কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি

    utilitarianism: সর্বাধিক সুখের তত্ত্ব

    utilitarianism: সর্বাধিক সুখের তত্ত্ব

    একটি ট্রলি অনিয়ন্ত্রিতভাবে পাঁচজন শ্রমিকের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে। আপনি একটি লিভারের পাশে দাঁড়িয়ে। লিভার টিপলে ট্রলিটি অন্যদিকে ঘুরে যাবে, কিন্তু সেখানে একজন শ্রমিক কাজ করছে। আপনি কী করবেন? কিছু করবেন না, তাতে পাঁচজন মারা যাবে; অথবা লিভার টিপে একজনকে বলি দিয়ে পাঁচজনকে বাঁচাবেন? দর্শনের ছাত্র থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সবাই কোনো না কোনো সময় এ প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন। এই প্রশ্নের সহজাত যে উত্তরটি উঠে আসে, তা হলো— “পাঁচজনকে বাঁচাতে একজনকে বলি দেওয়া ভালো, কারণ তাতে মোট সুখ বেশি এবং দুঃখ কম।'' চিন্তার এই সোজা সরল রেখাটিই গোটা একটি নীতিবাদী দর্শনের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে, যার নাম উপযোগবাদ (Utilitarianism)

    কিন্তু এটা কি সত্যিই এত সোজা? একজন নিরীহ মানুষকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বলি দেওয়া কি ন্যায়সংগত? যদি সেই একজন আপনার মা হন? কিংবা যদি সমাজের ৯০% মানুষের সুখের জন্য ১০% মানুষকে চিরস্থায়ী দাসত্বে রাখা হয়, তাহলে কি সেটা নৈতিক হবে? উপযোগবাদ এইসব প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। এই ব্লগ পোস্টে আমরা জেরেমি বেন্থামের ‘সুখের গণনা’ থেকে শুরু করে পিটার সিঙ্গারের ‘প্রাণী মুক্তি’ পর্যন্ত দীর্ঘ এই তাত্ত্বিক যাত্রাপথ গভীরভাবে বিশ্লেষণ করব।

    ‘ভালো’ আর ‘খারাপ’-এর সংজ্ঞা কী? ধর্ম বলে, ঈশ্বরের আদেশ; কান্ট বলেন, যুক্তির নিরঙ্কুশ নির্দেশ; অ্যারিস্টটল বলেন, সদগুণের চর্চা। কিন্তু উপযোগবাদ বলে, একটাই মাপকাঠি—সুখ (Pleasure) ও দুঃখ (Pain)। যে কাজ মোট সুখ বাড়ায়, সেটাই নৈতিক; যে কাজ মোট দুঃখ বাড়ায়, সেটাই অনৈতিক। এত সহজ ও বাস্তব নৈতিকতার মানদণ্ড আর হতে পারে না। কিন্তু এই সরলতার আড়ালেই লুকিয়ে আছে দর্শনের সবচেয়ে গভীর ও উত্তপ্ত বিতর্কগুলো।

    উপযোগবাদ একটি ফলাফলবাদী (Consequentialist) তত্ত্ব। অর্থাৎ, কোনো কাজের নৈতিক মূল্য নির্ভর করে তার ফলাফলের (Consequence) ওপর। একটি কাজ নিজস্ব গুণে ভালো বা খারাপ নয়; বরং, তা যে ফল উৎপন্ন করে, তার মাধ্যমেই বিচারিত হবে। আর ফলাফল পরিমাপ করতে হবে সুখ-দুঃখের নিরিখে। এ কারণেই একে বলা হয় ‘সর্বাধিক সুখের তত্ত্ব’ (Greatest Happiness Principle)

    এ ধারণা আধুনিক গণতন্ত্র, জননীতি, অর্থনীতি এবং ব্যক্তি-অধিকারের জগতে যে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে, তা বোঝার জন্যই এই বিশ্লেষণ।

    উপযোগবাদ কী?

