ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীর বৈজ্ঞানিক বিপ্লব মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মোড়। কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক মহাবিশ্ব, গ্যালিলিওর দূরবীক্ষণ পর্যবেক্ষণ, কেপলারের গ্রহীয় গতিসূত্র এবং সর্বোপরি নিউটনের মহাকর্ষ ও গতিসূত্র পৃথিবী সম্পর্কে মানুষের হাজার বছরের ধারণাকে আমূল বদলে দিয়েছিল। এই বিপ্লবের সবচেয়ে গভীর প্রভাব পড়েছিল দর্শনের জগতে। প্রকৃতিকে বোঝার জন্য পুরোহিত বা ধর্মগ্রন্থের শরণাপন্ন না হয়ে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণ ও গাণিতিক সূত্রের দিকে ঝুঁকলেন দার্শনিকেরা। এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই জন্ম নিল এক চরমপন্থী তত্ত্ব— যান্ত্রিক বাস্তুবাদ (Mechanical Materialism)।
যান্ত্রিক বাস্তুবাদের মূল কথা অত্যন্ত সরল: এই মহাবিশ্বের একমাত্র বাস্তবতা হলো জড় পদার্থ ও তার গতি। যা কিছু ঘটে, তার সবই ব্যাখ্যা করা যায় বস্তুকণার পারস্পরিক সংঘর্ষ ও যান্ত্রিক নিয়মের মাধ্যমে। কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তি, আত্মা বা ঈশ্বরের প্রয়োজন নেই। এই ধারণাকে পূর্ণতা দিয়েছিলেন দুইজন দার্শনিক—ইংল্যান্ডের টমাস হবস (১৫৮৮-১৬৭৯) এবং ফ্রান্সের জুলিয়েন অফ্রে দ্য লা মেত্রি (১৭০৯-১৭৫১)। হবস যেখানে মানবসমাজ ও রাষ্ট্রকে একটি যন্ত্র হিসেবে দেখেছিলেন, লা মেত্রি সেখানে স্বয়ং মানুষকেই বানিয়েছিলেন এক জৈবিক যন্ত্র—ম্যান আ মেশিন। এই ব্লগপোস্টে আমরা তাঁদের এই বৈপ্লবিক চিন্তাধারার গভীরে প্রবেশ করব।
১: যান্ত্রিক বাস্তুবাদের পূর্বপ্রস্তুতি — রেনেসাঁ থেকে বৈজ্ঞানিক বিপ্লব
১.১ মধ্যযুগের ধর্মকেন্দ্রিক বিশ্ব থেকে মুক্তি
মধ্যযুগে ইউরোপীয় চিন্তাজগতের কেন্দ্রে ছিল খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্ব। অ্যারিস্টটলের দর্শনকে খ্রিস্টীয় মতবাদের সঙ্গে মিলিয়ে টমাস অ্যাকুইনাস যে ‘স্কলাস্টিক’ দর্শন গড়ে তুলেছিলেন, তাতে মহাবিশ্ব ছিল একটি উদ্দেশ্যপূর্ণ, স্তরবিন্যস্ত কাঠামো—যার শীর্ষে স্বয়ং ঈশ্বর এবং সর্বনিম্নস্তরে জড় পদার্থ। সবকিছুরই একটি ‘চূড়ান্ত কারণ’ (final cause) আছে—বৃষ্টি হয় ফসল ফলানোর জন্য, সূর্য ওঠে আলো দেওয়ার জন্য। এই ‘টেলিওলজিক্যাল’ (উদ্দেশ্যমূলক) বিশ্বদৃষ্টি যান্ত্রিক বাস্তুবাদের উত্থানের পথে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল।
রেনেসাঁ এই বাধা ভাঙতে শুরু করে। লিওনার্দো দা ভিঞ্চি মানবদেহের শবচ্ছেদ করে দেখান যে দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো নিছক যান্ত্রিক কপিকলের মতো কাজ করে। ফ্রান্সিস বেকন বলেন, প্রকৃতিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে পরীক্ষণের মাধ্যমে—তবেই সে তার রহস্য প্রকাশ করবে। আর গ্যালিলিও গ্যালিলি ঘোষণা করেন, “প্রকৃতির বই লেখা হয়েছে গণিতের ভাষায়।”
১.২ দেকার্তের দ্বৈতবাদ: যন্ত্র ও আত্মার বিভাজন
