‘সভ্য পৃথিবীতে চিকিৎসা ব্যবস্থার শুরু হয় আফ্রিকার গৌরব প্রাচীন মিশরের মাটিতে। আমরা আধুনিক যুগে ‘মেডিকেল কেয়ার’ বলতে যা বুঝি, তার গোড়াপত্তন হয়েছিল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০০ সালে।’ যখন পৃথিবীর বেশিরভাগ অঞ্চলে মানুষ রোগের কারণ হিসেবে জাদুবিদ্যার আশ্রয় নিত, তখন প্রাচীন মিশরীয়রা রোগ নির্ণয়, অস্ত্রোপচার ও ওষুধ প্রস্তুতের মতো বিষয়গুলোকে নিয়মতান্ত্রিক রূপ দিয়েছিল।
তারা বিশ্বাস করত জাদু ও চিকিৎসা পরস্পর সম্পূরক। "জাদু ওষুধের সাথে কার্যকর, ওষুধ জাদুর সাথে কার্যকর।" কিন্তু বিজ্ঞানের চর্চায় তারা ছিল যুগান্তকারী। ১৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকেই তাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা এত উন্নত ছিল যে গ্রিক পণ্ডিত হিপোক্রেটিসের জন্মের হাজার বছর আগেই তারা মানবদেহের জটিল রহস্য ভেদ করতে শুরু করেছিল।
চিকিৎসা বিদ্যা – প্রাচীন প্যাপিরাসের অলৌকিক কাহিনি
প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসা সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের মূল উৎস হলো কয়েকটি হাতে লেখা প্যাপিরাস। এগুলো যেন সময়ের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে। ১৮৬২ সালে আবিষ্কৃত এডুইন স্মিথ প্যাপিরাস আজ অবধি আবিষ্কৃত সবচেয়ে পুরনো সার্জিকাল নিবন্ধ। এটি ৪.৬৮ মিটার লম্বা একটি স্ক্রল, যাতে ৪৮টি ট্রমা ও অস্ত্রোপচারের কেস স্টাডি বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে।
এই প্যাপিরাসটি মোট ৪৮টি কেসের বিবরণ দিয়েছে, যা প্রধানত মাথা, ঘাড় এবং উপরের ধড়ের আঘাত সম্পর্কিত। এটি কেবল রোগের লক্ষণই বর্ণনা করেনি, বরং একটি কাঠামোবদ্ধ পদ্ধতিতে পর্যবেক্ষণ (examination), রোগ নির্ণয় (diagnosis), রোগের ভবিষ্যদ্বাণী (prognosis), এবং চিকিৎসা (treatment) দেওয়ার চেষ্টা করেছে, যা আধুনিক মেডিসিনের ক্লিনিক্যাল পদ্ধতির সাথে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, অন্যান্য প্যাপিরাসের মত এতে জাদুবিদ্যার কোনো স্থান নেই; এটি সম্পূর্ণ যুক্তিবাদী ও পর্যবেক্ষণভিত্তিক।
মস্তিষ্ক ও স্নায়ুর জ্ঞান
আপনি কি জানেন প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসকরা মস্তিষ্কের গঠন সম্পর্কে বিস্তারিত জানতেন? এডুইন স্মিথ প্যাপিরাসে ক্রেনিয়াল সিউচার (মাথার খুলির সেলাই), মেনিনজেস (মস্তিষ্কের আবরণী), সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড (মস্তিষ্কের চারপাশের তরল) এবং ইন্ট্রাক্রেনিয়াল পালসেশনের (মাথার খুলির ভেতরের স্পন্দন) মতো বিষয় বর্ণিত আছে। মজার ব্যাপার হলো, পরবর্তী জীবনে (মৃত্যুর পর) মস্তিষ্কের কোনো কাজ নেই ভেবে তারা মমি বানানোর সময় নাকের ছিদ্র দিয়ে লম্বা হুক ঢুকিয়ে মস্তিষ্ক বের করে ফেলত। কিন্তু তার আগে, জীবিত অবস্থায় মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত রোগীর চিকিৎসার সময় তারা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ক্ষতস্থান পরীক্ষা করত, স্পর্শ করে হাড় ভাঙার অবস্থা নির্ণয় করত এবং প্যারালাইসিসের (পক্ষাঘাত) সম্পর্কেও ধারণা রাখত。
হৃদযন্ত্র ও সঞ্চালন ব্যবস্থা
প্রাচীন মিশরীয়রা হৃদযন্ত্রকে শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ মনে করত। তাদের বিশ্বাস ছিল, হৃদপিণ্ডের মাধ্যমেই শরীরের সব রক্তনালী (মেটু) বিস্তৃত হয়েছে। এবার্স প্যাপিরাস অনুসারে, হৃদপিণ্ড থেকে ২২টি রক্তনালী বের হয়ে শরীরের প্রতিটি অঙ্গে সঞ্চালিত হয়। প্যাপিরাসে রক্তনালীর স্পন্দন পর্যবেক্ষণের গুরুত্বও বর্ণিত আছে – যা আধুনিক নাড়ি পরীক্ষার আদি রূপ!
