যুদ্ধ শব্দটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে ধ্বংসের প্রতিধ্বনি। এটি মানবসভ্যতার সবচেয়ে ভয়ংকর অধ্যায়গুলোর একটি। অথচ ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মানবজাতি প্রায় অবিরাম যুদ্ধ করে চলেছে—সম্পদ, ক্ষমতা, ধর্ম, স্বাধীনতা, জাতীয়তাবাদের নামে কত রক্ত ঝরেছে, তার ইয়ত্তা নেই।
কিন্তু প্রতিটি যুদ্ধের পেছনে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খায়: এই যুদ্ধ কি ন্যায্য? একজন সৈনিক যখন শত্রুকে গুলি করে, একজন রাষ্ট্রনায়ক যখন বোমা ফেলার নির্দেশ দেন, তখন কি তাঁরা নিজেদের সঠিক বলে দাবি করতে পারেন? “ন্যায়যুদ্ধ” বলে কি কিছু হয়, নাকি সব যুদ্ধই শেষ বিচারে ভয়াবহ অন্যায়?
এই ব্লগপোস্টে আমরা যুদ্ধের নৈতিকতা নিয়ে গভীর এক যাত্রায় যাব। দর্শন, ধর্ম, আন্তর্জাতিক আইন, ইতিহাস এবং বাস্তবতার আলোকে খোঁজার চেষ্টা করব সেই কঠিন প্রশ্নের উত্তর: যুদ্ধ কি কখনো ন্যায্য?
অধ্যায় ১: “ন্যায়যুদ্ধ” তত্ত্বের জন্ম—ধর্ম থেকে দর্শনে
যুদ্ধকে ন্যায়সঙ্গত করার প্রচেষ্টা আধুনিক নয়। প্রাচীন গ্রিস, ভারত, চীন—সব জায়গাতেই এ নিয়ে ভাবনা ছিল। কিন্তু সুসংহত “ন্যায়যুদ্ধ তত্ত্ব” (Just War Theory) এসেছে দুই ধারায়: পশ্চিমের গ্রিক-রোমান ও খ্রিস্টীয় ঐতিহ্য এবং পূর্বের ইসলামি ও ভারতীয় দর্শন থেকে।
১.১ অ্যারিস্টটল ও সিসেরোর ভূমিকা
গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল যুদ্ধকে কেবল তখনই ন্যায়সঙ্গত মনে করতেন, যখন তা আত্মরক্ষা বা দুর্বলদের রক্ষার জন্য হয়, এবং এর চূড়ান্ত লক্ষ্য হবে শান্তি। রোমান দার্শনিক সিসেরো বলেছিলেন, “শক্তি প্রয়োগ তখনই ন্যায্য, যখন তা আইনের ভিত্তিতে প্রতিশোধ বা প্রতিরক্ষার জন্য ব্যবহৃত হয়।”
১.২ সেন্ট অগাস্টিন ও খ্রিস্টীয় দৃষ্টিভঙ্গি
চতুর্থ শতাব্দীতে খ্রিস্টীয় ধর্মতাত্ত্বিক সেন্ট অগাস্টিন প্রথমবারের মতো ন্যায়যুদ্ধের ধারণাকে প্রতিষ্ঠা দেন। পাহাড়ের উপদেশে যিশু বলেছিলেন, “যে তোমার ডান গালে আঘাত করে, তার দিকে বাম গালও ফিরিয়ে দাও।” কিন্তু রোম সাম্রাজ্যের পতনের বাস্তবতার মুখে অগাস্টিন যুক্তি দেন, খ্রিস্টানদেরও কখনো কখনো অন্যায় প্রতিরোধে অস্ত্র ধরতে হয়। তাঁর মতে, যুদ্ধ তখনই গ্রহণযোগ্য যখন:
তা ন্যায়সঙ্গত কারণে (Just Cause) হয়, যেমন আগ্রাসন প্রতিহত করা।
বৈধ কর্তৃপক্ষের (Legitimate Authority) নির্দেশে হয়।
এবং সঠিক অভিপ্রায় (Right Intention) নিয়ে হয়, অর্থাৎ প্রতিহিংসা নয়, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য।
১.৩ টমাস অ্যাকুইনাসের তিন শর্ত
ত্রয়োদশ শতাব্দীতে সেন্ট টমাস অ্যাকুইনাস এই তত্ত্বকে আরও পরিশীলিত করেন। তিনি যুদ্ধের ন্যায্যতার জন্য তিনটি মূল শর্ত আরোপ করেন:
সার্বভৌম কর্তৃপক্ষ: যুদ্ধ ঘোষণার এখতিয়ার কেবল রাষ্ট্রপ্রধানের থাকবে।
ন্যায়সঙ্গত কারণ: যুদ্ধ শুধু তখনই হবে যখন একটি জাতি অন্য জাতির কৃত অন্যায়ের শাস্তি বা সংশোধনের জন্য অস্ত্র ধারণ করে।