যান্ত্রিক বাস্তুবাদের ইতিহাসে রনে দেকার্তের (১৫৯৬-১৬৫০) ভূমিকা অপরিসীম। দেকার্ত প্রস্তাব করেছিলেন যে সমগ্র ভৌত জগৎ—গ্রহ-নক্ষত্র থেকে শুরু করে প্রাণীদেহ পর্যন্ত—সবই কাজ করে নিছক যান্ত্রিক নিয়মে। তিনি জীবজন্তুকে ‘বস্তু-মাত্র’ হিসেবে গণ্য করতেন এবং দাবি করতেন যে প্রাণীরা আসলে এক ধরনের জটিল যন্ত্র, যাদের কোনো অনুভূতি বা আত্মা নেই। এটি ছিল একটি বৈপ্লবিক ধারণা, যা পরবর্তীতে লা মেত্রির ‘ম্যান আ মেশিন’ ধারণার ভিত্তি তৈরি করে।
কিন্তু দেকার্ত একটি সীমারেখা টেনে দিয়েছিলেন—মানুষ। তার মতে, মানুষের দেহ যন্ত্র হলেও, মানুষের আছে একটি ‘চিন্তাশীল সত্তা’ (res cogitans) বা আত্মা, যা দেহ (res extensa) থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং ভৌত নিয়মের অধীন নয়। এই ‘দ্বৈতবাদ’ (dualism) ছিল এক ধরনের আপস—যা যান্ত্রিক বাস্তুবাদীরা কখনোই মেনে নিতে পারেননি।
২: টমাস হবস — যান্ত্রিক বস্তুবাদের স্থপতি
২.১ জীবন ও বৌদ্ধিক প্রেক্ষাপট
১৫৮৮ সালে ইংল্যান্ডের মালমেসবারিতে জন্ম নেওয়া টমাস হবস এক অস্থির সময়ের সাক্ষী ছিলেন। ইংরেজ গৃহযুদ্ধ, প্রথম চার্লসের মৃত্যুদণ্ড এবং ক্রমওয়েলের শাসন—এই রাজনৈতিক অস্থিরতা তাঁর চিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তিনি চেয়েছিলেন সমাজ ও রাষ্ট্রকে এমন এক বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে, যা ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল নয়। তাঁর মডেল ছিল গ্যালিলিওর পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যামিতি।
হবসের দীর্ঘ জীবনে তিনি ফ্রান্সিস বেকনের সচিব হিসেবে কাজ করেছিলেন, গ্যালিলিওর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন এবং দেকার্তের সঙ্গে পত্রালাপ করেছিলেন। এসব অভিজ্ঞতা তাঁকে এক কঠোর যান্ত্রিক বস্তুবাদী দর্শনের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।
২.২ যান্ত্রিক বস্তুবাদের ভিত্তি: গতি ও পদার্থ
হবসের দর্শনের মূলে ছিল একটিই ধারণা—গতিশীল পদার্থই একমাত্র বাস্তবতা। ব্রিটানিকা বিশ্বকোষ যথার্থই বলেছে: “সমস্ত পর্যবেক্ষিত ঘটনাকে পদার্থ ও গতির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয় যান্ত্রিক পদ্ধতিতে। হবস ছিলেন একজন যান্ত্রিক বস্তুবাদী: তিনি মনে করতেন যে বস্তু ছাড়া আর কিছুই বাস্তব নয়, এবং সমস্ত প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের বিষয়বস্তু হলো বিভিন্ন স্তরে বস্তুর গতি।”
হবসের মতে, দর্শনের কাজ হলো কারণ থেকে ফল এবং ফল থেকে কারণ নির্ণয় করা। আর এই কারণ-ফলের সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে যান্ত্রিক—যেমন একটি বিলিয়ার্ড বল অন্যটিকে ধাক্কা দিলে দ্বিতীয় বলটি গতিশীল হয়। হবস এই মডেল সমগ্র মহাবিশ্বের ওপর প্রয়োগ করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন: “জীবন আসলে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গতি ছাড়া আর কিছু নয়। ... হৃদযন্ত্র একটি স্প্রিং ছাড়া আর কিছু নয়, স্নায়ুগুলো অসংখ্য সূক্ষ্ম তার, আর অস্থিসন্ধিগুলো চাকা যা সমগ্র দেহকে গতিশীল রাখে।”
২.৩ জ্ঞানতত্ত্ব ও মনোবিজ্ঞানের যান্ত্রিক ব্যাখ্যা
