আমাদের গ্রহের ৭০ শতাংশেরও বেশি এলাকা জুড়ে রয়েছে সমুদ্র। কিন্তু বিস্ময়করভাবে, সমুদ্রের ৯৫ শতাংশেরও বেশি এখনো মানুষের চোখে পড়েনি, বোঝা যায়নি। আমরা চাঁদের পৃষ্ঠ সম্পর্কে যতটুকু জেনেছি, গভীর সমুদ্রের তলদেশের মানচিত্র তার চেয়েও কম বিস্তারিত। সমুদ্রের নিচের সেই অজানা জগৎ—এক ভিনগ্রহের চেয়ে কম রহস্যময় নয়। সেখানে রয়েছে সুউচ্চ পর্বতশ্রেণি, হাজার মাইল লম্বা গভীর খাত, অগ্ন্যুদ্গমকারী ধূম্রচিমনি, এবং আলোহীন জগতে বেঁচে থাকা অদ্ভুতদর্শন প্রাণী। এই ব্লগপোস্টে আমরা ডুব দেব সেই অতল গভীরে—যেখানে সূর্যের আলো কোনোদিন পৌঁছায় না, যেখানে চাপ এতটাই যে ইস্পাত গুঁড়িয়ে যায়, এবং যেখানে প্রাণ বিকশিত হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন নিয়মে। আপনি যদি বিজ্ঞানমনস্ক, সামুদ্রিক বিস্ময়ে কৌতূহলী, বা বাস্তুতন্ত্রের গভীরতা বুঝতে আগ্রহী হন, এই সম্পূর্ণ এসইও অপটিমাইজড নিবন্ধ আপনার জন্য।
গভীর সমুদ্রের স্তরবিন্যাস: কোথায় শুরু হয় অজানা?
সমুদ্রকে বিজ্ঞানীরা প্রধানত কয়েকটি উল্লম্ব অঞ্চলে ভাগ করেন। আলোর উপস্থিতি, তাপমাত্রা ও চাপই এদের পার্থক্য করে:
১. এপিপেলাজিক জোন (Epipelagic Zone): ০-২০০ মিটার। এখানেই সূর্যের আলো প্রবেশ করে, সালোকসংশ্লেষণ ঘটে। সমুদ্রের মাছ, প্রবাল, তিমি—আমরা যা দেখি তার সিংহভাগ এ স্তরেই সীমাবদ্ধ।
২. মেসোপেলাজিক জোন (Mesopelagic Zone): ২০০-১০০০ মিটার। আলো ক্রমশ ম্লান হতে থাকে, একে গোধূলি অঞ্চল বলে। এখানে প্রথম আজব প্রাণীদের দেখা মেলে—যাদের চোখ বড় বড়, অনেকেই বায়োলুমিনেসেন্ট।
৩. বাথিপেলাজিক জোন (Bathypelagic Zone): ১০০০-৪০০০ মিটার। সম্পূর্ণ অন্ধকার, প্রচণ্ড ঠাণ্ডা (২-৪°সে), পানি স্থির। এখানকার প্রাণীরা চাপের সাথে খাপ খাইয়ে চলেছে; এদের অনেকের দেহ স্বচ্ছ বা গাঢ় কালো।
৪. অ্যাবিসোপেলাজিক জোন (Abyssopelagic Zone): ৪০০০-৬০০০ মিটার। “অতল” এলাকা। সমুদ্রের তলের বিস্তীর্ণ সমভূমি (অ্যাবিসাল প্লেইন) এখানে। জনপ্রাণী বিরল হলেও এখানেই লুকিয়ে আছে বিস্ময়কর খনিজ ভাণ্ডার ও আণুবীক্ষণিক প্রাণ।
৫. হ্যাডাল জোন (Hadal Zone): ৬০০০ মিটার থেকে একেবারে নিচে, সবচেয়ে গভীর খাত। নামকরণ গ্রিক দেবতা হেডিসের নামে—মৃতলোক। পৃথিবীর গভীরতম স্থান মারিয়ানা ট্রেঞ্চের চ্যালেঞ্জার ডিপ (প্রায় ১১,০০০ মিটার) এই অঞ্চলের অন্তর্গত।
প্রতিটি স্তরই নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যে অজানা রহস্যের ভাণ্ডার। নিচে আমরা তাদেরই একে একে অন্বেষণ করব।
আলোহীন গভীরে প্রাণ: কীভাবে বাঁচে তারা?
