের বসনিয়া সংকট পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে। বার্লিন কংগ্রেসের (১৮৭৮) পর থেকে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা দখল করে প্রশাসন চালিয়ে আসছিল। কিন্তু ১৯০৮ সালে তরুণ তুর্কি বিপ্লবের পর যখন মনে হলো অটোমান সাম্রাজ্যে গণতান্ত্রিক ঢেউ আসছে এবং বসনিয়ার প্রতিনিধিরা নতুন অটোমান পার্লামেন্টে যোগ দিতে পারে, তখন ভিয়েনা এই আশঙ্কায় বসনিয়াকে পূর্ণাঙ্গভাবে সাম্রাজ্যভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। এটি ছিল সার্বিয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য এক বড় ধাক্কা, কারণ সার্বিয়া নিজেও বসনিয়াকে নিজেদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে দেখত। রাশিয়া, যারা নিজেকে বলকানের স্লাভ জাতিগোষ্ঠীগুলোর রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করত, এই সংকটে কূটনৈতিকভাবে অপদস্থ হয়, যার প্রতিশোধ নেওয়ার মানসিকতা ১৯১৪ সালে কাজ করে। এই সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে ১৯১৪ সালের জুলাই মাসে রাশিয়া সার্বিয়ার পাশে দাঁড়ানোর ব্যাপারে আগের চেয়ে বেশি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়।
বলকান অঞ্চলটি কেবল রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল ছিল না, বরং তা ছিল ইউরোপীয় শক্তিগুলোর জন্য একটি ‘প্রক্সি যুদ্ধক্ষেত্র’। রাশিয়া ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি উভয়েই বলকান অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছিল এবং এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা সরাসরি তাদের মধ্যকার সম্পর্ককে বিষিয়ে তুলছিল। ১৯১২-১৩ সালের দুইটি বলকান যুদ্ধ বলকান জাতিগুলোর মধ্যে গভীর বিভাজন ও শত্রুতা সৃষ্টি করে এবং বলকানকে ‘ইউরোপের পাউডার কেগ’ (বারুদের পিপা)-তে পরিণত করে যেখানে একটি স্ফুলিঙ্গই পুরো মহাদেশকে উড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
১.৪ সমরবাদ, অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও সামাজিক ডারউইনবাদ
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগের দুই দশকে ইউরোপে সামরিক ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পায়। প্রতিটি দেশই তাদের স্থলসেনা ও নৌবাহিনী আধুনিকীকরণে বিপুল অর্থ ব্যয় করে। যুদ্ধাস্ত্র উৎপাদনে প্রতিযোগিতা, জেনারেলদের রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি এবং যুদ্ধকে গৌরবময় হিসেবে দেখার সাংস্কৃতিক মনোভাব—এই তিনের সম্মিলিত রূপ ছিল সমরবাদ (Militarism)।
জার্মানি ও ব্রিটেনের মধ্যে নৌ-প্রতিযোগিতা ছিল এই অস্ত্র প্রতিযোগিতার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক। ১৮৯৮ সালে জার্মানির প্রথম নৌ-আইন পাশ হওয়ার পর থেকে অ্যাডমিরাল আলফ্রেড ফন টির্পিজ-এর নেতৃত্বে জার্মানি একটি বৃহৎ যুদ্ধবহর নির্মাণ শুরু করে, যা সরাসরি ব্রিটেনের নৌ-আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে। ব্রিটেন পাল্টা হিসেবে ১৯০৬ সালে এইচএমএস ড্রেডনট নামের যুগান্তকারী যুদ্ধজাহাজ তৈরি করে, যার প্রতিযোগিতায় জার্মানিও ড্রেডনট-শ্রেণির জাহাজ নির্মাণ শুরু করে। এই প্রতিযোগিতা উভয় দেশের সম্পর্ককে ক্রমশ তিক্ত করে তোলে এবং ব্রিটেনের জার্মান-বিরোধী মনোভাবকে শক্তিশালী করে।
ইউরোপের সামরিক পরিকল্পনাগুলোও যুদ্ধকে প্রায় অনিবার্য করে তুলছিল। জার্মানির শ্লিফেন পরিকল্পনা ছিল এই বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি যে, যুদ্ধ শুরু হলে জার্মানিকে একসঙ্গে ফ্রান্স ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে দুই ফ্রন্টে লড়তে হবে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফ্রান্সকে দ্রুত পরাজিত করে (ছয় সপ্তাহের মধ্যে প্যারিস দখল করা) তারপর রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে পুরো শক্তি নিয়োগ করতে হবে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, জার্মান সেনাবাহিনীকে ফ্রান্সের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা লাইন এড়িয়ে নিরপেক্ষ বেলজিয়ামের মধ্য দিয়ে ফ্রান্স আক্রমণ করতে হবে। কিন্তু বেলজিয়ামের নিরপেক্ষতা লঙ্ঘন ছিল আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন, যা ব্রিটেনকে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার নৈতিক অজুহাত দেয়।
