সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে শুরু করে বর্তমান ডিজিটাল যুগ পর্যন্ত, প্রতিটি রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি ছিল রাজস্ব। আর সেই রাজস্বের প্রধান উৎস ছিল ভূমি, এবং ভূমির ওপর নির্ধারিত কর বা রাজস্বই ইতিহাসে ‘খাজনা’ নামে পরিচিত। বাংলা ভাষায় খাজনা শব্দটি এসেছে ফারসি ও আরবি ‘খাজানা’ বা ‘খারাজ’ থেকে, যার অর্থ রাজস্ব, কর বা ভূমিকর। খাজনা নিছক একটি অর্থনৈতিক লেনদেন ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্র ও প্রজার মধ্যকার সম্পর্কের মূল ভিত্তি, ক্ষমতার প্রতীক এবং সামাজিক স্তরবিন্যাসের হাতিয়ার।
কিন্তু খাজনা কীভাবে শুরু হলো? কেনই বা এটি এত গুরুত্বপূর্ণ? মুঘল, ব্রিটিশ এবং স্বাধীন বাংলাদেশ— বিভিন্ন যুগে খাজনা ব্যবস্থা কেমন ছিল এবং বর্তমানে এর রূপটিই বা কী? এই ব্লগ পোস্টে আমরা খাজনা ব্যবস্থার উৎপত্তি থেকে বর্তমান ডিজিটাল ভূমি উন্নয়ন কর পর্যন্ত পুরো যাত্রাটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করব।
খাজনার ধারণা ও উৎপত্তি — রাষ্ট্র ও ভূমির প্রথম সম্পর্ক
মানবসমাজে যখন ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা জন্মায় এবং রাষ্ট্র নামক এক কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন থেকেই কর বা খাজনার উৎপত্তি। প্রাচীন সভ্যতাগুলোতে ভূমি ছিল উৎপাদনের প্রধান মাধ্যম, তাই স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্র তার আয়ের সিংহভাগ ভূমি থেকেই সংগ্রহ করত।
প্রাচীন ভারতে ভূমি রাজস্ব: বেদ থেকে মৌর্য
ভারতবর্ষে ভূমি রাজস্বের ধারণা অতি প্রাচীন। বৈদিক সাহিত্যে ‘বলি’ নামে একটি রাজস্বের উল্লেখ পাওয়া যায়, যা ছিল উৎপাদিত ফসলের একটি অংশ— যা প্রজারা স্বেচ্ছায় রাজাকে প্রদান করতেন। পরবর্তীকালে এই ‘বলি’ বাধ্যতামূলক করের রূপ নেয়। মনুসংহিতায় বলা হয়েছে, রাজা প্রজাদের কাছ থেকে উৎপাদিত ফসলের ষষ্ঠাংশ (১/৬) বা অষ্টমাংশ (১/৮) কর হিসাবে গ্রহণ করতে পারেন। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে (খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতক) ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থার এক বিস্তারিত চিত্র পাওয়া যায়। মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের শাসনামলে ভূমি জরিপ করা হতো, জমির উর্বরতা ও ফসলের ধরন অনুযায়ী রাজস্ব নির্ধারিত হতো এবং উৎপাদনের এক-চতুর্থাংশ থেকে এক-ষষ্ঠাংশ পর্যন্ত কর ধার্য ছিল। কৌটিল্য ‘সীতা’ (রাষ্ট্রীয় খামার), ‘ভাগ’ (উৎপাদনের অংশ) এবং ‘কর’ (নগদ কর)— এই তিন ধরণের রাজস্বের কথা উল্লেখ করেছেন। গ্রিক দূত মেগাস্থিনিসও উল্লেখ করেছেন যে, মৌর্য আমলে ভূমি রাজস্ব সংগ্রহ ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত, এবং রাজকর্মচারীরা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে কর আদায় করতেন।
বাংলার আদি-মধ্যযুগ: পাল, সেন ও পাঠান সুলতানি