ভেষজ ওষুধ ও ফার্মাকোপিয়া
এবার্স প্যাপিরাস প্রায় ৭০০টি ম্যাজিক্যাল ফর্মুলা এবং লোকজ প্রতিকারের সংকলন, যা কুমিরের কামড় থেকে পায়ের নখের ব্যথা সবকিছুর চিকিৎসার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এটি প্রায় ২০ মিটার লম্বা একটি স্ক্রোল, যাতে ৮৭০টিরও বেশি প্রতিকার (রেমেডি) লিপিবদ্ধ ছিল।
এতে যে সমস্ত রোগের কথা বলা হয়েছে তার তালিকা দেখলে চোখ কপালে ওঠার কথা:
ডায়াবেটিস: আধুনিক যুগের বহু আগেই মিশরীয় চিকিৎসকরা ‘পলিউরিয়া’ (অতিরিক্ত প্রস্রাব) লক্ষ্য করে ডায়াবেটিস চিহ্নিত করেছিলেন। এর চিকিৎসায় তারা এল্ডারবেরি, দুধ, বিয়ার ও খেজুরের মিশ্রণ ব্যবহারের পরামর্শ দিতেন।
জন্মনিয়ন্ত্রণ: খেজুর, বাবলা গাছের অংশ এবং মধু মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করে তা উলের সাথে মিশিয়ে পেসারি (যোনিপথে স্থাপনযোগ্য ওষুধ) হিসেবে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
ক্যান্সার: প্যাপিরাসে ‘টিউমার’ শনাক্তকরণ এবং ‘উষ্ণতা ও শক্ত টিউমার’ যা অপসারণ করা কঠিন, এমন বর্ণনা পাওয়া যায়।
ডিপ্রেশন ও মানসিক রোগ: মিশরীয়রা ‘মেলানকোলিয়া’ (বিষণ্নতা) কে একটি নির্দিষ্ট রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল এবং এর চিকিৎসায় ওষুধের বিধান ছিল।
অন্যান্য রোগ: হৃদরোগ, পেটের পীড়া, অন্ত্রের রোগ, পরজীবী সংক্রমণ, চোখের রোগ ও স্ত্রীরোগ সংক্রান্ত জটিলতার ওষুধের বিশদ বিবরণও এতে মেলে।
দন্তচিকিৎসা
এবার্স প্যাপিরাসে মুখের ব্যথা, মাড়ির প্রদাহ (gingivitis), পিরিওডন্টাইটিস এবং দাঁতের গহ্বরের (cavities) চিকিৎসার প্রায় ৮৭০টি প্রতিকারের কথা বলা হয়েছে। দাঁতের ব্যথা কমাতে তারা জিরা ও ধূপের মিশ্রণ ব্যবহার করত।
পেশেথে (Peseshet): ইতিহাসের প্রথম নারী চিকিৎসক?
আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৪০০ অব্দের দিকে প্রাচীন মিশরে পেশেথে নামে এক নারী চিকিৎসকের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। রোয়ার মিডিয়ার একটি প্রতিবেদনে তাকে ‘পেশায় ডাক্তার’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যিনি ভোরে উঠে শহরের ঘরে ঘরে গিয়ে অসুস্থদের চিকিৎসা করতেন এবং শিক্ষানবিশদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিতেন। তাকে ইতিহাসের প্রথম নারী চিকিৎসক হিসেবে ধরা হয়।
চিকিৎসার দেবতা ও দেবী
প্রাচীন মিশরে চিকিৎসার দেবতা ছিলেন ইমহোটেপ (Imhotep)। খ্রিস্টপূর্ব ২৭০০ শতকের এই প্রতিভাবান ব্যক্তি শুধু চিকিৎসকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন স্থপতি, প্রকৌশলী ও প্রধান মন্ত্রী। স্টেপ পিরামিডের স্থপতি হিসেবে খ্যাত এই ব্যক্তিকে পরবর্তীকালে দেবত্ব দেওয়া হয়।
কামড়ানো প্রাণী অনুযায়ী দেবতাও বদলে যেত। বিষাক্ত পোকা কামড়ালে ডাকতেন দেবী সেরকেতকে (Serket)। আর অস্ত্রোপচারের সময় ডাকা হতো দেবতা সোবেককে (Sobek)।
মমিকরণ – মৃত্যুকে জয় করার রাসায়নিক সূত্র
মমি বানানোর প্রক্রিয়া শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এটি ছিল অ্যানাটমি ও রসায়নের এক চমৎকার মিশ্রণ। যারা মমি তৈরির পুরো খরচ বহন করতে পারত, তাদের জন্য প্রক্রিয়াটি ছিল দীর্ঘ ও জটিল।
৭০ দিনের প্রক্রিয়া:
মস্তিষ্ক অপসারণ: নাকের ছিদ্র দিয়ে লম্বা ধাতব হুক ঢুকিয়ে মস্তিষ্ক বের করে ফেলা হতো। মস্তিষ্ককে ‘অপ্রয়োজনীয়’ অঙ্গ মনে করে ফেলে দেওয়া হতো。
অভ্যন্তরীণ অঙ্গ অপসারণ: পেটের বাম পাশে একটি ছেদ ফেলে ফুসফুস, যকৃত, পাকস্থলী ও অন্ত্র বের করে নেওয়া হতো। তবে হৃদযন্ত্রকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেহের ভেতরেই রেখে দেওয়া হতো, কারণ পরকালে বিচারের সময় এটি প্রয়োজন ছিল বলে ধারণা করা হতো।
শুষ্ককরণ: দেহটি নাট্রন (Natron) নামের এক বিশেষ লবণে ৪০ দিন ডুবিয়ে রাখা হতো, যা প্রাকৃতিকভাবে শরীর থেকে সমস্ত আর্দ্রতা শোষণ করে নিত।
মোড়ানো ও তেল মাখানো: শুকনো দেহের ভেতরে লিনেন কাপড়, ভেষজ ও বালি ভরে প্রাকৃতিক আকার ফিরিয়ে আনা হতো। তারপর সারা শরীরে মূল্যবান তেল মাখিয়ে লিনেন কাপড়ের স্তরের পর স্তর জড়ানো হতো। প্রতিটি স্তরের মাঝে রাখা হতো বিভিন্ন সুরক্ষা মূলক তাবিজ।
জ্যোতির্বিজ্ঞান – তারাদের সাথে যাদের বন্ধুত্ব
প্রাচীন মিশরীয়রা তারাদের এত কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করত যে তারা প্রায় নভোচারীদের মতো আকাশ বুঝত। তাদের জ্যোতির্বিজ্ঞান ছিল সময় গণনা, ক্যালেন্ডার তৈরী, নীল নদের বন্যার পূর্বাভাস এবং ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ক্যালেন্ডার ও সিরিয়াস তারকা
প্রাচীন মিশরীয়রা পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম সৌর ক্যালেন্ডার ব্যবহার শুরু করে। তারা চন্দ্র ও নাক্ষত্রিক পর্যবেক্ষণ একসঙ্গে ব্যবহার করে একটি ৩৬৫ দিনের বর্ষপঞ্জি তৈরি করেছিল। তাদের ক্যালেন্ডারে ৩০ দিনের ১২টি মাস ছিল এবং বছরের শেষে ৫টি অতিরিক্ত দিন যুক্ত করা হতো।
