কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি

    আগুনের বিজ্ঞান

    আগুন মানব সভ্যতার প্রাচীনতম সঙ্গী প্রায় ১০ লক্ষ বছর আগে মানবজাতি আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছিল সেই থেকে আজ পর্যন্ত আগুন আমাদের রান্না, আলো, উষ্ণতা, শক্তিসবকিছুর ৎস কিন্তু আমরা যতই আগুন ব্যবহার করি, এর প্রকৃতি সম্পর্কে আমাদের অনেক ধারণাই ভাসা ভাসা

    আগুন আসলে কী? কেন কখনো হলুদ, কখনো নীল, কখনো সবুজ শিখা দেখা যায়? আর সেই বিখ্যাত প্রশ্ন—"অক্সিজেন ছাড়া আগুন জ্বলে না"—এটা কি পুরোপুরি সত্যি? এই ব্লগে আমরা আগুন নিয়ে এমন সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজবো যা আপনাকে চমকে দেবে। রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান ইতিহাসের মিশেলে আমরা দেখব আগুন নামের এই চেনা জিনিসটির অচেনা দিকগুলো

    আগুনের বিজ্ঞান

    আগুন আসলে কী: রাসায়নিক দৃষ্টিকোণ থেকে

    আগুন কোন বস্তু নয়

    অনেকে মনে করেন আগুন একটা পদার্থ। কিন্তু বিজ্ঞানের ভাষায় আগুন কোনো বস্তু নয়, বরং এটি একটি রাসায়নিক বিক্রিয়ার দৃশ্যমান রূপ যে কোনো কিছু জ্বলছে, তার অণুগুলো বাতাসের অক্সিজেনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাপ আলো তৈরি করছে। এই পুরো প্রক্রিয়াকে বলে দহন (Combustion)

    দহনের ত্রিভুজ

    আগুন জ্বলতে তিনটি জিনিস একসাথে প্রয়োজন হয়:

    ·         জ্বালানি (Fuel): যা জ্বলবে, যেমন কাঠ, গ্যাস, তেল

    ·         অক্সিজেন বা জারক (Oxidizer): যে অক্সিজেন সরবরাহ করে দহন চালু রাখে

    ·         তাপ (Heat): যে তাপমাত্রা দহন শুরু করতে বজায় রাখতে প্রয়োজন

    এই তিনটি উপাদানকে একসঙ্গে "ফায়ার ট্রায়াঙ্গেল" বা অগ্নি ত্রিভুজ বলা হয়। এগুলোর কোনো একটি সরিয়ে দিলে আগুন নিভে যায়। পানিতে আগুন নেভানোর কারণ পানি তাপ শোষণ করে এবং জ্বালানিকে অক্সিজেন থেকে আলাদা করে

    শিখা কী?

    শিখা হল আগুনের দৃশ্যমান অংশ, যেখানে গ্যাসীয় জ্বালানি জ্বলছে। সাধারণত কাঠ বা মোমবাতি জ্বালালে যে হলুদ-কমলা অংশ দেখা যায়, তা হল অসম্পূর্ণ দহনের ফল। সেখানে কার্বনের ক্ষুদ্র কণা (যাকে "সুট" বা কালি বলে) উত্তপ্ত হয়ে আলো ছড়ায়

    আগুনের রং কেন বদলায়: এক রঙিন রহস্য

    আগুনের রং দেখে বোঝা যায় কী জ্বলছেএবং কতটা গরম হয়ে জ্বলছে। এটি পদার্থবিজ্ঞান রসায়নের যৌথ খেলা

    ১. তাপমাত্রার উপর নির্ভর করে রং

    তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে আগুনের রং বদলায়:

    ·         লাল: ৫০০-৮০০°C

    ·         কমলা: ৮০০-১১০০°C

    ·         হলুদ: ১১০০-১৩০০°C

    ·         সাদা: ১৩০০-১৫০০°C

    ·         নীল: ১৫০০°C-এর উপরে

    মোমবাতির শিখার বাইরের অংশ নীলচে আর ভেতরের অংশ হলুদ-কমলা হয়। বাইরের অংশে বেশি অক্সিজেন থাকায় সম্পূর্ণ দহন হয় তাপমাত্রা বেশি থাকে, তাই নীল রং দেখা যায়

    ২. রাসায়নিক উপাদানের প্রভাব: ফ্লেম টেস্ট

    কোন ধাতু বা যৌগ জ্বলছে, তার উপর ভিত্তি করেও শিখার রং বদলায়। একে বলে "ফ্লেম টেস্ট" ল্যাবে কোনো অজানা পদার্থে কী মৌল আছে, তা আগুনে পুড়িয়ে দেখার পদ্ধতি এটাই

    ·         সোডিয়াম: হলুদ (রাস্তার সোডিয়াম বাতির মতো)

    ·         পটাসিয়াম: বেগুনি

    ·         কপার (তামা): সবুজ বা নীল-সবুজ

    ·         লিথিয়াম: লাল

    ·         স্ট্রনশিয়াম: গাঢ় লাল

    ·         বেরিয়াম: আপেল-সবুজ

    ·         ক্যালসিয়াম: ইটের মতো কমলা-লাল

    ·         বোরন: সবুজ

    আতশবাজিতে যে রং-বেরঙের বিস্ফোরণ দেখা যায়, তা মূলত বিভিন্ন ধাতব যৌগের ফ্লেম টেস্টের ফল। আতশবাজির নকশায় স্ট্রনশিয়াম দেয় লাল, বেরিয়াম দেয় সবুজ, তামা দেয় নীলএইভাবে রং মেশানো হয়

    ৩. অসম্পূর্ণ বনাম সম্পূর্ণ দহন

    অসম্পূর্ণ দহনে কার্বন মনোক্সাইড আর সূক্ষ্ম কার্বন কণা তৈরি হয়, যা উত্তপ্ত হয়ে হলুদ-কমলা আভা দেয়। সম্পূর্ণ দহনে কার্বন ডাই-অক্সাইড পানি তৈরি হয়, আর তখন শিখা নীল দেখায়। রান্নাঘরের গ্যাসের চুলায় নীল আগুন দেখা যায়, কারণ সেখানে সম্পূর্ণ দহন হয়

    অক্সিজেন ছাড়া আগুন জ্বলে না: সত্যি না মিথ্যা?

    এখন আসি সবচেয়ে মজার প্রশ্নে। শৈশব থেকে আমরা শুনে আসছি: "অক্সিজেন থাকলে আগুন জ্বলে।" মানে মনে করা হয়, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে থাকা O₂ গ্যাসই একমাত্র জিনিস যা আগুন জ্বলতে সাহায্য করে

    কিন্তু এই ধারণা আংশিক সত্যসম্পূর্ণ সত্য নয়। অক্সিজেন ছাড়া আগুন জ্বলা অসম্ভব নয়, এবং তা প্রকৃতিতেও ঘটে

    অক্সিজেন নয়, "জারক" দরকার

    আগুন জ্বলতে আসলে অক্সিজেন নয়, বরং প্রয়োজন একটি জারক পদার্থ (Oxidizer) অক্সিজেন পৃথিবীতে সবচেয়ে সহজলভ্য জারক বলেই আমরা তাকেই চিনি। কিন্তু জারক হিসেবে আরও অনেক কিছু কাজ করতে পারে। নিচে তার প্রমাণ:

    ১. ক্লোরিন গ্যাসে আগুন

    ক্লোরিন একটি শক্তিশালী জারক। আপনি যদি জ্বলন্ত মোমবাতি ক্লোরিন গ্যাস ভর্তি পাত্রে ঢোকান, তাহলে মোমবাতি জ্বলতে থাকবেএবং ঘন কালো ধোঁয়া তৈরি করবে। কারণ ক্লোরিন মোমের হাইড্রোজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে হাইড্রোজেন ক্লোরাইড তৈরি করে, আর কার্বন মুক্ত হয় ধোঁয়া হিসেবে। পুরো প্রক্রিয়ায় অক্সিজেনের কোনো ভূমিকা নেই