সূর্যস্নাত পৃষ্ঠছাড়িয়ে অন্ধকারে সালোকসংশ্লেষণ অসম্ভব। সেখানে খাদ্যশৃঙ্খলের ভিত্তি কী? প্রধান দুটি পথ: সামুদ্রিক তুষার (Marine Snow) এবং কেমোসিন্থেসিস।
সামুদ্রিক তুষার মূলত উপর থেকে আসা জৈব কণা—মৃত প্লাঙ্কটন, ফেকাল পেলেট, এবং অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ, যা ধীরে ধীরে নিচে তলিয়ে যায়। এ গভীরে খাদ্যও অতি মূল্যবান; প্রাণীরা অপেক্ষায় থাকে এই বৃষ্টির জন্য। ফলে গভীর সমুদ্রের প্রাণীদের বিপাক অত্যন্ত মন্থর, তারা বছরে অল্প একবারও খেতে পায়, এবং বহু প্রজাতির আয়ু বিস্ময়করভাবে দীর্ঘ—যেমন গ্রিনল্যান্ড শার্ক ৪০০ বছর বাঁচতে পারে।
কেমোসিন্থেসিস হলো এক বৈপ্লবিক প্রক্রিয়া, যেখানে কিছু ব্যাকটেরিয়া রাসায়নিক শক্তি ব্যবহার করে (হাইড্রোজেন সালফাইড, মিথেন, লোহা) জৈব অণু তৈরি করে। এই ব্যাকটেরিয়া গড়ে তোলে সম্পূর্ণ স্বনির্ভর বাস্তুতন্ত্র—যেখানে প্রচলিত সূর্যালোকের প্রয়োজন নেই। এ নিয়েই নিচে আমরা আলোচনা করব উষ্ণপ্রস্রবণের জগৎ নিয়ে।
গভীর সমুদ্রের প্রাণীদের অভিযোজন রীতিমতো কল্পবিজ্ঞানকে হার মানায়:
প্রচণ্ড চাপ সহ্য: প্রতি ১০ মিটার গভীরে ১ বায়ুমণ্ডল চাপ বাড়ে। চ্যালেঞ্জার ডিপে চাপ ১০০০ বায়ুমণ্ডল ছাড়িয়ে যায়, অর্থাৎ আপনার ওপর পুরো একটি জাম্বো জেট চাপিয়ে রাখার মতো। এ চাপে সাধারণ প্রোটিন বিকৃত হয়, কোষঝিল্লি শক্ত হয়ে যায়। কিন্তু গভীর সমুদ্রের মাছেদের দেহে ট্রাইমিথাইলামাইন অক্সাইড (TMAO) নামের রাসায়নিক বেশি থাকে, যা প্রোটিনকে স্থিতিশীল রাখে। এদের ঝিল্লিতে পিছল চর্বি অণু (unsaturated lipids) ব্যবহারের হার বেশি, যাতে নমনীয়তা বজায় থাকে।
খাদ্যস্বল্পতায় অভিযোজন: অনেক মাছের পেট প্রসারণীয়, বিশাল মুখ ও তীক্ষ্ণ দাঁত। ব্ল্যাক সোয়ালোয়ার (Black Swallower) নিজের চেয়ে কয়েকগুণ বড় মাছ গিলতে পারে। অ্যাঙ্গলার ফিশের মাথার সামনে জ্বলজ্বলে টোপ শিকার আকর্ষণ করে।
অন্ধকারে দৃষ্টি ও অনুভূতি: অনেক প্রাণীর চোখ নেই, বদলে আছে অত্যন্ত সংবেদনশীল পার্শ্বরেখা (lateral line) সিস্টেম যা জলের কম্পন বোঝে। কারও আবার টিউব চোখ—উপরের দিকে তাকিয়ে থাকে, ক্ষীণ ছায়া দেখে শিকার চেনে।
প্রজনন কৌশল: সঙ্গী খুঁজে পাওয়া দুর্লভ। পুরুষ অ্যাঙ্গলার মাছ স্ত্রীর দেহে কামড় বসিয়ে অঙ্গীভূত হয়ে যায়, এক ধরনের যৌন পরজীবী হয়ে ওঠে।
উষ্ণপ্রস্রবণ ও ধূম্রচিমনি: ভূগর্ভস্থ জগতের ফোয়ারা