তাদের জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভিত্তি ছিল সিরিয়াস (Sothis) তারকা। তারা লক্ষ্য করেছিল, যখন সিরিয়াস তারকা সূর্যের সাথে একত্রিত হয়ে উদিত হয় (heliacal rising), তখনই নীল নদের বন্যা শুরু হয়। এটি এতটাই নির্ভুল ছিল যে বন্যার সময় মাত্র ১২ মিনিটের ব্যবধানে অনুমান করতে পারত তারা! এই আবিষ্কারের মাধ্যমে তারা ফসল রোপণের সঠিক সময় নির্ধারণ করতে পারত।
ডেকান ও তারাঘড়ি
সময় নির্ধারণের জন্য প্রাচীন মিশরীয়রা আকাশকে ৩৬টি ডেকানে (Decans) বিভক্ত করেছিল। ডেকান হল ৩৬টি নক্ষত্রপুঞ্জ, যা ১০ ডিগ্রি করে ৩৬০ ডিগ্রির পথ পরিভ্রমণ করে।
তারা মেরখেট (Merkhet) নামে একটি সময় পরিমাপক যন্ত্র আবিষ্কার করেছিল। এটি ছিল একটি প্লাম্ব লাইন যুক্ত কাঠের হাতল, যা দিয়ে তারা ডেকানগুলির অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে রাতের সময় নির্ধারণ করত। এটি ছিল পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্র।
ডেনডেরা জ্যোতিষ্ক (Dendera Zodiac)
হাথোর মন্দিরের সিলিংয়ে খোদাই করা ডেনডেরা জ্যোতিষ্ক প্রাচীন মিশরীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের সবচেয়ে বিস্ময়কর নিদর্শন। এই বৃত্তাকার ভাস্কর্যটিতে রাশিচক্রের সমস্ত চিহ্ন এবং সেই সময়ে দৃশ্যমান পাঁচটি গ্রহের (বুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি ও শনি) অবস্থান খোদাই করা আছে। এত নিখুঁতভাবে গ্রহের অবস্থান চিত্রিত করা হয়েছে যে আধুনা জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলেছেন, এই আকাশের চিত্রটি খ্রিস্টপূর্ব ৫০ সালের ১৫ জুন থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে কোনো এক সময়ের।
পিরামিড ও নক্ষত্রের রহস্য
গিজার পিরামিডগুলোর অবস্থান নির্ণয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ব্যবহার ছিল অসাধারণ। গ্রেট পিরামিডের ভেতরের বায়ু নালিগুলো (air shafts) ঠিক সেসব তারার দিকে ইশারা করে যেগুলো মিশরীয়রা পরকালের সাথে সম্পর্কিত বলে বিশ্বাস করত।
বিখ্যাত ওরিয়ন করিলেশন থিওরি (Orion Correlation Theory) অনুসারে, গিজার তিনটি পিরামিডের অবস্থান ওরিয়ন (Orion) নক্ষত্রমণ্ডলের বেল্টের তিনটি তারার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। কারণ প্রাচীন মিশরীয়রা বিশ্বাস করত ওসিরিস (Osiris) দেবতা ওরিয়ন নক্ষত্রমণ্ডলে বাস করেন, তাই ফারাওদের আত্মা যাতে পরকালে তার কাছে যেতে পারে সেজন্য পিরামিডগুলোকে ওরিয়নের সাথে মিল রেখে তৈরি করা হয়েছিল।
প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসা বিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞান তাদের সময়ের তুলনায় যুগান্তকারী ছিল। শল্যচিকিৎসা থেকে শুরু করে মানবদেহের জটিল গঠন বোঝা; নীল নদের বন্যার পূর্বাভাস থেকে শুরু করে পিরামিডের নিখুঁত স্থাপত্য – সর্বত্র তাদের বিজ্ঞানচর্চার ছাপ স্পষ্ট।
আরও পড়ুন -
