আমাদের সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে মানবমনে একটি প্রশ্ন বারবার ঘুরেফিরে এসেছে—জীবনের প্রতিটি ঘটনা কি পূর্বনির্ধারিত নাকি আমরা নিজেরাই নিজেদের ভাগ্যের নিয়ন্তা? তুমি যখন একটি চাকরির ইন্টারভিউতে সফল হও, ভালোবাসার মানুষটির সঙ্গে মিলিত হও, কিংবা হঠাৎ বিপদে পড়ো—তখন কি মনে হয় সবকিছু ‘হয়ে যাওয়ার ছিল’, নাকি তোমার প্রতিটি সিদ্ধান্তই জীবনকে নতুন পথে ঠেলে দিচ্ছে? এই দ্বন্দ্বই ‘স্বাধীনতা বনাম নিয়তি’ বিতর্কের প্রাণভোমরা। একদিকে আমাদের অস্তিত্বগত অভিজ্ঞতা চিৎকার করে বলে, “আমি স্বাধীন,” অন্যদিকে যুক্তিবাদী পর্যবেক্ষণ ইঙ্গিত দেয়, কোনো এক অদৃশ্য শৃঙ্খল মহাবিশ্বের গতিপথ বেঁধে দিয়েছে। সত্যটা কি কোনো একক পক্ষে লুকিয়ে, নাকি স্বাধীনতা আর নিয়তি একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ? দর্শন, বিজ্ঞান, ধর্মতত্ত্ব এবং আধুনিক মনোবিজ্ঞানের নির্যাস নিংড়ে আমরা আজ সেই রহস্যপুরীর মানচিত্র আঁকব।
স্বাধীনতা কী
যখন আমরা ‘স্বাধীনতা’ বলি, তখন স্রেফ রাজনৈতিক বা সামাজিক স্বাধীনতার কথা ভাবলে চলবে না। দার্শনিক অর্থে স্বাধীনতা হলো স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি (free will)—সেই ক্ষমতা, যার দ্বারা মানুষ কোনো বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ অনিবার্যতার কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ না করে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে গ্রহণ করতে পারে। ধরো, তুমি এই মুহূর্তে চা না কফি খাবে, সেটা সম্পূর্ণরূপে তোমার ব্যক্তিগত পছন্দের ওপর নির্ভর করছে বলে তুমি অনুভব করো। তুমি ভাবো, বিকল্প সম্ভাবনাগুলোর মধ্যে যে কোনো একটিকে বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা তোমার আছে। স্বাধীনতার এই অভিজ্ঞতাই নৈতিকতা, আইন, শাস্তি ও পুরস্কারের ভিত্তি। যদি মানুষ স্বাধীন না হয়, তাহলে একজন খুনিকে শাস্তি দেওয়ার নৈতিক যুক্তি কোথায়? কারণ সে তো ‘নিয়তির’ হাতের পুতুল মাত্র!
স্বাধীনতার ধারণা ব্যক্তিসত্তার অখণ্ডতার সঙ্গেও জড়িত। অস্তিত্ববাদী দার্শনিক জ্যঁ পল সার্ত্র বলেছিলেন, “মানুষ স্বাধীনতায় দণ্ডিত।” তার মতে, কোনো পূর্বনির্ধারিত ‘মানবপ্রকৃতি’ নেই; মানুষ আগে অস্তিত্ব পায়, পরে সে তার কর্মের মাধ্যমে নিজেকে সংজ্ঞায়িত করে। এই দৃষ্টিতে স্বাধীনতা এক ভারী দায়িত্ব, পালিয়ে যাওয়ার পথ যেখানে বন্ধ। আমরা প্রতিনিয়ত নিজেদের তৈরি করছি, এবং সেই নির্মাণের একমাত্র স্থপতি আমরা নিজেরাই। কিন্তু সত্যিই কী আমরা সব নির্মাণের স্থপতি? সংশয়বাদীরা প্রশ্ন তোলে, যাকে তুমি স্বাধীন ইচ্ছা ভাবছ, সেটা নিছক মস্তিষ্কের জটিল রাসায়নিক প্রক্রিয়ার ফসল নয় তো?
নিয়তি কি মহাজাগতিক চিত্রনাট্য?
