মেঘ গুড়গুড় করে ডাকছে, আকাশ কালো করে নামছে গুমোট অন্ধকার আর ঠিক সেই মুহূর্তে একটা-দুটো করে টুপটাপ জল পড়তে শুরু করল মাটিতে। আমরা দৌড়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি, তৃষিত মাটি থেকে ওঠে এক অনির্বচনীয় সোঁদা গন্ধ। কিন্তু কখনো কি ভেবেছ, এই অলৌকিক ঘটনাটা আসলে রসায়ন আর পদার্থবিদ্যার এক মন্ত্রমুগ্ধ নৃত্য? বৃষ্টি কেন হয়, কীভাবে হয়—এই প্রশ্নের উত্তর এতটাই সুন্দর ও জটিল যে তা উপলব্ধি করলে প্রতিটি বৃষ্টির ফোঁটা একেকটা মহাকাব্যিক যাত্রার ফসল বলে মনে হবে। আজ আমরা বৃষ্টির প্রতিটি স্তরকে কৈশিক থেকে মহাজাগতিক ব্যবচ্ছেদ করব। বিজ্ঞানের কঠিন সত্য, ভূগোলের ব্যাপ্তি, সাহিত্যের রস আর জীবনবোধের নির্যাস নিয়ে আমরা লিখব বৃষ্টির পূর্ণাঙ্গ এক আখ্যান।
জলচক্র: পৃথিবী নামক গ্রহের শ্বাস-প্রশ্বাস
“বৃষ্টি কেন হয়” প্রশ্নটির উত্তরের শুরুটা আমাদের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও অবিরাম চলমান এক প্রক্রিয়ার মধ্যে নিহিত—জলচক্র বা হাইড্রোলজিকাল সাইকেল। ধরো, পৃথিবী একটা বিশাল জীবন্ত সত্তা, আর জলই তার রক্ত। সমুদ্র, নদী, হ্রদ, মাটি এমনকি গাছপালা ও তোমার শরীর থেকেও প্রতিনিয়ত জল বাষ্প হয়ে মিশে যাচ্ছে বাতাসে। এই বাষ্পীভবনই পুরো চক্রের প্রথম ধাপ। সূর্যের তাপই এখানে প্রধান চালিকাশক্তি, যে তাপ জলকে তরল অবস্থা থেকে গ্যাসীয় অবস্থায় রূপান্তরিত করে। শুধু জলাশয় নয়, উদ্ভিদের পত্ররন্ধ্র দিয়েও জল বেরিয়ে আসে, যাকে বলে প্রস্বেদন। এই দুই মিলে ইভাপোট্রান্সপিরেশন।
বাতাস যখন উষ্ণ ও আর্দ্র হয়ে ওপরে ওঠে, তখন তার চাপ কমতে থাকে। উচ্চতার সঙ্গে তাপমাত্রাও কমে। প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ৬.৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড হারে তাপমাত্রা পড়তে থাকলে একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় গিয়ে সেই জলীয় বাষ্প আর গ্যাস হয়ে থাকতে পারে না। তখনই ঘটে ঘনীভবন, অর্থাৎ বাষ্প ফিরে আসে ক্ষুদ্র জলকণায়। এই জলকণাগুলোই সম্মিলিতভাবে তৈরি করে মেঘ। মেঘের ভেতর এই কোটি কোটি কণা জমাট বাঁধতে বাঁধতে যখন বাতাসে ভেসে থাকার মতো যথেষ্ট হালকা থাকে না, তখন তা পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে। এটাই বৃষ্টিপাত। তারপর সেই জল আবার নদী-সমুদ্রে ফিরে যায়, মাটি ভিজিয়ে ভূগর্ভস্থ জলাধার পূর্ণ করে, আর চক্র চলতেই থাকে। সহজ এই গল্পটির প্রতিটি ধাপই আলাদা করে গভীর ব্যাখ্যা দাবি করে।
বাষ্পীভবন ও বাতাসের আর্দ্রতা: অদৃশ্যের যাত্রা