হবসের যান্ত্রিক বাস্তুবাদের সবচেয়ে সাহসী প্রয়োগ দেখা যায় তাঁর জ্ঞানতত্ত্বে। তিনি প্রশ্ন করেছিলেন: আমরা কীভাবে বাইরের জগৎ সম্পর্কে জানতে পারি? তাঁর উত্তর ছিল—ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষণের মাধ্যমে। কিন্তু ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষণ নিজেই কী? হবসের মতে, বাইরের বস্তু থেকে নির্গত কণা আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহী অঙ্গে আঘাত করে, যা থেকে স্নায়ুতে এক ধরনের প্রতিরোধ বা চাপের সৃষ্টি হয়। এই চাপ মস্তিষ্ক ও হৃদযন্ত্রে পৌঁছে ‘সংবেদন’ (sensation) সৃষ্টি করে।
হবস বলেছিলেন: “সংবেদন আসলে গতি ছাড়া আর কিছু নয়।” তিনি আরও দাবি করেন যে কল্পনা (imagination) হলো “ক্ষয়িষ্ণু সংবেদন” (decaying sense) ছাড়া আর কিছু নয়। আমরা যখন কোনো বস্তু দেখি, তখন তা আমাদের ইন্দ্রিয়ে যে ছাপ ফেলে, বস্তুটি সরে যাওয়ার পরও সেই ছাপ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়—এই ধীর মিলিয়ে যাওয়াই হলো কল্পনা বা স্মৃতি।
এমনকি চিন্তা, যুক্তি ও ইচ্ছাশক্তিকেও হবস ব্যাখ্যা করেছিলেন সম্পূর্ণ যান্ত্রিকভাবে। তাঁর মতে, চিন্তা হলো একের পর এক ধারণার সংযোগ, যা বস্তুকণার গতির নিয়ম অনুসারে ঘটে। মানুষ যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তা আসলে তার অভ্যন্তরে চলা বিভিন্ন বাসনা ও ভীতির মধ্যেকার এক ধরনের যান্ত্রিক প্রতিযোগিতার ফল—যাকে তিনি বলেছিলেন “ডেলিবারেশন” (deliberation)।
২.৪ লেভিয়াথান: সমাজ ও রাষ্ট্র যন্ত্ররূপে
হবসের যান্ত্রিক দর্শনের চূড়ান্ত প্রয়োগ দেখা যায় তাঁর অমর গ্রন্থ ‘লেভিয়াথান’-এ (১৬৫১)। এই গ্রন্থে তিনি সমাজ ও রাষ্ট্রকে ব্যাখ্যা করেছিলেন একটি কৃত্রিম যন্ত্র হিসেবে। তাঁর বিখ্যাত উক্তি: “প্রকৃতি (যে শিল্পের মাধ্যমে ঈশ্বর বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন) মানুষের শিল্প দ্বারা অনুকৃত হয় ... একটি যন্ত্র তৈরির মাধ্যমে যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে।”
লেভিয়াথানে হবস প্রথমে মানব প্রকৃতির যান্ত্রিক বিশ্লেষণ দেন। তাঁর মতে, মানুষ মৌলিকভাবে স্বার্থপর ও আত্মরক্ষায় তৎপর। প্রকৃতির রাজ্যে (state of nature) মানুষের জীবন ছিল “একাকী, দরিদ্র, নোংরা, পাশবিক ও সংক্ষিপ্ত।” এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে মানুষ একে অপরের সঙ্গে ‘সামাজিক চুক্তি’ (social contract) করে এবং তাদের সমস্ত ক্ষমতা এক সার্বভৌম শাসকের হাতে অর্পণ করে।
এই সার্বভৌম রাষ্ট্র—লেভিয়াথান—হবসের ভাষায় একটি “কৃত্রিম মানুষ”: সার্বভৌমত্ব তার আত্মা, বিচারকরা তার সন্ধিস্থল, পুরস্কার ও শাস্তি তার স্নায়ু, সম্পদ তার শক্তি এবং আইন তার যুক্তি। রাষ্ট্র যেহেতু একটি যন্ত্র, তাই তার কাজকর্মও যান্ত্রিক নিয়মে বিশ্লেষণ করা সম্ভব। হবস এভাবেই রাজনীতিকে একটি বিজ্ঞানে পরিণত করতে চেয়েছিলেন।
৩: জুলিয়েন অফ্রে দ্য লা মেত্রি — ‘ম্যান আ মেশিন’ এবং চরম বস্তুবাদ
৩.১ এক অস্থির চিকিৎসক-দার্শনিক