নিয়তি বা ভাগ্যকে আমরা সহজ ভাষায় বলতে পারি, “যা হবার তা হবেই।” দর্শনের ভাষায় একে বলা হয় নির্ণায়কতাবাদ (determinism)—এই মতবাদ অনুযায়ী মহাবিশ্বের প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি অণু-পরমাণুর গতি, প্রতিটি মানুষের পছন্দ-অপছন্দ পূর্ববর্তী কারণগুলির অনিবার্য ফলাফল মাত্র। কল্পনা করো, একটি বিলিয়ার্ড বলকে গতিশীল করা হলো; এর গতিপথ, বেগ, সংঘর্ষের ফলাফল গণনা করে নিখুঁতভাবে বলে দেওয়া সম্ভব, যদি আমরা প্রাথমিক অবস্থাগুলো জানি। আঠারো শতকের ফরাসি বিজ্ঞানী পিয়ের-সিমোঁ লাপ্লাস একটি বুদ্ধিমান ‘দানবের’ কল্পনা করেছিলেন, যে বিশ্বের প্রতিটি কণার অবস্থান ও বেগ জানলে ভবিষ্যতের সবকিছু নির্ভুলভাবে বলে দিতে পারবে। এই দৃষ্টিতে আমাদের ইচ্ছা, চিন্তা, ভালোবাসা—সবই সেই মহাজাগতিক যন্ত্রের দাঁত ও চাকা মাত্র।
প্রাচ্য দর্শনে নিয়তিকে অনেক সময় ‘অদৃষ্ট’ বা কর্মফলের সমার্থক হিসেবে দেখা হয়। হিন্দুধর্মে প্রারব্ধ কর্মফল (যে কর্মের ফল ভোগ করার জন্যই বর্তমান জন্ম) একধরনের নিয়তি। প্রশ্নাতীতভাবে বিশ্বাস করা হয়, কিছু ঘটনা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে—যেমন আমাদের জন্ম, মৃত্যু, পিতামাতা। ইসলামে ‘তাকদির’ শব্দটি একই সুরে বলে, বান্দার জীবনের সবকিছু আল্লাহর লওহে মাহফুজে লেখা। এমনকি বিজ্ঞানের কঠিনতম শাখাতেও, বিগ ব্যাং-এর পরবর্তী মুহূর্তের শর্ত থেকে শুরু করে আজকের সূর্যমুখী ফুলের পাপড়ি মেলা পর্যন্ত সবই কার্যকারণ শৃঙ্খলে বাঁধা।
স্বাধীনতা বনাম নির্ণায়কতাবাদ
পাশ্চাত্য দর্শনে এই তর্ক শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলছে। স্পিনোজার মতো দার্শনিক মনে করতেন, স্বাধীনতা একটি ভ্রম মাত্র। মানুষ নিজেকে স্বাধীন ভাবে কারণ সে তার ইচ্ছার কারণগুলো জানে না। আমরা যখন কোনো সিদ্ধান্ত নিই, তার পেছনে কাজ করা অজস্র কারণ আমরা অনুভব করি না—শৈশবের অভিজ্ঞতা, জিনগত কোড, সামাজিক পরিবেশ, শারীরবৃত্তীয় অবস্থা। শোপেনহাওয়ার মন্তব্য করেছিলেন, “মানুষ যা চায় তাই করতে পারে, কিন্তু যা চায় তা চাওয়ার স্বাধীনতা তার নেই।” অর্থাৎ তুমি চা বেছে নিচ্ছ, কিন্তু কেন তুমি চা পছন্দ করছ, তার পেছনে রয়েছে একটি দীর্ঘ কার্যকারণ শৃঙ্খল যা তোমার নিয়ন্ত্রণে ছিল না।
অন্যপক্ষে ইমানুয়েল কান্ট নৈতিকতার জায়গা থেকে স্বাধীনতাকে অনিবার্য বলে প্রমাণ করতে চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, “উচিত বলতে পারা মানেই পারাকে বোঝায়”—যদি আমাদের নৈতিকভাবে ‘উচিত’ কোনো কাজ করার কথা বলা হয়, তাহলে সেই কাজ করার স্বাধীনতা আমাদের আছে বলেই ধরে নিতে হবে। কান্টের মতে, ইন্দ্রিয়জগতে আমরা কার্যকারণের নিয়মে বাঁধা থাকলেও, ‘নউমেনন’ বা চিন্তার জগতে আমরা স্বাধীন। অস্তিত্ববাদী সার্ত্র আরও একধাপ এগিয়ে বলেছেন, “নিয়তি বলে কিছু নেই, আছে শুধু মানুষের পরিকল্পনা।”
