পাশ্চাত্য দর্শনের ভিত গড়ে দেওয়া মানুষটিকে তারই প্রিয় নগরী হেমলকের পেয়ালা ধরিয়ে দিয়েছিল। ঘটনাটি আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের, কিন্তু এর প্রতিধ্বনি এখনো সমান প্রাসঙ্গিক। এথেন্সের গণতান্ত্রিক আদালত যে কারণে ৭০ বছর বয়সী এক খালি পায়ে হাঁটা দার্শনিককে মৃত্যুদণ্ড দেয়, তা হল হল রাষ্ট্র ও ব্যক্তিমানুষের চিন্তার স্বাধীনতার এক অনিবার্য সংঘাত। তবে অভিযোগপত্রের কাঠখোট্টা লাইনগুলোই কি প্রকৃত কারণ? নাকি তার পেছনে লুকিয়ে ছিল গভীর রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, প্রজন্মগত দ্বন্দ্ব, অথবা স্বয়ং সক্রেটিসেরই একটি আত্মঘাতী দার্শনিক অবস্থান? এই ব্লগ পোস্টে আমরা সেই বিচার, তার পটভূমি, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ, সক্রেটিসের জবাব এবং তার মৃত্যুর দার্শনিক তাৎপর্য গভীর থেকে বিশ্লেষণ করব।
খ্রিষ্টপূর্ব ৩৯৯ সালের বসন্ত। এথেন্সের ‘হেলিয়াইয়া’ নামের জনগণের আদালতে বিচারাধীন এক বৃদ্ধ। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ— ‘নগরের দেবদেবীতে বিশ্বাস করে না, নতুন দেবতার প্রবর্তন করে এবং যুবকদের বিপথগামী করে।’ এই অভিযোগের শাস্তি হিসেবে প্রস্তাবিত মৃত্যুদণ্ড। সেই বৃদ্ধ যদি সাধারণ কেউ হতেন, তাহলে হয়তো ঘটনাটি ইতিহাসের ধুলোয় হারিয়ে যেত। কিন্তু তিনি সক্রেটিস। তাঁর কোনো লেখা নেই, কোনো প্রতিষ্ঠান নেই; অথচ তাঁর নাম দর্শনের ইতিহাসে অমর। যে নগরী বাক্স্বাধীনতা ও মুক্তবুদ্ধির চর্চার গর্ব করত, সেই এথেন্স কেন তার শ্রেষ্ঠতম প্রশ্নকর্তাকে হত্যা করল? এই প্রশ্নের সহজ কোনো উত্তর নেই। এটি একাধারে আইনি, রাজনৈতিক ও দার্শনিক। সক্রেটিসের বিচার মানে কেবল একজন ব্যক্তির বিচার নয়— এটি মুক্তচিন্তা ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের চিরন্তন সংঘাতের একটি প্রতীকী অধ্যায়।
২. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: একটি আহত নগরী
সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ড বুঝতে হলে প্রথমে তাকাতে হবে তৎকালীন এথেন্সের দিকে। এটি ছিল পেলোপনেসীয় যুদ্ধের (খ্রি.পূ. ৪৩১-৪০৪) পরবর্তী সময়। প্রায় তিন দশকের এই যুদ্ধে স্পার্টার কাছে এথেন্সের চূড়ান্ত পরাজয় ঘটে। সাম্রাজ্য ধ্বসে পড়ে, অর্থনীতি বিপর্যস্ত, নগরের দেয়াল ভেঙে ফেলা হয় এবং স্পার্টার চাপে এথেন্সের গণতন্ত্র বিলুপ্ত করে ‘ত্রিশ অত্যাচারী’ (Thirty Tyrants) নামে একটি কঠোর কুলীনতান্ত্রিক শাসন চাপিয়ে দেওয়া হয়। এই ত্রিশ জনের শাসন চলে মাত্র আট মাস (খ্রি.পূ. ৪০৪-৪০৩), কিন্তু তার মধ্যে তারা নিষ্ঠুরভাবে শত শত গণতন্ত্রপন্থী নাগরিককে হত্যা করে, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে এবং আতঙ্কের রাজত্ব কায়েম করে।