    ২. ফ্লুরিন: অক্সিজেনের চেয়েও ভয়ংকর

    ফ্লুরিন গ্যাস অক্সিজেনের চেয়েও বেশি তীব্র জারক। এটি এতটাই সক্রিয় যে ইট, অ্যাসবেস্টস, এমনকি পানির সঙ্গেও জ্বলে ওঠে। পানির সঙ্গে ফ্লুরিনের বিক্রিয়ায় হাইড্রোফ্লুরিক অ্যাসিড অক্সিজেন তৈরি হয়আর সেই অক্সিজেন আবার ফ্লুরিনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে, তীব্র শিখা তৈরি করে। এখানে মূল জারক ফ্লুরিন, বাতাসের অক্সিজেন নয়

    ৩. নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডে আগুন

    নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড (NO₂) গ্যাসেও কিছু কিছু জিনিস জ্বলতে পারে। লোহিত-তপ্ত লোহার তার NO₂ গ্যাসে প্রবেশ করালে তা উজ্জ্বলভাবে জ্বলে ওঠে। এর কারণ, NO₂ সহজেই ভেঙে NO অক্সিজেন পরমাণু দিতে পারে, যা জারণ ঘটায়

    ৪. সালফার লোহার মিশ্রণ: বাতাস ছাড়াই

    গুঁড়া সালফার গুঁড়া লোহার মিশ্রণ একবার উত্তপ্ত করলে বাতাসের অনুপস্থিতিতেও প্রতিক্রিয়া চালিয়ে যায়, কারণ সালফার জারক হিসেবে কাজ করে। লোহা সালফারের বিক্রিয়ায় যে আয়রন সালফাইড তৈরি হয়, তা এতটাই তাপ ৎপন্ন করে যে পুরো মিশ্রণ লাল হয়ে ওঠেদেখে মনে হয় জ্বলছে, কিন্তু আশপাশে অক্সিজেন নেই

    ৫. পটাসিয়াম পারম্যাঙ্গানেট গ্লিসারিন

    পটাসিয়াম পারম্যাঙ্গানেট (KMnO₄) একটি শক্তিশালী জারক। এর উপর কয়েক ফোঁটা গ্লিসারিন ফেললে কিছু সেকেন্ডের মধ্যেই তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ধোঁয়া বেগুনি শিখা তৈরি হয়। এই পুরো বিক্রিয়ায় বাতাসের অক্সিজেন লাগে না, কারণ পারম্যাঙ্গানেট নিজেই অক্সিজেন সরবরাহ করে

    ৬. মহাকাশে আগুন: অক্সিজেনহীন পরিবেশ

    মহাকাশে তো বাতাস নেই, কিন্তু রকেট কীভাবে জ্বলে? রকেটের ইঞ্জিনে তরল অক্সিজেন নেওয়া হয় ঠিকই, তবে কিছু বিশেষ রকেট জ্বালানি জারক যুগলের মিশ্রণ এমনভাবে ডিজাইন করা হয় যে তারা প্রয়োজনীয় অক্সিজেন নিজেরাই বহন করে। মনোপ্রপেলান্ট জাতীয় রকেট জ্বালানি (যেমন হাইড্রাজিন) বাইরের কোনো অক্সিজেন ছাড়াই ভেঙে পড়ে এবং গরম গ্যাস ৎপন্ন করে

    ৭. পানির নিচে আগুন: ম্যাগনেসিয়াম টর্চ

    পানির নিচে আগুন জ্বালানো যায়, ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য শোনালেও সত্যি। ম্যাগনেসিয়াম এতটাই সক্রিয় ধাতু যে, তা জ্বলতে থাকা অবস্থায় পানির অক্সিজেন ছিনিয়ে নিতে পারে। পানির অণু (H₂O) ভেঙে হাইড্রোজেন মুক্ত হয় এবং সেই হাইড্রোজেন আবার জ্বলে। ম্যাগনেসিয়াম টর্চ জলের তলায় জ্বলতে পারে এবং পানির মধ্যেই থাকা অক্সিজেন ব্যবহার করে

    কেন আমাদের মনে হয় "শুধু অক্সিজেনেই আগুন জ্বলে"?

    পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রায় ২১% অক্সিজেন আছে। লাখো বছর ধরে মানুষ এই বায়ুমণ্ডলেই আগুন জ্বালিয়ে এসেছে। ফলে আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে: আগুন = বাতাসের অক্সিজেন

    অন্য জারকের সঙ্গে আগুনের দেখা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ঘটে না বলেই অক্সিজেনকে আগুনের একমাত্র 'খাদ্য' ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি

    বিভিন্ন সংস্কৃতি ইতিহাসে আগুন

    গ্রিক পুরাণে প্রমিথিউস

    গ্রিক পুরাণে টাইটান প্রমিথিউস দেবতাদের কাছ থেকে আগুন চুরি করে মানুষকে দেন। এর জন্য তাঁকে কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হয়। এই পুরাণ আগুনকে জ্ঞান সভ্যতার প্রতীক হিসেবে দেখায়

    হিন্দু ধর্মে অগ্নিদেব

    হিন্দু ধর্মে অগ্নি একজন দেবতা, যিনি দেবতা মানুষের মধ্যে বার্তাবহ। যজ্ঞের আগুনে আহুতি দেওয়া হয়, অগ্নি সে আহুতি দেবতাদের পৌঁছে দেন বলে বিশ্বাস করা হয়। এটি অগ্নির পবিত্রতা রূপান্তর ক্ষমতার প্রতি শ্রদ্ধা

    জরথুস্ত্রবাদ

    জরথুস্ত্রীয় ধর্মে আগুন অত্যন্ত পবিত্র। অগ্নি মন্দিরে অনির্বাণ শিখা জ্বালিয়ে রাখা হয়। অগ্নি আলো সত্যের প্রতীক, অন্ধকার মিথ্যার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের হাতিয়ার

    প্রাচীন চীন

    চীনে আগুনকে পাঁচটি মৌলিক উপাদানের একটি মনে করা হতোকাঠ, আগুন, মাটি, ধাতু, পানি। এই পাঁচটি উপাদান পরস্পরকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং সৃষ্টির ভিত্তি গঠন করে

    আগুনের ধরন কিছু অদ্ভুত আগুন

    শীতল আগুন (Cool Fire)

    সব আগুন গরম হয় না! কিছু রাসায়নিক বিক্রিয়ায় আগুনের মতো শিখা দেখা যায়, কিন্তু তা স্পর্শ করলে হাত পোড়ে না। সাধারণত নির্দিষ্ট ধরনের এস্টার বা অ্যালকোহলের বাষ্পের সঙ্গে অনুঘটক মিশিয়ে এই "শীতল আগুন" তৈরি করা যায়। বিজ্ঞান মেলায় এটি জনপ্রিয় প্রদর্শনী

    সবুজ আগুন

    তামা বা বোরনের যৌগ পোড়ালে সবুজ শিখা তৈরি হয়। ক্যাম্প ফায়ারে পুরনো পামগাছের কাঠ বা নির্দিষ্ট রাসায়নিক পাউডার ছিটিয়ে দিলে সেই আগুন সবুজ হয়ে জ্বলতে দেখা যায়

    কালো আগুন

    সোডিয়াম বাতি হলুদ আলো দেয়। যদি সেই আলোর সামনে আরেকটি সোডিয়াম বাতি জ্বালানো হয় খুব নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যে, তখন আলোতে শিখা দেখা যায় না—"কালো আগুন" তৈরি হয়। এটি আসলে অপটিক্যাল ইলুশন, কিন্তু দেখতে অসাধারণ