সমরবাদের পেছনে আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল সামাজিক ডারউইনবাদ—ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্বের একটি বিকৃত সামাজিক রূপ যা দাবি করত যে, সমাজ ও জাতির মধ্যেও একইভাবে যোগ্যতমের টিকে থাকার সংগ্রাম চলছে। অনেক ইউরোপীয় নেতা ও বুদ্ধিজীবী বিশ্বাস করতেন যে, যুদ্ধ কেবল অনিবার্য নয়, বরং জাতির স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয়—এটি দুর্বলকে নিশ্চিহ্ন করে ও শক্তিশালী জাতির উত্থান নিশ্চিত করে। এই বিশ্বাস ১৯১৪ সালের জুলাই মাসে কুটনৈতিকভাবে পিছু হটার পরিবর্তে সামরিক উত্তেজনা বাড়ানোর পক্ষে কাজ করে।
১.৫ আলজেরিয়া-লরেন: একটি অমীমাংসিত ক্ষত
১৮৭১ সালের ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধের পরিসমাপ্তিতে ফ্রান্স জার্মানির কাছে আলজেরিয়া-লরেন অঞ্চলটি হারায়—একটি আঘাত যা ফরাসি জাতীয় মানসিকতায় গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। প্রায় ১.৯ মিলিয়ন মানুষ এই অঞ্চলে বাস করত এবং এর শিল্পসম্পদ ছিল অমূল্য। ফরাসি রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রধানতম যুদ্ধলক্ষ্যই ছিল এই ‘হারানো প্রদেশগুলো’র পুনরুদ্ধার। জার্মানি অঞ্চলটিকে ‘রাইখসল্যান্ড’ বা সাম্রাজ্যের ভূমি হিসেবে সরাসরি কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে রাখে এবং জার্মানীকরণ নীতি প্রয়োগ করে। ফরাসি শিক্ষা, ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর চাপ প্রয়োগ এবং প্রায় ১২০,০০০ জার্মান অভিবাসীকে এখানে বসতি স্থাপনে উৎসাহিত করা হয়।
যদিও স্থানীয় জনগণের একটি অংশ ধীরে ধীরে জার্মান শাসনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিল, তবুও ফরাসি পুনরুদ্ধারবাদী আন্দোলন কখনোই পুরোপুরি ম্লান হয়নি। ফ্রান্সের রাজনীতিতে ‘লা রেভাঁশ’ (প্রতিশোধ) ধারণাটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। এ কারণেই ১৯১৪ সালে যখন যুদ্ধ শুরু হয়, তখন ফরাসি সেনাবাহিনী ও জনগণের কাছে এটি ছিল বহু প্রতীক্ষিত প্রতিশোধের সুযোগ। আলজেরিয়া-লরেন ইস্যুটি ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যকার সম্পর্ককে স্থায়ীভাবে বিষাক্ত করে রেখেছিল এবং কোনো অর্থবহ ফ্রাঙ্কো-জার্মান পুনর্মিলনের পথ অবরুদ্ধ করে রেখেছিল।
এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের জীবনও ছিল বিভক্ত। ১৯১১ সালে নতুন সংবিধানের মাধ্যমে অঞ্চলটিকে কিছু স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়, কিন্তু ১৯১৩ সালের জাবার্ন কাণ্ড (Zabern Affair)-এ জার্মান সেনাবাহিনীর দুর্ব্যবহারে স্থানীয় জনগণের মধ্যে জার্মান-বিরোধী মনোভাব তীব্রতর হয়। যুদ্ধ শুরু হলে প্রায় ৩৮০,০০০ আলজেশিয়-লরেইন যুবক জার্মান সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য হয়, তবে তাদের আনুগত্য নিয়ে জার্মান হাইকমান্ড সবসময় সন্দিহান ছিল—এদের বেশিরভাগকেই পূর্ব ফ্রন্টে বা নৌবাহিনীতে মোতায়েন করা হয়েছিল পশ্চিম ফ্রন্টে ফরাসি আত্মীয়দের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা এড়াতে। অন্যদিকে, প্রায় ১৭,৫০০ আলজেশিয়-লরেইন ফ্রান্সে পালিয়ে গিয়ে ফরাসি সেনাবাহিনীতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নাম লেখায়।
অধ্যায় ২:কীভাবে অঞ্চলিক দ্বন্দ্ব বিশ্বযুদ্ধ হলো?