প্রাচীন বাংলায় পাল (৮ম-১২শ শতক) ও সেন (১১শ-১২শ শতক) রাজবংশের শাসনামলে ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা ছিল মূলত স্থানীয় সামন্ততান্ত্রিক কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। পাল রাজারা বিশাল সাম্রাজ্য শাসন করলেও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের কারণে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হতো স্থানীয় সামন্ত, ভূস্বামী বা ‘বিষয়পতি’দের হাতে। সেন আমলে ‘হল’ (লাঙল) ভিত্তিক কর নির্ধারণের প্রথা প্রচলিত ছিল, অর্থাৎ একটি লাঙল দিয়ে যে পরিমাণ জমি চাষ করা যেত, তার ওপর কর ধার্য হতো। এছাড়াও গুপ্ত ও পরবর্তীকালে ‘ভূমি-দান’ প্রথার ব্যাপক প্রচলন ছিল, যেখানে রাজা ব্রাহ্মণ ও বৌদ্ধ বিহারগুলোকে করমুক্ত জমি দান করতেন। বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর (১৩শ শতক) ‘খারাজ’ নামে একটি ভূমি কর প্রবর্তিত হয়, যা ছিল অমুসলিম প্রজাদের জন্য বাধ্যতামূলক।
মুঘল আমল — খাজনা ব্যবস্থার সুবর্ণ যুগ ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ
ভারতবর্ষের ইতিহাসে মুঘল আমলকে (১৫২৬-১৭৫৭) খাজনা বা ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থার সবচেয়ে সুসংগঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানকারী যুগ হিসেবে গণ্য করা হয়। এই আমলেই খাজনা কেবল রাজস্ব আদায়ের মাধ্যম নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক বিজ্ঞানে রূপান্তরিত হয়।
রাজস্বের কেন্দ্রীয়তা
ভূমি রাজস্বই ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের আয়ের প্রধান উৎস। ঐতিহাসিক শিরিন মুসবির মতে, শিল্প ও বাণিজ্য থেকে আয়ের পরিমাণ ছিল নগণ্য; মোট আয়ের প্রায় ৯০% ভাগই আসত কৃষি থেকে। ভূমি রাজস্বের পারিভাষিক নাম ছিল ‘মাল’ বা ‘খারাজ’। এছাড়াও রাষ্ট্রের আয়ের অন্যান্য উৎসের মধ্যে ছিল যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ (খামস), অমুসলিমদের ওপর ধার্যকৃত কর (জিজিয়া), মুসলমানদের ধর্মীয় কর (জাকাত) এবং স্থানীয় বিভিন্ন কর (আবওয়াব, জিহত, ফুরুয়াত, সায়ের-ই-জিহত ইত্যাদি)।
সম্রাট আকবর ও রাজা টোডরমলের জাবতি ব্যবস্থা
সম্রাট আকবরের (১৫৫৬-১৬০৫) আমলে মুঘল রাজস্ব ব্যবস্থা চরম উৎকর্ষে পৌঁছায়। আকবরের রাজস্ব মন্ত্রী রাজা টোডরমল ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে ‘জাবতি ব্যবস্থা’ (Zabti System) বা ‘আইন-ই-দহশালা’ (দশসালা ব্যবস্থা) প্রবর্তন করেন, যা ছিল বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল:
জমির প্রকারভেদ: জমিকে চার ভাগে ভাগ করা হয়েছিল— পোলাজ (প্রতি বছর চাষযোগ্য), পারাউতি (কিছু সময়ের জন্য পতিত রাখা), চাচর (দীর্ঘদিন পতিত) এবং বানজার (অনুর্বর)।
উর্বরতা ভিত্তিক শ্রেণিবিভাগ: উর্বরতার ভিত্তিতে জমিকে উত্তম, মধ্যম ও নিম্ন— এই তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছিল।
দশ বছরের গড়: বিগত দশ বছরের উৎপাদনের গড় হিসাব করে ফসলের মূল্যের এক-তৃতীয়াংশ (প্রায় ৩৩%) রাজস্ব হিসাবে নির্ধারিত হয়েছিল, যা নগদ অর্থে আদায় করা হতো।
সরকারি জরিপ: রাজস্ব নির্ধারণের পূর্বে প্রতিটি গ্রামের জমি সঠিকভাবে জরিপ করা হতো এবং ফসলের উৎপাদন সম্পর্কে বিস্তারিত হিসাব রাখা হতো, যা ‘হাল-ই-হাসিল’ নামে পরিচিত।