    উপযোগবাদের মূল কথা তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়ানো:

    ১. সুখবাদের (Hedonism) মূল্যতত্ত্ব: একমাত্র সুখই নিজ মূল্যে ভালো, দুঃখ নিজ মূল্যে খারাপ। অন্যান্য কিছু ভালো (স্বাস্থ্য, জ্ঞান, সম্পর্ক) কেবল সুখ আনে বলেই ভালো।
    ২. ফলাফলবাদের নীতিতত্ত্ব: কোনো কাজের নৈতিকতা বিচার করতে হবে তার ফলাফলের ভিত্তিতে, কাজটির পেছনের উদ্দেশ্য বা নিয়মের ভিত্তিতে নয়।
    ৩. সর্বজনীনতার নীতি: প্রতিটি ব্যক্তির সুখ সমান গুরুত্বপূর্ণ। ‘প্রত্যেককে এক হিসেবে গণনা করবে, একের বেশি কাউকে নয়’, বলেছিলেন বেন্থাম। অর্থাৎ, আমার বন্ধুর সুখ আমার চেয়ে বেশি মূল্যবান নয়। সামগ্রিক সুখের হিসাব হবে ব্যক্তিগত সুখের গাণিতিক যোগফল।

    এর সরল রূপ: এমন কাজ করো যাতে সর্বাধিক সংখ্যক মানুষের সর্বাধিক সুখ হয় (Greatest Happiness of the Greatest Number)

    একটি উদাহরণ: একটি হাসপাতালে পাঁচজন মরণাপন্ন রোগী—একজনের দরকার হৃদপিণ্ড, একজনের ফুসফুস, একজনের কিডনি, ইত্যাদি। যদি একজন সুস্থ ভবঘুরেকে মেরে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাঁচজনে প্রতিস্থাপন করা হয়, তাহলে পাঁচজন বাঁচবে, মরবে একজন। উপযোগবাদের হিসাবে মোট সুখ-দুঃখের অঙ্কে এটা নৈতিকভাবে সঠিক হবে। কিন্তু আমাদের বিবেক বলবে এটা নৃশংস হত্যাকাণ্ড। এই দ্বন্দ্বই উপযোগবাদের সৌন্দর্য ও সংকট।

    দার্শনিক ভিত্তি: জেরেমি বেন্থাম ও সুখের ক্যালকুলাস

    ইংরেজ দার্শনিক জেরেমি বেন্থাম (১৭৪৮-১৮৩২) হলেন আধুনিক উপযোগবাদের জনক। লন্ডনের কুইন্স কলেজে অধ্যয়নকালীন তিনি এ ধারণা পান যে, মানবজীবন দুটি সার্বভৌম প্রভুর দ্বারা শাসিত—সুখ ও দুঃখ। তিনি ঘোষণা করলেন, “প্রকৃতি মানুষকে দুই সার্বভৌম কর্তার অধীনে রেখেছে: সুখ ও দুঃখ।”

    বেন্থামের সময়ে ইংল্যান্ডের আইন ও শাসনব্যবস্থা ছিল পুরোনো প্রথা, অভিজাততন্ত্র ও ধর্মীয় গোঁড়ামিতে জর্জরিত। আইনকে যুক্তিনির্ভর, বৈজ্ঞানিক ও গণতান্ত্রিক ভিত্তিতে দাঁড় করাতেই ছিল তাঁর লক্ষ্য। তিনি তৈরি করলেন ‘হেডোনিক ক্যালকুলাস’ (সুখের গণনা পদ্ধতি)। তার মতে, যেকোনো কাজের সুখ-দুঃখের পরিমাণ মাপা সম্ভব সাতটি মাপকাঠিতে:

    ১. তীব্রতা (Intensity): সুখটা কত জোরালো?
    ২. স্থায়িত্ব (Duration): কতক্ষণ স্থায়ী হবে?
    ৩. নিশ্চিততা (Certainty): তা পাওয়া কতটা নিশ্চিত?
    ৪. সান্নিধ্য (Propinquity): কত তাড়াতাড়ি পাওয়া যাবে?
    ৫. ফলপ্রদতা (Fecundity): আরো সুখ সৃষ্টির সম্ভাবনা কতটা?
    ৬. বিশুদ্ধতা (Purity): সঙ্গে দুঃখ মিশ্রিত হওয়ার সম্ভাবনা কতটা?
    ৭. ব্যাপ্তি (Extent): কতজন মানুষ এই সুখ-দুঃখের আওতায় আসবে?

