কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি

    হিউম্যান এনাটমি

    আপনার শরীরই এই মুহূর্তে এক মহাবিশ্ব ৩৭ ট্রিলিয়নেরও বেশি কোষ মিলে তৈরি এক সুশৃঙ্খল, স্বয়ংক্রিয়, জীবন্ত যন্ত্রযার প্রতিটি অংশ এক আশ্চর্য নকশার ফসল সকালে চোখ মেলা থেকে রাতে ঘুমিয়ে পড়া পর্যন্ত এই দেহ অবিরাম কাজ করে চলে, অথচ আমরা এর ভেতরকার জগ সম্পর্কে কতটুকুই বা জানি?

    হিউম্যান এনাটমি

    হিউম্যান এনাটমি বা মানব শারীরস্থান হলো জীববিজ্ঞানের সেই শাখা যা মানবদেহের গঠন নিয়ে আলোচনা করে। এটা শুধু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের তালিকা নয়; বরং প্রতিটি হাড়, পেশি, স্নায়ু, রক্তনালির সুনির্দিষ্ট অবস্থান, আকৃতি আন্তঃসম্পর্ক বোঝার বিজ্ঞান। প্রাচীন মিশরের মমি সংরক্ষণ থেকে শুরু করে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ডিসেকশন স্কেচ, ভেসালিয়াসের "De Humani Corporis Fabrica" থেকে আধুনিক থ্রিডি ইমেজিংএনাটমির ইতিহাস জ্ঞান সাহসের এক রোমাঞ্চকর যাত্রা

    এই ব্লগে আমরা মানবদেহের প্রতিটি প্রধান সিস্টেম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবসহজ ভাষায়, গভীর বিশ্লেষণে। জানব কীভাবে এক অদৃশ্য নীলনকশা মেনে আমাদের দেহ তৈরি হয়েছে, আর কীভাবে সেই নকশার প্রতিটি অংশ মিলে তৈরি করছে আমাদেরএকজন চলমান, চিন্তাশীল, অনুভূতিশীল মানুষ

    এনাটমি কী কেন গুরুত্বপূর্ণ

    সংজ্ঞা পরিধি

    "Anatomy" শব্দটি গ্রিক "anatomē" থেকে এসেছে, যার অর্থ "dissection" বা কেটে দেখা। প্রাচীনকালে শবদেহ কেটেই দেহের অভ্যন্তরীণ গঠন বোঝার চেষ্টা করা হতো। আজও ডিসেকশন মেডিকেল শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ

    এনাটমি মূলত দুই ভাগে পড়ে:

    ·         গ্রস এনাটমি: খালি চোখে দেখা যায় এমন গঠন নিয়ে আলোচনা

    ·         মাইক্রোস্কোপিক এনাটমি: আণুবীক্ষণিক গঠন, যেমন হিস্টোলজি (টিস্যুর গঠন) সাইটোলজি (কোষের গঠন)

    এছাড়া আছে আঞ্চলিক এনাটমি (মাথা, বুক, পেট), সিস্টেমিক এনাটমি (কঙ্কালতন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্র), ক্লিনিক্যাল এনাটমি যা চিকিৎসার প্রয়োজনে এনাটমির ব্যবহার শেখায়

    কেন জানব এনাটমি?

    রোগ নির্ণয় থেকে শল্যচিকিৎসা, ফিজিওথেরাপি থেকে স্পোর্টস সায়েন্স, এমনকি যোগব্যায়াম সঠিকভাবে করতে হলেও এনাটমির জ্ঞান জরুরি। নিজের দেহ বোঝা মানে নিজেকে বোঝা। ব্যাথা কোথায় হচ্ছে, সেটা কী কারণেএসব বুঝতে হলে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অবস্থান সম্পর্ক জানা দরকার

    কঙ্কালতন্ত্র: দেহের স্থাপত্য কাঠামো

    মানুষের কঙ্কাল যেন এক স্থাপত্যের মাস্টারপিস। জন্মের সময় ২৭০টির মতো হাড় থাকে, কিন্তু বড় হওয়ার সাথে সাথে কিছু হাড় জোড়া লেগে প্রাপ্তবয়স্কে সংখ্যা দাঁড়ায় ২০৬-

    কঙ্কালের বিভাজন

    অ্যাক্সিয়াল কঙ্কাল (৮০টি) —দেহের কেন্দ্রীয় অক্ষ গঠন করে:

    ·         করোটি (Skull): ২২টি হাড়ে তৈরি, মস্তিষ্ককে সুরক্ষা দেয়। ম্যান্ডিবল বা নিচের চোয়ালের হাড়ই একমাত্র নড়াচড়া করতে পারে

    ·         মেরুদণ্ড (Vertebral Column): ৩৩টি কশেরুকা (ভার্টিব্রা) স্তম্ভাকারে সাজানো। C1 থেকে Coccyx পর্যন্তমেরুদণ্ডের ভেতর দিয়ে স্পাইনাল কর্ড যায়, যা স্নায়ুতন্ত্রের মহাসড়ক

    ·         পাঁজর স্টার্নাম: ১২ জোড়া পাঁজর বুকের খাঁচা তৈরি করে হৃদযন্ত্র ফুসফুসকে সুরক্ষিত রাখে

    অ্যাপেন্ডিকুলার কঙ্কাল (১২৬টি) —অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তাদের সংযোগ:

    ·         উর্ধ্বাঙ্গ: স্ক্যাপুলা, ক্ল্যাভিকল, হিউমেরাস, রেডিয়াস, আলনা, কার্পাল, মেটাকার্পাল, ফ্যালাঞ্জেস

    ·         নিম্নাঙ্গ: পেলভিস, ফিমার, প্যাটেলা, টিবিয়া, ফিবুলা, টারসাল, মেটাটারসাল, ফ্যালাঞ্জেস

    হাড়ের গঠন বিস্ময়

    হাড় শুকনো সাদা জিনিস নয়; এটি জীবন্ত টিস্যু যা সারাক্ষণ পুনর্গঠিত হয়। অস্টিওব্লাস্ট কোষ নতুন হাড় গঠন করে, অস্টিওক্লাস্ট পুরনো হাড় ভাঙে। পুরো কঙ্কাল প্রায় প্রতি ১০ বছরে একবার সম্পূর্ণ রিনিউ হয়

    হাড় আমাদের দেহের ক্যালসিয়াম ব্যাংক প্রয়োজনে রক্ত থেকে ক্যালসিয়াম নেয়, আবার জমাও করে। ফিমার বা ঊরুর হাড় মানবদেহের সবচেয়ে বড় শক্তিশালী হাড়, আর স্টেপিস (কানের ভেতর) সবচেয়ে ছোটমাত্রমিলিমিটার

    পেশিতন্ত্র: গতি শক্তির ইঞ্জিন

    শরীরে ৬০০- বেশি পেশি আছে। এরা আমাদের চলাফেরা, কথা বলা, খাবার গেলা, হৃৎস্পন্দনসবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে

    পেশির প্রকারভেদ

    ·         কঙ্কাল পেশি (Skeletal Muscle): ঐচ্ছিক, আমাদের ইচ্ছায় চলে। স্ট্রায়েটেড বা ডোরাকাটা। এরা অস্থির সাথে যুক্ত থেকে গতি সৃষ্টি করে। বাইসেপস, ট্রাইসেপস এই ধরনের উদাহরণ

    ·         মসৃণ পেশি (Smooth Muscle): অনৈচ্ছিক, আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। পাকস্থলী, অন্ত্র, রক্তনালির দেয়ালে থাকে খাদ্যনালীর পেরিস্টালসিস এদের কাজ

    ·         হৃদপেশি (Cardiac Muscle): শুধু হৃদযন্ত্রে পাওয়া যায়। স্ট্রায়েটেড কিন্তু অনৈচ্ছিক। ক্লান্তিহীনভাবে সারাজীবন সংকোচন-প্রসারণ করে

    পেশি কীভাবে কাজ করে

    পেশির মৌলিক একক সারকোমিয়ার। অ্যাক্টিন মায়োসিন ফিলামেন্ট স্লাইডিং ফিলামেন্ট থিওরি অনুযায়ী একে অপরের উপর পিছলে যায়, পেশি সংকুচিত হয়। এর জন্য দরকার ATP ক্যালসিয়াম আয়ন

    অ্যান্টাগনিস্টিক পেয়ারযেমন বাইসেপস ট্রাইসেপসএকটি সংকুচিত হলে অন্যটি প্রসারিত হয়। ফলে হাত ভাঁজা খোলা সম্ভব হয়

