কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি

    মানুষ কেন প্রশ্ন করে? : দর্শনের শুরু

    পৃথিবীর সব প্রাণীর মধ্যে কেবল মানুষই থেমে থাকে না, থামিয়ে রাখে। একটি শিশু আকাশের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, "সূর্য কোথায় রাতে লুকায়?" এক কিশোর প্রথম প্রেমে পড়ে জানতে চায়, "ভালোবাসা কেন কষ্ট দেয়?" এক বৃদ্ধ জীবনসায়াহ্নে ফিসফিস করে বলে, "জীবনের অর্থ কী ছিল?" প্রশ্ন করা মানব জীবনের অবিচ্ছেদ্য এক অধ্যায়। আমরা শুধু খাই না, ঘুমাই না, বংশবৃদ্ধি করি না—আমরা থেমে প্রশ্ন করি। কিন্তু কেন? কী এমন তাড়না আমাদের ভেতরে যে আমরা অজানাকে জানতে চাই, অচেনাকে চিনতে চাই? দর্শনের গোড়াপত্তনও এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যদিয়ে। থ্যালেস, সক্রেটিস, দেকার্ত, কান্ট—কেউই আকাশ থেকে ঝরে পড়েননি। তারা সবাই সেই একই আদিম বিস্ময় থেকে শুরু করেছিলেন, যে বিস্ময় আজও আমাদের ঘুম ভাঙায়। এই ব্লগপোস্টে আমরা মানবমনের সেই গভীরতম কুঠুরিতে উঁকি দেব, যেখানে প্রশ্ন জন্ম নেয়। আমরা দেখব, প্রশ্ন করাই শুধু দর্শনের সূত্রপাত করেনি, বরং আমাদের বিজ্ঞান, শিল্প, ভাষা এবং সমগ্র সভ্যতার ভিত্তি গড়ে তুলেছে।

    মানুষ কেন প্রশ্ন করে? : দর্শনের শুরু

    প্রশ্ন করার জৈবিক ভিত্তি: বেঁচে থাকার জন্য জানা

    বিবর্তনের নিরিখে দেখলে, প্রশ্ন করার সূত্রপাত সম্ভবত টিকে থাকার প্রয়োজনে। গুহামানব যদি প্রশ্ন না করত—"এই গাছের ফল খেলে কি অসুস্থ হব?" বা "সিংহের গর্জনের পর কী করতে হবে?"—তাহলে সে বেশি দিন বাঁচত না। আমাদের পূর্বমস্তিষ্কের একটি বিশেষ অঞ্চল, যাকে বলে অরবিটোফ্রন্টাল কর্টেক্স (orbitofrontal cortex), পুরস্কার ও কৌতূহলের সাথে সরাসরি যুক্ত। গবেষণায় দেখা গেছে, যখন আমরা নতুন কিছু জানতে আগ্রহী হই, আমাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন ক্ষরণ হয়, যা আনন্দ ও তৃপ্তি দেয়। এই নিউরোট্রান্সমিটারটি একইসঙ্গে আসক্তি ও শিখনকে উৎসাহিত করে। সুতরাং, প্রশ্ন করা আমাদের জন্য স্বাভাবিক এক জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়া; আমরা জানতে চাই, কারণ জানলে আমাদের মস্তিষ্ক পুরস্কৃত হয়।

    শিশুদের দিকে তাকান। একটি ছোট শিশু দৈনিক গড়ে ৩০০-এর বেশি প্রশ্ন করে। কেন? কারণ তার মস্তিষ্ক দ্রুত বিকশিত হচ্ছে, স্নায়বিক সংযোগ তৈরি হচ্ছে। প্রতিটি প্রশ্ন ও উত্তর তার জ্ঞানভাণ্ডার গড়ার ইট। প্রশ্ন করা ছাড়া মানবশিশু ভাষা শিখতে পারত না, পরিবেশ বুঝতে পারত না। প্রকৃতি আমাদের প্রোগ্রাম করেছে প্রশ্ন করার জন্য, কারণ যারা প্রশ্ন করেনি, তারা অজানা বিপদে মারা গেছে।

    প্রশ্ন করার মনস্তাত্ত্বিক কারণ: তিন ধরণের তাড়না

    মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষ প্রশ্ন করে প্রধানত তিনটি গভীর কারণে:

    ১. অপূর্ণতা বোধ (Epistemic Curiosity): যখন আমরা অনুভব করি আমাদের জ্ঞানে একটি ফাঁক আছে এবং সেই শূন্যস্থান পূরণের তাড়নায় আমরা প্রশ্ন করি। বার্লাইন-এর তত্ত্ব অনুযায়ী, কৌতূহল হলো একটি অভ্যন্তরীণ প্রেষণা (intrinsic motivation), যেমন খিদে বা তৃষ্ণা। আমরা জানতে চাই, শুধু বাহ্যিক পুরস্কারের জন্য নয়, বরং না জানার অস্বস্তি থেকে মুক্তি পেতেই।

    ২. নিয়ন্ত্রণ লাভ (Control & Predictability): অজানা ভীতিকর। আমাদের প্রাচীন মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা (amygdala) অনিশ্চয়তাকে হুমকি হিসেবে দেখে। প্রশ্ন করে আমরা বিশ্বকে পূর্বানুমেয় করে তুলি, যা নিরাপত্তার অনুভূতি দেয়। জ্যোতিষশাস্ত্র, ধর্ম, বিজ্ঞান—এসবই কোনো না কোনো প্রশ্নের উত্তর দিয়ে বিশৃঙ্খল বিশ্বে একটি নিয়মের অনুভূতি জাগায়।

    ৩. সামাজিক সংযোগ (Social Bonding): প্রশ্ন কেবল তথ্যের জন্য নয়, সম্পর্কের জন্যও। "আপনার দিন কেমন কাটল?" বা "কেমন আছেন?"—এই প্রশ্নগুলো সেতু নির্মাণ করে। মনোবিজ্ঞানী আর্থার আরন দেখিয়েছেন, পারস্পরিক প্রশ্নোত্তর গভীর সম্পর্ক গড়ার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। এই কারণে আমরা গল্প শুনি, প্রশ্ন করি, ভালোবাসার মানুষটির শৈশব জানতে চাই।

    শিশুর প্রশ্ন: দর্শনের জন্মভূমি

    যদি দর্শনের প্রকৃত শুরু খুঁজতে যাই, তাহলে আমাদের দৃষ্টি ফেরাতে হবে শিশুদের দিকে। এক দার্শনিক যেমন জিজ্ঞেস করেন "কীভাবে আমি জানি যে জগৎ বাস্তব?", তেমনি একটি চার বছরের শিশুও জিজ্ঞেস করে, "আমি যখন চোখ বন্ধ করি, জগৎ কোথায় যায়?" গ্যারেথ ম্যাথুজ তাঁর Philosophy and the Young Child বইতে দেখিয়েছেন, শিশুদের প্রশ্নই হলো দর্শনের অপরিশোধিত রূপ। শিশুরা সত্তা, সময়, ন্যায়, মৃত্যু নিয়ে এমন সব প্রশ্ন করে, যা প্রাপ্তবয়স্করা ভয়ে বা অভ্যাসে চাপা দেয়। পাবলো পিকাসোর উক্তি—"প্রত্যেক শিশুই শিল্পী, সমস্যা হলো বড় হওয়ার পরও শিল্পী থাকা।" একই কথা দর্শনের বেলায়ও খাটে—প্রত্যেক শিশুই জন্মগত দার্শনিক, কিন্তু বড় হয়ে আমরা প্রশ্ন করতে ভুলে যাই!

    সক্রেটিস নিজেও বলতেন, তিনি কিছুই জানেন না, শুধু প্রশ্ন করতে জানেন। আর এই অজ্ঞতার স্বীকারই প্রকৃত জ্ঞানের সূচনা। একটি শিশুর কৌতূহল তাই নিকৃষ্ট নয়; এ-ই আমাদের বুনিয়াদ।