বৃষ্টি হওয়ার জন্য প্রথম শর্তই হলো বাতাসে যথেষ্ট জলীয়বাষ্প থাকা। আবহাওয়াবিদ্যায় আমরা বলি আপেক্ষিক আর্দ্রতার কথা। গরম বাতাস তার নিজস্ব আয়তনে অনেক বেশি জলীয়বাষ্প ধরে রাখতে পারে। তুমি যখন সকালে এক গ্লাস বরফ-ঠান্ডা পানির গায়ে ছোট ছোট জলকণা দেখো, ব্যাপারটা অনেকটা তা-ই। পাত্রের চারপাশের উষ্ণ বাতাস ঠান্ডা পৃষ্ঠের সংস্পর্শে এসে জল ধারণ ক্ষমতা হারায়, আর বাড়তি বাষ্প জল হয়ে ঝরে পড়ে। বায়ুমণ্ডলের বেলায় ঠান্ডা হওয়ার প্রক্রিয়াটা ঘটে ওপরে ওঠার মাধ্যমে, কোনো ঠান্ডা ভূপৃষ্ঠের ছোঁয়ায় নয়।
এক ঘনমিটার বাতাস নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় কত গ্রাম জলীয়বাষ্প ধরে রাখতে পারে, তা মোটামুটি নির্দিষ্ট। এই সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতাকে বলে সম্পৃক্ততা বিন্দু। তাপমাত্রা যত কমে, এই ধারণক্ষমতাও তত কমে। তাই উষ্ণ আর্দ্র বাতাস ওপরে উঠে শীতল হলেই জলীয়বাষ্প তার অদৃশ্য কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দৃশ্যমান জলকণায় পরিণত হয়। সমুদ্রের ওপরের বাতাস আর্দ্রতায় ভরপুর, আর সেই বাতাস যখন মৌসুমি বায়ুপ্রবাহের ঠেলায় স্থলভাগের দিকে ধাবিত হয়, তখন সৃষ্টি হয় বৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ।
নিউক্লিয়াস: যেভাবে জলবিন্দু জন্ম নেয়
পদার্থবিজ্ঞানের একটি মজার তথ্য হলো, বিশুদ্ধ জলীয়বাষ্প খুব সহজে ঘনীভূত হতে চায় না, এমনকি তাপমাত্রা শিশিরাঙ্কের নিচে নেমে গেলেও। এর জন্য দরকার একটি পৃষ্ঠ বা বীজ, যাকে বলে কনডেনসেশন নিউক্লিয়াস। এই নিউক্লিয়াস হতে পারে ধূলিকণা, সমুদ্রের লবণ, আগ্নেয়গিরির ছাই, পরাগরেণু, এমনকি কলকারখানার ধোঁয়ার কণাও। সামুদ্রিক পরিবেশে বৃষ্টির ফোঁটার কেন্দ্রে সাধারণত লবণকণা থাকে, আর মহাদেশের ওপরে থাকে ধুলো বা সালফেট কণা।
কীভাবে ঘটে ঘটনাটি? প্রথমত, কিছু আর্দ্রতাগ্রাহী কণা বাতাসের সামান্য আর্দ্রতাতেই জল টেনে নেয় এবং একটি অতি সূক্ষ্ম জলবিন্দু তৈরি করে। এই বিন্দুর চারপাশে আরও বাষ্প এসে জমা হতে থাকে। মেঘের ভেতর এই কণাগুলোর পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়, তারা একে অপরের সঙ্গে মিশে বড় হয়ে ওঠে। এভাবেই সৃষ্টি হয় মেঘবিন্দু, যার ব্যাস মাত্র ০.০১ মিলিমিটার বা তারও কম। এগুলো এতটাই হালকা যে সহজেই বাতাসে ভেসে থাকে। কিন্তু কীভাবে এই মেঘবিন্দুগুলো ভারী বৃষ্টির ফোঁটায় পরিণত হয়? সেটাই পরের অধ্যায়।
মেঘ থেকে বৃষ্টি: সংঘর্ষ আর হিমাঙ্ক
একটি সাধারণ বৃষ্টির ফোঁটা তৈরি হতে গড়ে প্রায় দশ লাখ মেঘবিন্দুর প্রয়োজন হয়। এই বিন্দুগুলো একত্রিত হয় মূলত দুটি প্রক্রিয়ায়: সংঘর্ষ-সমন্বয় প্রক্রিয়া এবং আইস ক্রিস্টাল বা বের্গেরন প্রক্রিয়া।