ভারতীয় দর্শন এই দ্বন্দ্বকে এক ভিন্ন সূত্রে গেঁথেছে। গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন, “কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন”—কর্মেই তোমার অধিকার, ফলে কখনো নয়। এখানে স্বাধীনতা ও নিয়তির এক আশ্চর্য সহাবস্থান দেখা যায়। তুমি তোমার কর্ম বেছে নিতে স্বাধীন, কিন্তু তার ফলাফল নিয়তির হাতে। কর্ম হল স্বাধীনতার ক্ষেত্র, আর কর্মফল হল নিয়তির। অদ্বৈত বেদান্ত আরও গভীরে গিয়ে বলে, মায়ার জগতে স্বাধীনতা-নিয়তি দুই-ই আপেক্ষিক, পরম সত্যে সবই এক নির্বিকার ব্রহ্ম। বৌদ্ধ দর্শনের ‘প্রতীত্যসমুৎপাদ’—নির্ভরশীল উৎপত্তি—একটি মধ্য পথ দেখায়। কিছুই শর্তহীনভাবে স্বাধীন নয়, আবার সম্পূর্ণরূপে নির্ধারিতও নয়। সবকিছুই কারণ ও প্রত্যয়ের সমষ্টি। তুমি ইট বিছোতে পারো, কিন্তু চূড়ান্ত মন্দিরটির স্থাপত্য সবটুকু তোমার পরিকল্পনার প্রতিফলন নাও হতে পারে।
আরও পড়ুন - যুদ্ধ কি ন্যায্য হতে পারে?
স্বাধীনতা ও নিয়তি
বিজ্ঞান কি তবে লাপ্লাসের দানবকেই সত্যি প্রমাণ করেছে? উনিশ শতক পর্যন্ত তেমনটাই মনে হতো। নিউটনের গতিসূত্রগুলো পুরো বিশ্বকে এক অনমনীয় ঘড়ির কাঁটায় বেঁধে দিয়েছিল। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শুরুতে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা এসে পুরো চিত্রটাই পাল্টে দিল। উপ-পরমাণু কণাদের জগতে নিশ্চিত করে কিছুই বলা যায় না; অনিশ্চয়তাই সেখানকার নিয়ম। বোর-আইনস্টাইন বিতর্ক বিখ্যাত, যেখানে আইনস্টাইন বলেছিলেন, “ঈশ্বর পাশা খেলেন না,” অর্থাৎ মহাবিশ্বের মূলে অনিশ্চয়তা থাকতে পারে না। কিন্তু কোয়ান্টাম তত্ত্ব ইঙ্গিত দেয়, ঈশ্বর শুধু পাশাই খেলেন না, অনেক সময় পাশা এমন জায়গায় ফেলেন যেখানে আমাদের দৃষ্টিই পৌঁছায় না।
তবে কোয়ান্টাম অনিশ্চয়তা কি আসলেই স্বাধীন ইচ্ছার পক্ষে জোরালো প্রমাণ? না, মোটেও নয়। কারণ অনিশ্চয়তা এবং স্বাধীনতা এক নয়। যদি তোমার মস্তিষ্কের কোনো স্নায়ুতে কোনো ইলেক্ট্রনের অবস্থান দৈবক্রমে নির্ধারিত হয়, সেটা স্বাধীন ইচ্ছা নয়, নিছক র্যান্ডমনেস। স্বাধীন ইচ্ছা দাবি করে ‘কারণহীন নয়, বরং আত্ম-নির্ধারিত’ কোনো ক্রিয়া। র্যান্ডমনেস এবং যান্ত্রিক নির্ণায়কতাবাদ—দুই ফাঁদেই স্বাধীনতা ধরা পড়ে না।