    প্রশ্ন ও দর্শনের সূত্রপাত: বিস্ময় থেকে চিন্তায়

    অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, "দর্শনের শুরু বিস্ময় থেকে।" মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে থমকে গিয়েছিল। তারা প্রশ্ন করেছিল: কী দিয়ে জগৎ গঠিত? পরিবর্তন কেন হয়? সত্য কী? প্রাচীন গ্রিসে, মাইলেটাসের থ্যালেস প্রথম প্রশ্ন করেছিলেন, "সবকিছুর মূল উপাদান কী?" তিনি উত্তর দিয়েছিলেন "জল"। ভুল হলেও, তিনিই প্রথম পৌরাণিক গল্পের বাইরে গিয়ে যুক্তি দিয়ে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন। এটাই ছিল দর্শনের জন্মমুহূর্ত।

    কিন্তু দর্শনকে সবচেয়ে বেশি প্রশ্নকেন্দ্রিক করে তোলেন সক্রেটিস। তাঁর সক্রেটিক পদ্ধতি (Socratic Method) হলো প্রশ্নের মাধ্যমে সত্য উদঘাটনের এক অনন্য প্রক্রিয়া। তিনি কোনো বক্তৃতা দিতেন না; তিনি প্রশ্ন করতেন: "সাহস কাকে বলে?" কেউ যখন উত্তর দিত, তিনি আরও প্রশ্ন করতেন, ধীরে ধীরে তার ধারণার অসঙ্গতি বের করে আনতেন। সক্রেটিসের মতে, জ্ঞান আসলে মানুষের ভেতরেই সুপ্ত থাকে; প্রশ্ন হলো ধাত্রী, যা সেই জ্ঞানের জন্ম দেয়। এ জন্যই তার শিক্ষাকে বলা হয় "মাইয়েউটিকস" (Maieutics), অর্থাৎ প্রসব-বিদ্যা।

    এরপর র্যনে দেকার্ত প্রশ্ন করলেন, "আমি কী করে নিশ্চিত হতে পারি যে আমার ইন্দ্রিয় আমাকে ঠকাচ্ছে না?" তিনি সবকিছু সন্দেহ করে টিকে থাকল একমাত্র সত্য—"আমি চিন্তা করি, সুতরাং আমি আছি" (Cogito, ergo sum)। দেকার্তের এই পদ্ধতিগত সংশয় (Methodological Doubt) দর্শনকে এক নতুন ভিত্তি দিয়েছিল। কান্ট প্রশ্ন করলেন, "জ্ঞান কীভাবে সম্ভব?" ভিটগেনস্টাইন প্রশ্ন করলেন, "ভাষায় বলা যায় না, তা কি থাকা সম্ভব?"—প্রত্যেকটি বড় দার্শনিক অগ্রগতি একটি শক্তিশালী প্রশ্নের গর্ভেই জন্ম নিয়েছে।

    আরও পড়ুন - বস্তুবাদ (পর্ব-০২): চার্বাক দর্শন

    অস্তিত্ববাদ: প্রশ্ন যেখানে প্রাণ হয়ে ওঠে

    অস্তিত্ববাদী দার্শনিকরা মানুষের সবচেয়ে গভীর প্রশ্নগুলোকে কেন্দ্রে এনেছিলেন। সোরেন কিয়ের্কেগার্ড প্রশ্ন করেছিলেন, "আমি কে?" "আমার জীবনের উদ্দেশ্য কী?" ফ্রিডরিখ নিচে ঘোষণা করেছিলেন, ঈশ্বর মৃত, এখন মানুষকে নিজেই নিজের মূল্যবোধ ও অর্থ নির্মাণ করতে হবে। জঁ-পল সার্ত্র বলেছিলেন, "অস্তিত্বই সারবত্তার পূর্বে"—আগে আমরা জন্মাই, তারপর আমাদের কর্ম ও প্রশ্নের মাধ্যমেই আমরা নিজেদের সংজ্ঞায়িত করি।

    অস্তিত্ববাদী প্রশ্নগুলি আমাদের ভীত করে, কখনো কখনো নৈরাশ্যে ফেলে। কিন্তু সেখানেই জীবনের সত্য লুকিয়ে, কারণ যে প্রশ্ন করে, সে-ই কেবল সত্যিকারের স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারে। আলবেয়ার কামু বলেছিলেন, আত্মহত্যাই একমাত্র গুরুতর দার্শনিক সমস্যা, কারণ এর উত্তরের ওপর নির্ভর করে জীবন ধারণযোগ্য কি না। এই রকম প্রশ্নই প্রমাণ করে, প্রশ্ন করা শুধু চিন্তার খেলা নয়, প্রাণরক্ষাকারী প্রক্রিয়া।