সঠিক অভিপ্রায়: নিয়ত হতে হবে ভালোকে পাওয়া এবং মন্দকে এড়ানো। নৃশংসতা, প্রতিশোধস্পৃহা বা শক্তিপ্রদর্শন নয়।
১.৪ ইসলামি ও ভারতীয় দর্শনে ন্যায়যুদ্ধ
ইসলামি আইনে ‘জিহাদ’-এর ধারণার একটি অংশ হচ্ছে আত্মরক্ষা ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “তোমরা আল্লাহর রাস্তায় তাদের সাথে যুদ্ধ কর, যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে, কিন্তু সীমা লঙ্ঘন করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমা-লঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।” (সূরা বাকারা ২:১৯০)
প্রাচীন ভারতীয় মহাকাব্য মহাভারতে যুদ্ধের ন্যায্যতা নিয়ে অর্জুনের দ্বিধা ও কৃষ্ণের উপদেশ বিখ্যাত। ভগবদ্গীতায় কৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন, অধর্মের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো ক্ষত্রিয়ের পবিত্র কর্তব্য। তবে এখানেও কিছু নিয়ম ছিল—নিরস্ত্র, স্ত্রী, শিশু, পলায়নরতকে হত্যা করা মহাভারতের যুদ্ধেও নিষিদ্ধ ছিল।
আরও পড়ুন -
অধ্যায় ২: ন্যায়যুদ্ধ তত্ত্বের মূল স্তম্ভ—তিনটি ধাপ
আধুনিক ন্যায়যুদ্ধ তত্ত্ব তিনটি বিভাগে বিভক্ত, যেগুলো যুদ্ধের আগে, চলাকালীন সময় ও পরে কীভাবে নৈতিকতা বজায় রাখা যায়, তার পথনির্দেশ দেয়।
২.১ যুদ্ধ শুরু করার ন্যায্যতা (Jus ad Bellum)
এই ধাপে দেখা হয়, যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি আদৌ ন্যায়সঙ্গত কি না। এর শর্তগুলো হলো:
ন্যায়সঙ্গত কারণ (Just Cause): অন্যায় আক্রমণের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষাই একমাত্র ন্যায়সঙ্গত কারণ। আধুনিক যুগে ‘আসন্ন হুমকি’ প্রতিরোধকেও অনেক সময় ন্যায়সঙ্গত ধরা হয়।
যোগ্য কর্তৃপক্ষ (Competent Authority): যুদ্ধ ঘোষণা কেবল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বৈধ রাষ্ট্রই করতে পারে, কোনো বিদ্রোহী বা জঙ্গি গোষ্ঠী নয়।
সঠিক অভিপ্রায় (Right Intention): লক্ষ্য হতে হবে শান্তি প্রতিষ্ঠা, প্রতিশোধ নয়। যুদ্ধ শেষ হলে পরাজিত শত্রুকেও মর্যাদা দিতে হবে।
শেষ উপায় (Last Resort): কূটনৈতিক সংলাপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, মধ্যস্থতার সব দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরই কেবল অস্ত্র ধরা যাবে।
সাফল্যের যৌক্তিক সম্ভাবনা (Probability of Success): যদি জয়ের সম্ভাবনাই না থাকে তাহলে মানুষ হত্যার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
আনুপাতিকতা (Proportionality): যুদ্ধের কারণে যতটুকু ক্ষতি হবে, তা যুদ্ধের উদ্দেশ্যের তুলনায় কম হবে কি না।
এই শেষোক্ত শর্তটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দেশ যদি একটি ছোট সীমান্ত সংঘর্ষের জেরে পারমাণবিক বোমা ফেলে, তাহলে তা কখনোই ন্যায়সঙ্গত হবে না।
২.২ যুদ্ধকালীন ন্যায্যতা (Jus in Bello)