গণতন্ত্রপন্থীরা পরে বিদ্রোহ করে ত্রিশ অত্যাচারীদের উৎখাত করে এবং পুনরায় গণতন্ত্র পুনঃস্থাপন করে। তবে এই পুনঃস্থাপন ছিল চরম সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন। নতুন সরকার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে, যাতে অতীতের ঘটনার জন্য সরাসরি বিচার না করা যায়। কিন্তু আঘাতটা গভীর ছিল। নগরের আত্মবিশ্বাস চূর্ণ, নৈতিক ভিত নড়বড়ে। এমন সময় একটি প্রশ্ন ঘুরতে থাকে— এথেন্সের এই অধঃপতনের জন্য দায়ী কারা? সহজ উত্তর ছিল, সেইসব ব্যক্তি যারা চিরাচরিত মূল্যবোধ, ধর্ম ও গণতান্ত্রিক রীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল। আর সেদিক থেকে সক্রেটিস ছিলেন একেবারে নিখুঁত বলির পাঁঠা।
৩. সক্রেটিসের জীবন ও পরিচয়
সক্রেটিস (খ্রি.পূ. ৪৭০-৩৯৯) ছিলেন একজন এথেনীয় ভাস্কর ও ধাত্রীর পুত্র। জীবনের প্রথম দিকে তিনি পাথর কাটার কাজ করলেও ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত জীবনযাত্রা গ্রহণ করেন। বাজার, আড্ডাখানা, ব্যায়ামাগার— যেখানে মানুষ জমায়েত হতো, সেখানেই তিনি দাঁড়িয়ে যেতেন এবং মানুষকে নৈতিকতা, ন্যায়, জ্ঞান, ধর্ম প্রভৃতি নিয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করতেন। তাঁর পদ্ধতি ছিল প্রশ্নের মাধ্যমে অগ্রসর হওয়া, সরাসরি কিছু শেখানো নয়। একে বলা হয় ‘সক্রেটিক এলেনচাস’ বা ‘সক্রেটীয় খণ্ডনমূলক পদ্ধতি’। তিনি বলতেন, “আমি কেবল এটুকুই জানি যে আমি কিছুই জানি না।”
তিনি কোনো বেতন নিতেন না, দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন কাটাতেন। খালি পা, একটিমাত্র মোটা চাদর— এই ছিল তাঁর চিরচেনা রূপ। সাহসী এই মানুষটি যুদ্ধেও অংশ নিয়েছিলেন; পটিডিয়া, ডেলিওন ও এম্পিপোলিসের যুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব প্রদর্শন করেছিলেন। তাঁর কথা শুনতে যুবক, অভিজাত ও কৌতূহলীরা ভিড় করত। আবার অনেকে বিরক্তও হতো, কারণ তিনি সমাজের প্রতিষ্ঠিত পণ্ডিত, রাজনীতিক ও কারিগরদের অজ্ঞ প্রমাণ করে দিতেন প্রকাশ্যে। এইভাবে তিনি একই সঙ্গে একদল ভক্ত ও একদল তীব্র শত্রু তৈরি করে ফেলেছিলেন।
৪. রাষ্ট্রদ্রোহের ছায়া: ত্রিশ অত্যাচারী ও সক্রেটিসের শিষ্যরা
সক্রেটিসের বিরুদ্ধে যারা ক্ষুব্ধ ছিল তাদের হাতে সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল তাঁর কয়েকজন শিষ্যের রাজনৈতিক ভূমিকা। এঁদের মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত হলো আলসিবিয়াদেস এবং ক্রিতিয়াস।
আলসিবিয়াদেস ছিলেন সক্রেটিসের ঘনিষ্ঠ তরুণ বন্ধু, পরবর্তীতে এথেনীয় সেনাপতি। তিনি অত্যন্ত মেধাবী, সুদর্শন কিন্তু উচ্চাভিলাষী ও নীতিভ্রষ্ট ছিলেন। পেলোপনেসীয় যুদ্ধ চলাকালে তিনি এথেন্সের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে প্রথমে স্পার্টা, তারপর পারস্যের পক্ষ নেন। তার কারসাজিতে এথেন্সের ব্যাপক ক্ষতি হয়। যদিও সক্রেটিস কখনোই আলসিবিয়াদেসের কাজ সমর্থন করেননি, তবু সাধারণ নাগরিকের মনে সন্দেহ জন্মানো স্বাভাবিক ছিল— এই দার্শনিকই তো তাকে গড়ে তুলেছিল!