    বেন্থাম মনে করতেন, এই মাপকাঠিতে সংসদ ও বিচারকরা গণনার পর যে কাজ বা আইনে সবচেয়ে বেশি ‘ইউটিলিটি’ (Utility) বা উপযোগ পাওয়া যাবে, সেটাই করা উচিত। তিনি জেল, দারিদ্র্য আইন, শিক্ষাব্যবস্থা, এমনকি সমকামিতার অপরাধীকরণের বিরুদ্ধেও যুক্তি দিয়েছিলেন। তাঁর দর্শন ছিল বিপ্লবী—কারণ এখানে রাজা, পুরোহিত বা রীতি-নীতির বদলে সাধারণ মানুষের সুখই আইনের ভিত্তি হলো।

    তবে বেন্থামের তত্ত্বে সুখের কোনো মানগত পার্থক্য ছিল না। একটি শিশুর খেলনা পাওয়ার সুখ এবং শেক্সপিয়ার পড়ার সুখ তাঁর হিসাবে শুধু তীব্রতা ও স্থায়িত্বে ভিন্ন হতে পারে, মানে নয়। এই জায়গাতেই আসেন জন স্টুয়ার্ট মিল।

    আরও পড়ুন - সক্রেটিস কেন মৃত্যুদণ্ড পেয়েছিলেন?

    জন স্টুয়ার্ট মিল: উচ্চ-নিম্ন সুখ ও মানের ধারণা

    জন স্টুয়ার্ট মিল (১৮০৬-১৮৭৩) পিতা জেমস মিল কর্তৃক কঠোর বেন্থামীয় শিক্ষায় বড় হয়েছিলেন। ছোটবেলাতেই গ্রিক, ল্যাটিন, দর্শন, অর্থনীতিতে পণ্ডিত হয়ে ওঠেন। কিন্তু কৈশোরে এক তীব্র মানসিক সংকটে তিনি উপলব্ধি করলেন যে, বেন্থামের যান্ত্রিক সুখবাদ তাকে জীবনের কোনো গভীর অর্থ দেয়নি। তাই তিনি উপযোগবাদকে পরিমার্জিত করলেন।

    তিনি বললেন, সুখের পরিমাণ নয়, গুণমান গুরুত্বপূর্ণ। বুদ্ধিবৃত্তিক, নৈতিক ও নান্দনিক সুখগুলো (কবিতা পড়া, বন্ধুত্ব, দর্শন) দৈহিক সুখ (খাওয়া, ঘুম) থেকে উচ্চতর। তিনি একটি বিখ্যাত বাক্য লেখেন:

    “একজন অসন্তুষ্ট মানুষ হয়ে থাকা, একটি সন্তুষ্ট শূকর হয়ে থাকার থেকে ভালো; একজন অসন্তুষ্ট সক্রেটিস হয়ে থাকা, একটি সন্তুষ্ট বোকা হয়ে থাকার থেকে ভালো।”

    এই গুণগত পার্থক্য বিচার করবেন কীভাবে? মিল বললেন, তার জন্য ‘যোগ্য বিচারক’ (Competent Judges) দরকার, যারা উভয় প্রকার সুখ ভোগ করেছে এবং উচ্চতরটিকে অগ্রাধিকার দেয়। মানবিক মর্যাদা ও বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ তার কাছে নিছক সুখ-যন্ত্র হওয়ার চেয়ে বড় হয়ে উঠল। মিলের এই সংশোধন উপযোগবাদকে একদিকে যেমন আরও মনুষ্যোচিত করল, অন্যদিকে বেন্থামের স্পষ্ট গণনাকে জটিল করে তুলল।

    মিল আরেকটি বড় কাজ করলেন: তিনি উপযোগবাদকে ন্যায়বিচার ও ব্যক্তি-অধিকারের তত্ত্ব হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করলেন। তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি ও সামগ্রিক সুখ বিবেচনা করলে দেখা যাবে, ব্যক্তিস্বাধীনতা, সত্যবাদিতা ও ন্যায়পরায়ণতার মতো সর্বজনীন নিয়মগুলোই প্রকৃতপক্ষে সর্বোচ্চ সুখ নিশ্চিত করে। সুতরাং, উপযোগবাদ মানে স্বৈরাচার বা সংখ্যাগরিষ্ঠের অত্যাচার নয়।

