কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি

    রবীন্দ্রনাথের দর্শন চিন্তা

    পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কিছু মনীষী জন্মেছেন, যাঁদের চিন্তা কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে বাঁধা পড়েনি; বরং তা সারা বিশ্বের মানুষের সম্পদ হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁদের অন্যতম। আমরা সাধারণত রবীন্দ্রনাথকে কবি, ঔপন্যাসিক, গীতিকার বা চিত্রকর হিসেবে চিনলেও, তাঁর আরেকটি বিশাল পরিচয় তিনি একজন দার্শনিক, এক অনন্য জীবনদ্রষ্টা। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের দর্শন কোনো নিরস তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা নয়; এটি জীবনবোধের, অনুভবের, আধ্যাত্মিক উপলব্ধির এক অনির্বচনীয় প্রকাশ। তাঁর দর্শন চিন্তা মানে জীবনকে গভীরতর করে দেখা, প্রকৃতি ও সত্তার মাঝে এক নিবিড় সংযোগ অনুভব করা এবং সীমার ভেতর থেকেই অসীমের সন্ধান করা।

    রবীন্দ্রনাথের দর্শন চিন্তা

    এই ব্লগ পোস্টে আমরা রবীন্দ্রনাথের দর্শন চিন্তার গভীর তলদেশে প্রবেশ করব। আমরা দেখব কীভাবে তিনি পাশ্চাত্যের যান্ত্রিকতা, প্রাচ্যের আধ্যাত্মিকতা এবং মানবতাবাদের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। ‘মানুষের ধর্ম’, ‘সাধনা’, ‘আত্মপরিচয়’, ‘ধর্মের অন্ধকার’ প্রভৃতি গ্রন্থের আলোকে আমরা বিশ্লেষণ করব তাঁর ভাবনার মূল স্তম্ভগুলো। শুধু তা-ই নয়, আধুনিক জীবনের সংকটে রবীন্দ্রনাথের দর্শন কতটা প্রাসঙ্গিক, তাও খতিয়ে দেখা হবে এই রচনায়।

    একটি স্বতন্ত্র ধারার জন্ম

    অনেক দার্শনিক আছেন যাঁরা জগৎ ও জীবন সম্পর্কে একটি সুসংবদ্ধ তত্ত্ব (Systematic Philosophy) নির্মাণ করেছেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তা করেননি। তিনি ছিলেন একাধারে কবি ও ঋষি। তাই তাঁর দর্শন যুক্তির পথ ধরে নয়, অনুভব ও অন্তর্দৃষ্টির (Intuition) পথ ধরে এগিয়েছে। এ কারণেই অনেকে একে ‘কবির দর্শন’ বা ‘ঋষির দর্শন’ বলে অভিহিত করেন।

    তবে একে নিছক কবিতা বা কল্পনার বিলাস ভাবার কোনো সুযোগ নেই। রবীন্দ্র দর্শনকে আমরা ‘মানবতাবাদী আদর্শবাদ’ (Humanistic Idealism) নামে চিহ্নিত করতে পারি। এর মূল সুরটি হলো—এই জগৎ ও জীবন সত্য, সুন্দর এবং অর্থপূর্ণ। ইহকালকে তিনি উপেক্ষা করেননি, আবার পারত্রিক মোক্ষলাভকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বলে মনে করেননি। তাঁর কাছে জীবনের সার্থকতা ‘এই মাটিতে’ ফুল ফোটানো, কিন্তু আকাশের আলোয়।

    রবীন্দ্রনাথের দর্শনের প্রধান বৈশিষ্ট্য ও স্তম্ভসমূহ

    তাঁর দর্শনকে কয়েকটি কেন্দ্রীয় ভাবনার চারপাশে সুবিন্যস্ত করা যায়। নিচের টেবিলে মূল বৈশিষ্ট্যগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