১৯৭৭ সালে গভীর সমুদ্রের বিজ্ঞানে বিপ্লব আসে, যখন পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে গ্যালাপাগোস রিফট-এ বিজ্ঞানীরা প্রথম হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট আবিষ্কার করেন। সেখানে সমুদ্রতলের ফাটল দিয়ে অতি উষ্ণ (৪০০°সে পর্যন্ত), খনিজ-সমৃদ্ধ পানি বেরিয়ে আসে। এই পানি আশপাশের ঠাণ্ডা সমুদ্রজলের সংস্পর্শে এলে খনিজ পদার্থ কঠিন হয়ে চিমনির মতো কাঠামো তৈরি করে—একে বলে “ব্ল্যাক স্মোকার” (কালো ধূম্রচিমনি) অথবা সাদা রঙের তরল নির্গত হলে “হোয়াইট স্মোকার”। ভেন্টের চারপাশে গড়ে ওঠে এক স্বয়ংসম্পূর্ণ নগরী।
এই বাস্তুতন্ত্রের ভিত্তি হলো কেমোসিন্থেটিক ব্যাকটেরিয়া, যারা হাইড্রোজেন সালফাইড জারিত করে শক্তি পায়। এই ব্যাকটেরিয়া টিউব ওয়ার্মদের (রিফটিয়া প্যাকিপ্টিলা) দেহের ভেতরে থাকে; কৃমিদের কোনো পৌষ্টিকতন্ত্র নেই, পুরোপুরি ব্যাকটেরিয়ার ওপর নির্ভরশীল। সেখানে দেখা যায় বিশালাকার ক্ল্যাম, ঝিনুক, সাদা কাঁকড়া, ব্লাইন্ড চিংড়ি এবং অনন্য অক্টোপাস। এসব প্রাণী শুধুমাত্র রাসায়নিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল, যা প্রমাণ করে সূর্য ছাড়াও প্রাণের সম্ভাবনা রয়েছে—বহির্জাগতিক প্রাণের সন্ধানে এ আবিষ্কার বিশাল প্রেরণা জোগায়। বৃহস্পতির চাঁদ ইউরোপা অথবা শনির এনসেলাডাসের বরফাচ্ছাদিত মহাসমুদ্রেও হয়তো এমন হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট বিদ্যমান, যেখানে প্রাণের অঙ্কুর হতে পারে।
বায়োলুমিনেসেন্সের জাদু: অন্ধকারের আলো
গভীর সমুদ্রের সবচেয়ে চোখ ধাঁধানো বৈশিষ্ট্য হলো বায়োলুমিনেসেন্স—জীবদেহ থেকে আলো বিকিরণ। গোধূলি অঞ্চল থেকে শুরু করে হ্যাডাল খাত পর্যন্ত প্রায় ৮০% প্রাণীর মধ্যেই কোনো না কোনোভাবে আলো সৃষ্টির ক্ষমতা আছে। বায়োলুমিনেসেন্স ঘটে লুসিফেরিন নামের রঞ্জক ও লুসিফারেজ এনজাইমের বিক্রিয়ায়। এর ব্যবহার বহুমুখী:
শিকার আকর্ষণ: অ্যাঙ্গলার ফিশের ঝলমলে টোপ।
শত্রুকে বিভ্রান্ত করা: চিংড়ি বা স্কুইড কালি ছাড়াও উজ্জ্বল তরল ছিটিয়ে পালায়।
ছদ্মবেশ: কাউন্টার-ইলুমিনেশন—নিচ থেকে আলো জ্বেলে পেটের ছায়া মুছে দেওয়া, যাতে ওপরে থাকা শিকারী সামুদ্রিক প্রাণী নিচ থেকে আলাদা করতে না পারে।
যোগাযোগ ও সঙ্গী খোঁজা: কিছু স্কুইড জটিল আলোক প্যাটার্নে বার্তা বিনিময় করে।
আমাদের বোধগম্যতা সীমিত; এখনো বেশিরভাগ আলো-সংকেতের অর্থ অজানা—এ যেন এক নিঃশব্দ ভাষা।
সবচেয়ে গভীর খাত: মারিয়ানা ট্রেঞ্চ ও চ্যালেঞ্জার ডিপ