স্নায়ুবিজ্ঞান আরও কঠিন প্রশ্ন তুলেছে। ১৯৮০-র দশকে বেঞ্জামিন লিবেট তাঁর ঐতিহাসিক পরীক্ষায় দেখান, কোনো ব্যক্তি সচেতনভাবে হাত তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রায় ৩০০ মিলিসেকেন্ড আগেই তার মস্তিষ্কের মোটর অঞ্চলে একটি ‘রেডিনেস পটেনশিয়াল’ তৈরি হয়। অর্থাৎ মস্তিষ্ক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, তারপর ‘তুমি’ সেই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সচেতন হও। এ যেন সচেতন ‘আমি’ চালক নয়, বরং এক পেছনের আসনের যাত্রী। যদিও পরবর্তী গবেষণায় লিবেটের পদ্ধতি নিয়ে জলঘোলা হয়েছে, তবু এটা স্পষ্ট যে আমাদের অচেতন মনের জৈবিক প্রক্রিয়াগুলোর ভূমিকা আমাদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি। মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চল যখন জটিল আন্তঃক্রিয়ায় লিপ্ত হয়, তখন আমরা তাকে নিজের ‘ইচ্ছা’ বলে গল্প বানাই। তা হলে কি স্বাধীনতা একটা মরীচিকা? অনেক বিজ্ঞানী নিউরোডিটারমিনিজম সমর্থন করে বলেন, মস্তিষ্ক যেহেতু ভৌত জগতের অংশ, তার সব কাজই ভৌত কারণের ফসল। কিন্তু কেউ কেউ মনে করেন, জটিলতাবাদ (complexity) এবং উত্থান (emergence) তত্ত্বের মাধ্যমে স্বাধীন ইচ্ছার জায়গা তৈরি হতে পারে। চেতনা যদি মৌলিক কোনো সত্তা হয়, তাহলে ভৌত প্রক্রিয়া সীমাবদ্ধতা হলেও সে কিছুটা ‘স্বাধীন কার্যকারণ’ চালাতে পারে।
জিনতত্ত্ব আর পরিবেশ বিজ্ঞানও আমাদের স্বাধীনতার সীমানা এঁকে দেয়। তুমি কোন বিষয়ে প্রতিভাবান হবে, ডিপ্রেশনে ভুগবে কিনা, সহিংসতা প্রবণ হবে কিনা—সবকিছুর পেছনে জিনের অবদান তো আছেই, সেই সঙ্গে আছে বেড়ে ওঠার পরিবেশ। অথচ, একই জিনগত ঝুঁকি থাকলেও মানুষ তার জীবনধারা বদলে ফল পাল্টে দিতে পারে। এপিজেনেটিক্স দেখিয়েছে, পরিবেশ, খাদ্যাভ্যাস, ধ্যান—এসব কিছু জিনের প্রকাশ বদলে দিতে পারে। তাই নিয়তি বলে দেওয়া ‘জিনগত ভাগ্য’কে আমরা কিছুটা হলেও নিজের হাতে নিতে পারি।
তাকদির এবং কর্তব্য
ইসলামে তাকদিরের ধারণা অত্যন্ত সুক্ষ্ম। কোরআনে আল্লাহ বলেন, “তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং তা নির্ধারিত করেছেন ভাগ্যে।” আবার অন্যত্র, “এটা তোমাদের কর্মের ফল।” ইসলামী ধর্মতত্ত্ববিদেরা জাবরিয়া (চরম নিয়তিবাদী) ও কদরিয়া (চরম স্বাধীনতাবাদী) সম্প্রদায়ের মধ্যে ভারসাম্য রেখেছেন। আশআরী মতবাদ ‘কাসব’ বা অর্জনের ধারণা দেয়—আল্লাহ সবকিছু সৃষ্টি করেন, কিন্তু বান্দা তা অর্জন করে এবং তার জন্য নৈতিকভাবে দায়ী। এ যেন একটি নাটকের মঞ্চ, চিত্রনাট্য যেখানে ঈশ্বরের, কিন্তু অভিনেতা হিসেবে তুমি নিজের সংলাপ আন্তরিকভাবে উচ্চারণ করছ। এই দ্বান্দ্বিক দৃষ্টি চরম সুন্নি মতবাদে স্বীকৃত।