১৭০৯ সালে ফ্রান্সের সেইন্ট-মালোতে জন্ম নেওয়া লা মেত্রি ছিলেন পেশায় চিকিৎসক এবং নেশায় দার্শনিক। তিনি প্যারিসে মেডিসিনে পড়াশোনা করেন এবং পরে লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিখ্যাত চিকিৎসক হারমান বোয়েরহাভের অধীনে গবেষণা করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ তাঁকে মানবদেহ সম্পর্কে এমন কিছু পর্যবেক্ষণ করতে সাহায্য করেছিল, যা তাঁকে চরমপন্থী বস্তুবাদী সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেয়।
লা মেত্রির জীবন ছিল নাটকীয়। জ্বরাক্রান্ত অবস্থায় তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে শরীরের তাপমাত্রা ও অসুস্থতার সঙ্গে তাঁর চিন্তাশক্তি ও মানসিক অবস্থার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তাঁকে বিশ্বাস করায় যে মন বা আত্মা নামে কোনো স্বতন্ত্র সত্তা নেই—মানসিক ঘটনা সম্পূর্ণরূপে দেহের ভৌত অবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
৩.২ দেকার্তের পশু-যন্ত্র থেকে মানুষ-যন্ত্র
লা মেত্রির সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ম্যান আ মেশিন’ (L‘homme machine) প্রকাশিত হয় ১৭৪৭ সালে। এই গ্রন্থে তিনি দেকার্তের ‘পশু-যন্ত্র’ ধারণাকে যৌক্তিক পরিণতিতে পৌঁছে দেন। দেকার্ত বলেছিলেন যে প্রাণীরা যন্ত্র, কিন্তু মানুষ ব্যতিক্রম কারণ তার আত্মা আছে। লা মেত্রি প্রশ্ন করলেন: যদি প্রাণীরা যন্ত্র হয় এবং তারা ব্যথা অনুভব করে, খাদ্য খোঁজে, সন্তান পালন করে—তাহলে কেন মানুষের ক্ষেত্রে এই একই আচরণ ব্যাখ্যা করতে আত্মার প্রয়োজন? উইকিপিডিয়া অনুসারে, “এই গ্রন্থে লা মেত্রি দেকার্তের যুক্তি—যে প্রাণীরা নিছক যন্ত্র বা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র—মানুষের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করেন। তিনি দ্বৈতবাদ এবং আত্মার অস্তিত্ব অস্বীকার করেন।”
লা মেত্রি যুক্তি দিয়েছিলেন যে মানবদেহ একটি অত্যন্ত জটিল যন্ত্র, যা নিজে নিজেই চলতে পারে—ঠিক যেমন একটি ঘড়ি চাবি দেওয়ার পর নিজে নিজে চলে। দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো ঘড়ির চাকা ও স্প্রিংয়ের মতোই কাজ করে, আর মস্তিষ্ক হলো সেই কেন্দ্রীয় প্রক্রিয়াকরণ যন্ত্র যা চিন্তা, অনুভূতি ও ইচ্ছার জন্ম দেয়।
তিনি লিখেছিলেন: “আসুন আমরা সাহসের সঙ্গে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাই যে মানুষ একটি যন্ত্র, এবং সমগ্র মহাবিশ্বে কেবল একটি মাত্র পদার্থ আছে, যা বিভিন্ন রূপে পরিবর্তিত হয়।”
৩.৩ আত্মা ও ঈশ্বরের স্থান: চরম বস্তুবাদের ঘোষণা
লা মেত্রি তাঁর গ্রন্থে ঘোষণা করেছিলেন যে আত্মার অস্তিত্ব একটি অপ্রয়োজনীয় অনুমান মাত্র। তিনি বলেন, “আমরা দেহে কেবল পদার্থই দেখতে পাই, এবং অনুভব করার ক্ষমতাও কেবল এই দেহেই লক্ষ করি।” তাঁর মতে, পদার্থ নিজেই চিন্তা ও অনুভূতির ক্ষমতা ধারণ করে যখন তা যথেষ্ট জটিলভাবে সংগঠিত হয়—যেমনটি ঘটে মানব মস্তিষ্কের ক্ষেত্রে।
লা মেত্রি আরও এগিয়ে গিয়ে বলেন যে নাস্তিকতাই একমাত্র যুক্তিসঙ্গত অবস্থান। তাঁর এই মতবাদ তখনকার ইউরোপে এতটাই বিপজ্জনক বলে বিবেচিত হয়েছিল যে তাঁকে প্রথমে ফ্রান্স, তারপর হল্যান্ড থেকেও পালিয়ে আশ্রয় নিতে হয় প্রুশিয়ার রাজা দ্বিতীয় ফ্রেডেরিকের দরবারে। সেখানেই ১৭৫১ সালে মাত্র ৪১ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