    উপযোগবাদের প্রধান দুই শাখা: কার্য বনাম নিয়ম উপযোগবাদ

    তত্ত্বটির অভ্যন্তরেও গুরুত্বপূর্ণ বিভাজন রয়েছে।

    • কার্য-উপযোগবাদ (Act Utilitarianism): বেন্থামের ধ্রুপদি রূপ। প্রতিটি নির্দিষ্ট কাজের আগে তার একক ফলাফল বিচার করতে হবে। একটি কাজ ভালো, যদি অপর যেকোনো কাজের চেয়ে বেশি সুখ উৎপন্ন করে। যেমন: ডাক্তার যদি একজন রোগীকে মেরেও পাঁচজনকে বাঁচায়, সেটা নৈতিক। সমস্যা হলো, এতে কোনো স্থায়ী নৈতিক নিয়ম দাঁড়ায় না, মিথ্যা বলা বা প্রতিশ্রুতি ভাঙা সহজেই বৈধ হয়ে যেতে পারে যদি তাতে সাময়িক সুখ বাড়ে।

    • নিয়ম-উপযোগবাদ (Rule Utilitarianism): জন স্টুয়ার্ট মিলের ধারণার অনুসারী। এখানে প্রশ্ন হয়, “সামগ্রিক সমাজে কোন নিয়মটি চালু থাকলে দীর্ঘমেয়াদে সর্বাধিক সুখ আসবে?” সেই নিয়ম অনুযায়ী কাজ বিচার হবে। যেমন, “ডাক্তাররা রোগী হত্যা করবে না” – এই নিয়ম সমাজে সার্বিক সুখ বাড়ায় (লোকের আস্থা, নিরাপত্তা, ন্যায়বোধ) যদিও বিরল ক্ষেত্রে তা ভাঙলে সাময়িক সুখ বাড়ত। তাহলে, নিয়ম-উপযোগবাদী ডাক্তার ভবঘুরেকে মারবে না, কারণ নিয়ম ভাঙার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি অনেক বেশি।

    আরও সূক্ষ্ম রূপ আছে, যেমন মোট সুখ বনাম গড় সুখ উপযোগবাদ। কেবলমাত্র মোট মানুষের সংখ্যা বাড়িয়ে সুখ যোগফল বাড়ানো কি নৈতিক? যদি জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয় কিন্তু সবাই সামান্য কম সুখী হয়, তবু মোট সুখ বেশি হতে পারে। এটা ‘অনৈতিক জনসংখ্যা বিস্ফোরণ’-এর মতো আপত্তি তোলে। এ নিয়ে আধুনিক ফলিত নীতিশাস্ত্রে ডেরেক পারফিট-এর মতো দার্শনিকেরা গভীর বিশ্লেষণ করেছেন।

    ‘সুখ’ পরিমাপের পদ্ধতি: হেডোনিক ক্যালকুলাস

    বেন্থামের সুখের গণনা ছিল একটি উচ্চাভিলাষী প্রকল্প। কিন্তু বাস্তবে সুখ কি পরিমাপ করা যায়? আধুনিক অর্থনীতি ও স্নায়ুবিজ্ঞান এখন ‘হ্যাপিনেস ইকোনমিক্স’ ও ‘ওয়েল-বিয়িং রিসার্চ’-এর মাধ্যমে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে।

    বেন্থামের সাতটি মাপকাঠি দিয়ে কিছু অপারগতা রয়ে গেছে: দুজন ভিন্ন ব্যক্তির সুখের তীব্রতা তুলনা করা কঠিন; একজন মায়ের সন্তানের হাসি দেখার সুখ আরেকজন ব্যবসায়ীর মুনাফার সুখ একই স্কেলে মাপা যায় না। তাছাড়া, মানুষের পছন্দ বলে এক কথা, কিন্তু তাদের প্রকৃত সুখ আরেক জায়গায় থাকতে পারে।

    ‘এক্সপেরিয়েন্স মেশিন’ নামে বিখ্যাত একটি চিন্তন পরীক্ষার কথা ভাবা যাক। রবার্ট নজিক বললেন, ধরুন একটি মেশিন আপনাকে সারাজীবন কেবলি সুখের অনুভূতি দেবে—আপনি প্রেম, সাফল্য, আনন্দ সব বাস্তব বলে অনুভব করবেন, আসলে কিছুই ঘটবে না। আপনি কি সেই মেশিনে প্লাগ-ইন করবেন? অধিকাংশ মানুষ ‘না’ বলে। এর অর্থ, আমরা কেবল সুখের অনুভূতি চাই না, আমরা চাই বাস্তবতা, অর্জন, সত্যিকারের সম্পর্ক। এই আপত্তি উপযোগবাদের ‘সুখই একমাত্র অন্তিম ভালো’ – বিশ্বাসকে কঠিন চ্যালেঞ্জে ফেলে।