আবুল ফজল তার ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে বাংলা সুবার ১৯টি সরকারের (জেলা) বিস্তারিত কৃষি ও রাজস্বের বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন। মুঘল আমলেই বাংলা সনের (বঙ্গাব্দ) প্রবর্তন হয়, যা ছিল ফসলি সন— অর্থাৎ কৃষি মৌসুমের সাথে মিল রেখে রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে। খাজনা আদায়ের এই রীতি চালু হয়েছিল প্রায় ৪৪০ বছর আগে, এবং আশ্চর্যজনকভাবে বাংলাদেশে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই মুঘল প্রথা অনুসরণ করা হয়েছে।
জমিদার ও প্রশাসনিক কাঠামো
মুঘল আমলে জমি দু’ভাগে বিভক্ত ছিল: ‘খালসা’ (সরকারি বা রাজকীয় জমি, যার রাজস্ব সরাসরি সম্রাটের কোষাগারে যেত) এবং ‘জায়গীর’ (প্রশাসনিক ব্যয়, উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের বেতন ও জনহিতকর কাজের জন্য নির্দিষ্ট জমি)। জমিদাররা মূলত রাজস্ব সংগ্রহকারী হিসাবে কাজ করতেন, কিন্তু তাদের জমির ওপর কোনো বংশানুক্রমিক মালিকানা স্বত্ব ছিল না। তারা বিনা খাজনায় কিছু জমি (‘নানকার’ বা ‘জায়গীর’) ভোগ করতেন, কিন্তু রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাদের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা হতো। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের (১৭৫৭) পূর্ব পর্যন্ত এই ব্যবস্থাই প্রচলিত ছিল।
ব্রিটিশ আমল — শোষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ভূমি ব্যবস্থার বিপর্যয়
পলাশীর যুদ্ধের (১৭৫৭) পর ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ লাভ করে এবং ১৭৬৫ সালে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছ থেকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার ‘দেওয়ানি’ (রাজস্ব আদায়ের অধিকার) লাভ করে। এই সময় থেকে বাংলার খাজনা ব্যবস্থায় এক ভয়াবহ অধ্যায়ের সূচনা হয়।
প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা: পাঁচসালা, একসালা ও দশসালা বন্দোবস্ত
কোম্পানির কর্মচারীরা বাণিজ্যিক কাজে অভিজ্ঞ হলেও ভূমি প্রশাসনে ছিল একেবারেই অনভিজ্ঞ। ফলস্বরূপ তারা শুরুতে প্রায় ১৫ বছর ধরে (১৭৬৫-১৭৮০) নানা ধরণের নীতি পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায়। ওয়ারেন হেস্টিংস প্রথমে পাঁচ বছরের জন্য (পাঁচসালা বন্দোবস্ত) নিলামে জমিদার বা ইজারাদারদের কাছে জমি বন্দোবস্ত দেন (১৭৭২)। এই ব্যবস্থা ব্যর্থ হলে তিনি এক বছরের (একসালা) বন্দোবস্ত চালু করেন এবং রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব ভারতীয় দেওয়ানদের হাতে অর্পণ করেন। কিন্তু কোনো ব্যবস্থাই কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি। কোম্পানির লোলুপ দালালরা কৃষকদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালাতো— প্রহার, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া, নারী নির্যাতন ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। রেজা খাঁ, গঙ্গাগোবিন্দ সিংহ, দেবী সিংহের মতো নিষ্ঠুর রাজস্ব আদায়কারীরা বাংলার গ্রামাঞ্চলে সন্ত্রাস সৃষ্টি করেছিল।