২.১ হত্যাকাণ্ড ও প্রথম প্রতিক্রিয়া
২৮ জুন ১৯১৪, সারায়েভো। অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ ও তাঁর স্ত্রী সোফি এক সরকারি সফরে বসনিয়ার রাজধানীতে আসেন। দিনটি ছিল সার্বিয়ার জাতীয় শোক দিবস (১৩৮৯ সালের কসোভো যুদ্ধের স্মরণে), যে কারণে অনেক সার্বের কাছেই এই সফর ছিল উত্তেজক। বসনিয়ার তরুণ সার্ব বিপ্লবী গাভরিলো প্রিন্সিপ ‘ইয়ং বসনিয়া’ নামের গোপন সংগঠনের সদস্য হিসেবে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় শাসন থেকে মুক্তির জন্য সংগ্রাম করছিলেন। ঘটনাক্রমে, ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দের গাড়িবহর ভুল পথে চলে গেলে প্রিন্সিপের সামনে এসে থামে, এবং তিনি ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ ও সোফিকে গুলি করে হত্যা করেন।
২.২ ‘ব্ল্যাঙ্ক চেক’ ও অস্ট্রিয়ার আলটিমেটাম
হত্যাকাণ্ডের পর অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু তা করতে গিয়ে জার্মানির সমর্থন নিশ্চিত করতে চায়। ৫ জুলাই কাইজার দ্বিতীয় ভিলহেল্ম ও চ্যান্সেলর থিওবাল্ড ফন বেটম্যান হলভেগ অস্ট্রিয়াকে যে উত্তর দেন, তা ইতিহাসে ‘ব্ল্যাঙ্ক চেক’ বা শর্তহীন সমর্থনের প্রতিশ্রুতি নামে পরিচিত। এই সমর্থন পাওয়ার পর অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি ২৩ জুলাই সার্বিয়ার কাছে ১০টি দফার একটি চরমপত্র বা আলটিমেটাম পেশ করে, যার শর্তগুলো ইচ্ছাকৃতভাবেই এমন কঠোর করা হয়েছিল যাতে সার্বিয়া তা মেনে নিতে না পারে।
২.৩ রুশ গণসংহতি ও জার্মানির প্রতিক্রিয়া
সার্বিয়া আশ্চর্যজনকভাবে আলটিমেটামের প্রায় সব শর্ত মেনে নেয়, কেবল একটি শর্ত ছাড়া—যা ছিল সার্বিয়ার অভ্যন্তরীণ বিচারব্যবস্থায় অস্ট্রীয় কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপের অনুমতি। তথাপি অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি ২৮ জুলাই সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ব্রিটেন একটি মধ্যস্থতাকারী সম্মেলনের প্রস্তাব দেয়, কিন্তু বার্লিন ও ভিয়েনা তা উপেক্ষা করে। ২৯ জুলাই রাশিয়া আংশিক গণসংহতি ঘোষণা করে সার্বিয়াকে সমর্থন জানায়, কিন্তু ৩০ জুলাই জার দ্বিতীয় নিকোলাস সম্পূর্ণ গণসংহতির নির্দেশ দেন। জার্মানি এর প্রতিক্রিয়ায় ১ আগস্ট রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং ৩ আগস্ট ফ্রান্সের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ ঘোষণা করে। শ্লিফেন পরিকল্পনার আওতায় জার্মান সেনাবাহিনী ১ আগস্ট লুক্সেমবার্গ ও ৪ আগস্ট নিরপেক্ষ বেলজিয়াম আক্রমণ করে, যার ফলে ব্রিটেন ৪ আগস্ট জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ৬ আগস্ট অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, এর মধ্য দিয়ে ইউরোপের পাঁচ সপ্তাহের কূটনৈতিক সংকট পুরোদমের বিশ্বযুদ্ধে পরিণত হয়।
২.৪ তৎপরতা বনাম ইচ্ছা: জুলাই সংকটের দায় বণ্টন