    ভাষা ও প্রশ্ন: মানুষের অনন্যতা

    কিছু প্রাণীও যোগাযোগ করে, কিন্তু তারা প্রশ্ন করে না। তোতা কথা বলতে পারে, কিন্তু সে কখনো জিজ্ঞেস করে না, "কাল সকালে নাস্তায় কী?" কেন? কারণ প্রশ্ন করতে গেলে একটি বিশেষ ব্যাকরণগত কাঠামো দরকার, যেখানে বক্তা বুঝতে পারে যে শ্রোতার কাছে এমন তথ্য আছে যা তার নিজের কাছে নেই। এটাকে ভাষাবিজ্ঞানীরা বলছেন "Theory of Mind"—অপরের মনের ধারণা। মানুষ ছাড়া আর কোনো প্রাণীর মধ্যে এত উন্নত Theory of Mind নেই।

    নোয়াম চমস্কির মতে, মানুষের ভাষা শেখার সহজাত ক্ষমতা রয়েছে, এবং প্রশ্ন-কাঠামো সেই সহজাত ব্যাকরণেরই অংশ। পৃথিবীর সব ভাষায়ই প্রশ্ন করার কোনো না কোনো কাঠামো আছে। ভিটগেনস্টাইন বলেছিলেন, "আমার ভাষার সীমা আমার জগতের সীমা নির্দেশ করে।" এই অর্থে, প্রশ্ন করাই হলো আমাদের জগৎ প্রসারিত করার প্রধান অস্ত্র। ভাষার মাধ্যমেই আমরা কল্পনা করতে পারি, "যদি এমন হতো?"

    বিজ্ঞান ও প্রশ্ন: প্রকৃতিকে জেরা করা

    বিজ্ঞানও জন্ম নিয়েছে প্রশ্ন থেকে। আইজ্যাক নিউটনের মনে একদিন প্রশ্ন জেগেছিল: আপেল কেন মাটিতে পড়ে? চার্লস ডারউইন প্রশ্ন করেছিলেন: এত বৈচিত্র্যময় প্রজাতি এল কোথা থেকে? মেরি কুরি প্রশ্ন করেছিলেন: তেজস্ক্রিয়তার উৎস কী? আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি (Scientific Method) পুরোপুরি একটি প্রণালীবদ্ধ প্রশ্নোত্তর প্রক্রিয়া:

    1. প্রশ্ন করো (Ask a Question)

    2. পটভূমি গবেষণা করো (Do Background Research)

    3. প্রকল্পনা তৈরি করো (Construct a Hypothesis)

    4. পরীক্ষা করো (Test with an Experiment)

    5. ফলাফল বিশ্লেষণ করো (Analyze Results)

    6. উপসংহার টানো (Draw Conclusions)

    এটি দর্শনের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিরই আধুনিক সংস্করণ। বিজ্ঞানী আসলে একজন পেশাদার প্রশ্নকর্তা, যিনি প্রকৃতিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন করেন এবং পরীক্ষার মাধ্যমে জবাব আদায় করে নেন। আলবার্ট আইনস্টাইন বলতেন, "আমার কোনো বিশেষ প্রতিভা নেই, আমি শুধু আবেগপ্রবণভাবে কৌতূহলী" এবং "গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রশ্ন করা বন্ধ না করা।" এই অদম্য কৌতূহলই আইনস্টাইনকে আপেক্ষিকতার তত্ত্ব দিতে সাহায্য করেছিল।

    আমাদের বর্তমান প্রযুক্তিও প্রশ্নের ফসল: "উড়া যায় কি?"—রাইট ভ্রাতৃদ্বয়; "রোগের জীবাণু দেখা যায় কী করে?"—অ্যান্থনি ফন লিউয়েনহুক; "মস্তিষ্ক ভাবনা চিন্তা কীভাবে করে?"—সান্তিয়াগো রামোন ই কাহাল। প্রতিটি বড় আবিষ্কারের পেছনে একটি বড় প্রশ্ন ছিল।

    প্রশ্ন করতে না পারলে কী হয়?