৩.৪ যান্ত্রিক বস্তুবাদের নৈতিকতা: সুখবাদ (Hedonism)
যান্ত্রিক বাস্তুবাদ শুধু বিশ্বদৃষ্টিই নয়, নৈতিকতারও এক নতুন ধারণা প্রদান করেছিল। লা মেত্রির মতে, যেহেতু কোনো আত্মা বা পরকাল নেই, তাই জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো ইহকালে সুখ ভোগ করা। তিনি বলেছিলেন: “জীবনকে এমনভাবে যাপন করা উচিত যাতে সর্বোচ্চ আনন্দ উৎপাদিত হয়।”
তবে লা মেত্রির সুখবাদ নিছক ইন্দ্রিয়সুখে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন যে জ্ঞানার্জন, শিল্পকলা ও বন্ধুত্বের মধ্যেও গভীর আনন্দ নিহিত আছে। সমাজের প্রচলিত নৈতিকতা, যার উৎস ধর্ম ও কুসংস্কার, তাকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং এক ধরনের ‘নান্দনিক-নৈতিক মুক্তি’র কথা বলেছিলেন।
৫: সমালোচনা ও সীমাবদ্ধতা
৫.১ যন্ত্রের রূপকের সীমাবদ্ধতা
যান্ত্রিক বাস্তুবাদের প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো এর ‘যন্ত্র’ রূপকটি জীবনের জটিলতাকে পুরোপুরি ধরতে পারে না। একটি ঘড়ি বা ইঞ্জিনকে যেমন ভেঙে তার যন্ত্রাংশ আলাদা করে বোঝা যায়, জীবন্ত প্রাণীকে সেভাবে বোঝা যায় না। জীবনের আছে আত্ম-সংগঠনের ক্ষমতা, পুনরুৎপাদন, অভিযোজন ও বিবর্তন—যা নিছক যান্ত্রিকতার ঊর্ধ্বে।
৫.২ চেতনার সমস্যা
হবস ও লা মেত্রির সবচেয়ে বড় দার্শনিক চ্যালেঞ্জ ছিল চেতনা বা ‘কোয়ালিয়া’র ব্যাখ্যা। কীভাবে জড় পদার্থের গতি থেকে আত্মসচেতনতা, অনুভূতি ও আবেগের জন্ম হয়, তা যান্ত্রিক বাস্তুবাদ কখনো সন্তোষজনকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেনি। হবস এটিকে ‘ফ্যান্টাজম’ বা ‘অরিজিনাল ফ্যান্সি’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
৫.৩ রাজনৈতিক অপব্যবহার
হবসের যান্ত্রিক রাষ্ট্রতত্ত্ব পরবর্তীকালে স্বৈরাচারী শাসকদের হাতে অস্ত্র হয়ে ওঠে। ‘সামাজিক চুক্তি’র নামে ব্যক্তি স্বাধীনতা খর্ব করার পক্ষে যুক্তি দেওয়া হয়। তবে একথাও মনে রাখতে হবে যে হবসের লক্ষ্য ছিল অরাজকতা থেকে মুক্তি, স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা নয়।
৬: উত্তরাধিকার ও আধুনিক প্রাসঙ্গিকতা
৬.১ মার্কস ও দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ
কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস যান্ত্রিক বস্তুবাদের সমালোচনা করলেও তাঁদের ওপর এর প্রভাব ছিল অনস্বীকার্য। মার্কসীয় দর্শনে যান্ত্রিক বাস্তুবাদকে ‘যান্ত্রিক বস্তুবাদ’ নামে অভিহিত করা হয় এবং একে ‘দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ’ থেকে পৃথক করা হয়। মার্কসের মতে, যান্ত্রিক বস্তুবাদ পদার্থকে নিষ্ক্রিয় এবং গতিকে শুধু বাহ্যিক ধাক্কার ফল মনে করে, অন্যদিকে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ পদার্থের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও পরিবর্তনের ধারাকে গুরুত্ব দেয়।
৬.২ আচরণবাদ ও আধুনিক মনোবিজ্ঞান