মারিয়ানা ট্রেঞ্চ, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের গুয়ামের কাছে অবস্থিত, পৃথিবীর গভীরতম স্থান। এর সর্বাধিক গভীরতা চ্যালেঞ্জার ডিপ, যা ১০,৯৯৪ মিটার (প্রায় ১১ কিমি)। মাউন্ট এভারেস্টকে সেখানে ফেলা হলে পুরোটা ডুবে যাবে, ওপরে এখনো ২ কিমি জলস্তর থাকবে। চাপ এখানে ১০০০ বায়ুমণ্ডলের বেশি। ১৯৬০ সালে জ্যাক পিকার্ড ও ডন ওয়ালশ প্রথম ট্রিয়েস্টে নামক ব্যাথিস্ক্যাফে সেখানে নামেন; ২০১২ সালে জেমস ক্যামেরন ডিপসি চ্যালেঞ্জার একক সাবমার্সিবলে পৌঁছান। এরপর বেশ কিছু ডুবোযান ও ল্যান্ডার এই অতল স্পর্শ করেছে।
চ্যালেঞ্জার ডিপে প্রাণ খুঁজে পাওয়া সবচেয়ে বড় চমক। সেখানে বড় আকারের অ্যামিপড (amphipod), সমুদ্র শশা (sea cucumber), ফোরামিনিফেরা (বিশাল এককোষী) এবং পলিচেট কৃমি দেখা গেছে। ২০১৪ সালে বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, মারিয়ানা ট্রেঞ্চের তলদেশে মাইক্রোপ্লাস্টিক জমেছে, এমনকি ১১ কিমি নিচেও মানবসভ্যতার দূষণ পৌঁছে গেছে। এটি এক উদ্বেগজনক বাস্তবতা।
হ্যাডাল জোন শুধু মারিয়ানা নয়, টোঙ্গা ট্রেঞ্চ, কের্মাডেক ট্রেঞ্চ, ফিলিপাইন ট্রেঞ্চেও বিস্তৃত; এর প্রাণীজগত বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো বিবর্তিত, প্রতিটি খাতের নিজস্ব স্থানীয় প্রজাতি আছে।
আরও পড়ুন -
অজানা প্রাণী ও নতুন আবিষ্কার: এখনও কত কিছু লুকানো?
প্রতি বছর গভীর সমুদ্র থেকে শত শত নতুন প্রজাতির সন্ধান মেলে। ২০২৩ সালেই বৈজ্ঞানিক অভিযানে আবিষ্কৃত কিছু বিস্ময়:
বিপন্ন স্বচ্ছ অক্টোপাস: গভীর জলে এক নতুন প্রজাতির কাচের মতো স্বচ্ছ অক্টোপাস।
প্লাস্টিক-খেকো ব্যাকটেরিয়া: হ্যাডাল অঞ্চলে মাইক্রোপ্লাস্টিক ভাঙতে সক্ষম ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে।
জম্বি কৃমি (Osedax): তিমির হাড় খেয়ে বাঁচে, এদের পৌষ্টিকতন্ত্র নেই, দেহে ব্যাকটেরিয়া দিয়ে হাড় গলিয়ে নেয়।
বৃহদাকার সিনেমাটিক স্কুইড: বিশাল পাখনাওয়ালা স্কুইড (Magnapinna) যাদের বাহু লম্বায় ৮ মিটার পর্যন্ত হয়, এখন পর্যন্ত হাতে গোনা কয়েকবার ভিডিওতে ধরা পড়েছে।
আরও আছে কাঁচের স্পঞ্জ, গভীর-সমুদ্রের ড্রাগনফিশ (যার দাঁত স্বচ্ছ), লম্বা-ঘাড়ের ফ্লেমিংগো জেলিফিশ—প্রকৃতি এত বৈচিত্র্যময় যে আমাদের কল্পনাও শেষ হয় না।
গবেষণার চ্যালেঞ্জ ও প্রযুক্তি
গভীর সমুদ্র নিয়ে জানার পথে প্রধান বাধা তিনটি: প্রচণ্ড চাপ, নিখুঁত অন্ধকার, এবং বিপুল বিস্তৃতি। মানুষ সরাসরি নামতে পারে ব্যাথিস্ক্যাফে অথবা ডিপ-সাবমার্সিবলে (যেমন DSV Alvin, Shinkai 6500, Deepsea Challenger, Limiting Factor)। এগুলোর প্রেশার হাল বেশিরভাগ টাইটানিয়াম ও বিশেষ সিরামিক দিয়ে তৈরি। রিমোটলি অপারেটেড ভেহিকল (ROV) যেমন Jason, SuBastian টিথার দিয়ে যুক্ত থেকে হাই-ডেফিনেশন ভিডিও, নমুনা সংগ্রহ করে। অটোনমাস আন্ডারওয়াটার ভেহিকল (AUV) স্বয়ংক্রিয়ভাবে সোনার ম্যাপিং করে তলদেশের ছবি তোলে।