যুদ্ধ শুরু করা ন্যায্য হলেও, যুদ্ধের পদ্ধতি যদি অন্যায় হয়, তাহলে পুরো যুদ্ধটাই অন্যায় হয়ে যায়। দুটি মূল বাধ্যবাধকতা:
বৈষম্যের নীতি (Discrimination): যোদ্ধা ও বেসামরিক নাগরিকের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করতে হবে। ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক মানুষ হত্যা চিরন্তন যুদ্ধাপরাধ।
আনুপাতিকতা (Proportionality): সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণের সময় অনিচ্ছাকৃত বেসামরিক ক্ষতি যদি প্রত্যাশিত সামরিক লাভের তুলনায় অতিরিক্ত বলে মনে হয়, তবে সেই আক্রমণ বৈধ নয়।
জেনেভা কনভেনশন (Geneva Conventions) যুদ্ধবন্দী, আহত ও চিকিৎসাকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে এই নৈতিকতাকে আইনি কাঠামো দিয়েছে।
২.৩ যুদ্ধ-পরবর্তী ন্যায্যতা (Jus post Bellum)
বিজয়ী পক্ষের জন্য এটি সবচেয়ে বড় নৈতিক পরীক্ষা। যুদ্ধ শেষে শান্তি স্থাপন করতে হবে ন্যায়পরায়ণতা বজায় রেখে। আত্মসমর্পণকারী শত্রু সেনাদের প্রতি নির্মম আচরণ, পরাজিত জাতির উপর অমানবিক প্রতিশোধ নেওয়া—এসব সংশোধনী ন্যায়ের ধারণাকে ভেঙে চুরমার করে দেয়।
অধ্যায় ৩: শান্তিবাদ—অপর পক্ষের যুক্তি
যেখানে ন্যায়যুদ্ধ তত্ত্ব নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে যুদ্ধকে সমর্থন করে, সেখানে শান্তিবাদ (Pacifism) প্রতিটি যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
৩.১ সম্পূর্ণ শান্তিবাদ
মহাত্মা গান্ধী, লিও টলস্টয়, মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের মতো ব্যক্তিত্বরা বিশ্বাস করতেন, কোনো কারণেই হিংসা ন্যায্য হতে পারে না। গান্ধী বলেছিলেন, “চোখের বদলে চোখ নেওয়ার নীতি পুরো পৃথিবীকে অন্ধ করে দেবে।” শান্তিবাদীদের মতে, যুদ্ধ সমস্যার সমাধান করে না, বরং নতুন করে ঘৃণা আর প্রতিশোধের জন্ম দেয়।
৩.২ খ্রিস্টীয় শান্তিবাদ
প্রাথমিক খ্রিস্টধর্মে তিন-চার শতাব্দী পর্যন্ত বেশিরভাগ খ্রিস্টান সেনাবাহিনীতে যোগ দিতেন না। যিশুর শিক্ষা “তরবারি যে ধারণ করে, সে তরবারির আঘাতেই মরবে”—এই নীতি তাদের কাছে যুদ্ধের বিপরীতে দাঁড়ানোর সাহস জোগাত। পরবর্তীতে রোমের রাষ্ট্রধর্মে পরিণত হওয়ার পর অগাস্টিনের মাধ্যমে এই সুর বদলায়, কিন্তু শান্তিবাদী ধারা কখনো পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি।
৩.৩ ব্যবহারিক শান্তিবাদ
এই দৃষ্টিভঙ্গি বলে, যুদ্ধ শুধু অনৈতিক নয়, অকার্যকরও। যুদ্ধ বিপুল সম্পদ ধ্বংস করে, সমাজের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করে এবং শেষ পর্যন্ত কোনো ন্যায্য শান্তি দিতে পারে না।
শান্তিবাদের সমালোচকেরা প্রশ্ন করেন: হিটলারের বাহিনী যখন পোল্যান্ড আক্রমণ করেছিল, তখনও কি কিছু না করাই সঠিক ছিল? কোনো শান্তিবাদী কি বলবেন যে সশস্ত্র প্রতিরোধ না করে আত্মসমর্পণ করাই নৈতিক ছিল? এই জায়গায় এসে ন্যায়যুদ্ধ তত্ত্ব জোরালো হয়।