খ্রিস্টধর্মেও একই রকম টানাপোড়েন। সন্ত অগাস্টিন বলেছিলেন আদি পাপের জন্য মানুষের স্বাধীনতা কলুষিত, ঈশ্বরের কৃপাই পরিত্রাণের একমাত্র পথ। ক্যাথলিক চার্চ স্বাধীন ইচ্ছাকে স্বীকৃতি দেয়, কিন্তু প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কারক ক্যালভিন ‘প্রিডেস্টিনেশন’ বা পূর্বনির্ধারণের তত্ত্ব দিলেন, যেখানে নির্বাচিত ব্যক্তিরাই কেবল মুক্তি পাবে। তবে অধিকাংশ খ্রিস্টানই স্বীকার করে, নৈতিক দায়িত্বের জন্য স্বাধীন ইচ্ছা জরুরি।
হিন্দুধর্ম কর্মফলের সূত্রের মধ্য দিয়ে নিয়তি ও স্বাধীনতার মিলন ঘটায়। জীবনের তিন প্রকার কর্মফল: সঞ্চিত (জমা হয়ে থাকা), প্রারব্ধ (যা ফল দিতে শুরু করেছে) এবং আগামী (বর্তমান কর্মের ভবিষ্যৎ ফল)। তুমি প্রারব্ধের দ্বারা অনেকটা নিয়ন্ত্রিত, যেমন শারীরিক সীমাবদ্ধতা, পরিবার। কিন্তু তুমি বর্তমানে যে আগামী কর্মফল তৈরি করছ, সেটা তোমার স্বাধীনতার নির্যাস। একজন তীরন্দাজের কথা ভাবো: ধনুকে তির জুড়েছে (স্বাধীনতা), ছেড়ে দিয়েছে (এখন নিয়তি)। তির ছোঁড়ার পর আর কিছু করার থাকে না, কিন্তু ছোঁড়ার মুহূর্তটুকু তার সম্পূর্ণ নিজের। গীতার নিষ্কাম কর্মযোগ তাই নিয়তির মুখেও এক অভেদ্য স্বাধীনতার দুর্গ: ফলাফলের চিন্তা না করে নিঃস্বার্থ কর্ম কেবল সীমাবদ্ধতার শৃঙ্খলই ভাঙে না, কর্মের বন্ধন থেকেও মুক্তি দেয়।
ভাগ্যবিশ্বাসের ছায়া ও আলো
মনোবিজ্ঞানে জুলিয়ান রটারের ‘লোকাস অব কন্ট্রোল’ তত্ত্ব সরাসরি এই বিতর্ককে স্পর্শ করে। যাদের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণবিন্দু (internal locus) আছে, তারা বিশ্বাস করে তাদের সাফল্য-ব্যর্থতা নিজেদের হাতে; অন্যদিকে বহির্মুখী নিয়ন্ত্রণবিন্দুর (external locus) মানুষজন ভাবে নিয়তি, ভাগ্য, ক্ষমতাবান অন্যরা সব নিয়ন্ত্রণ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণবিন্দু সম্পন্ন ব্যক্তিরা বেশি সফল, উদ্যোগী, মানসিক চাপ সহনশীল। আবার চরম মাত্রায় নিজেকে সবকিছুর নিয়ন্তা ভাবাও ‘নার্সিসিজম’ ও অপরাধবোধের জন্ম দিতে পারে। বহির্মুখী নিয়ন্ত্রণবিন্দু মানুষকে নিষ্ক্রিয়তা, শিখা অসহায়তায় (learned helplessness) ফেলে দিতে পারে। কিন্তু ভাগ্যের ওপর বিশ্বাস অনেক সময় দুঃসহ বাস্তবতার মোকাবিলায় সাইকোলজিক্যাল শিল্ড হিসাবে কাজ করে। “আল্লাহর ইচ্ছা,” “যা থাকে কপালে”—এই বাক্যগুলো মেনে নেওয়ার শক্তি জোগায়। তাই সুস্থ মানসিকতার জন্য উত্তম হলো, যা পরিবর্তন করা যায় না তা মেনে নেওয়ার প্রজ্ঞা, যা পরিবর্তন করা যায় তা করার সাহস, আর এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য বোঝার বোধ। সেই বোধটাই যেন স্বাধীনতা আর নিয়তির আপসহীন দ্বন্দ্বকে এক জীবনঘনিষ্ঠ সম্প্রীতিতে রূপ দেয়।
বাস্তবের মিথোজীবিতা: কোথায় দাঁড়াই আমরা?