জুলাই সংকট নিয়ে বিতর্কের মূল প্রশ্ন হলো, এই যুদ্ধ কি অনিচ্ছাকৃত তৎপরতার ফসল (War by timetable), নাকি এক বা একাধিক শক্তির সচেতন নকশার ফল? ‘‘ওয়ার বাই টাইমটেবল’’ তত্ত্ব অনুযায়ী, যুদ্ধ পরিকল্পনার গতিই (বিশেষ করে জার্মানির শ্লিফেন পরিকল্পনা, যার জন্য দ্রুত গণসংহতি ছিল অপরিহার্য) রাজনীতিবিদদের হাত থেকে নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেয়। একবার গণসংহতি শুরু হয়ে গেলে সেটাকে আর থামানো যায়নি, কারণ থামালে প্রতিপক্ষের কাছে অসহায় হয়ে যাওয়ার ভয় ছিল।
কিন্তু ফ্রিৎস ফিশার (Fritz Fischer)-এর মতো ঐতিহাসিকরা এই দৃষ্টিভঙ্গির কঠোর সমালোচনা করেন। ফিশারের মতে, ১৯১৪ সালের জুলাই মাসে জার্মানি ইচ্ছাকৃতভাবেই যুদ্ধ চেয়েছিল—ইউরোপে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট থেকে মনোযোগ সরাতে এবং ফ্রান্স ও রাশিয়াকে তাদের পুনরায় শক্তিশালী হয়ে ওঠার আগেই পরাস্ত করতে। ফিশারের এই অবস্থানকে ‘ফিশার থিসিস’ বলা হয় এবং এটি ১৯৬০-এর দশকে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।
আধুনিক ঐতিহাসিক গবেষণা অবশ্য কোনো একক দেশের ওপর সম্পূর্ণ দায় চাপানোর পরিবর্তে দায়ের একটি জটিল বিন্যাস তুলে ধরে। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি তার স্থানীয় দ্বন্দ্বকে আন্তর্জাতিকীকরণ করেছিল; জার্মানি তার মিত্রকে ‘ব্ল্যাঙ্ক চেক’ দিয়ে উৎসাহিত করেছিল; রাশিয়া তাড়াতাড়ি গণসংহতি ঘোষণা করে কূটনীতির সুযোগ সীমিত করেছিল; ফ্রান্স রাশিয়াকে তার কঠোর অবস্থানের জন্য সমর্থন দিয়েছিল; এবং ব্রিটেন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তার অবস্থান অস্পষ্ট রেখেছিল, যা জার্মানিকে ভুল হিসেব-নিকেশে প্ররোচিত করেছিল।
অধ্যায় ৩: বিতর্ক ও দায়—ইতিহাস লেখার রাজনীতি
৩.১ ভার্সাই চুক্তির ‘যুদ্ধাপরাধ ধারা’
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এর কারণ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। ১৯১৯ সালের জুন মাসে স্বাক্ষরিত ভার্সাই চুক্তির ২৩১ নম্বর ধারা—যা ‘ওয়ার গিল্ট ক্লজ’ (War Guilt Clause) নামে পরিচিত—জার্মানি ও তার মিত্রদের ওপর ‘সমস্ত ক্ষতি ও সর্বনাশের দায়’ চাপায়। বিজয়ী মিত্রশক্তির এই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য ছিল জার্মানির কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ আদায়ের বৈধতা দেওয়া। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এটি ছিল ধ্বংসাত্মক এক পদক্ষেপ।
জার্মানির কাছে এই ধারা ছিল জাতীয় অপমানের প্রতীক। ভাইমার প্রজাতন্ত্রের পুরো সময়কাল জুড়েই জার্মান সরকার ও বুদ্ধিজীবীরা এই ধারার বিরুদ্ধে তীব্র প্রচারণা চালায়। তারা ‘যুদ্ধাপরাধের মিথ্যা’ (Kriegsschuldlüge) আখ্যা দিয়ে এই ধারাকে অস্বীকার করে এবং ইতিহাসবিদদের নিয়োগ করে প্রমাণ করতে চায় যে, যুদ্ধের জন্য সকল ইউরোপীয় শক্তিই সমানভাবে দায়ী। ১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে এই ‘সংশোধনবাদী’ ইতিহাসচর্চা জার্মানিতে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয় এবং হিটলারের উত্থানের আদর্শিক পটভূমি তৈরি করে।