আরও ভয়ংকর ছিলেন ক্রিতিয়াস, যিনি ছিলেন ত্রিশ অত্যাচারী গোষ্ঠীর প্রধানতম নেতা। তিনি ছিলেন সক্রেটিসের ছাত্র। ক্ষমতায় এসে তিনি নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালান। যদিও সক্রেটিস এই আট মাসের শাসনামলে প্রকাশ্যে তাদের অন্যায় কখনো সমর্থন করেননি; এমনকি, একটি ঘটনায় জানা যায়, ক্রিতিয়াস যখন লিওন নামের এক নিরপরাধকে হত্যা করতে বলে, সক্রেটিস সেই আদেশ অমান্য করে বাড়ি চলে আসেন। তা সত্ত্বেও গণতান্ত্রিক পুনরুদ্ধার হওয়ার পর নাগরিকদের কাছে সক্রেটিসের নামটি হয়ে উঠেছিল অভিজাত একনায়কতন্ত্রের সঙ্গে জড়িত চিন্তার প্রতীক। ক্ষমার কারণে সরাসরি রাজনৈতিক অভিযোগে বিচার সম্ভব ছিল না, তাই অভিযোগ আনা হয় ধর্ম ও নৈতিকতার নামে।
৫. আনুষ্ঠানিক অভিযোগ: অনুশাসনহীনতা ও নাস্তিক্য
সক্রেটিসের বিরুদ্ধে যে তিন ব্যক্তি অভিযোগপত্র জমা দিয়েছিলেন তারা হলেন মেলেটাস (কবি), অ্যানাইটাস (গণতান্ত্রিক রাজনীতিক) ও লাইকোন (বাগ্মী)। অভিযোগের ভাষ্য ছিল এরকম:
“সক্রেটিস অপরাধ করছে, কারণ সে নগর যে দেবদেবীতে বিশ্বাস করে তাদের স্বীকার করে না, বরং নতুন ধরনের দৈব বিষয় প্রবর্তন করছে; আর সে যুবকদের বিপথগামী করছে। প্রস্তাবিত শাস্তি: মৃত্যুদণ্ড।”
প্রথম অভিযোগটি ‘ইম্পাইটি’ (asebeia) বা ধর্মহীনতা। গ্রিক সমাজে ধর্ম ছিল রাষ্ট্র ও জনজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নগরের দেবদেবীদের অসম্মান করা মানে রাষ্ট্রের ভিতেই আঘাত করা। সক্রেটিস মাঝে মাঝে ‘ডাইমনিয়ন’ নামে এক ধরনের অন্তর্দৈব নির্দেশনার কথা বলতেন, যা শোনাত নতুন দেবতার ধারণার মতো। তা ছাড়া তিনি নৃতাত্ত্বিক গ্রিক দেবতাদের কাহিনি নিয়ে ব্যঙ্গ করতেন।
দ্বিতীয় অভিযোগ, যুবকদের বিপথগামী করা। এর পেছনে ছিল রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। সক্রেটিসের প্রশ্ন করার পদ্ধতি তরুণদের চিন্তার জগতে বিপ্লব আনত। তারা বড়দের অবাধ্য হতে শিখত, কর্তৃত্বকে প্রশ্ন করতে শিখত। ঐতিহ্যবাদী এথেনীয় সমাজের কাছে এটি ছিল একেবারে ভয়ংকর ব্যাপার।
অ্যানাইটাস ছিলেন এই মামলার মূল চালিকা শক্তি। তিনি ছিলেন একজন প্রভাবশালী গণতান্ত্রিক নেতা এবং ত্রিশ অত্যাচারী প্রতিরোধের একজন নায়ক। তিনি সক্রেটিসকে ‘গণতন্ত্রের শত্রু’ তৈরির কারিগর হিসেবে দেখতেন।
আরও পড়ুন -
৬. বিচারপর্ব: ‘অ্যাপোলজিয়া’য় সক্রেটিসের আত্মপক্ষ সমর্থন
বিচারটি হয়েছিল ৫০১ জনের একটি জুরির সামনে (কিছু সূত্র অনুযায়ী ৫০০ বা ৫০১)। প্লেটোর ‘অ্যাপোলজিয়া’ থেকে আমরা সক্রেটিসের সেই বিখ্যাত আত্মপক্ষ সমর্থনের ভাষণ পাই। কিন্তু ভাষণটি মোটেও ক্ষমাপ্রার্থনামূলক ছিল না; বরং ছিল এক দার্শনিক বক্তৃতা ও তীব্র কটাক্ষের সমাহার।