    তা সত্ত্বেও, আধুনিক ‘সাবজেক্টিভ ওয়েল-বিয়িং’ গবেষণা এবং ‘কোয়ালিটি-অ্যাডজাস্টেড লাইফ ইয়ার’ (QALY) ধারণা চিকিৎসা বাজেট নির্ধারণে বেন্থামীয় গণনাকে নতুনরূপে ফিরিয়ে এনেছে।

    পক্ষে যুক্তি: কেন উপযোগবাদ শক্তিশালী এবং আকর্ষণীয়

    উপযোগবাদ এত প্রভাবশালী কেন? এর কিছু কারণ:

    • সরলতা ও স্পষ্টতা: একটি একক নীতি—সর্বোচ্চ সুখ। জটিল নৈতিক দ্বিধায় এটি দ্রুত পথ দেখায়।

    • সর্বজনীনতা ও নিরপেক্ষতা: এতে ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি, প্রজাতির ভেদাভেদ নেই। সবার সুখের হিসাব সমান।

    • বৈজ্ঞানিক মনোভাব: এটি পরিমাপযোগ্য, অভিজ্ঞতানির্ভর ও যুক্তিভিত্তিক। কোনো অতিপ্রাকৃত বা রহস্যময় বিধানের ওপর নির্ভর করে না।

    • সংস্কার-উপযোগী: বেন্থাম ও মিল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত, এ তত্ত্ব সমাজের কুসংস্কার, দাসপ্রথা, নারীনিপীড়ন, প্রাণী-নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অন্যতম ধারালো অস্ত্র। যখন প্রচলিত নীতি বা ধর্মগ্রন্থ বৈষম্যকে সমর্থন করে, উপযোগবাদ প্রশ্ন করে: “কিন্তু এর ফলে কার কতটা দুঃখ বাড়ছে?”

    • ফলিত নীতি নির্ধারণ: জনস্বাস্থ্য, করব্যবস্থা, পরিবেশ আইন—সব জায়গায় খরচ-সুবিধা বিশ্লেষণ নিঃসন্দেহে একধরনের উপযোগী হিসাব।

    বিপক্ষে যুক্তি: প্রধান নৈতিক আপত্তি ও সমালোচনা

    উপযোগবাদের বিপক্ষে যত আপত্তি, সম্ভবত অন্য কোনো নৈতিক তত্ত্বের বিরুদ্ধে তত নয়। সেগুলো হলো:

    ক. ব্যক্তি অধিকার লঙ্ঘন: পাঁচজনের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ জোগাড় করতে একজনকে হত্যা, কিংবা সমাজের বিনোদনের জন্য নির্দোষ গ্ল্যাডিয়েটরকে সিংহের সামনে ছোঁড়া কি গ্রহণযোগ্য? উপযোগবাদের হিসাবে, যদি সংখ্যাগরিষ্ঠের উল্লাস বিশাল হয়, তাহলে হ্যাঁ। আর এটাই ভয়ংকর। এখানে ন্যায়বিচার (Justice) নামক এক জিনিস বিসর্জিত হয়। কান্টীয় মতে, ব্যক্তিকে কখনোই ‘কেবলমাত্র উপায়’ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না, সে নিজেই ‘লক্ষ্য’। উপযোগবাদ ব্যক্তিকে সংখ্যায় পরিণত করে।

    খ. সুখের একক ও পরিমাপ: বেন্থামের ধারণায় সব সুখ সমান হলেও, বাস্তবে আমরা গুণগত পার্থক্য করি। নির্বোধের সস্তা সুখে সমাজের কোনো কল্যাণ নেই বলে আমরা মনে করি, মিলও তা বলেছেন। কিন্তু মিলের অবস্থান বেন্থামের নিরপেক্ষ গণনাকে দুর্বল করে দেয়। ‘যোগ্য বিচারক’ যদি অভিজাত শ্রেণি হয়, তবে তা পিতৃতান্ত্রিকতা।