    মানুষের শরীরে আগুন: স্পন্টেনিয়াস হিউম্যান কম্বাশন

    এটি বিতর্কিত এক ঘটনা, যেখানে মানুষ কোনো বাহ্যিক ৎস ছাড়াই আপাতদৃষ্টিতে জ্বলে ওঠেন বলে দাবি করা হয়। বিজ্ঞান এটিকে সন্দেহের চোখে দেখে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, বাইরের কোনো আগুন (সিগারেট, মোমবাতি) থেকেই এই অগ্নিকাণ্ড শুরু হয়, আর শরীরের চর্বি "মোমবাতির মোমের" মতো কাজ করেযাকে বলে "উইক ইফেক্ট" তবে রহস্য পুরোপুরি কাটেনি

    অক্সিজেন ছাড়া আগুন: আরও কিছু চমকপ্রদ উদাহরণ

    থার্মাইট বিক্রিয়া

    থার্মাইট হল অ্যালুমিনিয়াম গুঁড়া লোহার অক্সাইডের মিশ্রণ। একবার শুরু করলে এই মিশ্রণটি এত তীব্র তাপ ৎপন্ন করে যে লোহা গলে যায়কিন্তু পুরো বিক্রিয়ায় বাইরের কোনো অক্সিজেনের প্রয়োজন হয় না। কারণ লোহার অক্সাইড নিজেই অক্সিজেন জোগায়। রেললাইনের জোড়া লাগানো থেকে সামরিক অস্ত্রথার্মাইটের ব্যবহার বহুমুখী

    ক্লোরিন ট্রাইফ্লুরাইড

    ক্লোরিন ট্রাইফ্লুরাইড (ClF₃) এতটাই ভয়ংকর জারক যে অ্যাসবেস্টস, বালি, এমনকি কংক্রিটও এর সংস্পর্শে জ্বলে ওঠে। এটি রাখতে হয় বিশেষ ধাতব পাত্রে, যার গায়ে ধাতব ফ্লুরাইডের প্রলেপ থাকে যাতে জারিত হয়ে আর প্রতিক্রিয়া না করতে পারে। নাৎসি জার্মানি একে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করেছিল, কিন্তু এত ভয়ানক অনিয়ন্ত্রিত হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি

    ডাইঅক্সিজেন ডাইফ্লুরাইড (FOOF)

    রসায়নবিদেরা আড়ালে-আবডালে একে বলেন "শয়তানের জিনিস" ডাইঅক্সিজেন ডাইফ্লুরাইড প্রায় সব কিছুর সঙ্গেই বিষ্ফোরক প্রতিক্রিয়া করে। -১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও এটি বরফের সঙ্গে বিস্ফোরিত হয়। এই যৌগে অক্সিজেন ফ্লুরিন একসঙ্গে থাকেজারণ ক্ষমতা এতটাই চরম যে সাধারণ পদার্থগুলো এর সামনে জ্বালানি মনে হয়

    আগুনের প্রকারভেদ: ক্লাস , বি, সি, ডি, কে

    বিভিন্ন ধরনের আগুন নেভানোর পদ্ধতি ভিন্ন হয়। এজন্য আগুনকে শ্রেণিবিভাগ করা হয়েছে:

    ·         ক্লাস : কাঠ, কাগজ, কাপড়ের মতো সাধারণ দাহ্য পদার্থ

    ·         ক্লাস বি: তারল্য জ্বালানিপেট্রোল, তেল, রং

    ·         ক্লাস সি: বৈদ্যুতিক সরঞ্জামে আগুন

    ·         ক্লাস ডি: দাহ্য ধাতুম্যাগনেসিয়াম, সোডিয়াম

    ·         ক্লাস কে: রান্নার তেল-চর্বির আগুন

    পানি দিয়ে ক্লাস বি বা ক্লাস ডি আগুন নেভানো ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনতে পারে। রান্নার তেলে পানি ফেললে আগুন আরও ভয়াবহ হয়কারণ পানি তেলে ডুবে গিয়ে হঠা বাষ্প হয়ে তেল ছড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে ম্যাগনেসিয়ামের আগুনে পানি দিলে পানি ভেঙে হাইড্রোজেন তৈরি হয়, আর বিষ্ফোরণ ঘটে

    আগুনের বিজ্ঞান: প্লাজমা শিখার ভেতরের গঠন

    আগুন আসলে প্লাজমা?