লা মেত্রির ‘ম্যান আ মেশিন’ ধারণা বিংশ শতাব্দীর আচরণবাদী মনোবিজ্ঞানের (Behaviorism) ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। জন বি. ওয়াটসন ও বি. এফ. স্কিনারের মতো মনোবিজ্ঞানীরা মনে করতেন যে মানব আচরণ সম্পূর্ণরূপে পরিবেশগত উদ্দীপনা ও প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়—অন্তর্মুখী চিন্তা বা অনুভূতির কোনো প্রয়োজন নেই। এটি ছিল লা মেত্রির যান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিরই আধুনিক রূপ।
৬.৩ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ‘ম্যান-মেশিন’
একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমরা যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স ও নিউরোসায়েন্সের বিস্ময়কর অগ্রগতি দেখছি, তখন লা মেত্রির প্রশ্নটি আবারও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে: মানুষ কি সত্যিই একটি যন্ত্র? যদি একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম মানুষের মতো চিন্তা করতে, অনুভব করতে ও সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তাহলে মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যে পার্থক্যটা ঠিক কোথায়? ‘মস্তিষ্ক এক জৈবিক কম্পিউটার’—এই ধারণা আজ আর দর্শনের বিমূর্ত তত্ত্ব নয়, বরং স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণার কেন্দ্রীয় বিষয়।
যন্ত্রের বাইরেও কিছু আছে কি?
যান্ত্রিক বাস্তুবাদ ইউরোপীয় চিন্তাধারায় এক বিশাল অবদান রেখেছে। এটি আমাদের শিখিয়েছে যে প্রকৃতি ও মানবসমাজকে বোঝার জন্য অলৌকিকতার আশ্রয় না নিয়ে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণ ও যুক্তির ওপর নির্ভর করতে হবে। হবসের রাজনৈতিক দর্শন আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেছিল, আর লা মেত্রির ‘ম্যান আ মেশিন’ চিকিৎসাবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানকে মধ্যযুগীয় কুসংস্কারের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেছিল।
কিন্তু একইসঙ্গে, যান্ত্রিক বাস্তুবাদ আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়: সবকিছু যদি যন্ত্র হয়, তাহলে ভালোবাসা, সৌন্দর্যবোধ, ন্যায়পরায়ণতা—এসবের স্থান কোথায়? ঘড়ি যেমন নিজে নিজে চলে, কিন্তু তা জানে না যে সে সময় মাপছে; তেমনি একটি যান্ত্রিক মহাবিশ্ব অর্থহীন ও উদ্দেশ্যহীন। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়তো যান্ত্রিক বাস্তুবাদের সীমানার বাইরে খুঁজতে হবে।
হবস ও লা মেত্রির দেখানো পথ ধরে আধুনিক বিজ্ঞান আজ অনেক দূর এগিয়েছে। আমরা এখন জানি যে মহাবিশ্ব কেবল নিউটনের যান্ত্রিক ঘড়ি নয়—কোয়ান্টাম বলবিদ্যা ও আপেক্ষিকতা আমাদের দেখিয়েছে বাস্তবতা যন্ত্রের চেয়েও অনেক বেশি জটিল ও রহস্যময়। কিন্তু এই জটিলতার সূচনা যেখানে, সেখানে হবস ও লা মেত্রির অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
আরও পড়ুন -
#যান্ত্রিক_বাস্তুবাদ #হবস #লা_মেত্রি #MechanicalMaterialism #ThomasHobbes #LaMettrie #ManAMachine #Leviathan #দর্শন #Philosophy #বস্তুবাদ #Materialism #পাশ্চাত্য_দর্শন #WesternPhilosophy #বিজ্ঞান_ও_দর্শন #রেনেসাঁ #বৈজ্ঞানিক_বিপ্লব #আলোকিত_যুগ #Enlightenment #যুক্তিবাদ #Empiricism #রাষ্ট্রচিন্তা #PoliticalPhilosophy #বাংলা_ব্লগ #BanglaBlog