    স্নায়ুতন্ত্র: দেহের ইলেকট্রিক্যাল নেটওয়ার্ক

    স্নায়ুতন্ত্র আমাদের দেহের কমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক। মুহূর্তের মধ্যে সংকেত আদান-প্রদান করে এটি দেহকে এক সুসংহত সত্তা হিসেবে চালায়

    কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র (CNS)

    ·         মস্তিষ্ক (Brain): প্রায় ৮৬ বিলিয়ন নিউরনের সমন্বয়ে গঠিত। সেরিব্রাম, সেরিবেলাম, ব্রেনস্টেমপ্রতিটি অংশ আলাদা কাজ করে। ফ্রন্টাল লোব ব্যক্তিত্ব সিদ্ধান্তের, টেম্পোরাল লোব স্মৃতি শ্রবণের, অক্সিপিটাল লোব দৃষ্টির

    ·         স্পাইনাল কর্ড: মস্তিষ্ক থেকে কোমর পর্যন্ত বিস্তৃত স্নায়ুরজ্জু। রিফ্লেক্স অ্যাকশনে এটি সরাসরি সাড়া দেয়, মস্তিষ্কের অপেক্ষা করে না

    প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্র (PNS)

    ১২ জোড়া ক্রেনিয়াল নার্ভ মস্তিষ্ক থেকে বেরিয়ে মাথা ঘাড়ের অঙ্গে যায়। ৩১ জোড়া স্পাইনাল নার্ভ মেরুদণ্ড থেকে বেরিয়ে দেহের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে

    নিউরন: দেহের তার

    একটি নিউরনের গঠন তিনটি অংশে বিভক্ত: ডেনড্রাইট (সংকেত গ্রহণ), সেল বডি (প্রক্রিয়াকরণ), অ্যাক্সন (সংকেত প্রেরণ) অ্যাক্সনের চারপাশে মায়েলিন শিথ থাকে, যা বৈদ্যুতিক অন্তরক হিসেবে কাজ করে। নিউরন থেকে নিউরনে সিন্যাপস নামক ফাঁক দিয়ে নিউরোট্রান্সমিটার রাসায়নিক ছড়িয়ে সংকেত যায়

    মস্তিষ্কের প্লাস্টিসিটি বা পরিবর্তনশীলতানতুন কিছু শিখলে নতুন সিন্যাপস তৈরি হয়। মস্তিষ্ক জীবনভর বদলাতে পারে, এটি এনাটমির অন্যতম বড় চমক

    আরও পড়ুন - 

    সংবহনতন্ত্র: জীবনের নদী

    রক্ত শুধু লাল তরল নয়, এটি জীবনের বাহক। সংবহনতন্ত্র রক্তের মাধ্যমে অক্সিজেন, পুষ্টি, হরমোন, বর্জ্য পরিবহন করে

    হৃদযন্ত্র: কেন্দ্রীয় পাম্প

    হৃদপিণ্ডের ওজন গড়ে ২৫০-৩৫০ গ্রাম। এটি চার প্রকোষ্ঠে বিভক্তদুটি অ্যাট্রিয়াম দুটি ভেন্ট্রিকল। ডান পাশ ফুসফুসে রক্ত পাঠায় (পালমোনারি সার্কুলেশন), বাম পাশ সারা দেহে (সিস্টেমিক সার্কুলেশন)

    হৃদযন্ত্রের নিজস্ব পেসমেকার—SA নোডবৈদ্যুতিক তরঙ্গ তৈরি করে হৃদপেশিকে ছন্দবদ্ধভাবে সংকুচিত করায়। প্রতিদিন হৃদপিণ্ড প্রায় ১,০০,০০০ বার ধুকধুক করে, ৭,৫০০ লিটার রক্ত পাম্প করে

    রক্তনালির নেটওয়ার্ক

    ·         ধমনী (Artery): হৃদপিণ্ড থেকে অঙ্গে রক্ত নেয় (পালমোনারি ধমনী ছাড়া অক্সিজেনেটেড)

    ·         শিরা (Vein): অঙ্গ থেকে হৃদপিণ্ডে রক্ত ফেরায়

    ·         ক্যাপিলারি: এক কোষ পুরু প্রাচীরের ক্ষুদ্র নালিকা, যেখানে গ্যাস পুষ্টি বিনিময় হয়

    মানবদেহের সব রক্তনালি এক সরলরেখায় সাজালে তার দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ১,০০,০০০ কিলোমিটারপৃথিবীকে আড়াইবার পেঁচানোর সমান