ল্যান্ডার সিস্টেম: ক্যামেরা, ট্র্যাপ ও সেন্সরসহ একটি ফ্রেম গভীরে ছেড়ে দেওয়া হয়, যা ওজন সহযোগে নিচে গিয়ে নির্দিষ্ট সময় পর ওজন খুলে ভেসে ওঠে। এভাবে অপেক্ষাকৃত কম খরচে হ্যাডাল অঞ্চলের ডেটা পাওয়া যায়।
ডিএনএ সিকোয়েন্সিং ও এনভায়রনমেন্টাল ডিএনএ (eDNA) দিয়ে পানির নমুনা থেকেই প্রজাতির উপস্থিতি শনাক্ত সম্ভব হচ্ছে, যা গবেষণার গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তবে এখনও পুরো সমুদ্রতলের মাত্র ২০% আধুনিক সোনারে ম্যাপ করা হয়েছে; বাকিটা অনুমাননির্ভর। প্রতি ডুবেই তাই নতুন কিছু মেলে।
গভীর সমুদ্রের খনিজ সম্পদ
গভীর সমুদ্রতলে ছড়িয়ে আছে পলিমেটালিক নডিউল, কোবাল্ট ক্রাস্ট, এবং ম্যাসিভ সালফাইড আমানত। এই নডিউলগুলোতে ম্যাঙ্গানিজ, নিকেল, কপার, কোবাল্ট থাকে, যা বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারির জন্য প্রয়োজনীয়। তার ফলে সমুদ্রতলের খনির দিকে আগ্রহ বাড়ছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর। কিন্তু এই খনন পুরো বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করে দিতে পারে। যে প্রাণীরা হাজার বছরে এক ইঞ্চি বাড়ে, তাদের পুনরুদ্ধার অসম্ভব। এখনই আন্তর্জাতিক সমুদ্র কর্তৃপক্ষ (ISA) খনির নিয়ম তৈরি করছে, কিন্তু পরিবেশবাদীরা গভীর সমুদ্রের সুরক্ষায় জোর দিচ্ছেন। কারণ, আমরা যখন বুঝতে শুরু করেছি কী অমূল্য এই জগৎ, তখনই হয়তো তা হারানোর মুখে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই অজানা জগৎ?
সমুদ্রের অতল গভীরতা কেবল কৌতূহলের বিষয় নয়। এটি পৃথিবীর কার্বন চক্র, জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সামুদ্রিক তুষার কার্বনকে বহু বছর ধরে তলদেশে সঞ্চয় করে, বায়ুমণ্ডল থেকে প্রচুর CO₂ সরিয়ে ফেলে। গভীর সমুদ্রের অনুজীব অজানা জিন নিয়ে আসে যা ভবিষ্যতের অ্যান্টিবায়োটিক বা শিল্প উপযোগী এনজাইম হতে পারে। যেমন, এক গভীর-সমুদ্রের ব্যাকটেরিয়া থেকে প্রাপ্ত এনজাইম PCR পরীক্ষায় বিপ্লব আনে। সমুদ্রতলের বাস্তুতন্ত্র বুঝলে আমরা গ্রহের জন্ম ও প্রাণের উৎপত্তি সম্বন্ধেও নতুন ধারণা পাব।
সর্বোপরি, অজানা জগৎ আমাদের কল্পনার ইন্ধন। কে জানে, হয়তো চ্যালেঞ্জার ডিপের কাদায় অতিকায় এককোষী প্রাণীই একদিন আমাদের শেখাবে অভিনব বিপাক প্রক্রিয়া, যা অমৃত সমান হবে!