    গ. বিশেষ সম্পর্ক ও নৈতিক দায়িত্ব: আমরা মনে করি, নিজের মা-বাবা, সন্তান, বন্ধুর প্রতি আমাদের বিশেষ দায়িত্ব আছে। উপযোগবাদী হিসাবে, যদি অনাথাশ্রমে দান করলে মোট সুখ বেশি বাড়ে, তাহলে নিজের সন্তানের জন্য খরচ না করে অনাথদের জন্য করা উচিত। কিন্তু সহজাত নৈতিক বোধ তা মানে না। উপযোগবাদ এখানে অত্যধিক দাবিদার (Overdemanding)।

    ঘ. প্রতিশ্রুতি ও ন্যায়সংগত প্রত্যাশা: যদি প্রতিশ্রুতি ভেঙে দেওয়ায় মোট সুখ বেশি হয়, তাহলে উপযোগবাদ তা করতে বলে। কিন্তু তা মানুষের পারস্পরিক আস্থা ও ন্যায়বিচারের মূল্যবোধে আঘাত করে।

    ঙ. জনসংখ্যা ও নেতিবাচক উপযোগবাদ: মোট সুখ বাড়াতে আরো মানুষ তৈরি করা কি কর্তব্য? যদি অসুখী মানুষের সংখ্যা বেড়ে মোট সুখও বেড়ে যায় (কারণ তারা অল্প সুখী), তাহলে সেটা পীড়াদায়ক। কেউ কেউ বলেন, উপযোগবাদের আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত দুঃখ কমানো ('নেগেটিভ ইউটিলিটারিয়ানিজম'), যা আবার মানবতাবিরোধী চরমে নিয়ে যেতে পারে (সকল দুঃখের স্থায়ী সমাপ্তি হিসেবে সর্বনাশ)।

    মিলের উত্তর ও তত্ত্বের আধুনিক বিবর্তন

    জন স্টুয়ার্ট মিল এসব আপত্তির অনেকগুলোর উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ‘ন্যায়বিচার’ নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি দেখানোর চেষ্টা করেছেন, কেন দীর্ঘমেয়াদি ও সার্বিক সুখ হিসেব করলেই দেখা যাবে নির্দোষকে শাস্তি দেওয়া, প্রতারণা করা, স্বাধীনতা হরণ করা ইত্যাদি সর্বোচ্চ সুখনীতি বিরুদ্ধ—কারণ এগুলো সমাজের নিরাপত্তাবোধ ও আস্থার ভিত নষ্ট করে, যা মৌলিক সুখের শর্ত। অর্থাৎ, উপযোগবাদী নীতিতেই ব্যক্তি-অধিকার রক্ষিত হওয়া উচিত।

    বিংশ শতাব্দীতে প্রেফারেন্স ইউটিলিটারিয়ানিজম (পছন্দ-উপযোগবাদ) এসেছে। এতে সুখ-দুঃখের বদলে ব্যক্তির পছন্দ বা আকাঙ্ক্ষা পূরণকেই কল্যাণের মাপকাঠি করা হয়। যেমন, কেউ হয়তো কঠিন সত্য জানতে চায়, যা সাময়িক দুঃখ দেয়। তাকে মিথ্যা বলে ‘সুখী’ রাখার পরিবর্তে তার যুক্তিসিদ্ধ পছন্দকে সম্মান দেখানো হয়। আবার অগ্রগণ্যবাদী উপযোগবাদীরা বলেন, ‘সুখ’ একমাত্র উপাদেয় নয়; জ্ঞান, স্বাধীনতা, সৌন্দর্য ইত্যাদি অভিজ্ঞতার মাধ্যমেও কল্যাণ আসে।

    অন্যদিকে, রিচার্ড হেয়ারের মতো দার্শনিক ‘দ্বি-স্তরী উপযোগবাদ’ (Two-Level Utilitarianism) প্রস্তাব করেন। দৈনন্দিন জীবনে আমরা যেসব স্বজ্ঞা ও সাধারণ নৈতিক নিয়ম (‘মিথ্যা বলবে না’, ‘হত্যা করবে না’) মেনে চলি, সেগুলোর ভিত্তি হলো এগুলোর দীর্ঘমেয়াদী উপযোগিতা। কিন্তু ভয়াবহ সংকটের সময়ে (যেমন যুদ্ধকালীন) আমাদের সেই স্বজ্ঞার ওপরে উঠে সমালোচনামূলক চিন্তা করে কার্য-উপযোগবাদের স্তরে যেতে হবে। এভাবে তত্ত্বটি অনেক নমনীয় হয়েছে।