    যে মানুষ প্রশ্ন করা বন্ধ করে, সে স্থবির হয়ে যায়। ইতিহাস বলে, যে সমাজে প্রশ্ন করা নিষিদ্ধ, সে সমাজে অগ্রগতি থেমে যায়। নিকোলাস কোপার্নিকাস যদি প্রশ্ন না করতেন, "সূর্য কি পৃথিবীর চারপাশে না পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘোরে?" তাহলে ইউরোপীয় জ্ঞানতাত্ত্বিক বিপ্লব হতো না। গ্যালিলিও গ্যালিলেই যদি চার্চের ভয়ে প্রশ্ন করা ছেড়ে দিতেন, আধুনিক বিজ্ঞানের পথচলা শুরু হতো না।

    আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় অস্বস্তিকর প্রশ্নকে উৎসাহ না দিয়ে প্রায়ই মুখস্থ বিদ্যাকে পুরস্কৃত করা হয়। কিন্তু প্রকৃত শিক্ষা হলো প্রশ্ন করার সাহস অর্জন করা। একবার ভাবুন, রবীন্দ্রনাথ যদি প্রশ্ন না করতেন, "আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধুলার 'পরে", তাহলে কি গীতাঞ্জলি লেখা যেত? রবীন্দ্রনাথের পুরো সাহিত্যই ঈশ্বর, প্রকৃতি ও মানবমনকে প্রশ্ন করার এক মহাকাব্য।

    মৃত্যুর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন

    মানুষের সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি মৃত্যুকে ঘিরে। আমরা একমাত্র প্রাণী যারা জানে যে একদিন মরতে হবে। এই জ্ঞান ভয়ানক। কিন্তু এই ভয় থেকেই জন্ম নিয়েছে দর্শন, ধর্ম, শিল্প। মিশরীয়রা প্রশ্ন করেছিল: মৃত্যুর পরে কী হয়? তারা পিরামিড বানিয়েছিল। বুদ্ধ প্রশ্ন করেছিলেন: দুঃখ কেন আছে? কীভাবে তা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়? তিনি বোধিবৃক্ষের নিচে বুদ্ধত্ব লাভ করেছিলেন। মৃত্যুর অনিবার্যতা উপলব্ধি করেই মানুষ অর্থ খোঁজে। ভিক্টর ফ্র্যাংকল তাঁর লোগোথেরাপিতে বলেছিলেন, জীবনের অর্থ খোঁজাই মানুষের প্রধান প্রেষণা। সেই অর্থ খোঁজার যাত্রা শুরু হয় প্রশ্নের মাধ্যমেই: "কেন আমি?"

    প্রশ্ন করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা

    আমরা যদি আগামী প্রজন্মকে ভালো প্রশ্ন করতে শেখাতে পারি, তাহলে ভবিষ্যৎ নিরাপদ হবে। সক্রেটিসের সময় এথেন্সের যুবকরা প্রশ্ন করতে গিয়ে বিষপান করেছিলেন। আজকের যুগে তাঁদের সেই সাহসকে আমরা সম্মান জানাই। প্রশ্ন করা মানে কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করা। প্রগতিশীল সমাজে প্রশ্নকারীরা সম্মানিত হয়; স্থবির সমাজে তারা নিগৃহীত হয়। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রশ্নকারীরাই সমাজকে বদলে দিয়েছেন—গান্ধী থেকে শুরু করে গ্রেটা থানবার্গ পর্যন্ত।

    শেষ পর্যন্ত, প্রতিটি মানুষ তার নিজের জীবনের দার্শনিক। আপনার জীবন যে পথে যাচ্ছে, তা হয়তো আগে কেউ যায়নি। সেই পথের মানচিত্র তৈরি করতে হয় নিজের প্রশ্ন দিয়ে। কার্ল সাগান বলতেন, "আমরা তারায় তারায় পৌঁছতে না পারলেও প্রশ্ন করতে পারি।"

