মহাবিশ্বে আমরা কি একা?
রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে অসংখ্য তারার মেলা দেখেছেন নিশ্চয়ই। সেই বিশালতার মাঝে মনে হয়েছে, এই অসীম মহাবিশ্বে কি আমরা একা? কোথাও কি আমাদের মতো প্রাণের অস্তিত্ব আছে? এই প্রশ্ন হাজার হাজার বছর ধরে মানুষকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। বিজ্ঞান এখন উত্তর দেয়ার দ্বারপ্রান্তে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আমাদের সৌরজগতের বাইরে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন গ্রহ (এক্সোপ্লানেট) আবিষ্কার করছেন, আর আধুনিক টেলিস্কোপগুলো সেগুলোর বায়ুমণ্ডলে জীবনের সম্ভাব্য রাসায়নিক স্বাক্ষর খুঁজছে।
এই ব্লগ পোস্টে আমরা সেই রোমাঞ্চকর সফরে যাবো। জানবো কীভাবে বিজ্ঞানীরা এই দূরের গ্রহগুলো খুঁজে পান, বর্তমানে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় গ্রহগুলো কোনগুলি এবং এলিয়েন প্রাণের খোঁজে বিজ্ঞান আজ কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে।
এক্সোপ্লানেট কী এবং কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
এক্সোপ্লানেট বা বহির্গ্রহ হলো আমাদের সৌরজগতের বাইরে অন্য কোনো নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করা গ্রহ। ১৯৯০ সালের আগেও এদের অস্তিত্ব নিয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রথমবারের মতো ১৯৯২ সালে পোলটারজি নামক পালসার নক্ষত্রের চারপাশে কয়েকটি গ্রহ পাওয়া গেলেও সেগুলো ছিল একেবারেই অনাকাঙ্খিত পরিবেশে। এরপর ১৯৯৫ সালে এক বৈপ্লবিক আবিষ্কার হয়। সুইস জ্যোতিঃপদার্থবিদ মাইকেল মেয়র ও দিদিয়ে কুয়েলজ প্রথমবারের মতো একটি সূর্যের মতো নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণরত এক্সোপ্লানেট (৫১ পেগাসি বি) আবিষ্কার করেন। সেই রাতারাতি বদলে যায় জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাস।
কিভাবে খোঁজে বিজ্ঞানীরা এক্সোপ্লানেট?
দূরের গ্রহকে সরাসরি দেখা প্রায় অসম্ভব, কারণ নক্ষত্রের প্রচণ্ড আলোর কাছে গ্রহের প্রতিফলিত আভা নিঃশেষ হয়ে যায়। তাই বিজ্ঞানীরা পরোক্ষ পদ্ধতি ব্যবহার করেন।
ট্রানজিট পদ্ধতি (Transit Method): কোনো গ্রহ যখন তার নক্ষত্রের সামনে দিয়ে যায়, তখন নক্ষত্রের আলো মিটমিট করে। কেপলার ও টেস টেলিস্কোপ বেশিরভাগ গ্রহই এই পদ্ধতিতে আবিষ্কার করেছে।
রেডিয়াল ভেলোসিটি (Radial Velocity): গ্রহের অভিকর্ষ টান নক্ষত্রকেও সামান্য দোলা দেয়। নক্ষত্রের বর্ণালীর ডপলার শিফট মেপে এই পদ্ধতিতে গ্রহ খোঁজা হয়। এই পদ্ধতির মাধ্যমেই প্রথম এক্সোপ্লানেট আবিষ্কৃত হয়।
ডাইরেক্ট ইমেজিং: অত্যাধুনিক টেলিস্কোপের করোনাগ্রাফ ব্যবহার করে কোনো কোনো দৈত্যাকার গ্রহের ছবি তোলা যায়। তবে এটি এখনও কঠিন এবং সীমিত।
জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ: নতুন যুগের সূচনা
যদি এক্সোপ্লানেটের ইতিহাসকে ‘বিফোর জেমস ওয়েব’ ও ‘আফটার জেমস ওয়েব’ ভাগ করা যায়, তাহলে সেটা মোটেই বাড়িয়ে বলা হবে না। ১০ বিলিয়ন ডলারের এই টেলিস্কোপটি এক্সোপ্লানেটের বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। হাবল টেলিস্কোপ দিয়ে কেবল পানির উপস্থিতি শনাক্ত করা গেলেও জেমস ওয়েব অতি-লাল আলোয় মিথেন, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, সোডিয়ামসহ আরও অনেক অণুর সন্ধান দিতে পারে।
🚨 সাম্প্রতিক আবিষ্কার: সম্প্রতি জেমস ওয়েব বায়োসিগনেচারের সন্ধানে একটি সম্ভাবনাময় অগ্রগতি ঘোষণা করেছে। K2-18 b নামের একটি গ্রহের বায়ুমণ্ডলে মিথেন ও কার্বন-ডাই-অক্সাইডের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এগুলো পৃথিবীর জৈব প্রক্রিয়ার অন্যতম স্বাক্ষর। যদিও এখনই নিশ্চিত হওয়া যায়নি, গবেষণা ক্ষেত্রটি আরও গতিশীল হয়েছে।
‘গোল্ডিলক্স জোন’ এবং বাসযোগ্য গ্রহের তালিকা
প্রাণের জন্য প্রথম শর্ত হলো তরল পানি। সেজন্য নক্ষত্রের আশেপাশে এমন একটি অঞ্চল থাকতে হবে, যেখানে তাপমাত্রা অতিরিক্ত কম বা বেশি না হয়ে ‘সমান’ থাকে; এই অঞ্চলের নামই গোল্ডিলক্স জোন বা বাসযোগ্য অঞ্চল। ২০২৬ সালের একটি যুগান্তকারী গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির ‘গায়া’ মিশন ও নাসার আর্কাইভের তথ্য ব্যবহার করে সম্পূর্ণ নতুন করে বাসযোগ্য গ্রহের তালিকা তৈরি করেছেন। বিশাল যাচাই-বাছাই শেষে তারা ৪৫টি শিলাময় গ্রহ পেয়েছেন, যেগুলো হয়তো প্রাণ ধারণের উপযোগী। এরমধ্যে আরও কঠোর নিয়মে ২৪টিকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সবচেয়ে সম্ভাবনাময় এক্সোপ্লানেটের তালিকা (২০২৬ আপডেট)
১. TRAPPIST-1 e: পৃথিবী থেকে ৪০ আলোকবর্ষ দূরে লাল বামন নক্ষত্রের বাসযোগ্য অঞ্চলে অবস্থিত এই পৃথিবী-সদৃশ গ্রহটি বর্তমানে সর্বোচ্চ আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। সম্প্রতি জেমস ওয়েবের তথ্যে নাইট্রোজেন সমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডলের সম্ভাবনা দেখা গেছে।
২. TOI-715 b: ‘সুপার-আর্থ’ শ্রেণির এই গ্রহটি বিজ্ঞানীদের টপ টার্গেট।
৩. K2-18 b: সুবৃহৎ ‘সাব-নেপচুন’ গ্রহটি বাসযোগ্য অঞ্চলে অবস্থিত। জেমস ওয়েব সম্প্রতি এখানে কার্বন বহনকারী অণু ও মিথেন পেয়েছে।
৪. Proxima Centauri b: আমাদের সবচেয়ে কাছের (মাত্র ৪.২৪ আলোকবর্ষ) নক্ষত্রের গ্রহ। লাল বামনের অতি সক্রিয় পরিবেশ বড় চ্যালেঞ্জ।
৫. LHS 1140 b: ‘হায়েস গোল্ডিলক্স জোনে’ অবস্থিত আরেকটি সম্ভাবনাময় সুপার-আর্থ।
SETI প্রকল্প: আমরা কি নিঃসঙ্গ?