বাস্তব জীবনে স্বাধীনতা আর নিয়তি কখনো জোয়ার-ভাটার মতো, কখনো একই স্রোতে দুই নৌকা। তুমি সমুদ্রে পালতোলা নৌকার ক্যাপ্টেন: হাওয়ার গতি-দিক (নিয়তি) তোমার হাতে নেই, অথচ তুমি পাল খুলতে পারো, গুঁটিয়ে নিতে পারো, হাল ঘোরাতে পারো (স্বাধীনতা)। অদৃষ্টের হাওয়া যদি প্রতিকূলেও হয়, দক্ষ নাবিক তবু পথ বের করে নেয়। দাবার বোর্ডেও তাই: নিয়ম (নিয়তি) আগে থেকেই নির্ধারিত, কিন্তু চাল দেওয়ার ছন্দ, কৌশল আর সাহস সম্পূর্ণ খেলোয়াড়ের নিজস্ব। জীবনও যেন তাই। আমরা জন্মাই একটি নির্দিষ্ট সমাজ, ইতিহাস ও জৈবিক সীমার মধ্যে; সেই সীমারেখার ভিতরেই আমাদের সমস্ত স্বাধীনতার লীলা।
তাই কোনটা সত্য? এই প্রশ্নের উত্তর “হয় এটি, নয় ওটি”—এই দ্বৈত কাঠামোতে সম্ভব নয়। সত্য সম্ভবত দুটিরই সমন্বয়ে। পরমার্থে মহাবিশ্বের কার্যকারণ শৃঙ্খল সম্পূর্ণ, কিন্তু আপেক্ষিক মানবিক অভিজ্ঞতার জগতে স্বাধীনতা এক অনস্বীকার্য বাস্তবতা। বৌদ্ধ ‘দুই সত্য’ তত্ত্ব (সংস্কৃত ও পরমার্থ সত্য) যেন বলছে, ব্যবহারিক জীবনে স্বাধীনতা সত্য; গভীরতর বিশ্লেষণে সবই শর্তাধীন। একজন মানবতাবাদীর জন্য মহাবিশ্ব নির্ণায়িত হলেও মানুষের বিবেকের কণ্ঠস্বর, কল্পনা, ভালোবাসা—এগুলোকে স্বাধীন না ভেবে বাঁচা অসম্ভব। দার্শনিক ড্যানিয়েল ডেনেট যে ধারণাকে বলেন ‘স্বাধীনতার ব্যবহারিক বাস্তবতা’, সেটাই আমাদের নৈতিক জগতের ভিত। আমরা যখন কাউকে ‘ধন্যবাদ’ বলি কিংবা অপরাধীকে বিচার কাঠগড়ায় দাঁড় করাই, তখন আমরা একযোগে ধরে নিচ্ছি যে সে স্বাধীন; নইলে সব অর্থহীন।
স্বাধীনতা বনাম নিয়তির দ্বৈরথ কোনো পরাজয় বা জয়ের গল্প নয়। এ যেন একই পাখির দুই ডানা। গভীর উপলব্ধি হলো: নিয়তি মঞ্চ তৈরি করে দেয়, স্বাধীনতা সেই মঞ্চে নাটক মঞ্চস্থ করে। নিয়তি বলে, “এই পৃথিবী, এই দেহ, এই সময়—তোমার,” স্বাধীনতা বলে, “এখন এগুলোকে কী অর্থ দেবে, কী আঁকবে তুমি, তা একান্তই তোমার।” তাই জীবন মানে নিয়তির দেওয়া তাস খেলা, আর স্বাধীনতা হলো সেই তাসগুলো কী কৌশলে খেললে, সেই শিল্প। তুমি যদি বিশ্বাস করো সম্পূর্ণ নিয়তি, তাহলে পঙ্গু নিষ্ক্রিয়তা গ্রাস করবে; যদি মানো শুধু স্বাধীনতা, তাহলে অহংকারের মরীচিকায় ভুগবে। বাস্তবিক জ্ঞানী সে, যে নিয়তির অপরিহার্যতাকে মেনে নিয়ে স্বাধীনতার সর্বোচ্চ অনুশীলন করে। ঠিক যেমন নদী জানে, পাহাড়ের ঢাল তার গতিপথ অনেকখানি ঠিক করে দিয়েছে, কিন্তু নিজের প্রবাহের তীব্রতা ও পাথর কাটার গান সে নিজেই রচনা করে।
আরও পড়ুন - ইমানুয়েল কান্টের নৈতিক তত্ত্ব