    রক্তের উপাদান

    লোহিত রক্তকণিকা (অক্সিজেন পরিবহন), শ্বেত রক্তকণিকা (রোগ প্রতিরোধ), অণুচক্রিকা (রক্ত জমাট বাঁধা), এবং প্লাজমা (তরল মাধ্যম)—এই চার উপাদান মিলে রক্ত গঠিত

    শ্বসনতন্ত্র: নিঃশ্বাসের স্থাপত্য

    প্রতি মিনিটে ১২-১৬ বার আমরা শ্বাস নিই। দিনে প্রায় ২০,০০০ বার। এই নিরন্তর প্রক্রিয়ার পেছনে সুগঠিত এক অঙ্গতন্ত্র কাজ করে

    শ্বাসপথের যাত্রা

    বায়ু নাক বা মুখ দিয়ে প্রবেশ করেফ্যারিংসল্যারিংস (ভোকাল কর্ডের বাড়ি) → ট্রাকিয়া (শ্বাসনালি) → ব্রংকাইব্রংকিওলঅ্যালভিওলাই। অ্যালভিওলাই হলো কোটি কোটি ক্ষুদ্র বায়ুথলি, যেখানে গ্যাস বিনিময় ঘটে

    ফুসফুস

    দুটি ফুসফুস বুকের খাঁচায় অবস্থিত। ডান ফুসফুসে তিনটি লোব, বামে দুটি (হৃদপিণ্ডের জন্য জায়গা ছেড়ে) ফুসফুসের মোট পৃষ্ঠতল ক্ষেত্রফল প্রায় ৭০ বর্গমিটারএকটি টেনিস কোর্টের সমান!

    ডায়াফ্রাম শ্বাসক্রিয়া

    শ্বাস নেওয়ার সময় ডায়াফ্রাম নিচে নামে, বুকের আয়তন বাড়ে, বায়ু ঢোকে। নিঃশ্বাস ছাড়ার সময় ডায়াফ্রাম উপরে ওঠে। এটি অনৈচ্ছিক কিন্তু ইচ্ছাকৃত নিয়ন্ত্রণও সম্ভবগান গাওয়া বা ডুব দেওয়ার সময় যেমন

    পরিপাকতন্ত্র: খাদ্য থেকে শক্তি

    পরিপাকতন্ত্র মুখ থেকে মলদ্বার পর্যন্ত প্রায়মিটার দীর্ঘ একটি নল, যা খাদ্য ভেঙে পুষ্টি শোষণ করে

    মুখ অন্ননালি

    মুখে দাঁত লালারস পরিপাক শুরু করে। টায়ালিন এনজাইম শ্বেতসার ভাঙতে শুরু করে। খাদ্য বলস হিসেবে অন্ননালি দিয়ে পেরিস্টালসিস আন্দোলনে নিচে নামে

    পাকস্থলী

    J-আকৃতির এই থলিতে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড পেপসিন প্রোটিন হজম শুরু করে। pH হতে পারে ১.৫-২.০ পাকস্থলীর দেয়াল মিউকাস স্তরে ঢাকা, নাহলে এই অ্যাসিড পাকস্থলী নিজেই হজম করে ফেলত

    ক্ষুদ্রান্ত্র

    প্রায়মিটার দীর্ঘ, তিন ভাগে বিভক্ত: ডিওডেনাম, জেজুনাম, ইলিয়াম। এখানে অগ্ন্যাশয়ের এনজাইম, পিত্ত, অন্ত্রীয় রসের সহায়তায় পূর্ণ পরিপাক ঘটে এবং ভিলাই নামক অঙ্গুলিসদৃশ অভিক্ষেপ পুষ্টি শোষণ করে

    বৃহদান্ত্র মলত্যাগ

    বৃহদান্ত্রে পানি লবণ শোষিত হয়। এখানে কোটি কোটি ব্যাকটেরিয়া (গাট মাইক্রোবায়োটা) বাস করে, যারা ভিটামিন সংশ্লেষণসহ নানাভাবে দেহকে সাহায্য করে

    রেচনতন্ত্র: দেহের পিউরিফায়ার

    কিডনি হলো দেহের ফিল্টার। প্রতিদিন প্রায় ১৮০ লিটার রক্ত ফিল্টার করে ১-১.৫ লিটার ইউরিন তৈরি করে

    আরও পড়ুন - মানুষের বুদ্ধিমত্ত্বার সীমা কোথায়?