সক্রেটিস বলতে শুরু করেন, তিনি আদালতের ভাষায় কথা বলতে জানেন না, বরং সরল সত্য বলবেন। তারপর তিনি গল্প করেন, কীভাবে ডেলফির দৈববাণী বলেছিল “সক্রেটিসের চেয়ে জ্ঞানী কেউ নেই”। এই বাণী পরীক্ষা করতে গিয়ে তিনি রাজনীতিক, কবি ও কারিগরদের প্রশ্ন করেছেন এবং আবিষ্কার করেছেন যে তারা কিছুই জানে না, কিন্তু জানে না বলেও অহংকার করে; অথচ তিনিই প্রকৃত জ্ঞানী, কারণ তিনি অন্তত জানেন যে তিনি কিছুই জানেন না। জুরির এই বড় অংশই ছিল সেইসব কারিগর ও সাধারণ নাগরিক, যাদের তিনি আগে অপমান করেছিলেন। তাদের সামনে এই যুক্তি একপ্রকার উস্কানিই ছিল।
মেলেটাসকে জেরা করার সময় সক্রেটিস তাকে হাস্যকর অবস্থায় ফেলে দেন। তিনি প্রশ্ন করেন, “কে যুবকদের ভালো করে?” মেলেটাস উত্তর দেন— “বিচারকেরা, জুরিরা, আইনসভার সদস্যরা।” সক্রেটিস বিদ্রুপ করে বলেন, তাহলে তো পুরো এথেন্সই যুবকদের উন্নতি করে, কেবল একজন সক্রেটিস ছাড়া। এই কৌশল যুক্তিগতভাবে চমৎকার হলেও আদালতের মন জয় করার পক্ষে ছিল আত্মঘাতী।
সক্রেটিস স্পষ্ট ঘোষণা দেন, “আমার বিরুদ্ধে আসল অভিযোগ হলো, আমি যখন বলি, ‘অনিরীক্ষিত জীবন বেঁচে থাকার যোগ্য নয়’, তখন বহু লোক নিজেদের অপমানিত বোধ করে।” এখানে তিনি পুরো বিচার প্রক্রিয়াকে একটি প্রতীকী যুদ্ধে রূপ দেন— একদিকে সত্য ও নৈতিকতা, অন্যদিকে জনতার ভুল ধারণা।
৭. কেন সক্রেটিস জিততে পারলেন না: গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণ
জুরির প্রথম ভোটে সক্রেটিস অল্প ব্যবধানে দোষী সাব্যস্ত হন। প্রাচীন সূত্র মতে, মাত্র ৩০টি ভোটের ব্যবধান ছিল (২৮০ বিপক্ষে, ২২০ পক্ষে)। অর্থাৎ প্রায় ৪৪% জুরি সদস্য তাকে নির্দোষ মনে করেছিলেন! তাহলে কেন শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড হলো?
প্রথমত, সক্রেটিস একটি সুবিচার পেতে আগ্রহী ছিলেন না। বরং তিনি চেয়েছিলেন তাঁর মৃত্যু যেন একটি দার্শনিক শিক্ষা হয়ে থাকে। তিনি যখন সাজার প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগ পেলেন, তখন তিনি বললেন, “রাষ্ট্রের উপকারী ব্যক্তি হিসেবে আমার প্রিটানিয়ামে (নগরের সম্মানিত অতিথি ভবনে) বিনা খরচে আজীবন খাওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত।” এই উক্তি চরম অহংকার হিসেবে দেখা হয়। এরপর জুরির চাপে একটি অল্প জরিমানা প্রস্তাব করলেও দ্বিতীয় ভোটে মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে ব্যবধান আরও বেড়ে যায় (৩৬০ পক্ষে, ১৪০ বিপক্ষে)।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক আবহাওয়া তখন বিষাক্ত। সাধারণ ক্ষমার কারণে সক্রেটিসকে সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে বিচার করা না গেলেও জুরির মনে বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে তিনি সেই ‘অভিজাত চক্রের’ গুরু, যারা এথেন্সকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। অ্যানাইটাস এই ক্ষোভকে ব্যবহার করেছিলেন।