১৭৭০-এর দুর্ভিক্ষ: খাজনার ভয়াবহ পরিণতি
১৭৬৯-৭০ সালে বাংলায় এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যা ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ নামে পরিচিত। এই দুর্ভিক্ষে বাংলার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জনগণ (প্রায় এক কোটি মানুষ) মৃত্যুবরণ করে। চাষাবাদ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু কোম্পানি রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ একবিন্দুও কমায়নি। বরং জীবিত কৃষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করে রাজস্ব আদায় আরও বাড়ানো হয়। এই ঘটনা বাংলার কৃষি অর্থনীতিতে এক স্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করে।
আরও পড়ুন -
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯৩): জমিদারি প্রথার অভিষেক
ক্রমাগত ব্যর্থতা ও অস্থিতিশীলতার পর লর্ড কর্নওয়ালিস ১৭৯৩ সালে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যায় ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ (Permanent Settlement) প্রবর্তন করেন। এই ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
জমিদারদের জমির চিরস্থায়ী মালিক হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যেখানে মুঘল আমলে তারা ছিলেন কেবল রাজস্ব সংগ্রহকারী।
রাজস্বের পরিমাণ চিরকালের জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়— জমিদার বাড়াতে বা কমাতে পারবে না।
মোট রাজস্বের ১০/১১ ভাগ (প্রায় ৯১%) কোম্পানির কোষাগারে জমা দিতে হবে, বাকি ১/১১ ভাগ (প্রায় ৯%) জমিদার পাবে।
নির্দিষ্ট দিনে (সূর্যাস্তের আগে) রাজস্ব জমা না দিলে জমিদারি নিলামে বিক্রি করে দেওয়ার বিধান রাখা হয়, যা ‘সূর্যাস্ত আইন’ নামে কুখ্যাত।
দুর্ভিক্ষ, বন্যা বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগেও রাজস্ব মওকুফের কোনো বিধান ছিল না।
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলায় এক নতুন ভূস্বামী শ্রেণির সৃষ্টি হয়, যারা ব্রিটিশ শাসনের প্রতি অনুগত ছিল। কিন্তু এর ফলে কৃষকদের অবস্থা হয় শোচনীয়। পূর্বে মুঘল আমলে ফসলের নির্দিষ্ট অংশ কর হিসাবে দেওয়া হলেও, ব্রিটিশ আমলে নগদ অর্থে কর দিতে গিয়ে কৃষকদের মহাজনদের শরণাপন্ন হতে হয়, যা এক ভয়াবহ ঋণের ফাঁদ তৈরি করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’কে ‘ভারতের ইতিহাসে এক বিভীষিকা’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।
রায়তওয়ারি ও মহালওয়ারি ব্যবস্থা
বাংলার বাইরে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে দুটি ভিন্ন ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। রায়তওয়ারি ব্যবস্থা (১৮২০, স্যার টমাস মুনরো প্রবর্তিত) মাদ্রাজ, বোম্বে, আসাম প্রভৃতি অঞ্চলে চালু ছিল, যেখানে সরকার সরাসরি কৃষকদের (রায়ত) কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করতো এবং কৃষকরাই জমির মালিক হিসাবে স্বীকৃত ছিল। শুষ্ক জমির জন্য ৫০% এবং সেচযুক্ত জমির জন্য ৬০% পর্যন্ত রাজস্ব ধার্য ছিল। মহালওয়ারি ব্যবস্থা (১৮২২, হোল্ট ম্যাকেঞ্জি প্রবর্তিত) উত্তর-পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে চালু ছিল, যেখানে পুরো গ্রাম বা ‘মহল’-কে একটি একক কর-ইউনিট হিসাবে গণ্য করা হতো এবং গ্রামের মোড়ল বা প্রধান রাজস্ব জমা দিতেন।