    কিডনির গঠন

    দুটি শিমআকৃতির অঙ্গ। প্রতিটিতে প্রায় ১০ লক্ষ নেফ্রন থাকেএটাই কিডনির কার্যকরী একক। গ্লোমেরুলাসে রক্ত ফিল্টার হয়, টিউব্যুলে প্রয়োজনীয় জিনিস পুনঃশোষিত হয়

    মূত্রনালি মূত্রথলি

    ইউরেটার নামক সরু নল মূত্র কিডনি থেকে মূত্রথলিতে আনে। ইউরেথ্রা দিয়ে দেহের বাইরে নিষ্কাশিত হয়। পুরুষের ইউরেথ্রা প্রায় ২০ সেমি, নারীর মাত্রসেমিএই গঠনগত পার্থক্যের কারণে নারীরা মূত্রনালির সংক্রমণে বেশি ভোগেন

    ত্বকও রেচন অঙ্গ

    ত্বকের ঘর্মগ্রন্থি থেকে ঘাম নির্গত হয়ে তাপ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কিছু বর্জ্যও নিষ্কাশন করে

    অন্তঃক্ষরা গ্রন্থিতন্ত্র: হরমোনের রসায়ন

    হরমোন দেহের রাসায়নিক বার্তাবাহক। অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হয়ে রক্তের মাধ্যমে দূরবর্তী অঙ্গে গিয়ে কাজ করে

    প্রধান গ্রন্থিসমূহ

    ·         পিটুইটারি: "মাস্টার গ্ল্যান্ড"—মটরদানার আকার, কিন্তু বৃদ্ধি, প্রজনন, বিপাকসহ বহু কাজ নিয়ন্ত্রণ করে

    ·         থাইরয়েড: গলার সামনে, বিপাকের গতি নির্ধারণ করে

    ·         অ্যাড্রিনাল: কিডনির উপরে, স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল অ্যাড্রিনালিন নিঃসরণ

    ·         অগ্ন্যাশয়: ইনসুলিন গ্লুকাগন রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ

    ·         জনন গ্রন্থি: ডিম্বাশয় (ইস্ট্রোজেন, প্রজেস্টেরন) শুক্রাশয় (টেস্টোস্টেরন)

    হরমোনের সামান্য তারতম্যও বিশাল প্রভাব ফেলে। হাইপোথাইরয়েডিজম থেকে শুরু করে ডায়াবেটিসসবই হরমোনের ভারসাম্যহীনতা

    রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা: দেহের সেনাবাহিনী

    আমাদের দেহ প্রতি মুহূর্তে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ফাঙ্গাসের আক্রমণ প্রতিরোধ করছে। ইমিউন সিস্টেম সে যুদ্ধের ফ্রন্টলাইন

    লিম্ফ্যাটিক সিস্টেম

    লসিকানালির জাল, লসিকাগ্রন্থি, প্লীহা, টনসিল, থাইমাসএগুলো ইমিউন সিস্টেমের অংশ। লিম্ফ নোডগুলো ফিল্টার স্টেশনের মত, যেখানে ক্ষতিকর বস্তু আটকে যায়। ঠাণ্ডা লাগলে গলার গ্ল্যান্ড ফুলে ওঠার কারণ এটাই

    শ্বেত রক্তকণিকার বাহিনী

    ·         নিউট্রোফিল: প্রথম প্রতিরক্ষা, ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে

    ·         লিম্ফোসাইট: B-কোষ অ্যান্টিবডি তৈরি, T-কোষ সরাসরি আক্রমণ

    ·         ম্যাক্রোফেজ: বড় খাদক, প্যাথোজেন গিলে ফেলে

    ·         মেমোরি সেল: একই রোগজীবাণু আবার এলে দ্রুত সাড়া দেয়ভ্যাকসিনের মূলনীতি

    প্রজননতন্ত্র: প্রজাতির ধারাবাহিকতা

    পুরুষ প্রজননতন্ত্র

    শুক্রাশয়, এপিডিডাইমিস, ভাস ডিফারেন্স, সেমিনাল ভেসিকল, প্রোস্টেট, পেনিস। শুক্রাণু ৎপাদন স্ক্রোটাম নামক বহিঃস্থ থলিতে হয়, কারণ শুক্রাণু তৈরির জন্য দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে ২-৩ ডিগ্রি কম তাপমাত্রা প্রয়োজন