সংঘর্ষ-সমন্বয় প্রক্রিয়া সাধারণত উষ্ণ মেঘে ঘটে, যেখানে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের ওপরে থাকে। এই প্রক্রিয়ায় বড় বড় জলবিন্দুগুলো মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে ধীরে ধীরে নিচের দিকে পড়তে থাকে। পথিমধ্যে তারা ছোট ছোট বিন্দুকে নিজের সঙ্গে বাঁধিয়ে ফেলে। যতই বড় হয়, ততই দ্রুত নিচে পড়তে থাকে এবং আরও বেশি ছোট বিন্দুকে শুষে নেয়। অনেকটা পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া তুষারগোলার মতো; শুরুতে ছোট থাকলেও গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তা বিশাল আকার ধারণ করে।
অন্যদিকে, ঠান্ডা মেঘে বা শীতপ্রধান অঞ্চলের মেঘে ঘটে বের্গেরন প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া এক অদ্ভুত ভৌত ধর্মের ওপর দাঁড়িয়ে আছে: বরফ স্ফটিকের ওপরে সম্পৃক্ত বাষ্পচাপ অতি-শীতল জলবিন্দুর ওপর সম্পৃক্ত বাষ্পচাপের চেয়ে কম। ফলে, মেঘের মধ্যে যখন একই সঙ্গে বরফ স্ফটিক ও অতি-শীতল জল (শূন্য ডিগ্রির নিচেও তরল অবস্থায় থাকা জল) থাকে, তখন জলীয় বাষ্প ধীরে ধীরে জলবিন্দু ছেড়ে বরফ স্ফটিকের ওপর জমা হয়। এর ফলে বরফ স্ফটিক দ্রুত বেড়ে উঠতে থাকে। একসময় তা এত ভারী হয় যে মাধ্যাকর্ষণ টেনে নামায়। পথে তাপমাত্রা বাড়লে তা গলে জলবিন্দুতে রূপ নেয়, নতুবা তুষার বা শিলা হিসেবে ভূপৃষ্ঠে পৌঁছে যায়। বৃষ্টির ফোঁটার সর্বোচ্চ আকার সাধারণত ৫ মিলিমিটার ব্যাসের বেশি হয় না, কারণ তার বেশি হলে তা বাতাসের ঘর্ষণে নিজেই ভেঙে ছোট ছোট টুকরায় বিভক্ত হয়ে যায়।
বৃষ্টির প্রকারভেদ: ঝিরিঝিরি থেকে মহাপ্লাবন
সব বৃষ্টি এক রকম নয়। আবহাওয়াবিদ্যায় বৃষ্টিকে কয়েকটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়, যা নির্ভর করে মেঘের ধরন, তীব্রতা ও স্থায়িত্বের ওপর। শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টি (Orographic rain) ঘটে যখন আর্দ্র বাতাস পাহাড় বা পর্বতের গায়ে ধাক্কা খেয়ে ওপরে উঠতে বাধ্য হয় এবং ঠান্ডা হয়ে বৃষ্টি ঝরায়। মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে পৃথিবীর সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের অন্যতম কারণ এই শৈলোৎক্ষেপ প্রভাব। পরিচলন বৃষ্টি (Convectional rain) সাধারণত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে দেখা যায়। সূর্যের তীব্র তাপে ভূপৃষ্ঠ গরম হয়ে ওপরে বায়ু উঠে যায় এবং দ্রুত ঘনীভূত হয়ে বিকেলের দিকে প্রবল