অধ্যায় ৪: বাস্তবতাবাদীদের চোখে “ন্যায্য যুদ্ধ”—একটি ভ্রম?
রাজনৈতিক বাস্তবতাবাদ (Political Realism) ন্যায়যুদ্ধ তত্ত্বকে নমনীয় অলীক কল্পনা বলে মনে করে। থুসিডাইডিস, নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি, টমাস হবস থেকে শুরু করে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হান্স মরগেনথাউ—সবাই এক সুরে বলেন: যুদ্ধে নৈতিকতার কোনো স্থান নেই। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক শক্তি-রাজনীতির উপর নির্ভর করে। শক্তি অর্জন ও টিকিয়ে রাখাই রাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য। ন্যায়-অন্যায়, নীতিবোধ—এসব কেবল শক্তিধরদের হাতের অস্ত্র। ইতিহাস লেখে বিজয়ীরা।
বাস্তবতাবাদীদের দাবি, ক্রুসেড থেকে শুরু করে ইরাক যুদ্ধ পর্যন্ত অধিকাংশ যুদ্ধই স্বার্থরক্ষার জন্য হয়েছে, পেছনে ন্যায়ের মুখোশ পরে থেকেছে। “ন্যায্য যুদ্ধ” শুধু একটি সুবিধাজনক আখ্যান, যা ভোটার ও আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন আদায়ের কাজে লাগে।
অধ্যায় ৫: ইতিহাসের দর্পণে কিছু গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধের বিচার
৫.১ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯–১৯৪৫)
ন্যায়যুদ্ধ তত্ত্বের পক্ষে এটি সবচেয়ে শক্ত উদাহরণ। হিটলারের নাৎসি বাহিনী একের পর এক দেশ দখল করছিল, ইহুদি গণহত্যা চলছিল ডেথ ক্যাম্পে। এই পরিস্থিতিতে মিত্রবাহিনীর হস্তক্ষেপ কি ন্যায়সঙ্গত ছিল? বেশিরভাগ নীতিবিদের উত্তর ‘হ্যাঁ’। কারণ বিদ্যমান ছিল এবং আগ্রাসন প্রতিহত করার ন্যায়সঙ্গত কারণ ছিল। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় যুদ্ধকালীন ন্যায্যতা নিয়ে: ড্রেসডেন, হিরোশিমা-নাগাসাকিতে নির্বিচার বোমাবর্ষণ—এই গণহত্যাগুলো কীভাবে ন্যায্য হবে? এ নিয়ে মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে পাল্টা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ উঠেছে বারবার।
৫.২ ভিয়েতনাম যুদ্ধ (১৯৫৫–১৯৭৫)
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কমিউনিজম প্রতিরোধের নামে ভিয়েতনামে হস্তক্ষেপ করেছিল। ন্যায়যুদ্ধ তত্ত্বের মাপকাঠিতে এটি ছিল এক বিতর্কিত অধ্যায়। সঠিক কর্তৃপক্ষের ঘাটতি ছিল, আনুপাতিকতার চরম লঙ্ঘন ঘটেছে (যেমন মাই লাই হত্যাযজ্ঞ) এবং শেষ উপায় হিসেবে কূটনীতি পুরোপুরি শেষ হয়নি বলেও অনেকে মনে করেন।
৫.৩ ভারত-পাকিস্তান ১৯৭১ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ
এদিক থেকে দেখলে ১৯৭১ সালের যুদ্ধ একটি জটিল নৈতিক ক্ষেত্র তৈরি করে। পাকিস্তানি বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের উপর নির্মম গণহত্যা চালায়। ভারত যখন হস্তক্ষেপ করে, তখন তা ‘মানবিক হস্তক্ষেপ’ (Humanitarian Intervention) হিসেবে সমর্থন পায় আন্তর্জাতিক মহলের একাংশের। কিন্তু আবারও প্রশ্ন ওঠে, সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ কতটা ন্যায়সঙ্গত?