    দার্শনিক ধারণামূল বক্তব্য
    মানুষের ধর্মসংকীর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের ঊর্ধ্বে মানবসত্তার শাশ্বত প্রকাশই প্রকৃত ধর্ম।
    সীমা ও অসীমের দ্বান্দ্বিকতাসীমিত দেহ ও ইন্দ্রিয়ের ভেতর দিয়েই অসীম সত্তার (ভগবান/পরমব্রহ্ম) প্রকাশ।
    প্রকৃতি বনাম সভ্যতাপ্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় মিলন মানবাত্মার পরিপূর্ণতার চাবিকাঠি। আধুনিক সভ্যতা এই বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে।
    সত্য, শিব ও সুন্দরসত্য (জ্ঞান), শিব (কল্যাণ) ও সুন্দর (সৌন্দর্য) একে অপরের পরিপূরক। সুন্দরের মধ্য দিয়ে তিনি পরমসত্তায় পৌঁছাতে চেয়েছেন।
    শিক্ষাদর্শনশিক্ষা হবে প্রকৃতির মুক্তাঙ্গনে আনন্দময়, যা সৃজনশীলতা বাড়ায় এবং বিশ্বনাগরিক গড়ে তোলে।
    জাতীয়তাবাদ ও বিশ্বমানবতাবাদউগ্র জাতীয়তাবাদের ঘোর বিরোধী ছিলেন। ‘বিশ্বমানব’ হওয়ার আকাঙ্ক্ষাই তাঁর দর্শনের চরম লক্ষ্য।

    রবীন্দ্রনাথের দর্শনের গভীরে

    এবার আসুন, এই ধারণাগুলোর গভীরে প্রবেশ করি। প্রতিটি স্তম্ভ কীভাবে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং কীভাবে তা একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবোধের জন্ম দেয়, তা বিশ্লেষণ করা যাক।

    ১. ‘মানুষের ধর্ম’: প্রাতিষ্ঠানিকতার ঊর্ধ্বে মানবতার জয়গান

    রবীন্দ্রনাথের দর্শন চিন্তার সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর ‘মানুষের ধর্ম’ (Religion of Man) ধারণা। তিনি দেখলেন, পৃথিবীর সব ধর্মই কোনো না কোনোভাবে মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি করেছে। ধর্মের নামে হানাহানি, সংকীর্ণতা ও কুসংস্কার মানুষকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। এই প্রেক্ষাপটে তিনি এমন এক ধর্মের কথা বলেন যা কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের নয়, বরং সর্বকালের সর্বমানবের।

    এই ধর্মের ভিত্তি কী?
    রবীন্দ্রনাথ বলেন, মানুষের জন্মগত ভাবেই কিছু গুণ আছে—সহানুভূতি, প্রেম, সৌন্দর্যপ্রিয়তা, সত্যের প্রতি আকাঙ্ক্ষা। এই গুণগুলোই প্রমাণ করে যে, মানুষ শুধু পশু নয়, তার ভেতর এক ‘অতিরিক্ত’ সত্তা আছে। এই অতিরিক্ত সত্তাই তাকে সর্বদা সীমা ছাড়িয়ে যেতে প্ররোচিত করে। আর মানবজীবনের এই যে ‘উদ্বৃত্ত’ শক্তি, এই যে নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার প্রবণতা—এটাই হলো মানুষের ধর্ম।

    তিনি বলেন, মানুষ যখন নিজের ভেতরকার এই মহত্তর সত্তাকে উপলব্ধি করে, তখন সে বুঝতে পারে তার সঙ্গে সমগ্র বিশ্বমানবের আত্মিক সম্পর্ক। ‘ধর্মের অন্ধকার’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, ধর্ম যখন ভোগের বস্তু হয়, তখন সে অন্ধকার; আর যখন তা ত্যাগ ও প্রেমের প্রকাশ হয়, তখনই সে আলো।