বজ্রবিদ্যুৎ সহ বৃষ্টি নামায়। আমাদের গ্রীষ্মের কালবৈশাখী এই প্রকারেরই উদাহরণ। আর ঘূর্ণবাতজনিত বৃষ্টি (Cyclonic or Frontal rain) ঘটে যখন উষ্ণ ও শীতল দুই বায়ুরাশির মিলনে উষ্ণ বাতাস ঠান্ডা বাতাসের ওপর দিয়ে পিছলে ওঠে এবং দীর্ঘস্থায়ী, বিরামহীন বৃষ্টি দেয়। নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের শীতকালীন বৃষ্টি এভাবেই হয়।
মৌসুমি বৃষ্টি: এক বিস্ময়কর ভূ-ভৌতিক ব্যবস্থা
বাংলাদেশ ও ভারতের প্রেক্ষাপটে বৃষ্টি মানেই মৌসুমি বায়ুর দান। মৌসুমি শব্দটা এসেছে আরবি ‘মাওসিম’ থেকে, অর্থাৎ ঋতু। এর নেপথ্যে রয়েছে স্থলভাগ ও জলভাগের অসম উষ্ণতা বৃদ্ধি পাওয়ার এক অপূর্ব ঘটনা। গ্রীষ্মকালে এশিয়া মহাদেশের বিশাল ভূখণ্ড দ্রুত গরম হয়ে ওঠে এবং তার ওপরের বাতাস উত্তপ্ত হয়ে ওপরে উঠে একটি নিম্নচাপ অঞ্চল সৃষ্টি করে। অন্যদিকে, ভারত মহাসাগর তুলনামূলকভাবে ঠান্ডা থাকে এবং সেখানে উচ্চচাপ বিরাজ করে। বায়ু সব সময় উচ্চচাপ থেকে নিম্নচাপের দিকে ছুটে যায়। ফলে জলীয় বাষ্পে ভরপুর দক্ষিণ-পশ্চিমী বাতাস প্রবল বেগে স্থলভাগের দিকে ধাবিত হয়। এই পথে বঙ্গোপসাগরের ওপর দিয়ে আসার ফলে বাতাস অতিরিক্ত আর্দ্রতা কুড়িয়ে নেয়। তারপর হিমালয় পর্বতমালার বিশাল প্রাকৃতিক দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ওপরে উঠতে বাধ্য হয়ে ঠান্ডা হয়ে রূপ নেয় মহাপ্লাবী বর্ষায়। এ যেন প্রকৃতির সবচেয়ে নাটকীয় আর নিয়মতান্ত্রিক আয়োজন।
জুন মাসে এই বৃষ্টি কেরালা উপকূলে হানা দিয়ে ক্রমে সারা উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। অক্টোবরে স্থলভাগ ঠান্ডা হয়ে আসে, তখন বাতাস ফিরে যায় উত্তর-পূর্ব দিক থেকে, এবং পথে বঙ্গোপসাগর থেকে আর্দ্রতা নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের পূর্ব উপকূলে ঘূর্ণিঝড় সহ প্রত্যাবর্তনকালীন বৃষ্টি দেয়। এই চক্রই এ অঞ্চলের কৃষি, অর্থনীতি আর সংস্কৃতির ধমনী। কবে বৃষ্টি হবে, কতটুকু হবে—তার সামান্য তারতম্যই নিয়ে আসতে পারে খরা কিংবা বন্যা, ভূমিকম্পের থেকেও ভয়াবহ আকারে মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে বৃষ্টির অনিয়ম।
আরও পড়ুন -
কৃত্রিম বৃষ্টি: বিজ্ঞানের হস্তক্ষেপ