    ফলিত নীতিশাস্ত্রে উপযোগবাদ: চিকিৎসা, আইন, অর্থনীতি ও প্রাণী কল্যাণ

    উপযোগবাদ একাডেমিক বিতর্কে আটকে থাকেনি, বাস্তব বিশ্বেও তার গুরুত্ব অপরিসীম।

    • স্বাস্থ্যনীতি: হাসপাতালের সীমিত বাজেটে কোন চিকিৎসায় অর্থ ঢালা হবে? স্বাস্থ্য অর্থনীতিতে খরচ-কার্যকারিতা বিশ্লেষণ ও ‘কোয়ালিটি-অ্যাডজাস্টেড লাইফ ইয়ার’ (QALY) হলো সরাসরি উপযোগী গণনা। কোভিডকালীন ট্রায়াজ—কাকে ভেন্টিলেটর দেওয়া হবে? বয়স্ক না যুবক? যেখানে মোট সম্ভাব্য জীবন-বর্ষ ও সুখের হিসাব করা হয়।

    • ফৌজদারি আইন: কঠোর শাস্তি প্রয়োগের মাধ্যমে অপরাধ দমন—সম্ভাব্য অপরাধীর কষ্ট বনাম ভবিষ্যৎ অপরাধীর হাত থেকে সমাজের বহু মানুষের কষ্ট হ্রাসের হিসাব।

    • পরিবেশ অর্থনীতি: জলবায়ু পরিবর্তন রোধে কত খরচ করতে হবে? বর্তমান প্রজন্মের ব্যয় বনাম ভবিষ্যতের শত কোটি মানুষের কষ্ট ও ধ্বংস রোধ।

    • পশু কল্যাণ ও প্রাণী অধিকার: উপযোগবাদের অন্যতম বিপ্লবী প্রয়োগ এখানেই। বেন্থাম লিখেছিলেন, “প্রশ্নটা এটা নয় যে, তারা যুক্তি দিতে পারে কিনা? অথবা, তারা কথা বলতে পারে কিনা? বরং, তারা কষ্ট পেতে পারে কিনা?” যেহেতু প্রাণীরা দুঃখ বোধ করে, তাদের কষ্ট উপযোগী হিসাবে আসবে। আধুনিক দার্শনিক পিটার সিঙ্গার তার ‘এনিম্যাল লিবারেশন’ বইতে এই যুক্তি দিয়েই দেখান যে, খামারে পশুর ভোগান্তি এবং পরিবেশের ক্ষতির বিপরীতে আমিষ খাওয়ার স্বল্প সুখ হিসাব করলে নিরামিষ চর্চা নৈতিকভাবে বাধ্যতামূলক। তার মতে, প্রজাতিবাদ (Speciesism) বর্ণবাদ বা লিঙ্গবাদের মতোই অযৌক্তিক।

    বাংলাদেশ ও ভারতীয় উপমহাদেশের প্রেক্ষিতে এক ঝলক

    উপমহাদেশে নৈতিকতার আলোচনা মূলত ধর্ম ও সম্প্রদায়কেন্দ্রিক। কিন্তু আমরা অজান্তেই নীতি নির্ধারণে উপযোগী হই। গণভবনের বিদ্যুৎ বিল মওকুফ না করে দরিদ্রদের ভর্তুকি দেওয়া, কিংবা টিকাদান কর্মসূচিতে কয়েকজনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি নিয়েও কোটি মানুষকে বাঁচানো—এসবই উপযোগী নীতির উদাহরণ।

    এখানকার ভোগ্যপণ্যের বাজারেও ‘মোট সুখের’ এক অদ্ভুত প্রতিফলন দেখা যায়। অল্প দামে অনেক মানুষের প্রয়োজন মেটানো—মাইক্রো ইকোনমিকসে যার নাম ‘উপযোগ সর্বোচ্চকরণ’। তবে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও পারিবারিক বন্ধনের নিরিখে কঠোর উপযোগবাদী সিদ্ধান্ত (যেমন, নিজের বৃদ্ধ পিতামাতার চেয়ে বেশী কর দিলে সমাজের বেশি উপকার হবে) এখনো সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের মুখে পড়ে।