    প্রাসঙ্গিকতা: আজকের মেরুকরণে বিভক্ত বিশ্বে, যেখানে ধর্মই সন্ত্রাসের হাতিয়ার হচ্ছে, সেখানে ‘মানুষের ধর্ম’-এর ধারণা এক অমৃতবার্তা।

    ২. অসীমের সন্ধান: ‘জীবনদেবতা’র আরাধনা

    রবীন্দ্রনাথের দর্শনের মধ্যমণি হলো ‘সীমা ও অসীমের’ এই দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক। উপনিষদের ব্রহ্মবাদ ও বৌদ্ধ দর্শনের প্রভাব এখানে স্পষ্ট, তবে তা একেবারে নিজস্ব ঢঙে প্রকাশিত। তিনি বলেন, আমাদের দেহ, ইন্দ্রিয়, চিন্তা সবই সীমাবদ্ধ। কিন্তু এই সীমার মাঝেই আমরা একটি অসীমের আভাস পাই। তিনি এই অসীমকে কখনও ‘পরমব্রহ্ম’, কখনও ‘জীবনদেবতা’, কখনও বা ‘মানবাত্মার রাজা’ বলে অভিহিত করেছেন।

    ‘জীবনদেবতা’র ধারণা:
    রবীন্দ্রনাথের একটি বিখ্যাত ধারণা হলো ‘জীবনদেবতা’। এটি ব্যক্তিগত ঈশ্বর। এটি আমার ভেতরেই অবস্থানকারী এক সত্তা, যে আমার জীবনকে রূপ দিচ্ছে, গতি দিচ্ছে। এটি কোনো বাইরের বিচ্ছিন্ন স্রষ্টা নয়, বরং আমারই অন্তর্নিহিত শক্তি ও সৃজনীপ্রতিভার উৎস। তিনি কবিতায় বলেন, “আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ, / চুনি উঠল রাঙা হয়ে।” অর্থাৎ, জগতের সৌন্দর্য ও সত্যকে উপলব্ধি করার ক্ষমতা আমার চৈতন্যের ভেতরেই নিহিত, আর সেই চৈতন্যের মূলে যে শাশ্বত পুরুষ, তিনিই জীবনদেবতা।

    মোক্ষ বনাম জীবনের পূর্ণতা:
    প্রাচীন ভারতীয় দর্শনে মোক্ষ বা মুক্তি হলো জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্ত হওয়া। কিন্তু রবীন্দ্র দর্শনে মুক্তির সংজ্ঞা ভিন্ন। তাঁর কাছে মুক্তি হলো সীমার মধ্যেই অসীমকে অনুভব করে জীবনকে পরিপূর্ণতায় উপনীত করা। “মুক্তি” মানে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত হওয়া। এই জন্যই তিনি পার্থিব জীবনকে অস্বীকার করেননি; বরং জীবনের রসাস্বাদনই তাঁর কাছে পরম উপাসনা। গীতাঞ্জলির সেই বিখ্যাত পঙ্ক্তি, “ক্লান্তি মানে না আমার, আমি কি ভুলি”—এই যে জীবনকে নিবিড়ভাবে পান করার আকুতি, তা-ই তাঁর দর্শনের প্রাণভোমরা।

    ৩. প্রকৃতি, সৌন্দর্য ও আনন্দ: ‘ইস্কুলের’ গণ্ডি পেরিয়ে ‘শান্তিনিকেতনের’ স্বপ্ন

    রবীন্দ্রনাথের দর্শন চিন্তায় প্রকৃতির স্থান অত্যন্ত উচ্চে। পাশ্চাত্যের রেনেসাঁস-উত্তর যান্ত্রিক সভ্যতা মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে এক গভীর বিচ্ছেদ তৈরি করেছিল, যা রবীন্দ্রনাথ তীব্রভাবে অনুভব করেছিলেন। তিনি দেখেছিলেন, কংক্রিটের শহর মানুষের আত্মাকে শুষ্ক করে ফেলছে। এই যন্ত্রণা থেকে জন্ম নিয়েছিল তাঁর শিক্ষাদর্শন ও শান্তিনিকেতনের স্বপ্ন।