মানুষ যখন আকাশের জলের ফোঁটা ফোটানোর জন্য প্রকৃতির অপেক্ষা করতে নারাজ, তখনই আমরা কৃত্রিম বৃষ্টি বা ক্লাউড সিডিংয়ের কথা ভাবি। এর পেছনের তত্ত্ব সেই কনডেনসেশন নিউক্লিয়াসেরই বাস্তব প্রয়োগ। মেঘের মধ্যে যখন পর্যাপ্ত জলীয়বাষ্প থাকে কিন্তু ঘনীভবনের নিউক্লিয়াসের অভাবে বৃষ্টি হতে চায় না, তখন বিমান বা রকেটের সাহায্যে মেঘের মধ্যে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র লবণ, সিলভার আয়োডাইড, অথবা ড্রাই আইস (কঠিন কার্বন ডাই অক্সাইড) স্প্রে করা হয়। সিলভার আয়োডাইডের কেলাসের গঠন অনেকটা বরফের কেলাসের মতো, তাই তা অতি-শীতল জলে বরফের নিউক্লিয়াস হিসেবে কাজ করে। এটি বের্গেরন প্রক্রিয়াকে কৃত্রিমভাবে উসকে দেয়, এবং দ্রুত বৃষ্টির ফোঁটা তৈরি করে।
চীন, আমেরিকা, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিশ্বের বহু দেশে বৃষ্টি বাড়ানো, শিলাবৃষ্টি ঠেকানো, কিংবা খরা মোকাবিলায় ক্লাউড সিডিং নিয়মিত ব্যবহৃত হয়। ২০০৮ বেইজিং অলিম্পিকের উদ্বোধনী দিনে মেঘ সরিয়ে রাখতে চীন ক্লাউড সিডিং করেছিল। যদিও এর পরিবেশগত দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে বিতর্ক আছে, কৃত্রিম বৃষ্টি আমাদের শিখিয়েছে যে, আমরা আকাশের রসায়নকে নিজেদের প্রয়োজনে খানিকটা হলেও বশে আনতে পেরেছি।
জলবায়ু পরিবর্তন ও বৃষ্টির নতুন ছন্দ
একবিংশ শতাব্দীতে বৃষ্টি কেন হয়, সেই সহজ প্রশ্নটির সঙ্গে জুড়ে গেছে জটিল এক অধ্যায়—জলবায়ু পরিবর্তন। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাষ্পীভবনের হার বাড়ছে, আর উষ্ণ বাতাস বেশি জলীয়বাষ্প ধারণ করছে। এর ফলাফল হিসেবে একই জায়গায় বৃষ্টির পরিমাণ ও তীব্রতা দুটোই বাড়ছে। অর্থাৎ, যেখানে বৃষ্টি হবে, সেখানে হবে প্রবল মুষলধারে; আর যেখানে হবে না, সেখানে দীর্ঘ খরা নামবে। আবহাওয়াবিদরা একে বলেন ‘প্রিসিপিটেশন এক্সট্রিমস’।
আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগরের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়ার ফলে সৃষ্টি হওয়া ঘূর্ণিঝড়গুলো আরও দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে, এবং স্থলভাগে আছড়ে পড়ার সময় রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি ঝরাচ্ছে। বাংলাদেশের উপকূলে আম্পান, সিডর বা ইয়াসের মতো ঝড়গুলো একই গল্প বলে। আবার, হিমালয়ের হিমবাহ গলার সঙ্গে সঙ্গেও বৃষ্টির ধারা বদলে যাচ্ছে। একদিকে বর্ষা অনিয়মিত হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে শহরাঞ্চলে হিট আইল্যান্ড ইফেক্ট অতিরিক্ত পরিচলন বৃষ্টি নামাচ্ছে। বৃষ্টি আগের মতো আর কেবল প্রকৃতির চক্র নয়, এখন তা হয়ে উঠেছে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের এক জীবন্ত আয়না।
ধর্ম, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বৃষ্টি