    প্লাজমা হল পদার্থের চতুর্থ অবস্থাকঠিন, তরল, গ্যাসের পর। এটি আয়নিত গ্যাসের সমাহার। উচ্চ তাপমাত্রার আগুনে গ্যাস আয়নিত হয়ে প্লাজমা তৈরি করে। কিন্তু আমরা যে সাধারণ মোমবাতির আগুন দেখি, তা পুরোপুরি প্লাজমা নয়আংশিক আয়নিত গ্যাস বলা যায়

    শিখার গঠন: একাধিক স্তর

    একটি মোমবাতির শিখার তিনটি প্রধান স্তর থাকে:

    ·         অন্তঃস্থল: সবচেয়ে ভেতরের অন্ধকার অংশ, যেখানে মোম বাষ্পীভূত হয় কিন্তু দহন ঘটছে না

    ·         মধ্যস্থল: হলুদ-কমলা অংশ, অসম্পূর্ণ দহনের জায়গা, কার্বন কণা উত্তপ্ত হয়ে জ্বলছে

    ·         বহিঃস্থল: নীলচে অংশ, সম্পূর্ণ দহনের অঞ্চল, সর্বোচ্চ তাপমাত্রা

    আগুন নিয়ে কিছু মিথ সত্য

    মিথ ১: "প্রাচীনকালে পাথর ঘষে আগুন জ্বালানো হতো"

    এটা পুরোপুরি সঠিক নয়। পাথর ঘষলে স্ফুলিঙ্গ হয়, কিন্তু আগুন ধরাতে দরকার বিশেষ ধরনের পাথরযেমন ফ্লিন্ট পাইরাইট। সাধারণ পাথরে ঘষলে কিছুই হবে না

    মিথ ২: "গ্যাসোলিন আগুন জ্বালায়, কিন্তু ডিজেল জ্বালায় না"

    এটা আধা-সত্যি। গ্যাসোলিন কম তাপমাত্রায় বাষ্পীভূত হয় সহজে আগুন ধরে, ডিজেলের ফ্ল্যাশ পয়েন্ট অনেক বেশি। কিন্তু গরম করলে ডিজেলও জ্বলে ওঠে

    মিথ ৩: "আগুন অক্সিজেন 'খায়'"

    আগুন অক্সিজেন খায় না, অক্সিজেনের সঙ্গে অন্য অণুর বিক্রিয়া ঘটায়। রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অক্সিজেন অণু জ্বালানি অণুর সঙ্গে বন্ধন তৈরি করে আর তাপ-আলো ছাড়ে

    অক্সিজেন আর জ্বলন: সম্পর্কটা ঠিক কী?

    অক্সিজেন অণু (O₂) আসলে বেশ স্থিতিশীল। খোলা বাতাসে কাঠ ফেলে রাখলে কিছু হয় না। কিন্তু তাপ প্রয়োগ করলে অক্সিজেনের বন্ধন ভাঙতে ৎসাহিত হয়, তখন জারণ বিক্রিয়া শুরু হয়। অক্সিজেনের ভূমিকা হল ইলেকট্রন গ্রহণ করা, জ্বালানি ইলেকট্রন ছাড়ে। এই ইলেকট্রনের আদান-প্রদানই বিপুল তাপ ৎপন্ন করে

    ফ্লুরিন বা ক্লোরিনও ইলেকট্রন গ্রহণ করতে পারেএবং অনেক সময় অক্সিজেনের চেয়েও আগ্রাসীভাবে। তাই তো তারা অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতেও আগুন জ্বালাতে পারে