    প্রকৃতি: এক নিবিড় গুরুর ভূমিকা:
    রবীন্দ্রনাথের কাছে প্রকৃতি শুধু ভোগের সম্পদ বা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার বস্তু নয়, এটি এক চৈতন্যময়ী সত্তা। প্রকৃতির ছন্দ, তার রূপ-রস-গন্ধ মানুষের মনকে এমন এক আনন্দে ভরিয়ে দেয়, যা কোনো কৃত্রিম বস্তু দিতে পারে না। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিশু যখন প্রকৃতির মাঝে বেড়ে ওঠে, তখন তার জ্ঞানেন্দ্রিয় শাণিত হয়, কৌতূহল জাগে এবং সৃজনশীলতা বিকশিত হয়। এই দর্শন থেকেই বিশ্বভারতীর মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল, যেখানে গাছতলায় খোলা আকাশের নিচে ক্লাস হতো। এটি ছিল বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক শিক্ষামূলক দৃষ্টান্ত।

    সৌন্দর্যই সত্যের দ্বার:
    রবীন্দ্রনাথের মতে, সৌন্দর্য উপভোগ করা বিলাসিতা নয়, আধ্যাত্মিক সাধনা। যখন আমরা কোনো সুন্দর ফুল দেখে মুগ্ধ হই, তখন আমরা আসলে সীমার মাঝে অসীমের প্রকাশ দেখতে পাই। তাঁর দর্শনে ‘সুন্দর’ একটি স্বতন্ত্র আদর্শ, যা ‘সত্য’ ও ‘শিব’-এর (কল্যাণ) সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। তিনি বলেন, সত্যই শিব, শিবই সুন্দর। আমাদের উপলব্ধি যখন সত্যকে জানতে পারে, তখন তা সুন্দর হয়ে ধরা দেয় এবং সেটাই আমাদের কাছে পরম কল্যাণ। এই বোধ থেকেই তিনি বলতে পেরেছিলেন, “বাইরের দিকে যা প্রকাশ, ভিতরের দিকে তা-ই আনন্দ।”

    ৪. ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও বিশ্বমানবতাবাদ: ‘আমি’ থেকে ‘আমরা’র পথে

    রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক ও সামাজিক দর্শনও তাঁর সামগ্রিক ভাবনারই অংশ। উনিশ শতকের বঙ্গীয় নবজাগরণের সন্তান হয়েও তিনি উগ্র জাতীয়তাবাদকে কখনোই সমর্থন করেননি। ‘জাতীয়তাবাদ’ (Nationalism) নামক গ্রন্থে তিনি একে বিশ্বমানবতার জন্য ভয়ংকর হুমকি বলে চিহ্নিত করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে তিনি লিখেছিলেন, জাতির এই অন্ধ অহংকারই মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

    ব্যক্তিসত্তার মহিমা:
    তিনি সমষ্টির চাপে ব্যক্তিসত্তাকে হারিয়ে যেতে দিতে চাননি। তাঁর ‘আত্মপরিচয়’ প্রবন্ধে তিনি মানুষের স্বকীয়তার ওপর জোর দেন। প্রতিটি মানুষের ভেতর যে অনন্য সৃষ্টিশীল সম্ভাবনা আছে, তা বিকশিত হওয়া চাই। কিন্তু এই ‘আমি’-র বিকাশ কখনো বিচ্ছিন্নতার পথে নয়। বরং একমাত্র অপরের সঙ্গে সম্পর্কের ভেতর দিয়েই ‘আমি’ পরিপূর্ণতা পায়। যে ‘আমি’ শুধু নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত, সে কখনো মহৎ হতে পারে না।