৩.২ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ঐতিহাসিক ধারা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার পর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দায় নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়। ইতিহাসবিদরা মোটাদাগে তিনটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েন:
প্রথম ধারার ইতিহাসবিদরা বিশ্বাস করেন যে, জার্মানি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি ছিল প্রধান দায়ী। ফ্রিৎস ফিশার এই ধারার সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রবক্তা। ১৯৬১ সালে প্রকাশিত ‘গ্রিফ নাখ ডের ভেল্টমাখট’ (Griff nach der Weltmacht) গ্রন্থে ফিশার যুক্তি দেন যে, ১৯১৪ সালে জার্মানি ইচ্ছাকৃতভাবে যুদ্ধ চেয়েছিল এবং এই যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল ইউরোপে জার্মান আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। ফিশারের মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জার্মান যুদ্ধলক্ষ্যের যোগসূত্র আছে—একটি ধারাবাহিকতা যা জার্মান সম্প্রসারণবাদী আকাঙ্ক্ষার প্রমাণ।
দ্বিতীয় ধারার ইতিহাসবিদরা বিশ্বাস করেন যে, যুদ্ধ অপরিকল্পিত ছিল, কিন্তু জার্মানি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির ঝুঁকিপূর্ণ আচরণই প্রধানত দায়ী। এই মতে, কোনো দেশই যুদ্ধ চায়নি, কিন্তু জার্মানি ও অস্ট্রিয়া তাদের কূটনীতিকে এমনভাবে পরিচালনা করেছিল যাতে সংকট নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
তৃতীয় ধারার ইতিহাসবিদরা মনে করেন, সব বৃহৎ শক্তিই সম্মিলিতভাবে দায়ী। এই মতে, যুদ্ধ ছিল ইউরোপীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার এক পদ্ধতিগত ব্যর্থতা, যেখানে কোনো একক দেশের চেয়ে বরং সমগ্র ইউরোপীয় কূটনৈতিক ও সামরিক কাঠামোই দায়ী।
৩.৩ একবিংশ শতাব্দীর দৃষ্টিভঙ্গি
সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ইতিহাসবিদরা একক দায়ের প্রশ্ন থেকে সরে এসে আরও জটিল, বহুমাত্রিক ব্যাখ্যার দিকে ঝুঁকেছেন। ক্রিস্টোফার ক্লার্ক-এর ‘দ্য স্লিপওয়াকার্স’ (The Sleepwalkers: How Europe Went to War in 1914) গ্রন্থে ক্লার্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেন: ইউরোপীয় নেতারা যুদ্ধের দিকে ‘ঘুমন্ত অবস্থায় হাঁটছিলেন’—না তারা পুরোপুরি সচেতনভাবে যুদ্ধ চেয়েছিলেন, না তারা পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় ছিলেন; বরং ভুল হিসাব, ভুল যোগাযোগ ও ভ্রান্ত বিশ্বাসের এক শৃঙ্খল তাদের যুদ্ধের দিকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল।