সমুদ্রের নিচের অজানা জগৎ আসলে পৃথিবীরই এক বিস্মৃত অর্ধেক। সেখানে রূপকথাকে হার মানানো বাস্তবতা, চোখ ধাঁধানো আলো, পরম নিঃসঙ্গতা আর অবিশ্বাস্য অভিযোজন মিলেমিশে এক ভিন্ন মহাকাশ যেন। আমরা প্রযুক্তির কল্যাণে ধীরে ধীরে সেই অন্ধকারের পর্দা সরাচ্ছি, আর প্রতিটি অভিযানেই নিজেদের অজ্ঞতার গভীরতা টের পাচ্ছি। এই রহস্যময় জগতের সুরক্ষা করা মানবজাতির নৈতিক দায়িত্ব—কারণ যা এখনো অজানা, তাকে না বুঝেই ধ্বংস করা মূর্খতা। আশা করা যায় আগামী প্রজন্ম এই অজানা জগৎকে জানবে শুধু পর্যটক হতেই নয়, রক্ষক হতেও।
আরও পড়ুন -
FAQs
প্রশ্ন ১: সমুদ্রের কত শতাংশ এখনো অজানা?
উত্তর:
ধারণা করা হয়, সমুদ্রের প্রায় ৮০-৯৫% এখনো পুরোপুরি অন্বেষিত হয়নি;
মহাসাগরের তলদেশের মাত্র ২০% আধুনিক প্রযুক্তিতে ম্যাপ করা হয়েছে।
প্রশ্ন ২: গভীর সমুদ্রের প্রাণীরা কিভাবে প্রচণ্ড চাপে টিকে থাকে?
উত্তর:
এদের দেহে ট্রাইমিথাইলামাইন অক্সাইড (TMAO) এর মতো অণু বেশি থাকে যা
প্রোটিনকে চাপে বিকৃত হওয়া থেকে রক্ষা করে। কোষঝিল্লিতে বিশেষ ধরনের চর্বি
নমনীয়তা বজায় রাখে।
প্রশ্ন ৩: গভীর সমুদ্রে সবচেয়ে অদ্ভুত প্রাণী কোনটি?
উত্তর:
অ্যাঙ্গলার ফিশ, ব্ল্যাক সোয়ালোয়ার, ভ্যাম্পায়ার স্কুইড, জম্বি কৃমি,
ম্যাগনাপিনা স্কুইড, ব্যারেল আই ফিশ—সবই অদ্ভুত; এককভাবে বেছে নেওয়া কঠিন।
প্রশ্ন ৪: গভীর সমুদ্রে মাছেরা কী খায়?
উত্তর:
উপর থেকে আসা জৈব ধ্বংসাবশেষ (সামুদ্রিক তুষার), মৃতদেহ, অথবা অন্ধকারে
শিকার করে। উষ্ণপ্রস্রবণের প্রাণীরা কেমোসিন্থেটিক ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে
খাদ্য তৈরি করে।
প্রশ্ন ৫: মারিয়ানা ট্রেঞ্চের এত গভীরে কি মানুষ যেতে পারে?
উত্তর:
হ্যাঁ, বিশেষ সাবমার্সিবল বা ল্যান্ডারের মাধ্যমে মানুষ বা যন্ত্র
গিয়েছে। এখন পর্যন্ত মাত্র কয়েকজন মানুষ চ্যালেঞ্জার ডিপে সরাসরি
নেমেছেন।
প্রশ্ন ৬: গভীর সমুদ্রের সংরক্ষণ কেন জরুরি?
উত্তর:
এটি জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ, জৈববৈচিত্র্য, খাদ্যশৃঙ্খল ও ভবিষ্যতের
চিকিৎসা-গবেষণার জন্য অপরিহার্য। খনন বা দূষণে এই ধীরগতির বাস্তুতন্ত্র
ধ্বংস হলে পুনরুদ্ধার প্রায় অসম্ভব।