পাকিস্তান আমল ও স্বাধীন বাংলাদেশ — জমিদারি উচ্ছেদ ও আধুনিকায়নের পথে
১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) ভূমি ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৯৫০ সালের ‘পূর্ববঙ্গ জমিদারি তালুক অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন’-এর মাধ্যমে ১৯৫২ থেকে ১৯৫৬ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ করা হয়। এর ফলে প্রায় ২০০ বছরের পুরনো জমিদারি শাসনের অবসান ঘটে। সরকার জমিদারদের কাছ থেকে জমি অধিগ্রহণ করে এবং প্রজারা সরাসরি সরকারের কাছে খাজনা প্রদানকারী (রায়ত) হিসেবে স্বীকৃতি পায়। জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের পূর্বে পূর্ব পাকিস্তানে ভূমি ব্যবস্থাপনার কাজ ছিল সীমিত; তখন সরকারের কাজ ছিল মূলত জমিদারদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করা।
স্বাধীন বাংলাদেশে ভূমি ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে ‘ভূমি উন্নয়ন কর’ (Land Development Tax) প্রবর্তনের মাধ্যমে। ১৯৭৬ সালের ‘ভূমি উন্নয়ন কর অধ্যাদেশ’-এর মাধ্যমে পুরাতন ‘খাজনা’ শব্দটির পরিবর্তে ‘ভূমি উন্নয়ন কর’ নামকরণ করা হয়। বর্তমানে ভূমি উন্নয়ন কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কৃষি ভূমি, চা বাগান এবং অন্যান্য ভূমির করের হার, সীমা ও শর্ত নির্ধারণ করে থাকে।
সাম্প্রতিক একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন হলো ২০২৪ সালের জুলাই মাসে মুঘল আমলের ৪৪০ বছরের পুরনো বাংলা সন ভিত্তিক ভূমি কর আদায়ের প্রথা বাতিল করা। এখন থেকে পহেলা বৈশাখ থেকে ৩০শে চৈত্রের পরিবর্তে ইংরেজি অর্থবছর (পহেলা জুলাই থেকে ৩০শে জুন) অনুযায়ী ভূমি উন্নয়ন কর আদায় করা হচ্ছে। সরকারের মতে, কৃষির ফলনের ঋতু পরিবর্তন এবং আর্থিক কাঠামোর সাথে সঙ্গতি রেখে হিসাব ব্যবস্থাপনা সহজ করার লক্ষ্যেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।
বর্তমান খাজনা ব্যবস্থা — ডিজিটালাইজেশন, আইন ও বাস্তবতা
বর্তমানে
বাংলাদেশে খাজনা বলতে ভূমি উন্নয়ন করকেই বোঝানো হয়। ভূমি মন্ত্রণালয়ের
আওতাধীন ভূমি সংস্কার বোর্ড এই কর আদায়ের দায়িত্বে নিয়োজিত। নাগরিকরা এখন
সরাসরি ldtax.gov.bd ওয়েবসাইট বা
মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করতে পারেন। বিকাশ,
নগদ ইত্যাদি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমেও কর পরিশোধের সুবিধা
চালু হয়েছে।
করের হার ও জমির শ্রেণিবিভাগ
ভূমি উন্নয়ন করের হার জমির প্রকৃতি ও পরিমাণের ওপর নির্ভরশীল। কৃষি জমি, অকৃষি জমি (বাড়ি, দালান, পুকুর), চা বাগান ইত্যাদির জন্য আলাদা হার নির্ধারিত। সাধারণত, কৃষি জমির জন্য করের পরিমাণ খুবই নামমাত্র (প্রতি শতাংশে কয়েক টাকা), যেখানে শহরাঞ্চলে অকৃষি জমির জন্য কর তুলনামূলকভাবে বেশি। ২৫ বিঘা পর্যন্ত কৃষি জমির জন্য কর মওকুফের বিধানও রয়েছে, যা প্রান্তিক কৃষকদের জন্য স্বস্তিদায়ক।