তৃতীয়ত, সক্রেটিসের সমালোচনার ধরন। এথেনীয় গণতন্ত্র ‘আইসেগোরিয়া’ (সবার বক্তৃতার অধিকার) ও ‘প্যারেসিয়া’ (স্পষ্টভাষিতা) মূল্যবোধে বিশ্বাস করলেও, সক্রেটিসের কৌশল সরাসরি ব্যক্তিকে অপমান করে তাদের সামাজিক মর্যাদা নষ্ট করত। যাদের তিনি প্রশ্ন করতেন তারা প্রায়ই গিয়ে তরুণদের বলত, “সক্রেটিস তোমাদের বিপথে নিয়ে যাচ্ছে।” তিনি যে সোফিস্ট নন, অর্থাৎ বেতন নিয়ে বাগাড়ম্বর শেখান না, তা সাধারণ জনগণের কাছে পরিষ্কার ছিল না। তাদের চোখে তিনিও এক বিপজ্জনক বুদ্ধিজীবী ছাড়া কিছুই নন।
৮. দার্শনিক কারণ: গ্যাডফ্লাই, এলেনচাস ও অজ্ঞতার প্রজ্ঞা
সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ডের বিশ্লেষণে দার্শনিক স্তরটি সবচেয়ে গভীর। তিনি নিজেকে ‘গ্যাডফ্লাই’ (ডাঁশ) বলতেন— যে পতঙ্গ একটি অলস ঘোড়াকে যেমন কামড়ে সক্রিয় করে, তেমনি তিনি এথেন্স নামের রাষ্ট্ররূপী ঘোড়াটিকে জাগিয়ে রাখতে চান। কিন্তু যেকোনো রাষ্ট্রই এইরকম ডাঁশকে পছন্দ করে না; শেষ পর্যন্ত তাকে মেরে ফেলতে চায়।
তাঁর পুরো পদ্ধতিটিই ছিল নেতিবাচক— খণ্ডনমূলক। তিনি কখনো বলেননি ন্যায় কী, বরং প্রশ্ন করতেন “তুমি ন্যায় বলতে কী বোঝ?” ‘ইউথিফ্রো’ সংলাপে যখন ইউথিফ্রো বলে, “ধার্মিকতা হলো দেবতারা যা পছন্দ করেন,” সক্রেটিস প্রশ্ন করেন, “কর্ম ধার্মিক বলে কি দেবতারা পছন্দ করেন, না দেবতারা পছন্দ করেন বলে তা ধার্মিক?” এই প্রশ্নের গভীরতা সরাসরি ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত নাড়িয়ে দেয়। তরুণ ইউথিফ্রো বা আরও অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন, কিন্তু কোনো বিকল্প পান না। সমাজের কাছে এটি শুধু ধ্বংসাত্মক মনে হয়।
তাঁর ‘অজ্ঞতার প্রজ্ঞা’র ধারণা, প্রচলিত মূল্যবোধের প্রতি এটাই বোঝায় যে কোনোকিছুই প্রশ্নোর্ধ্ব নয়। কিন্তু ৫ম শতাব্দীর এথেন্সে ধর্ম, বীরত্ব, এমনকি গণতন্ত্রকেও প্রশ্নাতীত মনে করা হতো। সক্রেটিস যখন জিজ্ঞাসা করতেন, “রাজনীতি কী শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছা, না কি প্রকৃত জ্ঞানের ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত?” তখন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা নড়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক।
সুতরাং, সক্রেটিসের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রকৃতপক্ষে একটি নির্দিষ্ট জীবনপদ্ধতির বিরুদ্ধে অভিযোগ— যে পদ্ধতি পরীক্ষা ও যাচাইকে সবকিছুর ওপরে স্থান দেয়, প্রথা বা কর্তৃত্বকে নয়।
৯. রায় ও সাজা: মৃত্যুকে বেছে নেওয়া
দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর আইন অনুযায়ী অভিযুক্ত ও অভিযোগকারী উভয় পক্ষকে সাজার প্রস্তাব দিতে হয়েছিল। সক্রেটিস প্রথমে মজা করে প্রস্তাব দেন, ‘পিটানিয়ামে বিনা খরচে ভোজন’, কারণ তিনি নিজেকে নগরের হিতকারী মনে করেন। এটি নিছক কৌতুক নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক বার্তা: নগর যে তাকে শাস্তি দেবে, তার বদলে পুরস্কার দেওয়া উচিত। এরপর গম্ভীর হয়ে একটি জরিমানা প্রস্তাব করেন (প্রথমে ১০০ ড্রাখমা, পরে প্লেটো ও বন্ধুদের অনুরোধে ৩,০০০ ড্রাখমা)। কিন্তু অ্যানাইটাস ও মেলেটাসের পক্ষ থেকে মৃত্যুদণ্ডই চূড়ান্ত প্রস্তাব হিসেবে জোরালো ছিল। জুরির কাছে সক্রেটিসের ব্যবহার ছিল ক্ষমাহীন; তাই দ্বিতীয় ভোটে আরও বেশি সংখ্যক জুরি মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে ভোট দেয়।