    আগুন পরিবেশ: দহনের অন্ধকার দিক

    আগুন শক্তি দেয়, কিন্তু পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকর। বিশেষত, জীবাশ্ম জ্বালানির দহন থেকে বিপুল পরিমাণে CO₂ নির্গত হয়, যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ। এছাড়া অসম্পূর্ণ দহন থেকে কার্বণ মনোক্সাইড (CO), নাইট্রোজেন অক্সাইড (NOx), সালফার ডাই-অক্সাইডের মতো ক্ষতিকর গ্যাসও তৈরি হয়

    বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা এখন দহন বিকল্প নিয়ে কাজ করছেনহাইড্রোজেন জ্বালানি, বৈদ্যুতিক শক্তি, সৌরচুল্লি ইত্যাদি, যেখানে আগুন জ্বালাতে হবে না। কিন্তু এখনো রকেট থেকে রান্নাঘরআগুন আমাদের জীবনের অংশ হয়েই আছে

    ভবিষ্যতের আগুন: আরও পরিচ্ছন্ন, আরও নিয়ন্ত্রিত

    বিজ্ঞানীরা এমন গ্যাস টারবাইন ইঞ্জিন বানাচ্ছেন যেখানে দহন তাপমাত্রা অক্সিজেন সরবরাহ নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করে দূষণ শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে আনা যায়। "প্লাজমা-অ্যাসিস্টেড কম্বাশন" প্রযুক্তি আগুনের শিখা নিয়ন্ত্রণের এক বৈপ্লবিক উপায়, যেখানে ইলেকট্রিক ফিল্ড দিয়ে শিখার গঠন পরিবর্তন করা যায়

    আর সুদূর ভবিষ্যতের কথা বললে, যদি মানবজাতি কখনো টাইটান (শনির চাঁদ) বা অন্য কোনো গ্রহে উপনিবেশ স্থাপন করে যেখানে অক্সিজেন বায়ুমণ্ডল নেই, তখন তারা ফ্লুরিন-ভিত্তিক বা অন্য জারক-ভিত্তিক আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে শিখবে। আগুনের সংজ্ঞাই তখন নতুন করে লিখতে হবে

    আগুন আমাদের সবচেয়ে পুরনো বন্ধু, তবু এখনো তার চরিত্র পুরোপুরি বোঝা শেষ হয়নি আমাদের। সাধারণ দৃষ্টিতে আগুন সরলজ্বালানি জ্বালাও, ধরে যাবে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে আগুন এক জটিল নৃত্য: ইলেকট্রনের, ফোটনের, উত্তপ্ত গ্যাসের, প্লাজমার

    আমরা জেনেছি, আগুন কোনো বস্তু নয়, একটি প্রক্রিয়া। তার রঙের খেলা শুধু সুন্দরই নয়সে বলে দেয় তাপমাত্রার কথা, জ্বালানির পরিচয়। আর সবচেয়ে বড় চমক: অক্সিজেন ছাড়াও আগুন জ্বলতে পারে। ফ্লুরিন, ক্লোরিন, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডএরা সবাই আগুনের খোরাক হতে পারে। বাস্তবে আগুনের জন্য "জারক" দরকার, অক্সিজেন শুধুই সেই জারকের একটিপৃথিবীতে সহজলভ্য

    হাজার বছরের ইতিহাস, পুরাণ, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞানসব কেমন এক সুতোয় গাঁথা এই সাধারণ আগুনকে ঘিরে। বিজ্ঞান যতই এগোবে, আমরা হয়তো আরও চমকপ্রদ সব জারক আর অদ্ভুত সব শিখার সন্ধান পাবো। কিন্তু আগুনের প্রতি মানুষের যে আদিম মুগ্ধতা, সেটা বোধহয় কখনো নেভাবে না 

    একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

    নবীনতর পূর্বতন

    نموذج الاتصال