খাজনা বাকি থাকলে ভয়াবহ পরিণতি
বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা আইনের অধীনে, কোনো ব্যক্তি টানা ৩ বছর খাজনা পরিশোধ না করলে তার জমি সরকারি ‘খাস’ খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতে পারে, অর্থাৎ জমির মালিকানা রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হতে পারে। এই বিধানটি নাগরিকদের নিয়মিত কর প্রদানে বাধ্য করে, যদিও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখনও খাজনা প্রদান পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন নয়।
ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা
ভারতে স্বাধীনতার পর (১৯৪৭) ভূমি সংস্কারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত করা হয় এবং ‘ভূমি-থেকে-চাষী’ (Land to the Tiller) নীতি গ্রহণ করা হয়। পশ্চিমবঙ্গে ‘অপারেশন বর্গা’ (১৯৭৮)-র মাধ্যমে বর্গাদার বা ভাগচাষীদের রেকর্ডভুক্ত করা এবং তাদের স্বত্ব সুরক্ষিত করা ছিল এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে ভূমি রাজস্ব বলতে মূলত ‘জমা’ (খাজনা) বোঝানো হয়, যা খুবই নামমাত্র এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর গুরুত্ব দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। তবে জমির মালিকানার রেকর্ড (Record of Rights) রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ভূমি রাজস্ব প্রশাসন এখনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
খাজনা ব্যবস্থার সামাজিক-রাজনৈতিক প্রভাব
খাজনা নিছক একটি অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া ছিল না, এটি সমাজ ও রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। ব্রিটিশ আমলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে সৃষ্ট জমিদার শ্রেণি ছিল ব্রিটিশ শাসনের অন্যতম স্তম্ভ, কিন্তু অন্যদিকে কৃষকসমাজ ক্রমাগতভাবে দরিদ্রতর হতে থাকে। এই বৈষম্যের প্রতিক্রিয়াতেই উনিশ শতকের বিভিন্ন কৃষক বিদ্রোহ (নীল বিদ্রোহ, পাবনা বিদ্রোহ, ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ) সংঘটিত হয়। বিশ শতকের গোড়ার দিকে কৃষক আন্দোলন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে পড়ে।
স্বাধীন বাংলাদেশেও ভূমি ও খাজনা প্রশ্ন রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করে আসছে। জমিদারি উচ্ছেদ এবং ভূমি সংস্কার ছিল নবীন রাষ্ট্রের অন্যতম অঙ্গীকার। তবে বাস্তবিক অর্থে বৃহৎ ভূমিস্বত্ব এখনও সমাজের একাংশের হাতে কুক্ষিগত, এবং প্রকৃত ভূমিহীন কৃষকদের হাতে জমির মালিকানা পৌঁছানো আজও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও সংস্কারের পথ
খাজনা বা ভূমি উন্নয়ন কর ব্যবস্থা আধুনিকীকরণের পথে থাকলেও একাধিক চ্যালেঞ্জ এখনও বিদ্যমান।
ভূমি জরিপের অনিশ্চয়তা
বাংলাদেশে সর্বশেষ ভূমি জরিপ (ডিজিটাল ল্যান্ড সার্ভে) চলমান থাকলেও, জমির মালিকানা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি এখনও একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা। সঠিক জরিপ ছাড়া সঠিক কর নির্ধারণ সম্ভব নয়।