আধুনিক গবেষণায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো, বলকান অঞ্চলের স্থানীয় রাজনীতির ওপর বর্ধিত জোর দেওয়া। আগে ইতিহাসবিদরা প্রধানত বার্লিন, ভিয়েনা, সেন্ট পিটার্সবার্গ, প্যারিস ও লন্ডনের দৃষ্টিকোণ থেকে কাহিনি বলতেন, কিন্তু এখন বেলগ্রেডের ভূমিকাও গুরুত্ব সহকারে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। সার্বিয়ার গোপন গোয়েন্দা সংস্থা ‘কালো হাত’ (Black Hand) সংগঠনের ভূমিকা, সার্বিয়ার সম্প্রসারণবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির বহুজাতিক সাম্রাজ্যের ভঙ্গুরতাকে এখন আরও বিস্তারিতভাবে দেখা হয়।
এর পাশাপাশি, ঐতিহাসিকরা এখন ‘কাঠামোগত’ (systemic) ও ‘ঘটনা-ভিত্তিক’ (contingent) ব্যাখ্যার মধ্যে ভারসাম্য খোঁজেন। কাঠামোগত ব্যাখ্যা মিত্রজোট, সামরিক পরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার মতো বিষয়গুলোর ওপর জোর দেয় এবং যুক্তি দেয় যে, এই কাঠামোগুলো একবার তৈরি হয়ে গেলে যুদ্ধ প্রায় অনিবার্য ছিল। অন্যদিকে, ঘটনা-ভিত্তিক ব্যাখ্যা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, কূটনৈতিক ভুল বোঝাবুঝি ও আকস্মিক ঘটনার গুরুত্ব তুলে ধরে—যেমন গাভরিলো প্রিন্সিপের ঐতিহাসিক সেই ভুল পথের গাড়িবহর, যা ছাড়া হয়তো পুরো ট্র্যাজেডি এড়ানো যেত।
একটি বহুমাত্রিক ট্র্যাজেডি থেকে শিক্ষা
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার কারণ একক কোনো ফর্মুলায় ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এটি ছিল মিত্রজোট ব্যবস্থার অনমনীয়তা, সাম্রাজ্যবাদী প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, জাতীয়তাবাদের বিস্ফোরক শক্তি, বলকান অঞ্চলের জটিল রাজনীতি, সমরবাদী সংস্কৃতি ও সামাজিক ডারউইনবাদের প্রভাব, আলজেরিয়া-লরেনের অমীমাংসিত ক্ষত, এবং জুলাই ১৯১৪-এর ভুল হিসাব ও ভুল যোগাযোগের এক বিষাক্ত মিশ্রণ।
কিন্তু সম্ভবত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, কাঠামো ভেঙে পড়লে ব্যক্তির সিদ্ধান্ত কতটা সর্বনাশা হয়ে উঠতে পারে। ইউরোপের শক্তির ভারসাম্য, মিত্রজোট ব্যবস্থা, সামরিক পরিকল্পনা—এসব কাঠামোগত উপাদান যুদ্ধের সম্ভাবনা তৈরি করেছিল, কিন্তু তা বাস্তবে রূপ নিয়েছিল কয়েক ডজন নারী-পুরুষের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে, যাঁরা ভয়, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ভ্রান্ত বিশ্বাস ও ভুল হিসাব নিয়ে কাজ করেছিলেন।
আজকের বিশ্বরাজনীতির দিকে তাকালে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শিক্ষা হয়তো আগের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। ক্রমবর্ধমান বৃহৎ শক্তি প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সামরিক বাজেটের রেকর্ড বৃদ্ধি, জাতীয়তাবাদের উত্থান এবং কূটনৈতিক যোগাযোগের সংকট—এই উপাদানগুলো কি আমাদেরও কোনো নতুন ‘স্লিপওয়াকিং’-এর দিকে ঠেলে দিচ্ছে না তো? ইতিহাস কখনোই আক্ষরিকভাবে পুনরাবৃত্তি হয় না, কিন্তু তার ছন্দ চেনা যায়। আর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ছন্দ আমাদের সবচেয়ে ভয়ংকর শিক্ষাটি দেয়: সংকটের মুহূর্তে ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য হতে পারে অকল্পনীয়।
আরও পড়ুন -