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে ত্রিশ দিন দেরি হয়েছিল, কারণ তখন ডেলোসে ধর্মীয় মিশন পাঠানো হয়েছিল, যে সময়ে কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা নিষিদ্ধ।
১০. পালানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান: ‘ক্রিটো’র নৈতিক ভিত্তি
সক্রেটিসের বন্ধু ও শিষ্যরা জেল থেকে পালানোর বন্দোবস্ত করে ফেলেছিলেন। গার্ডকে ঘুষ দেওয়া হয়েছিল, জাহাজও তৈরি ছিল। ক্রিটো নামের এক অনুগত ধনী বন্ধু সক্রেটিসকে পালানোর জন্য কাকুতি-মিনতি করেন— তার নিন্দা হবে, বন্ধু বলে যদি টাকা খরচ না করে; স্ত্রী-সন্তান এতিম হবে, ইত্যাদি। কিন্তু সক্রেটিস ‘ক্রিটো’ সংলাপে যেসব যুক্তি দেন, তা নৈতিক দর্শনের এক রত্নভাণ্ডার।
তিনি বলেন, অন্যায়ের প্রতিশোধ অন্যায় দিয়ে নেওয়া যায় না। রাষ্ট্রের আইন ভেঙে পালানো মানে রাষ্ট্রের সঙ্গে করা চুক্তি ভঙ্গ করা। তিনি ‘রাষ্ট্রের রূপক’ তৈরি করেন: এথেন্সের আইন যেন একজন ব্যক্তি, যে তাকে জন্ম দিয়েছে, শিক্ষা দিয়েছে, নাগরিক করেছে। সেই আইন তাকে বলে, “তোমার জীবনের প্রতিটি ধাপে তুমি আমাদের সমর্থন করেছ, এখন একবার প্রতিকূল সিদ্ধান্ত এলে তুমি ধ্বংস করতে চাও?” সক্রেটিস উত্তর দেন, যদি তিনি পালান, তাহলে তিনি যে ন্যায়ের কথা এতদিন বলে এসেছেন তার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করবেন। আর সর্বোপরি, একজন দার্শনিকের মৃত্যুকে ভয় করা উচিত নয়, কারণ দর্শন চর্চা করা মানেই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হওয়া। এই দৃঢ়তা তাঁকে স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করতে উদ্বুদ্ধ করে।
১১. হেমলকের পেয়ালা: মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
মৃত্যুর দিন সকালে সক্রেটিসের স্ত্রী জ্যানথিপ্পি, তিন পুত্র ও বন্ধু-শিষ্যরা জেল কক্ষে জড়ো হন। প্লেটোর ‘ফিয়েডো’ সংলাপে সেই শেষ মুহূর্তের করুণ অথচ শান্ত বর্ণনা আছে। সক্রেটিস তাদের বলেন, কাঁদবেন না। একজন দার্শনিকের দেহাবসান কেবল আত্মার মুক্তি। তিনি স্নান করেন, স্ত্রী-সন্তানকে বিদায় জানিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে শেষবারের মতো আত্মা ও অমরত্ব নিয়ে আলোচনা করেন। তারপর সূর্যাস্তের আগে কারারক্ষক বিষমিশ্রিত হেমলকের পেয়ালা নিয়ে এলে তিনি সম্পূর্ণ প্রশান্তভাবে তা পান করেন। কিছুক্ষণ হাঁটাচলা করে যখন পা অবশ হতে থাকে, তিনি শুয়ে পড়েন। শেষ মুহূর্তে ক্রিটোকে বলেন, “আমরা আস্ক্লেপিয়াসের কাছে একটি মোরগ দিতে ঋণী, সেটা শোধ কোরো।” (আস্ক্লেপিয়াস আরোগ্যের দেবতা। এই উক্তির প্রতীকী ব্যাখ্যা হলো, মৃত্যুতে জীবনরোগ থেকে আরোগ্য লাভ হয়েছে)।