প্রান্তিক কৃষকের অসচেতনতা
গ্রামীণ জনপদের একটি বড় অংশ এখনও অনলাইন কর পরিশোধ প্রক্রিয়া সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নয়। আবার অনেকেই খাজনার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন নন, যার ফলে খাজনা বাকি রেখে জমি হারানোর ঝুঁকি নিচ্ছেন।
কর ফাঁকি ও দুর্নীতি
ভূমি উন্নয়ন করের হার অত্যন্ত কম হওয়া সত্ত্বেও, শহরাঞ্চলে অকৃষি জমির ক্ষেত্রে কর ফাঁকি একটি বড় সমস্যা। ভূমি অফিসগুলোতে দালালচক্র ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়।
সমাধানের পথ
ডিজিটালাইজেশন এই সমস্যাগুলোর একটি বড় অংশের সমাধান হতে পারে। ldtax.gov.bd
প্ল্যাটফর্মের পরিধি বৃদ্ধি, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য ডিজিটাল সচেতনতা
কার্যক্রম, এবং ভূমি অফিসগুলোতে স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে খাজনা
ব্যবস্থাকে আরও জনবান্ধব করে তোলা যেতে পারে। এছাড়াও ভারতের ‘ডিজিটাল
ইন্ডিয়া ল্যান্ড রেকর্ডস মডার্নাইজেশন প্রোগ্রাম’ (DILRMP)-এর অনুরূপ
উদ্যোগ বাংলাদেশেও ভূমি রেকর্ড আধুনিকীকরণের জন্য নেওয়া হচ্ছে।
খাজনা ব্যবস্থার তুলনামূলক রূপরেখা
| বৈশিষ্ট্য | প্রাচীন যুগ | মুঘল আমল | ব্রিটিশ আমল | বর্তমান (বাংলাদেশ) |
|---|---|---|---|---|
| করভিত্তি | ফসলের অংশ (বলি, ভাগ) | ফসলের মূল্যের ১/৩ অংশ (জাবতি) | চিরস্থায়ী নগদ কর | ভূমি উন্নয়ন কর (নামমাত্র) |
| সংগ্রহকারী | স্থানীয় ভূস্বামী, সামন্ত | জমিদার (সংগ্রহকারী মাত্র) | জমিদার (ভূমির মালিক) | সরকার (সরাসরি) |
| মালিকানা | রাষ্ট্র ও সামন্ত | রাষ্ট্র (খালসা/জায়গীর) | জমিদার (চিরস্থায়ী) | রায়ত (কৃষক) |
| পরিশোধ মাধ্যম | শস্য | নগদ অর্থ (মূলত) | নগদ অর্থ | ডিজিটাল (অনলাইন, মোবাইল) |
| করহার নমনীয়তা | উৎপাদনভিত্তিক | উৎপাদনভিত্তিক | সম্পূর্ণ অনমনীয় | সরকারি প্রজ্ঞাপন দ্বারা নির্ধারিত |
সহস্রাব্দের পথপরিক্রমা
খাজনা ব্যবস্থার ইতিহাস মানব সভ্যতারই ইতিহাস। বৈদিক যুগের ‘বলি’ থেকে শুরু করে সম্রাট আকবরের ‘জাবতি’, লর্ড কর্নওয়ালিসের ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ হয়ে বাংলাদেশের ডিজিটাল ‘ভূমি উন্নয়ন কর’ পর্যন্ত এই যাত্রা কেবল অর্থনৈতিক লেনদেনের বিবর্তন নয়— এটি শাসক ও শাসিতের সম্পর্কের বিবর্তন। মুঘলদের ফসলি সনের ৪৪০ বছরের প্রথা বাতিল একটি প্রতীকী সমাপ্তি, যা নির্দেশ করে খাজনা এখন প্রাচীন দায়-বাধ্যবাধকতার পরিবর্তে আধুনিক নাগরিক-রাষ্ট্র চুক্তির অংশ হয়ে উঠছে।
তবে চ্যালেঞ্জ শেষ হয়নি। ভূমিহীনদের জন্য জমির নিশ্চয়তা, কর ফাঁকি রোধ, ডিজিটাল ব্যবস্থার পরিপূর্ণতা— এগুলো এখনও অসমাপ্ত অধ্যায়। তবু, আমরা যখন পেছনে তাকাই, দেখি সহস্রাব্দ ধরে চলে আসা খাজনার ধারণা কীভাবে শোষণের হাতিয়ার থেকে ধীরে ধীরে উন্নয়নের উপকরণ হয়ে উঠছে। এই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েই আগামীর পথ নকশা করতে হবে— যেখানে খাজনা হবে উন্নয়নের বাহন, শোষণের নয়।
আরও পড়ুন -