    বিশ্বমানবের ধারণা:
    তাই তাঁর চূড়ান্ত আদর্শ হলো ‘বিশ্বমানব’ (The Universal Man)। তিনি মনে করতেন, ইতিহাস ক্রমশ এক বিশ্বসভ্যতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে মানুষ তার দেশ, কাল ও ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে সমগ্র মানবজাতির সঙ্গে একাত্ম বোধ করবে। তাঁর বিখ্যাত গান, “আমি পৃথিবীর কবি, যেথা তার উঠেছে ফুল, / ফলেছে ফল, সেইখানেতে জেগেছে মোর গান”—এটি কোনো ভাবালুতা নয়, তাঁর জীবনব্যাপী সাধনার মূলমন্ত্র।

    ৫. অন্ধকার ও দুঃখবোধ: ‘মৃত্যুঞ্জয়ী’ প্রাণের জয়গান

    রবীন্দ্র দর্শন যে শুধুই আলো আর আনন্দের দর্শন, তা নয়। তিনি ব্যক্তিজীবনে সন্তান হারানো, প্রিয়জন বিচ্ছেদসহ অসহনীয় যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেছেন। কিন্তু এই দুঃখকেও তিনি জীবনবৃক্ষের অপরিহার্য রস হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাঁর দর্শনে দুঃখ হলো আত্মশুদ্ধির হাতিয়ার। “দুঃখ যদি না পাবে তো, দুঃখ তোমার ঘুচবে কবে?”—এই আপ্তবাক্যই বলে দেয়, দুঃখকে নিবৃত্তির বস্তু হিসেবে নয়, বিকাশের ধাপ হিসেবে তিনি দেখেছেন।

    মৃত্যু নিয়েও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অনন্য। মৃত্যুকে তিনি শূন্যতা বা শেষ বলে মনে করেননি, বরং পুরাতন আবরণ ভেঙে নতুন রূপে আত্মার প্রকাশই মৃত্যু। জরা ও মৃত্যুকে তিনি জীবনেরই অঙ্গ হিসেবে বরণ করে নিয়েছিলেন প্রাচ্যের স্থিতধী ভঙ্গিতে। “মরণ রে, তুঁহু মম শ্যাম সমান”—এই ভাবনা গভীর দার্শনিক উপলব্ধিরই ফসল।

    আধুনিক জীবনের সংকটে রবীন্দ্র দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা

    আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগের লেখা রবীন্দ্রনাথের দার্শনিক ভাবনা আজকের ডিজিটাল যুগ, জলবায়ু সংকট ও অস্তিত্বের দোটানায় আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।

    ১. পরিবেশ দর্শন (Eco-Philosophy): রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সম্ভবত প্রথম আধুনিক দার্শনিকদের একজন, যিনি প্রকৃতিকে অর্থনীতির হাতিয়ার ভাবেননি, বরং এক স্নেহ-প্রতিপাল্যের জায়গা দিয়েছেন। আজকের তরুণ প্রজন্ম যখন ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন’-এর জন্য রাজপথে নামে, তখন তারা অজান্তেই রবীন্দ্র দর্শনেরই প্রতিধ্বনি করে। বৃক্ষরোপণ, যান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, গ্রামীণ সভ্যতার পুনর্জাগরণ—সবই তাঁর দর্শনের ভেতর নিহিত ছিল।

    ২. মানসিক স্বাস্থ্য ও অর্থের সংকট: আধুনিক মানুষ এক গভীর নৈঃসঙ্গ্যে ভুগছে। অর্থহীনতাবাদ (Nihilism) আমাদের গ্রাস করছে। রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনদেবতা’র ধারণা, ‘আনন্দ’র দর্শন এই শূন্যতায় এক পরম ভরসার জায়গা। তিনি বলেন, জীবন একটিমাত্র মর্মবস্তু—আনন্দ। এই আনন্দ ভোগের উচ্ছ্বাস নয়, এটি সৃষ্টির মধ্যে নিজেকে সম্প্রসারিত করার গভীর তৃপ্তি। হতাশা থেকে মুক্তির যে মন্ত্র তিনি দেন, তা কোনো বাইরের জগতের মোহ নয়, বরং অন্তরের ‘অতিচেতনার’ (Super-consciousness) সঙ্গে যুক্ত হওয়া।