বৃষ্টি নিছক ভৌত ঘটনা হলে মানুষের মনে এমন গভীর আলোড়ন তুলতে পারত না। বৈদিক যুগ থেকে শুরু করে আধুনিক কবিতা পর্যন্ত বৃষ্টি একই সঙ্গে প্রেম, বিরহ, উর্বরতা, ধ্বংস ও পুনর্জন্মের প্রতীক হয়ে আছে। কালিদাসের ‘মেঘদূত’-এ বৃষ্টির মেঘই হয়ে ওঠে প্রেমিকের বার্তাবাহক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল’ থেকে শুরু করে নজরুলের ‘বাদল-বরিষণে’, বৃষ্টি মানেই বাঙালি মানসে এক মাতাল করা স্নেহ ও স্নিগ্ধতার ছোঁয়া। বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনে ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, নদীতে এল বান’ ছড়াটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম মুখে মুখে ফিরছে। বৃষ্টি মানেই শ্রাবণের বিষণ্ণতা, কিংবা স্মৃতি রোমন্থনের এক মোক্ষম সময়।
ইসলামি সংস্কৃতিতে বৃষ্টি হলো রহমত ও করুণার প্রতীক। কোরআনে বলা হয়েছে, “তিনিই সেইজন যিনি বৃষ্টি বর্ষণ করেন তাদের হতাশ হয়ে যাওয়ার পর, এবং তাঁর করুণা ছড়িয়ে দেন।” মহানবী (সা.) যখন বৃষ্টি প্রার্থনার জন্য সালাতুল ইসতিস্কা পড়তেন, বৃষ্টি কামনায় আকাশের দিকে হাত তোলা ছিল গভীর আধ্যাত্মিক আত্মসমর্পণের প্রকাশ। হিন্দু পুরাণে ইন্দ্র দেবতাদের রাজা ও বৃষ্টির অধিপতি। গ্রামবাংলায় আজও অনাবৃষ্টি কালে ‘হুদুম দেও’র মতো লোকাচার টিকে আছে। বৃষ্টি এদেশে কেবল ফসল ফলানোর জল এনে দেয় না, এনে দেয় মনের ভেতরের কাব্য আর ভক্তির ফসল।
বৃষ্টির নগ্ন বিজ্ঞান থেকে ঘন কাব্যের নির্যাস
বৃষ্টি কেন হয়, এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আমরা দেখলাম, এটি আসলে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে টানা এক বহুমাত্রিক জগৎ। একই অণু হয়তো কোনো প্রাচীন সভ্যতার নদী থেকে বাষ্প হয়ে উঠেছিল, বরফ যুগের হিমবাহে কেটেছে কয়েক সহস্রাব্দ, তারপর সমুদ্রের গভীরে কয়েক শতক কাটিয়ে আবার মেঘ হয়ে ভেসে এসে ঝরল তোমার বাগানের গোলাপ গাছে। এ যেন এক মহাজাগতিক পুনর্জন্মের চক্র, যেখানে আমাদের দেহের ষাট শতাংশ জলও অংশ নিচ্ছে প্রতিনিয়ত।
বৃষ্টি বোঝা মানে পৃথিবী নামক এই বদ্ধ জৈবমণ্ডলের অপার সুন্দর ভারসাম্যটা বোঝা। প্রতিটি ফোঁটা বলে দেয়, কিছুই বিচ্ছিন্ন নয়, কিছুই অর্থহীন নয়। বৃষ্টি কেন হয়? কারণ, পৃথিবী ও সূর্যের নৃত্য আছে, কারণ বাতাসের প্রবাহ আছে, কারণ ধূলিকণারাও এক একটি নিউক্লিয়াস হয়ে মহৎ কোনো কাজে অংশ নিতে জানে। সর্বোপরি, বৃষ্টি হয়, কারণ এই গ্রহ প্রাণ ধারণের এক অনন্য ক্ষমতা নিয়ে মহাবিশ্বে ভাসছে। সেই প্রাণের জলধারা কখনো ঝুম বৃষ্টি হয়ে ধানক্ষেতে নামে, কখনো ইলশেগুঁড়ি হয়ে প্রেমিকের কপালে চুমু আঁকে। বৈজ্ঞানিক যুক্তি আর কাব্যিক রস তাই বৃষ্টির গল্পে একাকার।
আরও পড়ুন -