সক্রেটিসের মৃত্যুকে ঘিরে যতই দার্শনিক সৌন্দর্য আরোপ করা হোক, বাস্তবতা একটাই: এথেন্সের হাতে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল আইনসঙ্গতভাবে।
১২. আধুনিক ব্যাখ্যা ও মৃত্যুর দার্শনিক উত্তরাধিকার
ইতিহাসবিদ ও দার্শনিকেরা সক্রেটিসের বিচার ও মৃত্যু নিয়ে বহু ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ই. এফ. সি. লুডভিগ মনে করেন, এটি ছিল গণতন্ত্রের পরীক্ষায় আইনের আত্মহত্যা। আই. এফ. স্টোন তাঁর ‘The Trial of Socrates’ গ্রন্থে যুক্তি দেন, সক্রেটিস সত্যিই গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ছিলেন; তিনি মনে করতেন রাজনীতি করা উচিত জ্ঞানীদের, সাধারণ জনগণের নয়। তাই গণতন্ত্রের দৃষ্টিতে তাঁর শাস্তি ন্যায্য ছিল। অনেকের মতে সক্রেটিস ইচ্ছা করেই এমন আচরণ করেছিলেন যাতে মৃত্যুদণ্ড হয়, কারণ তাঁর দর্শনের পূর্ণতার জন্য একজন শহিদের প্রয়োজন ছিল।
তবে সব তর্ক ছাপিয়ে গিয়ে সক্রেটিসের উত্তরাধিকার দাঁড়িয়ে থাকে চিন্তার স্বাধীনতার প্রাচীনতম দলিল হিসেবে। তাঁর মৃত্যু স্পষ্ট করে যে, সমাজ যখন নিজের ভিত নিয়ে প্রশ্ন করা সহ্য করতে পারে না, তখন সত্যের সন্ধানকারীকে বলি দিতে দ্বিধা করে না। পরবর্তীকালে তাঁর শিষ্য প্লেটো একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন, অ্যারিস্টটল লেখেন নীতিশাস্ত্র, এবং পুরো পাশ্চাত্য দর্শন সক্রেটিসের প্রশ্ন করার উত্তরাধিকার বহন করে।
গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে আজ বাক্স্বাধীনতা সংবিধানের অঙ্গ, কিন্তু সক্রেটিসের প্রতি যা ঘটেছিল, তা প্রতিনিয়ত সতর্ক করে যে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতই যদি চূড়ান্ত সত্য হয়, তবে ব্যক্তির মুক্তচিন্তা বিপন্ন হয়। আবার একই ঘটনা এও দেখায় যে আইন ও রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের দায়িত্ব কী গভীর হতে পারে— নাগরিক অবাধ্যতার সীমা কোথায়।
কেন সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ড ইতিহাসের অনিবার্য অধ্যায়
সুতরাং, সক্রেটিস কেন মৃত্যুদণ্ড পেয়েছিলেন? কারণ তাঁর পুরো অস্তিত্ব ছিল একটি জীবন্ত প্রশ্নবোধক চিহ্ন। তিনি ধর্মহীনতাবাদী নন, বরং ধর্মের গভীরতর অর্থ খুঁজতেন। তিনি যুবকদের বিপথগামী করেননি; বরং তাদের চিন্তা করতে শিখিয়েছিলেন, যা যে কোনো কাঠিন্যগ্রস্ত সমাজের কাছে হুমকি মনে হয়। তাঁর বিচার হয়েছিল একটি আহত, আতঙ্কিত ও প্রতিশোধপরায়ণ এথেন্সে, যেখানে তাঁর শিষ্যদের অপরাধের বোঝা তাঁর ওপর চেপে বসেছিল। আর তিনি নিজেও মৃত্যুকে বেছে নিয়েছিলেন, কারণ আইনের প্রতি দার্শনিক আনুগত্য না ভেঙে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে, অনিরীক্ষিত জীবনের চেয়ে মৃত্যু অনেক গৌরবময়।
আরও পড়ুন -