যদিও বেশিরভাগ অনুসন্ধান ক্ষুদ্র প্রাণের ওপর কেন্দ্রীভূত, একটি অংশ খুঁজছে বুদ্ধিমান সভ্যতার প্রযুক্তিগত স্বাক্ষর। বহির্জাগতিক বুদ্ধিমত্তা অনুসন্ধান (SETI) প্রকল্পটি দশকের পর দশক ধরে আকাশ জুড়ে রেডিও তরঙ্গের কৃত্রিম প্যাটার্ন শোনার চেষ্টা করছে। ব্রেকথ্রু লিসেন প্রকল্পটি সবচেয়ে শক্তিশালী এই অনুসন্ধান চালাচ্ছে। এখন পর্যন্ত আমরা স্পষ্ট কোনো সংকেত পাইনি।
মহাবিশ্বের সম্ভাবনার গাণিতিক রূপ: ড্রেক সমীকরণ
আমরা কতটা একা? ১৯৬১ সালে জ্যোতির্বিদ ফ্রাঙ্ক ড্রেক এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য বিখ্যাত ড্রেক সমীকরণ তৈরি করেন। সমীকরণটি মিল্কিওয়েতে সভ্যতার সংখ্যা বের করে, যার ভেরিয়েবলগুলোর প্রায় সবগুলোই এখনো অজানা। অনেকে হিসেব করে বলেন, গ্যালাক্সিতে কয়েক হাজার থেকে কয়েক কোটি সভ্যতা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
ফার্মি প্যারাডক্স: তাহলে সবাই কোথায়?
ইতালীয় পদার্থবিদ এনরিকো ফার্মি ১৯৫০ সালে এক প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তাহলে সবাই কোথায়?’ যদি এত সভ্যতা থাকার কথা, তাহলে এখনো তাদের কোনো স্পষ্ট স্বাক্ষর আমরা পেলাম না কেন? এই বিতর্ককেই ফার্মি প্যারাডক্স বলা হয়। সাম্প্রতিকতম সমাধানগুলোর একটি হলো প্রযুক্তিগত সভ্যতার আয়ু খুবই কম। একটি গবেষণা বলছে, সভ্যতার আয়ু ৫,০০০ বছরের উর্ধ্বে যেতে পারে না।
এলিয়েন কেমন দেখতে হতে পারে?
হলিউডের কল্পনা সত্ত্বেও, বিজ্ঞানীদের ধারণা অনেকটাই ভিন্ন। জ্যোতির্জীববিজ্ঞানীরা যুক্তি দেন যে কার্বন-ভিত্তিক জীবনই সম্ভাব্য, কারণ কার্বন অত্যন্ত জটিল যৌগ গঠনে সক্ষম। তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার জীবন কল্পনা করেন অনেকে। একসময় ধারণা ছিল সিলিকন-ভিত্তিক প্রাণের, কিন্তু সিলিকনের জৈব-রাসায়নিক সীমাবদ্ধতার কারণে তা খুব কম গুরুত্ব পায়।
ভবিষ্যৎ মিশন: আমরা কি প্রাণ পাচ্ছি?
২০২৭ সালে ন্যান্সি গ্রেস রোমান টেলিস্কোপ উৎক্ষেপণের কথা, যা এক্সোপ্লানেট আবিষ্কারে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। ২০৪০-এর দশকে হ্যাবিটেবল ওয়ার্ল্ডস অবজারভেটরি সরাসরি পৃথিবীসদৃশ গ্রহের ছবি তোলার সক্ষমতা রাখবে। এছাড়া ইউরোপিয়ান এক্সট্রিমলি লার্জ টেলিস্কোপ ২০২৯ সালে যাত্রা শুরু করবে। নাসার প্রশাসক বিল নেলসন মনে করেন, আগামী দশকের মধ্যেই আমরা প্রাণের অস্তিত্বের জোরালো ইঙ্গিত পেয়ে যেতে পারি। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘এখন শুধু সময়ের ব্যাপার’।
অপেক্ষার প্রহর শেষের পথে
এক্সোপ্লানেট গবেষণা এখন আর শুধু সংখ্যা বাড়ানোর প্রতিযোগিতা নয়, বরং সেখানে জীবন আছে কিনা, তা প্রমাণের চূড়ান্ত লড়াই। জেমস ওয়েবের প্রতিটি তথ্য, বায়ুমণ্ডলের প্রতি অণু আমাদের সেই উত্তরের কাছাকাছি পৌঁছে দিচ্ছে। মহাবিশ্বে আমরা একা কিনা—এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো এই প্রজন্মই পেয়ে যাবে।
আরও পড়ুন -