    একটি বিশেষ দৃষ্টান্ত: রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটে বাংলাদেশ সরকার যে বিপুল মানবিক সহায়তা দিয়েছে, তাকে একটি উপযোগী হিসাব দিয়েও ব্যাখ্যা করা যায়—আট লাখ মানুষের জীবন ও মৌলিক কষ্ট হ্রাসের যে বিপুল সুফল, তার কাছে সাময়িক অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ বহন করা সর্বাধিক সুখের নীতির সাথেই সঙ্গতিপূর্ণ। অবশ্য, অনুভূতির বিষয়টি এখানে বড় ভূমিকা রাখে; কিন্তু নীতির চূড়ান্ত যুক্তি উপযোগী কাঠামো ছাড়া দাঁড়ায় না।

    উপযোগবাদ বনাম অন্যান্য নীতিতত্ত্ব: তুলনামূলক বিশ্লেষণ

    উপযোগবাদকে ভালোভাবে বুঝতে হলে তার প্রতিদ্বন্দ্বী তত্ত্বগুলোর দিকে তাকাতে হবে।

    • কান্টীয় নীতিশাস্ত্র (Deontology) : এতে নৈতিকতা নির্ভর করে সর্বজনীন যুক্তির নিয়ম (Categorical Imperative) পালনের ওপর, ফলাফলের ওপর নয়। মিথ্যা বলা সবসময় অন্যায়, তাতে যতই সুখ আসুক। উপযোগবাদী বলেন, বাস্তবতা উপেক্ষা করে এমন নিরঙ্কুশ নীতি বিপর্যয় ডেকে আনে (যেমন, খুনিকে সত্য বলা)।

    • সদগুণ নীতিশাস্ত্র (Virtue Ethics) : অ্যারিস্টটলের মতে ভালো জীবন হলো সদগুণের চর্চা, সুখের যোগফল নয়। একজন উপযোগবাদী পাল্টা বলেন, সদগুণগুলো মূল্যবান কেন? কারণ এগুলো ব্যক্তি ও সমাজের দীর্ঘমেয়াদি সুখ নিশ্চিত করে।

    • সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব: রাষ্ট্র ও নৈতিকতার ভিত্তি হলো পারস্পরিক চুক্তি। উপযোগবাদ বলে, চুক্তির থেকেও গভীরে আছে সুখ-দুঃখের বাস্তবতা, যা চুক্তিবিহীন প্রাণী বা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও প্রযোজ্য।

    উপযোগবাদের শক্তি হলো এটি একটি মেটা-নীতি, যা অন্যান্য নৈতিক নীতিকেও ব্যাখ্যা করতে পারে। কিন্তু এর দুর্বলতা হলো সবকিছুকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হয়তো ব্যক্তিগত অখণ্ডতা ও ন্যায়ের অনন্যতা হারিয়ে ফেলা।

    একুশ শতকের জটিল পৃথিবীতে সর্বাধিক সুখের প্রাসঙ্গিকতা

    ক্লোনিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু বিপর্যয়, বৈশ্বিক মহামারি—আমাদের যুগের নৈতিক সংকটগুলি ক্রমশ জটিলতর ও বৈশ্বিক হচ্ছে। এমন সময়ে উপযোগবাদ তার সরল অথচ ব্যাপক প্রয়োগযোগ্য কাঠামোর জন্য অপরিহার্য। কারণ যেকোনো নীতির প্রশ্নে এটি মূল্যবান একটি প্রশ্ন সামনে আনে: “এর ফলে বাস্তবে কাদের কতটা কষ্ট বাড়ল বা কমল?”

    হয়তো নিখুঁত সুখের ক্যালকুলাস কোনোদিন হবে না। একজন নিরীহ মানুষকে ফাঁসি দেওয়ার নির্মম হিসাব আমাদের সহজাত ন্যায়বোধ কোনোদিন মেনে নেবে না। কিন্তু উপযোগবাদ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নৈতিকতা আকাশ থেকে পড়া কিছু নির্বচনীয় বাণী নয়; এটি আমাদের চারপাশের রক্ত-মাংসের মানুষের কষ্ট ও আনন্দের জমাখরচ।

    সর্বাধিক সুখের তত্ত্ব তাই চূড়ান্ত উত্তর নয়, বরং সঠিক প্রশ্ন জিজ্ঞাসার একটি অমূল্য পদ্ধতি। 

    আরও পড়ুন - মানুষের বুদ্ধিমত্ত্বার সীমা কোথায়?

    একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

    নবীনতর পূর্বতন

    نموذج الاتصال