    তাহলে মানুষ কেন প্রশ্ন করে? কারণ প্রশ্নই আমাদের প্রাণ। প্রশ্নই প্রমাণ করে আমরা শুধু জৈবিক মেশিন নই, আমরা অর্থের অন্বেষী সত্তা। আমাদের মস্তিষ্কের গঠন, ভাষা, সামাজিকতা, মৃত্যুভয়, এবং নিরন্তর কৌতূহল—সব মিলে প্রশ্ন আমাদের নিঃশ্বাসের মতো স্বাভাবিক। আর দর্শন সেই প্রশ্নেরই শৃঙ্খলাবদ্ধ রূপ। যখনই কোনো মানুষ থমকে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে, "কেন?", ঠিক তখনই দর্শনের পুনর্জন্ম হয়। পৃথিবী হয়তো আরও জটিল হয়ে উঠবে, প্রযুক্তি বদলে দেবে জীবনের গতিপ্রকৃতি, কিন্তু প্রশ্ন করার এই আদিম তাড়না কখনো থামবে না। কারণ যতক্ষণ মানুষ থাকবে, ততক্ষণ প্রশ্ন থাকবে। আর যতক্ষণ প্রশ্ন থাকবে, ততক্ষণ দর্শন বেঁচে থাকবে। তাই নির্ভয়ে প্রশ্ন করুন, কারণ প্রতিটি প্রশ্নই এক একটি নতুন সকালের সূচনা।

    আরও পড়ুন - ইবনে সিনার ইসলামিক দর্শন: জ্ঞানতত্ত্ব, অধিবিদ্যা ও আত্মা তত্ত্ব


    FAQ

    প্রশ্ন ১: প্রশ্ন করার সাথে দর্শনের সম্পর্ক কী?
    উত্তর: দর্শনের শুরুই হয়েছে প্রশ্ন থেকে। সক্রেটিসের মতে, প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমেই সত্য উদঘাটিত হয়। অ্যারিস্টটল বলেছেন, বিস্ময়ই দর্শনের জন্ম দেয়, আর বিস্ময়ের প্রকাশই হলো প্রশ্ন।

    প্রশ্ন ২: কোন বয়স থেকে শিশুরা কেন-কেন প্রশ্ন শুরু করে?
    উত্তর: সাধারণত দুই থেকে চার বছর বয়সের মধ্যে শিশুরা "কেন" প্রশ্নের ধারা শুরু করে। এটি ভাষার বিকাশ ও কার্যকারণ বোঝার ক্ষমতা অর্জনের সাথে সম্পর্কিত।

    প্রশ্ন ৩: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি কখনো সত্যিকারের প্রশ্ন করতে পারবে?
    উত্তর: বর্তমানে এআই প্যাটার্ন চিনে উত্তর তৈরি করে, কিন্তু মানুষের মতো কৌতূহল বা অস্তিত্বগত প্রশ্ন করতে পারে না। ভবিষ্যতে চেতনাসম্পন্ন এআই তৈরি হলে হয়তো প্রশ্ন করবে, তবে তা এখনো তাত্ত্বিক।

    প্রশ্ন ৪: সক্রেটিক পদ্ধতি কীভাবে কাজ করে?
    উত্তর: এটি প্রশ্নোত্তরের একটি দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি, যেখানে শিক্ষক ক্রমাগত প্রশ্ন করে শিক্ষার্থীর ধারণার ভিত্তি পরীক্ষা করেন এবং অসঙ্গতিগুলো প্রকাশ করে তাকে নতুন বোধিতে পৌঁছান।

    প্রশ্ন ৫: দর্শনে সবচেয়ে বিখ্যাত প্রশ্ন কী?
    উত্তর: "জীবনের অর্থ কী?" সম্ভবত সর্বকালের সবচেয়ে বিখ্যাত দার্শনিক প্রশ্ন। তবে দেকার্তের "আমি কিভাবে জানি যে আমি আছি?" এবং কান্টের "আমি কী জানতে পারি?"-ও অত্যন্ত প্রভাবশালী।

    প্রশ্ন ৬: প্রশ্ন করা বন্ধ করে দিলে কী হয়?
    উত্তর: প্রশ্ন করা বন্ধ করলে ব্যক্তিগত ও সামাজিক বিকাশ স্থবির হয়ে যায়। কৌতূহল ব্যতিরেকে জ্ঞান, উদ্ভাবন বা সম্পর্কের গভীরতা অর্জন সম্ভব নয়।

    একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

    নবীনতর পূর্বতন

    نموذج الاتصال