৫.৪ ইরাক যুদ্ধ (২০০৩)
এটি আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বড় নৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে দাবি করে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে আক্রমণ চালায়। পরবর্তীতে দেখা যায় সেই দাবি মিথ্যা ছিল। “ন্যায়সঙ্গত কারণ” পুরোপুরি ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে। এর ফলে ইরাকের ভয়াবহ ধ্বংস, লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু এবং আইএসের মতো জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থান—সবই এই যুদ্ধের প্রত্যক্ষ পরিণতি। এই যুদ্ধ শেষ বিচারে ন্যায়যুদ্ধের সমস্ত শর্ত ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়।
অধ্যায় ৬: আধুনিক যুদ্ধ ও ন্যায়পরতার নতুন সংকট
একুশ শতকে এসে যুদ্ধের চেহারা পুরোপুরি বদলে গেছে। ন্যায়যুদ্ধ তত্ত্বের পুরনো ছক এই নতুন বাস্তবতায় কতটা প্রযোজ্য, তা নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলছে।
৬.১ সন্ত্রাস-বিরোধী যুদ্ধ ও “আসন্ন হুমকি”
সন্ত্রাসবাদ প্রচলিত যুদ্ধের ধারণাকে ওলট-পালট করে দিয়েছে। প্রতিপক্ষ এখন আর সার্বভৌম রাষ্ট্র নয়, বরং কোনো ভূখণ্ড-বিবর্জিত ছায়া সংগঠন। এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে ‘আসন্ন হুমকি’ ধারণাটি বিপজ্জনকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। একটি সন্দেহভাজন ড্রোন হামলা চালিয়ে অনেক সময় নির্দোষ মানুষ হত্যা করা হয়, যাকে এক্সট্রাজুডিশিয়াল কিলিং বলা হয়। বৈষম্যের নীতি এখানে কার্যত অচল।
৬.২ সাইবার যুদ্ধ
একটি দেশ আরেকটি দেশের বিদ্যুৎ গ্রিড, ব্যাংকিং সিস্টেম বা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় সাইবার আক্রমণ চালাচ্ছে। প্রচলিত অস্ত্র নেই, তবু ধ্বংস বিপুল। সাইবার যুদ্ধকে ন্যায়যুদ্ধের ছকে ফেলতে হলে ‘সশস্ত্র আক্রমণ’-এর সংজ্ঞাই নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে।
৬.৩ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র
কল্পনায় নয়, বাস্তবে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত ড্রোন ও রোবট সেনা যুদ্ধ করছে। তারা কি বৈষম্যের নীতি মানতে সক্ষম? একটি শিশু ও সশস্ত্র বিদ্রোহীর মধ্যে পার্থক্য করতে পারবে না এমন মেশিনের হাতে ট্রিগার তুলে দেওয়া এক নতুন নৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছে।
অধ্যায় ৭: তাহলে যুদ্ধ কি কখনো ন্যায্য? চূড়ান্ত বিশ্লেষণ
একেবারে শেষ প্রশ্নে ফিরে আসা যাক। হাজার বছরের দর্শন, লাখো যুদ্ধের ইতিহাস এবং কোটি শহীদের সাক্ষ্য ঘেঁটে আমরা কী পেলাম?