    ৩. বিশ্ব রাজনীতি ও শান্তি: জাতীয়তাবাদের উত্থান আজ আবার দুনিয়াকে বিভক্ত করছে। রাষ্ট্রগুলো নিজেদের ‘বদ্ধ’ করছে। রবীন্দ্রনাথের ‘বিশ্বভারতীর’ ধারণা—যেখানে সারা দুনিয়ার মানুষ এক মিলনকেন্দ্রে এসে জ্ঞানচর্চা করবে—সেটা আজকের দেওয়াল তোলার রাজনীতির একেবারে বিপরীত। তাঁর মানবতাবাদী আন্তর্জাতিকতাবাদ (Humanist Internationalism) বিশ্বশান্তির জন্য চিরকালীন পাথেয়।

    ৪. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও মানবসত্তা: যে সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা ভাবছি যন্ত্র নাকি মানুষকে গ্রাস করবে, তখন রবীন্দ্রনাথের কথা মনে পড়ে, মানুষ তার সৃজনশীলতা ও প্রেমের গুণেই মানুষ। যন্ত্র কখনো মানুষের ‘উদ্বৃত্ত’ সত্তাকে ধারণ করতে পারবে না। যে সৌন্দর্য, যে সহমর্মিতা মানুষের অন্তর থেকে উৎসারিত, তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ‘ডাটা সেট’-এ ধরা পড়বে না। তাই রবীন্দ্র দর্শন আমাদের শেখায়, যন্ত্রকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করো, কিন্তু মানুষের হৃদয়কেই প্রকৃত পাথেয় করে তোলো।

    রবীন্দ্রনাথের দর্শন কি নিছকই এক ইউটোপিয়া?

    অনেক সমালোচক বলেন, রবীন্দ্রনাথের দর্শন বাস্তবতার কঠোর মাটি ছুঁয়ে থাকে না; এটি যেন এক মেঘের প্রাসাদে বাস করার স্বপ্ন। কিন্তু এই অভিযোগ সম্পূর্ণ সত্য নয়। রবীন্দ্রনাথ ‘দারিদ্র্যের অর্থনীতি’ বুঝতেন, সাম্রাজ্যবাদের বর্বরতা দেখেছিলেন, কৃষকের না-খেতে পাওয়া যন্ত্রণা তাঁর চোখ এড়ায়নি। তিনি ‘রাশিয়ার চিঠি’তে যেমন সমাজতন্ত্রের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন, তেমনি গ্রামীণ সমবায় ও স্বাবলম্বনের ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য জমিদারির পাটুলিতে কার্যত কাজ করেছিলেন।

    তাঁর দর্শন তাই পলায়নী নয়; এটি এক ‘কর্মযোগ’। কর্মের মাধ্যমেই যে পরমতত্ত্বকে পাওয়া যায়, এই বাণীই তিনি দিয়েছেন। গীতার মতো তাঁর বাণীও নিষ্কাম কর্মের। তবে তিনি কৃষিকাজ, শিল্পসাধনা বা সেবাকর্মের মাধ্যমে সেই আত্মার মুক্তির কথা বলেছেন। তাঁর মতে, প্রতিটি কাজ যদি নিবেদিত চিত্তে করা হয়, তাহলে সেই কাজই উপাসনা হয়ে ওঠে।

    আরও পড়ুন - মৃত্যু-ভয় কেন মানুষের চিরন্তন সঙ্গী?

    একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

    নবীনতর পূর্বতন

    نموذج الاتصال