    নারী প্রজননতন্ত্র

    ডিম্বাশয়, ফ্যালোপিয়ান টিউব, জরায়ু, যোনি। নারী জন্মের সময়েই সব ডিম্বাণু নিয়ে জন্মায়জন্মকালে প্রায় ২০ লাখ, বয়ঃসন্ধিতে ৩-৪ লক্ষে নেমে আসে। জরায়ুতে এন্ডোমেট্রিয়াম প্রতি মাসে তৈরি হয়, গর্ভধারণ না হলে মাসিকের মাধ্যমে ঝরে যায়

    ইন্দ্রিয়তন্ত্র: পৃথিবীকে বোঝার জানালা

    দৃষ্টি

    চোখ ফটো ক্যামেরার মতো। কর্নিয়া লেন্স আলো ফোকাস করে রেটিনায়। রেটিনার রড কোষ (আলো-আঁধার) কোন কোষ (রং) আলোকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর করে, যা অপটিক নার্ভ দিয়ে মস্তিষ্কে যায়। মানুষের চোখ প্রায়কোটি রং পার্থক্য করতে পারে

    শ্রবণ ভারসাম্য

    বহিঃকর্ণ শব্দ সংগ্রহ করে, মধ্যকর্ণের তিনটি অস্থি (ম্যালিয়াস, ইনকাস, স্টেপিস) শব্দতরঙ্গকে পরিবর্ধিত করে, অন্তঃকর্ণের ককলিয়া সেই কম্পনকে স্নায়ুসংকেতে বদলে মস্তিষ্কে পাঠায়। ভেস্টিবুলার সিস্টেম ভারসাম্য রক্ষা করে

    ঘ্রাণ, স্বাদ, স্পর্শ

    নাকে ৪০০ ধরনের ঘ্রাণ রিসেপ্টরট্রিলিয়নেরও বেশি গন্ধ পার্থক্য করতে পারে। জিহ্বার স্বাদকোরক পাঁচটি মৌলিক স্বাদ চেনে। ত্বকের অজস্র রিসেপ্টর স্পর্শ, চাপ, তাপ, শীতলতা, ব্যথাসব আলাদাভাবে শনাক্ত করে

    ইন্টিগুমেন্টারি সিস্টেম: ত্বক, চুল, নখ

    ত্বক দেহের সবচেয়ে বড় অঙ্গপ্রাপ্তবয়স্কে ক্ষেত্রফল প্রায়বর্গমিটার, ওজন প্রায় ৩.৫-৪ কেজি। তিনটি স্তর:

    ·         এপিডার্মিস: বাইরের স্তর, মেলানোসাইট কোষ মেলানিন তৈরি করে যা ত্বকের রং নির্ধারণ করে UV রশ্মি থেকে রক্ষা করে

    ·         ডার্মিস: রক্তনালি, স্নায়ুপ্রান্ত, ঘর্মগ্রন্থি, সেবাসিয়াস গ্রন্থি, চুলের গোড়াসব এখানে। কোলাজেন ইলাস্টিন ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা দেয়

    ·         হাইপোডার্মিস: চর্বির স্তর, অন্তরক হিসেবে কাজ করে, শক্তি সঞ্চয় করে

    ত্বক প্রতি ২৮ দিনে সম্পূর্ণ নবায়িত হয়। ধূলোয় যে মৃত চামড়া পাওয়া যায়, তার বেশির ভাগই আমাদের নিজেদের

    চিকিৎসা প্রযুক্তিতে এনাটমির ব্যবহার

    ইমেজিং টেকনোলজি

    আধুনিক এনাটমি আর শুধু ছুরি-কাঁচির বিষয় নয়। এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, এমআরআই, আলট্রাসাউন্ড, পিইটি স্ক্যানের মাধ্যমে দেহ না কেটেই ভেতরকার গঠন দেখা সম্ভব। সার্জন রোবটিক সার্জারির আগে থ্রিডি রিকনস্ট্রাকশন দেখে পরিকল্পনা করেন

    প্রস্থেটিক্স বায়োনিক্স

    এনাটমির জ্ঞান ছাড়া কৃত্রিম হাত-পা বানানো অসম্ভব। আধুনিক বায়োনিক লিম্ব স্নায়ুর সংকেত পড়তে পারে, মস্তিষ্কের আদেশে নড়াচড়া করে। অঙ্গ প্রতিস্থাপনে এনাটমিকাল কম্পাটিবিলিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ

    ফরেনসিক এনাটমি

    অপরাধ তদন্তে কঙ্কাল বা দেহাবশেষ দেখে ব্যক্তির বয়স, লিঙ্গ, উচ্চতা, এমনকি মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ করা যায় ফরেনসিক এনাটমিস্টরা

    এনাটমি শেখার উপায়: আধুনিক পদ্ধতি

    শুধু বই পড়ে এনাটমি শেখা কঠিন। থ্রিডি অ্যাপ (Complete Anatomy, Visible Body), এনাটমিকাল মডেল, অগমেন্টেড রিয়েলিটি, ডিসেকশন ভিডিওএই সমস্ত আধুনিক মাধ্যমে এখন এনাটমি শেখা আরও সহজ আকর্ষণীয় হয়েছে

    মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য বডি ডোনেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যারা মৃত্যুর পর দেহ দান করেন, তাঁরা নীরবে হয়ে ওঠেন হাজারো শিক্ষার্থীর প্রথম শিক্ষক। এনাটমি ল্যাবে কৃতজ্ঞতা সম্মানের আবহ সবসময় বজায় থাকে

    কিছু বিস্ময়কর তথ্য

    1.      সবচেয়ে বড় কোষ: নারীর ডিম্বাণু (Ovum), খালি চোখে দেখা যায়

    2.      সবচেয়ে ছোট কোষ: পুরুষের শুক্রাণু

    3.      দীর্ঘতম হাড়: ফিমার (উরুর হাড়)

    4.      ক্ষুদ্রতম হাড়: স্টেপিস (কানের ভেতর)

    5.      শক্তিশালী পেশি (ওজন অনুপাতে): ম্যাসেটার (চোয়ালের পেশি)

    6.      দীর্ঘতম স্নায়ু: সায়াটিক নার্ভ (কোমর থেকে পা পর্যন্ত)

    7.      লিভার একমাত্র অঙ্গ যা পুনরায় বৃদ্ধি পেতে পারে

    8.      পাকস্থলীর আস্তরণ প্রতি ৩-৪ দিনে সম্পূর্ণ বদলে যায়

    9.      কর্নিয়া একমাত্র টিস্যু যেখানে রক্তনালি নেই

    10. মস্তিষ্ক নিজে ব্যথা অনুভব করে নামাথাব্যথা আসে মেনিনজেস বা রক্তনালি থেকে

    হিউম্যান এনাটমি কেবল বিজ্ঞান নয়, এটি শিল্পও বটে। মানবদেহের প্রতিটি অংশ একে অপরের সাথে এমন সুসমঞ্জসে তৈরি যে, একটি অংশের অনুপস্থিতি বা বিকলতা পুরো সিস্টেমকে প্রভাবিত করে। অথচ আমরা রোজ সকালে উঠে এই মহাব্যবস্থাকে বিনা ভাড়ায় ব্যবহার করছি, অধিকাংশ সময় কোনো কৃতজ্ঞতা ছাড়াই

    আমাদের প্রতিটি হৃৎস্পন্দন, প্রতিটি নিঃশ্বাস, প্রতিটি ভাবনাসবকিছুর পেছনে কাজ করছে হাজারো অঙ্গ, টিস্যু, কোষ, অণু। তাদের যৌথ সহযোগিতার ফসল এই "আমি" নামের সত্তা। এনাটমি জানা মানে নিজেকে জানা। নিজেকে জানা মানে নিজের যত্ন নিতে শেখা। কারণ এই দেহই আমাদের একমাত্র বাড়িএটিকে বোঝার আগে আমরা আসলে নিজেদেরই বুঝিনি

    লিওনার্দো দা ভিঞ্চি বলেছিলেন, "The human foot is a masterpiece of engineering and a work of art." এই উক্তি পুরো মানবদেহের জন্যই সত্য। আমরা হাঁটছি, দৌড়াচ্ছি, নাচছি, গান গাইছিসবই সম্ভব হচ্ছে এই জৈবিক স্থাপত্যের কারণেই। এনাটমি আমাদের শেখায় বিনয়আমরা যতই জটিল হই না কেন, আমরা প্রকৃতিরই অংশ। আর সেই প্রকৃতি অসাধারণ

      আরও পড়ুন - প্রাণীর শ্রেণিবিন্যাস কীভাবে করা হয়?

    একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

    নবীনতর পূর্বতন

    نموذج الاتصال