ন্যায়যুদ্ধ তত্ত্ব আমাদের একটি অত্যন্ত মূল্যবান ‘নৈতিক কম্পাস’ দিয়েছে। এটা মনে করিয়ে দেয়, যুদ্ধ যখন শেষ উপায়, তখন তা হতে হবে নিয়ন্ত্রিত, সংযত এবং ন্যায়ের পথে পরিচালিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই, অথবা গণহত্যা থেকে একটি জাতিকে রক্ষা করতে সামরিক হস্তক্ষেপ—এসব ক্ষেত্রে যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা কঠিন। এখানে যুদ্ধ নৈতিকভাবে অনেকটাই ন্যায্য।
কিন্তু ইতিহাস এও শিখিয়েছে, মানবজাতির সবচেয়ে বড় অভিশাপ হচ্ছে, তারা “ন্যায়ের” নামে সবচেয়ে বড় অন্যায়গুলো করেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে নেতারা প্রায় নিশ্চিতভাবেই একে ন্যায়সঙ্গত বলে আখ্যা দেন। হিটলার দাবি করেছিলেন, পোল্যান্ড না আক্রমণ করলে জার্মান জাতি বিপন্ন হয়ে পড়ত। জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরাককে “মন্দের অক্ষশক্তি” বলে অভিহিত করেছিলেন।
সমস্যা এখানেই। ন্যায্য যুদ্ধের শর্তগুলো এতই নমনীয় এবং ব্যাখ্যাসাপেক্ষ যে, এগুলো কেবল যুদ্ধ-পরবর্তী সুবিধাজনক ইতিহাস লেখার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। যুদ্ধ যখন সত্যিই ন্যায্য হয়, তখন তার প্রয়োজন পড়ে কেন? এর পেছনে থাকে কূটনীতির চরম ব্যর্থতা, ঔপনিবেশিক লোভ, শাসকের নার্সিসিজম, কিংবা গণমানুষের অন্ধ জাতীয়তাবাদী উন্মাদনার ভূমিকা।
অতএব, প্রশ্নের উত্তর অতি-সরলীকরণ করা যাবে না। বরং বলতে হবে:
যুদ্ধ কখনো কখনো ‘অনিবার্য’ হতে পারে, কিন্তু ‘ন্যায্য’ বলে দাবি করার জন্য অসাধারণ সততার প্রয়োজন। এবং ইতিহাসের আলোকে মানুষের সেই সততা বিরল।
একজন সাধারণ সুইস দার্শনিক হেনরি ফ্রেডেরিক আমিয়েল যা লিখেছিলেন, সেটাই হয়তো শেষ সত্য: “যুদ্ধ একটি জঘন্য ব্যাপার, তবুও দাসত্বের চেয়ে কম জঘন্য।”
সেই ‘দাসত্ব’—অত্যাচারী, গণহত্যাকারীর পায়ের নিচে নিষ্পেষিত হওয়ার ভয়াবহতা—যুদ্ধের চেয়েও বড় অন্যায় কি না, সেটাই যুদ্ধ সমর্থকদের শেষ যুক্তি। আর এর বিপরীতে প্রশ্ন থেকে যায়: যুদ্ধ শেষে শান্তি এলেও যে পোড়া মাটি, বিধ্বস্ত নগরী আর মায়ের কোল খালি করা সন্তান থেকে যায়, তারা কি নিঃশেষে গৃহীত? এই দ্বিধা মানবসভ্যতার চিরন্তন এক বেদনা, যা আগামী দিনের দার্শনিক, রাষ্ট্রনায়ক এবং সাধারণ মানুষকেও ভাবিয়ে যাবে।
আরও পড়ুন -
